STORYMIRROR

Partha Pratim Guha Neogy

Abstract

4  

Partha Pratim Guha Neogy

Abstract

সুখী গৃহকোণ

সুখী গৃহকোণ

6 mins
398

জীবনে আনন্দ', সুখ এই সব কথাগুলি বহুবার শোনা কথা - সবাই শোনে । কাকে আনন্দ, কাকে সুখ বলে কে জানে । আজকাল খুব ভাবি । কিন্তু ভেবেও কুল পাইনা। কখন মনে হয় যেটা ভাবছি সেটাই ঠিক, পরক্ষনেই মনে হয় না ওটা সঠিক নয়।


আবাসনের এই আকাশছোঁয়া বারান্দাটায় বসে ভাবি । এ বাড়িটায় ভুল করেও কোনো আর্থ্রোপোডা অ্যানেলিডা(প্রজাপতি, চিংড়ি, আরশোলা, কাঁকড়া ইত্যাদি ) ঢুকে আসে না । রোজ সকালে দুজন লোক সারা বাড়ি ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে । রান্নাঘরে চিমনি, ঝুলকালি জমার উপায় নেই । মডিউলার কিচেন । সব জিনিসের মাপমতো খোপ । আরশোলারা থাকবে কোথায় !


আমাদের সেই পুরোনো যৌথ পরিবারের বাড়িতে সাত আটটা হুমদো বিড়াল আসাযাওয়া করত । কিন্তু তা সত্ত্বেও ছুঁচো ইঁদুর কম ছিল না । রান্নাঘরে ইয়া বড় বড় ছুঁচো ঘুরে বেড়াত । ইঁদুর কম ছিল । ইঁদুরগুলো থাকত ছাইগাদার দিকটায় লুকিয়ে বাইরে থেকে বোঝা যেত না । ওদের কেউ কিছু বললে,মা পিসিমারা হৈ হৈ করে উঠে বলতেন , `আহা ষষ্ঠীর জীব । ওরাই বা কোথায় যাবে ।'


এখনকার এই রান্নাঘরে ছুঁচো ইঁদুর দূরের কথা, একটা টিকটিকি পর্যন্ত নেই । এমনকি পিঁপড়েও নয় । আমার গৃহিণীর কড়া নজর । নিজেকে যেমন সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে জানেন, তেমন বাড়িটাকেও । পশুপাখি কীটপতঙ্গ দূরের কথা, মানুষের বাচ্চাও নেই ।


আমার একমাত্র ছেলে স্যাণ্ডি (শখ করে নাম রেখেছিলাম সন্দীপ, সে এখন `স্যাণ্ডি' হয়ে গেছে), ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ে, রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে থাকে, বছরে একবার বাড়ি আসতেও ভালো লাগে না তার । ছুটির সময় বিদেশে বেড়াতে যায় । সে স্বয়ম্ভূ একটা গাছের মতো ।


গাছ ! নাকি শ্যাওলা ! শিকড় আঁকড়ে থাকায় বিশ্বাস নেই এ প্রজন্মের । ভেসে ভেসে বেড়াবে । সেই প্রথম এককোষী প্রাণীটার মতো । অ্যামিবা । প্রোটোজোয়া । স্বয়ম্ভূ । শুধু নিজের বেঁচে থাকার সময়টা নিয়েই ভাবনা । কারো জন্যে কোনো পিছুটান নেই, দায় নেই । আচ্ছা বলুন তো শিকড় ছাড়া টান বা বন্ধন তৈরী হয়। আমিও সঠিক জানিনা - আর এখন জানার চেষ্টাও করি না।


ওর দোষ নেই । ওকে আমরাই এমন মানুষ করেছি । ফুটফুটে ছেলেটাকে মা কি করে ছেড়ে থাকে ভাবি । পাছে ছেলে নিয়ে আমি আদিখ্যেতা করি, তা নিয়ে শ্রীমতি ও তাঁর আপনজনেরা খুব যত্নবান ছিলেন । ছেলের সঙ্গে আমার কোনো মানসিক সম্পর্কই গড়ে ওঠেনি । কে বোঝাবে এদের যে মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক জৈবিক নিয়মেই থাকার কথা, বাবার সঙ্গে তা নয় । লালনপালনের মধ্যে দিয়ে কত যত্নে গড়ে তুলতে হয় ।


এতবড় বাড়িটা.. একটা শিশুর কলকাকলি, একটি অভিমানী কিশোরের আবেগ পেল না । এ বাড়িতে সব সাজানো পরিপাটি সুন্দর । অপ্রয়োজনীয় অনাবশ্যক কোনো জিনিসের জায়গা নেই । আবেগের তো নয়ই ।


