Sukdeb Chattopadhyay

Classics

5.0  

Sukdeb Chattopadhyay

Classics

ভিখারি

ভিখারি

6 mins
5.3K


ডাকটা চেনা হয়ে গেছে। প্রতি সোমবার সকালে খঞ্জনী বাজিয়ে নাম সংকীর্তন করতে করতে হাজির হয় লোকটা। মাথায় সাদা পাগড়ী, অঙ্গে সাদা শার্ট আর ধুতি। চুল দাড়ি ধবধবে সাদা। একহারা টানটান চেহারা। বাড়ির সামনে এসে গান থামিয়ে গৃহস্থের উদ্দেশ্যে হাল্কা করে ডাক “জয় নিতাই”। এক আধ দিন আবার একটু বেশি সকালে চলে আসে। আমরা তখনো হয়ত ঘুম থেকে উঠিনি। তাই ডাকে কোন রেসপন্স না পেয়ে বাধ্য হয়ে তখন কলিং বেল বাজায়।কলিং বেল বাজিয়ে কেউ ভিক্ষা চাইলে আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়। তবে মেজাজ যেমনই থাক ওই লোকটিকে কখনো বিমুখ করিনি। সামনে যা দুচারটে পয়সা থাকে দিয়ে দিই। আমার স্ত্রী শ্রাবণী ধর্মপ্রাণা মহিলা। ও এই আধা ভিখারি আধা সাধুটিকে দশ বিশ টাকা, সঙ্গে মাঝে মাঝে চাল, ডাল, আনাজপাতিও দেয়।স্বাভাবিক কারণেই লোকটি আমার থেকে আমার স্ত্রীকেই বেশী পছন্দ করে।এ নিয়ে তামাশা করে শ্রাবণীকে বলি, যে লোকটারএকটু দোষ আছে। আমার বাড়ির পাওনা গণ্ডা মিটে গেলে অনেক আশীর্বাদ আর ভাল ভাল কথা বলে আবার খঞ্জনী বাজিয়ে গান করতে করতে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে রওনা হয়। বাড়িতে নানা রূপে, নানা অছিলায়, অনেক ভিখারি আসে, কিন্তু এই বৃদ্ধের প্রতি আমাদের একটা টান এসে গেছে। কোন সোমবার সকালে “জয় নিতাই” ডাকটা না শুনতে পেলে একটু আশঙ্কা, একটু অভাব বোধ মনে ঘুরপাক খায়।

এক রবিবার দুপুরবেলায় সস্ত্রীক আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে বেরিয়েছি। কিছুটা যাওয়ার পর এক অনাথ আশ্রমের দিকে চোখ পড়ল। আমাদের বাড়ী থেকে কিছুটা দূরে রাস্তার ওপরেই পড়ে আশ্রমটা। বহুবার সামনে দিয়ে যাতায়াত করেছি। ওখানে কিছু সাহায্য করার ইচ্ছে অনেকদিন থেকেই রয়েছে। তবে তা পরিকল্পনার স্তরেই রয়ে গেছে, এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। আশ্রম সংলগ্ন ছোট মাঠটায় খাওয়া দাওয়া হচ্ছে। মাঝে মাঝে কোন সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে এই অভাগা শিশু ও কিশোরগুলি একটু ভালমন্দ খেতে পায়। দেখতে ভাল লাগে। গাড়ি থেকে নেমে আশ্রমের গেটের সামনেটায় গিয়ে দাঁড়ালাম। হঠাত কানে এল “জয় নিতাই”। আরে, এতো চেনা গলা! গেট দিয়ে একটু ভেতরে উঁকি মেরে দেখি হ্যাঁ, সেই লোক। ঘুরে ঘুরে বচ্চাগুলোর খাওয়া দাওয়া তদারকি করছে। কার কি লাগবে জিজ্ঞেস করছে।

শ্রাবণী বলল- নিজের বোধহয় কোন বাড়ী ঘর নেই, ও মনে হয় এখানেই থাকে।

উৎসাহিত হয়ে আর একটু ভেতরে ঢুকলাম। আশ্রমের লোকজন পরিবেশন করছে। বাড়ির বারান্দার একটা ধারে রান্না খাবার রাখা আছে। একজন বয়স্কা মহিলা একটা ছোট টুলে বসে স্টোর থেকে পরিবেশনের লোকেদের খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। আর একটু ভেতরে যেতেই লোকটি আমাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল। মুখে তার খুশির ছটা। -- বাবুরা এখানে ?

--এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তোমায় দেখতে পেয়ে চলে এলাম।

--এই দুটো চেয়ার নিয়ে আয়, এস মা জননী...

