STORYMIRROR

MD ROBIUL ALAM

Tragedy Classics Inspirational

4  

MD ROBIUL ALAM

Tragedy Classics Inspirational

জোনাকি নিভে যাওয়ার আগে

জোনাকি নিভে যাওয়ার আগে

3 mins
22.8K

আজকাল প্রায়শই মনেহয় 

যেন হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে 

ঘুমের মধ্যে আমার পা ধরে কেউ টানে 

আর তৎক্ষণাৎ আমি বিছানা ছেড়ে 

বিমানের মতো উড়তে শুরু করি 


চেনা স্বপ্ন বার বার দেখতে দেখতে

স্বপ্ন দেখার আনন্দও শেষ হয়ে গেছে


এতো দিনে ওড়াও শিখে গেছি 


এবার মনেহয় আমার 

উড়ে যাওয়ার পালা 

উড়ে ঠিক নয় উবে যাবো, 

শরীর থেকে আত্মা 

উবে যাবে আমার


বয়স অনেক হয়েছে 

ছিয়াত্তর বছর 

ডায়াবেটিস 

হাই প্রেসার 

কোলেস্টেরল 

দু বার স্ট্রোকও হয়েছে


তার থেকেও বড়ো কথা 

দুটো কিডনি দুটোই 

খারাপ হতে চলেছে 

এখন ডায়ালিসিস চলছে 


একটাও বড়োলোক রোগ 

আমার আর বাকি নেই মনেহয়


এসিও এখন স্যুট করে না 

শুয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যান ঘোরা দেখি 

আর মাঝে মধ্যে

নাতি নাতনিরা এলে গল্প শোনাই, 

ডুগডুগি বাজিয়ে সাপ খেলা দেখাই 


তাও শুয়ে শুয়ে, 


এখন আমার সহধর্মিণী স্ত্রী 

সুধা, আমার একমাত্র অবলম্বন , 

ওঠা বসা খাওয়া পরা স্নান 

বাথরুম সব সব

তবে প্রথম থেকেই ছিল,


বিয়ের আগের থেকেই, 

ভালোবাসার শুরু থেকে 

শশুরের নটা মেয়ে ছিলো, 

আমার বৌ সপ্তম 

বুঝেশুনেই গরিবের মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম 

এবং বিয়ে করেছিলাম


গরিবরা টাকা দেখেনি 

তাই ভালো বাসতে শিখেছে 

এটা আমার আগাগোড়া বিশ্বাস 

তবে সত্যিও বটে 

এতো দিনে আমার স্ত্রী

আমার কূকর্মেও 

নিজের কর্তব্য যথেষ্ট 

পালন করেছে 


ছেলেরা আছে, 

সবাই প্রতিষ্ঠিত 

সবাইকে ভালোভাবেই 

দাঁড় করিয়ে দিয়েছি


একটা কিডনি ডোনারের জন্যে 

ওরাও খুব চেষ্টা করছে 

সাথে, আমাদের হাউস ফিজিসিয়ান

ডাক্তার এস মাইতিও


এতো দিনের আভিজাত্যের ভারে 

চেহারা ভাঙছে , 

পয়সায় সব পাওয়া যায়, 

সবই পেয়েছি 

শুধুমাত্র একটা মেয়ে সন্তান ছাড়া, 

মেয়ের আশায় পাঁচটা ছেলে আমার


কেউ বড়বাবু দাদাবাবু 

সাহেব ছাড়া আমাকে 

ডাকতে সাহস পায় নি 

কাউকে শিখিয়ে দিতেও হয় নি


না, আমি কোনো সরকারি 

অফিসার বা নেতা না, 

তবে একবারই মাত্র 

ভোটে দাঁড়িয়ে ছিলাম, 

তাও প্রভাবশালী হওয়ার জন্যে


কত মানুষের পিঠে 

বোঝা চাপিয়ে 

বিচারে শাস্তিও দিয়েছি, 

মাঝে মাঝে 

অন্যায়ও হয়েছে আমার 

তবে কেউ প্রতিবাদও করেনি

  