উঁহু । ভুল হল । বাড়ি না, ফ্ল্যাট ।


আমার এই আড়াই হাজার স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে ঝলমলে সুখ । ক্যাবিনেটে ক্রিস্টালের শোপিস থেকে ডোকরার মূর্তি, দেওয়াল জুড়ে যামিনী রায়, সবুজ ল্যাম্পস্ট্যাণ্ডের সোনালি টোপর, কাঁচের সেন্টারটেবিলের নিচে সুচারুভাবে বিন্যস্ত ম্যাগাজিন, গোল ডাইনিং টেবিলের পাশে ঘননীল ফ্রিজ । বাঁকুড়ার পোড়ামাটির ঘোড়া, জয়পুরী মিনার কাজ করা ফুলদানি, এমনকি দরজার মাথায় শ্বেতপাথরের গণেশমূর্তি পর্যন্ত উপস্থিত । সিলিং থেকে ঝাড়বাতি । ঘরের কোণে প্লাস্টিকের ফুল, প্লাস্টিকের সবুজ পাতা । কাটাগ্লাসের শৌখিন ফুলদানিতে তাজা গোলাপ । পেতলের লম্বা ফুলদানিটার ওপর একটা পালকি বসানো ।


যেখানে যেটা মানায় । সুখী গৃহকোণ একেই বলে বোধহয় ।


আচ্ছা, সুখ কাকে বলে ! এই যে রোজ স্যুট-টাই সাজে অফিস যাই, শনিবার হলেই ক্লাব নয় পার্টি, সুন্দরী শিক্ষিতা স্ত্রী, সাজানো সংসার, বছরে একবার বিদেশ ট্যুর.. একেই তো সুখ বলে । আচ্ছা, সুখ মানেই কি আনন্দ ! আমার মেধাবী খুড়তোতো দাদা , যে এখন একটা সরকারি ব্যাঙ্কের কেরাণী আর সবচেয়ে ভালোমানুষ বড়দা , যে এখন একটা মুদির দোকান চালায়.. তাদের জীবনটা তো কেউ সুখের জীবন বলবে না । আমার আরেক দাদা অবশ্য প্রোমোটারি করে সুখের জীবন কাটাচ্ছে, কিন্তু তার কাছেও আমার জীবনটা বেশি লোভনীয় । অন্তত মেয়েমহলের কুটকচালি থেকে যা জেনেছি । আমার গৃহিণী আবার কুটুম্বিতায় বিশ্বাস করেন না । তাই বিশেষ জানার সুযোগ নেই আমার ।


তবে নিজের ভাইবোনের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও কাকিমা আর মনুর সঙ্গে দেখা হয় । মনু এখন বড় সরকারী অফিসার , মহাকরণে বসে । তাই আমার গৃহিণীর কাছে তার বিশেষ খাতির । মনুর দৌলতে শ্বশুরবাড়িতে আমারও খাতির বেড়েছে । মনুর বৌটিও সুন্দর রুচিশীল অভিজাত পরিবারের কন্যা, ওদের সঙ্গে আমাদের বেশ মেলে । একে অন্যের বাড়ির পার্টিতে যাই । ক্লাবেও দেখা হয় ।


মনু আর আমি আর কখনও শ্যাওলা ধরা বাড়িটার গল্প করি না । তবু ওর সঙ্গে দেখা হলেই কোনো না কোনোভাবে সেই পুরোনো বাড়ির গন্ধ বুকের মধ্যে ঢুকে পড়ে । এই তো গত শনিবারের কথা । মনুর বাড়ির পার্টি । পার্টির সময় কাকিমা নিজের ঘরে থাকেন । আমি একফাঁকে টুক করে গিয়ে প্রণাম সেরে আসি । সেদিনও তাই গেছিলাম । ঘরে ঢুকে দেখি, ন'কাকিমা টিভি দেখছেন । আর দু'চোখ উপছে দু'গাল বেয়ে জল নেমেছে । `কি গো কাকিমা, বাচ্চা মেয়ের মতো টিভি দেখে কাঁদছ ?' আমি হেসে হেসে পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম । `এই সিরিয়ালটা দেখলেই বড্ড পুরানো পাড়ার কথা মনে পড়ে রে । যখন একসাথে ছিলাম, তখন মনে হত কবে মনু বড় হয়ে আমাকে এখান থেকে বার করে নিয়ে যাবে । আর এখন..' আঁচলে চোখ ঢাকলেন, `আমার বড্ড মনকেমন করে রে বাবু ।'


সেই তো । টিভির সিরিয়াল ছাড়া আজকাল আর অমন বারো ঘর এক উঠোন, গায়ে গায়ে লেপ্টে থাকা লোকজন কই ! `আমাকে একদিন মিমির বাড়ি নিয়ে যাবি বাবু ? কতদিন সেজদিকে দেখিনি । মনুকে বলতে ভয় করে । যা মেজাজ ওর বৌয়ের!'