বললাম, এক যায়গায় নিমন্ত্রণ আছে সময় নেই, বসা যাবে না। কোন ওজর আপত্তি না শুনে আমাদের প্রায় টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে একটা গাছের ছায়ায় চেয়ার পেতে বসাল।

পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল একজন মাঝ বয়সী লোক। আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল –সুমন্ত, সুমন্ত সরকার। ওই এই আশ্রমের সেক্রেটারি।

--বাবু, তোমরা একটু বস। বাচ্চাগুলো খাচ্ছে, ওখানটা একবার ঘুরে এখনি আসছি।

লোকটি চলে গেলে সুমন্তকে জিজ্ঞেস করলাম—উনি কি এখানেই থাকেন?

--না না, গোঁসাইয়ের বাড়ী এখান থেকে দু কিলোমিটার উত্তরে, রুইয়াতে।

--তা এখানে কি করেন?

--আশ্রমের কেউ না হয়েও উনিই আশ্রমের সব, অভিভাবক বলতে পারেন। মাসে একবার অন্তত বাচ্চাগুলোকে পাত পেড়ে খাওয়ান। এ ছাড়া জামা, প্যান্ট, খাতা, পেন তো আকছারই এনে দিচ্ছেন।

কথার মাঝেই “জয় নিতাই” ফিরে এল।

কথায় কথায় জানলাম, ওর নাম শুকদেব গোস্বামী। পদবী ছিল সরকার, দীক্ষা নিয়ে গোস্বামী হয়েছে।

বললাম—আমার নামও তো শুকদেব।

--ওই জন্যই তো এত টান কত্তা।

জিজ্ঞেস করলাম—ভিক্ষা কর কেন?

--সে অনেক গল্প কত্তা। মোটামুটি একটা চাকরি করতাম। তারই ভরসায় বিয়ে, ঘর সংসার, সবই করেছি। মেয়েটার বিয়ে দিয়েছি। ছেলেটাও বড় হয়েছে। কারখানায় কাজ করে, বিয়েও করেছে। রিটায়ার করার পরে সংসারটা একটু বাড়াবার ইচ্ছে হল। ব্যাস ওইখানেই যত বিপত্তির শুরু।

--সে তো হবেই। রিটায়ারের পরে সংসার বাড়াবে, এমন কাজ কোন বাড়ির লোক মানবে বল তো?

গোঁসাই হেসে বলে—না না, তুমি যেমনটা ভাবছ তা নয়। এই আশ্রমটা তখন সবে হয়েছে। প্রায়ই আসতাম। বাচ্চাগুলোকে দেখে বড় কষ্ট হত।ওরাও তো কারো না কারো সন্তান। মায়ায় জড়িয়ে গেলাম। কিন্তু আমার সঙ্গতি কোথায়? পেনসনের সামান্য কটা টাকায় তো কিছু হবে না। তাই বাড়ী বাড়ী ঘোরা ছাড়া আর তো আমার কোন উপায় নেই।

--এই যে ভিক্ষা কর, বাড়ির লোকে কিছু বলে না।

--বলবে না আবার। প্রথমে বউ, ছেলে, মেয়ে, অনেক মানা করেছে। তারপর বচসা, তিরস্কার, গালমন্দ।তবে ছেলে যেদিন আমার গায়ে হাত তুলতে এল সেদিন গিন্নি আমার পাশে এসে দাঁড়াল। শুধু পাশে দাঁড়ানই নয়, ছেলেকে সেদিনই বাড়ী থেকে বার করে দিল। আর সেই থেকে আমার সমস্ত পাগলামিতে ও সঙ্গ দেয়। কেবল ভিক্ষার সময় সঙ্গে নিই না। বাড়ির বৌ তো মনটা সায় দেয় না।

--ভিক্ষা করাটা তো সকলে দেখছে, কিন্তু এই যে এত দান ধ্যান কর তা ছেলে, মেয়ে, পাড়া প্রতিবেশীরা জানে?

-- দান তো তোমরা করছ বাবা মায়েরা, আমি তো কেবল সেগুলো জড় করি। আশ্রমের ব্যাপারটা আমি বরাবর আড়ালে রাখতে চেষ্টা করেছি কিন্তু কেমন করে জানি জানাজানি হয়ে গেছে।

--তুমি একটা ভাল কাজ করছ, তা গোপন করবে কেন? এই ব্যাপারে মহাপুরুষদের পরামর্শের সাথে আমি একমতনই। ভাল কাজের কথা লোকে জানলে তবেই তো এগিয়ে আসবে সাহায্য করতে। তাতে তোমার এই বড় সংসারের মানুষগুলোও আর একটু ভাল থাকতে পারবে।

--এটা তুমি ভুল বলনি বাবু। আগে যারা ফিরেও তাকাত না এখন না চাইতেই তাদের অনেকে মাঝে মাঝে বিশ পঞ্চাশ হাতে গুঁজে দেয়। আশ্রমের খবরাখবর নেয়।

 

মানুষ চেনা বড় সহজ নয়। এতদিনের দেখা এক ভিখারির কি অনন্য রূপ প্রত্যক্ষ করলাম।নতুন করে মানুষটাকে জানলাম।

 

এক দৃষ্টে চেয়ে আছি দেখে ও শুধোলো—বাবু, অমন করে কি দেখছো?

