খামের ভাঁজে বন্দী দেশ
খামের ভাঁজে বন্দী দেশ
দরজার নিচে গলে ঢুকে পড়ে
একটা নীল খাম—
বাতাসে উড়ে আসেনি,
আকাশ থেকে পড়েনি,
কারও কাঁধে চেপে এসেছে নীরবে।
খামের রংটা অদ্ভুত শান্ত,
ঠিক যেমন শান্ত থাকে
দপ্তরের কাঁচঘেরা ঘর,
যেখানে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়
মানুষকে বাদ দিয়ে।
ভিতরে থাকে না চিঠি,
থাকে না ভালোবাসার কোনো ভাষা—
থাকে সংখ্যার গন্ধ,
নোটের ভাঁজে লুকোনো অন্ধকার।
কেউ বলে—
“এটা শুধু একটা প্রথা।”
কেউ বলে—
“এটাই নিয়ম।”
আর নিয়মের নামে
অন্যায়ের গলায় পরিয়ে দেয়া হয়
একটা সরকারি টাই।
যে হাতটা খামটা এগিয়ে দেয়
সে হাত কাঁপে না—
কারণ সে জানে,
এই কাঁপুনি বহুদিন আগেই
মেরে ফেলা হয়েছে।
যে হাতটা খামটা নেয়
সে হাতও কাঁপে না—
কারণ তার সন্তানের স্কুল ফি,
তার বাবার ওষুধ,
তার নিজের ভাঙা স্বপ্ন—
সবকিছুর দাম লেখা আছে
খামের ভেতরের পাতায়।
শহরের রাস্তায় তখনও
মিছিল হাঁটে সততার স্লোগান নিয়ে,
পোস্টারে লেখা থাকে—
“দুর্নীতি মুক্ত দেশ চাই।”
পোস্টারের আঠা শুকিয়ে যায়,
কিন্তু খামের আঠা
আরও শক্ত হয়ে লেগে থাকে।
একটা চাকরি বদলে যায়,
একটা টেন্ডার বদলে যায়,
একটা হাসপাতালের বেড বদলে যায়,
একটা মৃতদেহের রিপোর্ট বদলে যায়—
শুধু বদলায় না
খামের রং।
নীল—
ঠিক আকাশের মতো,
যেখানে আমরা স্বপ্ন ছুড়ি।
নীল—
ঠিক সমুদ্রের মতো,
যেখানে ডুবে যায় সত্য।
কখনো কখনো
খামের ভেতর ঢুকে পড়ে
একটা গ্রামের রাস্তা,
একটা স্কুলের ভাঙা ছাদ,
একটা সেতুর অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি—
সবাই গিয়ে আটকে থাকে
একই ভাঁজে।
তারপর একদিন
খামটা খুলে যায়—
সংবাদপত্রের শিরোনামে,
টিভির পর্দায়,
আদালতের কাঠগড়ায়।
কিন্তু ততদিনে
খামটা বদলে ফেলেছে ঠিকানা,
নতুন দরজার নিচে
নতুন করে গলে পড়েছে।
আর আমরা ?
আমরা দাঁড়িয়ে থাকি লাইনে—
সার্টিফিকেট হাতে,
রিপোর্ট হাতে,
আবেদনপত্র হাতে—
চোখের ভেতর লুকিয়ে রাখি
একটা প্রশ্ন,
“খামটা ছাড়া কি
দরজা খুলবে না ?”
উত্তর আসে না।
শুধু দরজার নিচে
আবারও নীরবে
গলে পড়ে
একটা নীল খাম।