এলাকায় একচেটিয়া

রাজত্ব ছিল আমার 

কারো কিছু বেচার দরকার হলে, 

একমাত্র ক্রেতা আমি,

বিচারকও 

তাই হবেই না বা কেনো ,

ছিয়াত্তর সলে বি এ পাস


বুদ্ধিতেই রাজ্য জয় 

করেছি আর বুদ্ধিতেই 

রাজত্ব করেছি 

অবশ্য এখন সেগুলো 

বুদ্ধি নয় ফন্দি মনেহয়


এখন চোখের চশমাটাও 

ভারী মনে হয় আর 

মাঝে মাঝে দরকার ছাড়াই 

শুধা শুধা বলে ডাকি 

শুধা জেনে গেছে যে 

আমি এমনি এমনি ওকে ডাকি


শুধা কিছুক্ষন বাদে বাদেই এসে 

আমার কপালে চোখে 

ভিজে রুমাল বুলিয়ে মুছে দেয়, 

গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, 

ছেলে বৌমা নাতি নাতনিদের 

গল্প শোনায়


আর কাজের মেয়ে তুলসী তো 

সারাক্ষণ থাকে, 

ওর কোনো ঘেন্না কষ্ট কিচ্ছু নেই 

আমার ইউরিন ব্যাগ পাল্টানো থেকে 

শুরু করে নোংরা ঝোংরা পরিস্কার 

সব কাজ


করে, 

ঐটুকু মেয়ে, মাধ্যমিক ফেল 

তবুও আয়ার মতন ফরওয়ার্ড, 

একবারেই সব শিখে নেয় 

হ্যাঁ, মাইনে ভালো দিই ঠিকই 

তবে টাকায় কি সব হয়?


এখন সকাল দশটা 

আজকে আমার 

কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের ব্যাপারে 

কি সব রিপোর্ট আসার কথা 

ডাক্তার মিত্র আর ছেলেরা মিলে

আলোচনা করছে পাশের ঘরে


আমি অবশ্য শুনতে পাচ্ছি সব

বড় ছেলে সুধা কে ডাকলো 

: মা, ওমা, একটু এই ঘরে এসো

-বল , কিছু উপায় হলো?

সুধা মনেহয় মুহূর্তের মধ্যে ঢুকলো


তারপর কিছুক্ষন নিস্তব্দ 

এবার ডাক্তার মিত্রর গলা : 

বৌদি একটাই উপায়, 

আপনার রিপোর্ট তা ঠিক মিলছে, 

এখন আপনি রাজি


না! 


যেন বেশ জোরেই বললো সুধা,

এর থেকে অনেক অনেক 

আস্তে বললেও সবাই 

অনায়াসে শুনতে পেত


তারপর আবার ডাক্তার মিত্রর গলা : 

বৌদি আর একবার ভেবে দেখুন, 

আপনার জন্যে দাদার 

জীবনটা বাঁচতো, আপনারও 

খুব ক্ষতি না, 

একটা কিডনি দিলে তাতে


এবারও কথা শেষ হওয়ার আগেই 

সুধা বললো 

না, আমি পারবো না


হ্যাঁ, এবারে সুধা 

অনেক আসতে বলেছিল ঠিকই, 

তবে আমার কানে এতো জোরে 

এতো জোরে আওয়াজ হলো 

যেনো আমার কানের পর্দা ফুঁড়ে 

ত্রিশুলের মতন 

মগজে বিধে গেল


এতো দিনে অনেক অত্তাচার করেছি

কিন্তু এরকম নিরুপায় মৃত্যুদণ্ড আর্তনাদ, জীবনে কখনো শুনি নি


দুবার আমার ষড়যন্ত্রে 

দুটো নেতা পাবলিকের হাতে 

মারা যায় 

অবশ্য দুজনেই অসৎ ছিলো তাই


এরকম নৃশংস হত্যাকারী 

নিজেকে কখনো মনে হয় 


এখন আমি কাঁদতেও পারছি না, 

এ পরাজয় সবার সামনে 

বিবস্ত্র হওয়ার মতো লজ্জাজনক হবে 

তার চেয়ে বরং আমার ভিতরেই 

এ কথা আমার অজানা হয়ে থাক্


হঠাৎই আমার মায়ের মতন 

একটা গলা শুনতে পেলাম : 

ডাক্তারবাবু, 

আমারটা একবার দেখুন না হয় কি 


ওহ, এটা কাজের মেয়ে তুলসীর গলা

ঠিক আমার আট বছর বয়সে 

বিশাল জন্ডিসে আমার মা যেমন ভাবে 

ডাক্তারের চেম্বারে কেঁদে উঠেছিল, 

এটাতো তেমনই গলা 


মুহুর্তের মধ্যে আমি যেন অনুভব করলাম আমার দুটো কিডনি ঠিক হয়ে গেছে


হাত পা দেহ সচল হয়ে গেছে 

ডায়াবেটিস 

হাই প্রেসার 

কোলেস্টেরল 

স্ট্রোক

সব সব সব

ভালো হয়ে গেছে


কিন্তু

এবার আর ঠকাতে পারলাম না 

ভাবলাম, শেষবারের মতো, 

অন্তত জীবনে একবার 

কারো রক্ত চোষা বন্ধ করি 

কাউকে না ঠকিয়ে, 

সুযোগ না নিয়ে


অন্তত একবার, একবার 

মানুষ হওয়ার শেষ সুযোগটা 

কাজে লাগাই 


জোনাকি নিভে যাওয়ার আগে 

কাউকে মায়ের মতো 

ভালোবাসি একবার



এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali poem from Tragedy