--তোমাকে।

--সেকি, আমারে আবার নতুন করে কি দেখবে? এই ভিখারি তো কবে থেকে তোমাদের বাড়িতে গিয়ে হাত পাতছে।

-- গোঁসাই, আমরা সকলেই কোন না কোন সময় ভিক্ষা করি। রাজনীতির কারবারিরা ভোটের আগে বাড়ী বাড়ী গিয়ে ভিক্ষা করে। আবার ভোটে জিতে গদিতে বসার পরে তাদেরই কাছে ইচ্ছায় হোক বা বাধ্য হয়ে আমরা অনেকেই কৃপা ভিক্ষা করতে যাই। জীবনে ওপরে ওঠার তাগিদে মানুষ কতজনের কাছে কতকিছু হারিয়ে নিজের ভিক্ষার পাত্র পূর্ণ করার সাধনায় মেতে থাকে। কেউ উঠতে পারে, কেউ পারে না। এ সবই ভিক্ষা। তবে এর সবটাই নিজের অথবা আত্মজনের জন্য।তোমার ভিক্ষা অপরের জন্য।

আপন ঘর, আপন জন,

এতেই ব্যস্ত সবাই,

কিন্তু পালতে গিয়ে অন্যজনায়

ভিক্ষা করে গোঁসাই।

--অপর কেন বলছ কত্তা? আমিও তো নিজের মানুষদের জন্যেই ভিক্ষা করি। এই বাচ্চাগুলো তো আমার পর নয়, এরাও তো আমারই সংসার।

এমন ভাবে কজন ভাবতে পারে? গোঁসাইয়ের ভাবনার গভীরতায়, বিশালত্যে, আপন পরের সীমারেখাটা হারিয়ে যায়।

--তোমার এই ভাবনাটা আমাকে ভিক্ষা দাও না গোঁসাই।

--কি যে হেঁয়ালি করে কথা কও কিছু বুঝি না। চল আমার গিন্নির সাথে আলাপ করিয়ে দিই, খুশি হবে।

আমাদের নিয়ে গেল রান্নার জায়গায় টুলে বসে থাকা সেই বয়স্কা মহিলাটির কাছে।

--গিন্নি, এই বাবু আর মা জননী তোমার ভিখারি বরকে অনেক সাহায্য করে।

মহিলা স্নেহের দৃষ্টিতে আমাদের দেখে বললেন—এর সাথে বেশী মিশোনা বাবু। নিজে পাগল, তোমাদেরও পাগল করে ছাড়বে।

নিজের সুখদুঃখ, আয়েশ, সম্পর্ক, অহম্ সবকিছুকে আহূতি দিয়ে তবেই আত্মোৎসর্গের এই যজ্ঞে সামিল হওয়া যায়। এ পাগল তাড়া করে চলেছে সমাজের আভাব, অনটন, দারিদ্রকে।

বললাম- অমন পাগল কি যে সে হতে পারে মাসী! আর কত্তার পাগলামোতে তুমিও তো দেখছি বেশ মেতে রয়েছ।

--কি আর করি বল, ছেলে, মেয়ে সব এক এক করে ছেড়ে চলে গেল। আমি পাশে না থাকলে বুড়োটা যে একেবারে একা হয়ে যাবে বাবা। সত্যি কথা বলতে কি ওর ভিক্ষা করার কথা যখন প্রথম কানে এল তখন ছেলে মেয়েদের সাথে আমিও ওকে পাঁচকথা শুনিয়েছি। স্বামী ভিক্ষা করে একথা শুনলে কার না রাগ হয় বল? তারপর এই আশ্রমের কথাটা জানলাম। একদিন এসে আড়াল থেকে দেখলাম। ওকে ঘিরে ধরে বাচ্চাগুলোকে আনন্দ করতে দেখে মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। তারপর থেকে আর প্রশ্ন করিনি, পাশে থেকেছি।

অনেক দেরী হয়ে গেছে, এবার যেতে হবে। গোঁসাইকে সে কথা জানাতে ও আমতা আমতা করে বলল—বাবু, না গেলেই নয়।

বললাম—কেন?

--আমাদের সাথে যদি দুটি ডাল ভাত খেতেন বড় ভাল লাগত।

পঙক্তি ভোজে ভিক্ষালব্ধ অন্ন সেবনের এমন আন্তরিক আহ্বান ফেরাবার সাধ্য আমার ছিল না।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Classics