সেজদি । মানে আমার মা । চার চারটি ডাগর ছেলে থাকতে যাঁকে মেয়ের কাছে থাকতে হয় । ছেলেদের সংসারে আমার মায়ের জায়গা হয়নি । মিমি , আমার ছোট্ট বোনটা । কবে যে আমাদের সবার চেয়ে বড় হয়ে উঠে মা-বাবার শেষ আশ্রয় হয়ে রইল ।


বড়জ্যাঠা অত কাণ্ড করে আলাদা হয়ে গেলেন, এখন দুই বুড়োবুড়ি চন্দননগরের কোন্‌ বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন । মেজজ্যাঠা আর আমার বাবা এক বছরের মধ্যে গত হয়েছেন । মেজজ্যেঠিমা নিজের কোন এক দূর সম্পর্কের বোনের বাড়িতে আছেন । ফুলদি রাঙাদি কেউই তাদের মাকে নিয়ে যায়নি ।


ছোটকাকা কাকিমা অনেকদিন পুরোনো বাড়ি আঁকড়ে পড়েছিলেন, মামলায় হেরে গিয়ে ওপাড়াতেই বাড়িভাড়া করে আছেন । তিন ছেলেমেয়ে কেউ সঙ্গে থাকে না । বড়পিসিমা কোন্‌ আশ্রমে দীক্ষা নিয়ে চলে গেছেন, সেখানেই থাকেন । ওনার মেয়ে নাকি দেখাশোনা করে ।


আমাদের সেই জমজমাট বাড়িটায় এখন ভূতের সংসার । শুনেছিলাম ওটা ভেঙে ফ্ল্যাট উঠবে । তারপর শুনেছিলাম, কি সব আইনি ঝামেলা চলছে ।


একসময় নাকি সারা পৃথিবীটাই জঙ্গল ছিল । আদিম মানুষ একা একা ঘুরে বেড়াত । সঙ্গী ছিল গাছগাছালি নদনদী আকাশ বাতাস, আর জন্তু জানোয়ার সাপ পাখি । একসময় মানুষসঙ্গের খিদে জাগল । মানুষের সঙ্গে, মেধার সঙ্গে বাসের ইচ্ছে । কবে থেকে যেন তারা দল বাঁধতে শিখল, ঘর বাঁধতে শিখল । সুখের ভাবনায় এল পরিবার । এল গ্রাম । একা একা বাঁচা নয় । সবাই মিলে থাকা । ভালো থাকার চেষ্টা । সুখ এল । স্বস্তি এল । জঙ্গল বিনাশ করে মানুষ নামের উন্নত প্রাণী সব জীবজন্তুকে গৃহহারা করে নিজেদের সংসার রচনা করল । সেই অভিশাপেই কি এল যত জটিলতা ! কে জানে । কবে থেকে আবার ঘর ভাঙা শুরু হল । যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে ভেঙে টুকরো । সাজানো গোছানো মনোরম নাগরিক জীবন জুড়ে নেমে এল জঙ্গল । বিচ্ছিন্নতা । একা একা থাকা । আপনি আর কোপনির সংসার । শেষ বয়সে কোনো ঠিকানা নেই । এখন বানপ্রস্থের ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম । আমার মায়ের তো তবু মিমি আছে ।


ছেলেদের কাঁদতে নেই । টপ করে এক ফোঁটা জল পড়ল তবু । `এই বাবু , এই..' সস্নেহে চোখ মুছিয়ে দিলেন ন'কাকিমা, `এই জন্যেই সেজদির তোকে নিয়ে এত চিন্তা । সবসময় বলে, `বাবুটাকে নিয়েই চিন্তা, ওর মনটা যে খুব নরম ।'


বলে ? মা এইরকম বলে ?


মিমির বাড়ি যাই বছরে একবার । বিজয়ার পরে । মা গালে মাথায় হাত ছুঁয়ে বুকে হাত বুলিয়ে দেয় । মুখে কথা নেই কতদিন । চোখদুটো মাছের মতো । নিষ্প্রাণ ।


ভারবাহী পশুর থেকে মাছে বিবর্তনের কোনো থিওরি লেখেননি ডারউইন সাহেব । কিন্তু আমার মায়ের মধ্যে এই বিবর্তন চাক্ষুষ করেছি আমি । সত্যি বলছি । মাছের চোখেও জল আসে ! বাবুর জন্যে কান্না আসে ?


আসলে লিখতে লিখতে বস্তাপচা সেকেলে আবেগে নিজেকে হয়ত হারিয়ে ফেলেছিলাম - না, এভাবে হারালে চলবে না। বিশ্বায়নের যুগে একটা গ্লোবাল ভিলেজের সদস্য সে ঐ সব সেকেলে সেন্টিমেন্ট রাখলে হবে।


আমাদের চেনা সেই ছোটবেলার সুখী গৃহকোণ হারিয়ে গিয়েছে, সব হারিয়ে আমরা এই নূতন 

সুখী গৃহকোণকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছি। এতে হয়ত সুখ আছে, কিন্তু শান্তি থাকবে কি?


( রচনাটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক রচনা, যদি কারোর সাথে মিল পাওয়া যায় তা অনিচ্ছাকৃত।)


তথ্য : আন্তর্জাল, বিভিন্ন পত্রিকা।


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract