Sucharita Das

Classics


2  

Sucharita Das

Classics


সম্পর্ক

সম্পর্ক

13 mins 588 13 mins 588

 অগ্নিমিত্রা সেন। অম্বরীশ সেনের পুত্রবধূ। হ্যাঁ, এই পরিচয়টাই সে দেয় সকলকে। এছাড়াও তার আরোও অনেক পরিচয় আছে অবশ্য। সেন বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী অভীক সেনের স্ত্রী সে। আর কোলকাতার এক নামকরা কলেজের অধ্যাপিকা সে। কিন্তু যে মানুষটা র জন্য আজ অগ্নিমিত্রা এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে, তার সমস্ত কাজে তার উৎসাহদাতা যিনি , সেই মানুষটার পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করাতে অগ্নিমিত্রা গর্ব বোধ করে।এই মানুষটার ঋণ সে জীবনে কোনদিন শোধ করতে পারবে না।আর করতে গেলেও ওনাকে অসম্মান করা হবে। আর তাই অগ্নিমিত্রা এইভাবেই মানুষটাকে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছে। নিজেকে তাঁর পুত্রবধূ হিসাবে পরিচয় করিয়ে।


এবার ফিরে যাওয়া যাক বছর পাঁচেক আগের অতীতে। মাস্টার্স কমপ্লিট করবার পর অগ্নিমিত্রা আর ওর বাবা মা তিনজনে বেড়াতে গিয়েছিলো কালিম্পং। পাহাড় অগ্নিমিত্রা কে চিরকাল ই টানে। তাই সে বছর ঘুরতে যাবার জন্য ও কালিম্পং কেই বেছে নিয়েছিল। বাবা মা ও একমাত্র মেয়ের আবদার ফেলতে পারেনি। যদিও ওদের বেড়াতে যাবার সময়টা খুব একটা নিরাপদ সময় ছিলো না। কারণ এইসমস্ত জায়গায় বর্ষা জুনের শুরু তেই নেমে আসে।তাও অগ্নিমিত্রার আবদারের কাছে হার স্বীকার করেছিলো ওর বাবা মা। সবাই মিলে নির্দিষ্ট দিনে রওনা হয়েছিল শৈলশহর কালিম্পংয়ের উদ্দেশ্যে। 



ওখানে গিয়ে ওখানকার সাইড সিন দেখতে গিয়েছিল ওরা।ফেরবার পথে শুরু হয়েছিল প্রচন্ড দুর্যোগ। তার মধ্যে পাহাড়ী রাস্তায় ধস নেমে, সমস্ত রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়। মনের মধ্যে এই আতঙ্ক ও ছিলো ভীষণভাবে। যদিও অল্পবয়সী ড্রাইভার ছেলেটি ওদের আধা ভাঙ্গা হিন্দিতে সাহস জোগাচ্ছিলো যে, কিছু ভয় নেই।তাও অচেনা জায়গা , ওদের মন থেকে ভয় কিছুতেই যাচ্ছিলো না। খুব সন্তর্পণে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ছেলেটি। হঠাৎই রাস্তায় এক জায়গায় ওরা দেখলো একটা গাড়ি পাহাড়ের খাঁজে আটকে আছে। অগ্নিমিত্রা দের গাড়িটা ওর পাশ দিয়ে চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ অগ্নিমিত্রা ড্রাইভার ছেলেটিকে গাড়িটা দাঁড় করাতে বললো। তারপর নিজে নেমে গাড়ির সামনে এগিয়ে গেল। গাড়িতে বছর পঁয়ষট্টির এক সৌম্য দর্শন ভদ্রলোক যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। সম্ভবত পায়ে চোট পেয়েছেন। অগ্নিমিত্রা গাড়ির দরজা খুলে আস্তে আস্তে ভদ্রলোককে ধরে নামালেন। তারপর নিজেদের গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে ফার্স্ট এইড করালো।এরপর হোটেলে নিয়ে গিয়ে নিজেদের বরাদ্দ রুমে ওনাকে বিশ্রাম নিতে বলে, নিজে গিয়ে গরম দুধের ব্যবস্থা করলো।এতে ভদ্রলোক অনেকটাই সুস্থ বোধ করছিলেন। নিজে থেকে উঠে বসলেন ভদ্রলোক। এতক্ষণে অগ্নিমিত্রা একটু নিশ্চিন্ত বোধ করলো।



একটু সুস্থ হতে ই ভদ্রলোক বললেন, নিজের হোটেলে ফিরবেন। কিন্তু যাবার আগে অগ্নিমিত্রা র সম্পর্কে যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় জেনে নিয়েছিলেন ওর বাবার কাছ থেকে।আর নিয়েছিলেন কোলকাতায় ওদের বাড়ির ঠিকানা। নিজের কার্ড ও দিয়ে গিয়েছিলেন। অগ্নিমিত্রা আর ওর বাবা গিয়েছিল ওনাকে হোটেলে পৌঁছাতে। খুব বেশি দূর ছিলো না ওদের হোটেল থেকে জায়গাটা। এরপরও অগ্নিমিত্রা ওর বাবার সঙ্গে গিয়ে যে কদিন ওখানে ছিলো, রোজ জেনে এসেছে ওনার শরীরের অবস্থা। যতটুকু প্রয়োজন যত্নও করেছে। এরপর তো সবাই কোলকাতায় ফিরেও এসেছিল। অগ্নিমিত্রা ফিরে এসে আবার নতুনভাবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে নিজের পড়াশোনার জগতে। সবকিছু ধীরে ধীরে ভুলেও গেছে। কিন্তু অনেক সময় ভুলতে চাইলেই কি ভোলা যায় সবকিছু? তার প্রমাণ অগ্নিমিত্রা কিছুদিনের মধ্যেই পেলো, যখন একদিন বিকালে অম্বরীশ সেন ওদের বাড়িতে এলেন।



অগ্নিমিত্রা প্রথমটা একটু হকচকিয়ে গেলেও, পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে ওনাকে ভিতরে আসতে বললো। তারপর যথারীতি ধীর স্থির ভাবে ওনার থেকে জানতে চাইলো ,কেমন আছেন এখন উনি। অম্বরীশ সেন ও তৎক্ষণাৎ অগ্নিমিত্রা কে জেরা শুরু করলেন যে, কেন সে নিজে থেকে এই বুড়োটাকে মনে করেনি প্রথমে। আজ উনি এখানে এলেন, আর তাই তো অগ্নিমিত্রা র মনে পড়লো ওনাকে। অগ্নিমিত্রা নিজের ভুল স্বীকার করলো। সত্যিই তো ওর কোলকাতায় ফিরে একবার খবর নেওয়া উচিত ছিল অসুস্থ মানুষটার। খুব বড়ো ভুল হয়ে গেছে ওর। ওদের কথাবার্তা র মাঝেই ওর বাবা মা এসে গিয়েছিল।সবাই মিলে অনেকক্ষণ গল্প করেছিলো ওরা। অম্বরীশ সেন এবার যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। আর অগ্নিমিত্রা আর ওর বাবা মা কে নিজের বাড়িতে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন সামনের রবিবার।



অগ্নিমিত্রার বাবা এই বয়স্ক মানুষটির আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে পারলেন না। আর তাই রবিবার বিকালে ওরা সবাই গিয়েছিল সেন বাড়িতে। প্রাচীন ঐতিহ্য পূর্ণ বাড়ি। চারিদিকে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু বাড়িতে কি আর কেউ থাকেন না? এতো খালি খালি লাগছে কেন। জিজ্ঞেস ও করা যাচ্ছে না। ওরা যেতেই বয়স্ক মানুষটি যে খুবই আনন্দ পেয়েছিলেন, তা তো তাঁর চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। আরোও দুজন ওরা যেতে বেরিয়ে এসেছিল। মায়া মাসী আর বিশ্বনাথ দাদা, এরা দুজন এই বাড়ির পুরানো কাজের লোক।একজন রান্নাবান্না করে, আর একজন ঘরের কাজ। দুজনেই এই বাড়িতেই থাকে। কোনো পিছুটান নেই দু'জনের ই। কিন্তু এই বাড়িতে তো আরও কারুর থাকার কথা। তিনি কই।এই প্রশ্নের উত্তর ওরা পেয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। অম্বরীশ সেন নিজেই সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন। ওনার স্ত্রী মালিনী দেবী বছর দশেক আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান।সেই থেকেই এই বাড়িতে উনি একা, সঙ্গীহীন। মায়া আর বিশ্বনাথ ই সেই থেকে ওনাকে দেখাশোনা করে।আর ওনার একমাত্র সন্তান অভীক তো বিদেশে ই পড়াশোনা করে, চাকরি নিয়ে , আপাতত ওখানেই আছে। মাস দুয়েক পর দেশে ফিরবে।



এর পরের ঘটনার জন্য অগ্নিমিত্রা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। অম্বরীশ সেন ওনার একমাত্র ছেলের বউ হিসাবে অগ্নিমিত্রা কে পছন্দ করেন। আর সরাসরি সেই প্রস্তাব ওর বাবা মা কে দেন। অগ্নিমিত্রার মতামত ও জানতে চান তিনি এ ব্যাপারে।দু মাস পর যখন অভীক আসবে এ দেশে, তখন সব কথাবার্তা এগোবে। তার আগে অবশ্যই অগ্নিমিত্রা এবং ওর বাবা মা কে উনি সব ব্যাপারে ভালো করে খোঁজ খবর নিয়ে , তবেই এগোতে বলেছেন। কারণ বিয়ের মতো একটা বন্ধন বলে কথা।মাস দুয়েক পর অভীকের সঙ্গে অগ্নিমিত্রার বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়।অভীক এ দেশে ফেরার পর অম্বরীশ সেন নিজে , অগ্নিমিত্রা ও তার বাবা মা কে আবার আমন্ত্রণ জানান সেন বাড়িতে আসার জন্য।সবার সম্মতি তেই এই বিয়ে হবে, এরকমই ইচ্ছা ছিল অম্বরীশ সেনের। রাশভারী মানুষটি জোর করে কারুর উপর নিজের মতামত চাপাতে চাননি কখনোই। আর এ তো বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত।



অগ্নিমিত্রা আর অভীকের বিয়ে খুব ধুমধাম করে দিয়েছেন অম্বরীশ সেন। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে অগ্নিমিত্রা পদার্পণ করার পর তিনি সংসারের সমস্ত যাবতীয় দায়িত্ব অগ্নিমিত্রা কে দিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন, "এই বুড়ো ছেলেটাকে এবার মুক্তি দে মা।"অগ্নিমিত্রা ও এই বুড়ো ছেলের আবদার মেনে নিয়েছে। সংসার থেকে শুরু করে সমস্ত দায়িত্ব নিজের উপর নিয়েছে।এই বাবা ও তো তারই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অগ্নিমিত্রার কড়া শাসনে থাকতে হতো তাঁকে।কখন কোন খাবার, কখন কোন ওষুধ,কখন হাল্কা হাঁটতে হবে,আর কতক্ষণ ই বা বিশ্রাম নিতে হবে।সমস্ত খুঁটিনাটি অগ্নিমিত্রা র নখদর্পণে। বাবার শরীরের ব্যাপারে কোনো অবহেলা সে বরদাস্ত করতে পারে না। নিয়মিত ডাক্তার কাকুকে ডেকে পাঠিয়ে, ব্লাড প্রেসার চেক করায়। এতদিনে অম্বরীশ সেন এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে , তিনি খাঁটি হীরা কে পছন্দ করেছেন তাঁর পুত্রবধূ হিসাবে।



একদিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে তিনি অগ্নিমিত্রা কে বললেন, পি এইচ ডি করবার ইচ্ছা থাকলে, অগ্নিমিত্রা যেন তা করে। এছাড়াও অগ্নিমিত্রা নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা কিছু পরিকল্পনা করছে, তা সবই ও করতে পারে।আর সেক্ষেত্রে যদি ওর এই বুড়ো ছেলেটাকে কোনো প্রয়োজন হয়, তাতে এই ছেলেটাই আনন্দ পাবে। ব্যস্ অগ্নিমিত্রা কে এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি কখনও। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী হিসাবে পরিচয় তো তার ছিলো ই। এবার বাবার উৎসাহে সে নিজের সমস্ত স্বপ্ন পূরণ করেছিলো।বছর পাঁচেক এর মধ্যেই নিজের একটা স্বতন্ত্র পরিচয় পেয়ে গিয়েছিল সে।আর এক্ষেত্রে সে তার শ্বশুর মশাইয়ের অবদান কে কোনো ভাবেই অস্বীকার করতে পারবে না। কজন শ্বশুর পারে এভাবে নিজের পুত্রবধূর স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করবার জন্য তার পাশে দাঁড়াতে। কখনও কখনও তো এমনও হয়েছে , অগ্নিমিত্রা পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়াশোনা করছে,আর অম্বরীশ সেন ওর জন্য গরম কফি করে এনে,পরম স্নেহে ওর পাশে বসে থেকেছেন। ঠিক যেমন একজন মা তার সন্তানের জন্য করে। 



অগ্নিমিত্রার মনে আছে, ওদের বিয়ের পর যখন অভীক ওকে কাছে পেতে চাইতো রাত্রিতে।তখন অগ্নিমিত্রা হয়তো ওর এই বুড়ো ছেলে,আর বিশ্বনাথ দা আর মায়া মাসী র সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। কতো রকমের গল্প যে ওরা করতো তার ঠিক নেই। অগ্নিমিত্রার খুব ভালো লাগতো ভুতের গল্প শুনতে। বিশ্বনাথ দা ওদের গ্ৰামে ছোটবেলায় কখন কোন ভুত দেখেছিলো,তা শোনাতো খুব আগ্ৰহের সঙ্গে।আর অগ্নিমিত্রা বড়ো বড়ো চোখ করে সেই গল্প শুনতো। কখনো হয়তো ওদের সেই গল্পের মাঝে অভীক এসে পড়তো।আর অম্বরীশ সেন তখন ছেলেকে উদ্দেশ্য করে অগ্নিমিত্রা কে বলতেন,"দেখেছিস মা , এই বুড়ো ছেলেটাকে সঙ্গ দিচ্ছিস সহ্য হচ্ছে না ওনার।তাই তো হিংসায় নিজের ঘর থেকে চলে এসেছে আমার ঘরে। দেখতে পাচ্ছিস তো?" অগ্নিমিত্রা তখন মিটিমিটি হেসে তাকাতো অভীকের দিকে। আর অভীক ওর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলতো, "সবার সব কিছু তে তোমার লক্ষ্য, অথচ আমার দিকে তাকাবার ফুরসৎ নেই তোমার"। এরপর অবশ্য অম্বরীশ সেন নিজে অগ্নিমিত্রা কে পাঠিয়ে দিতেন ওর ঘরে। মনে মনে তিনি খুব খুশি হতেন অবশ্য ছেলের এই অভিব্যক্তি তে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে চাকরি করা ছেলে যে তাঁর পছন্দকে এতো পছন্দ করবে, তা অম্বরীশ সেন ভাবতে পারেননি। অবশ্য সুন্দরী, দীর্ঘাঙ্গী অগ্নিমিত্রা কে অপছন্দ করবার কোনো কারণ ছিলো না।তাও মনের মধ্যে একটা খুঁত ছিলো, যেহেতু ছেলে এত বছর বিদেশে থেকেছে, হয়তো বা কাউকে পছন্দ করে রেখেছে সে। কিন্তু না।অভীক তার বাবা র পছন্দকেই গুরুত্ব দিয়েছে।



অম্বরীশ সেন অগ্নিমিত্রা কে বলতেন,"যা রে মা , কৃষ্ণের মান ভঞ্জন কর গিয়ে।"আর অগ্নিমিত্রা লজ্জায় লাল হয়ে বলতো,"কি যে বলো বাবা তুমি।" তারপর ঘরে গিয়ে সত্যিই অনেক সাধ্য সাধনা করে , তবে অভীকের মান ভাঙ্গাতে পারতো সে।আর তারপর অভীক যখন অগ্নিমিত্রা কে নিজের বুকের উপর চেপে ধরে রাখতো, অগ্নিমিত্রা কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারতো না, অভীকের বাহুবন্ধন থেকে।আর অভীক তখন আরো জোরে ওকে নিজের শরীরের সঙ্গে চেপে ধরে বলতো, এটা ওর কাছে দেরিতে আসার শাস্তি। অগ্নিমিত্রা শেষপর্যন্ত হার স্বীকার করতে বাধ্য হতো।আর তারপর ওকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতো অভীক।



একদিন বিকালে হঠাৎই অগ্নিমিত্রা কে ওর মা ফোন করে বললো,ওর বাবার বুকে খুব ব্যাথা করছে। আর তার সঙ্গে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অগ্নিমিত্রা সঙ্গে সঙ্গে ওর শ্বশুরকে জানালো সব কথা।দুজনে তৎক্ষণাৎ গাড়ি নিয়ে ওখানে পৌঁছে, নার্সিংহোমে ভর্তি করে দিলো ওর বাবা কে। কিন্তু পারলো না শেষরক্ষা করতে। পরের দিনই ওর বাবা চলে গেল চিরদিনের মতো। অগ্নিমিত্রার খুব কষ্ট হচ্ছিল বাবার মৃতদেহের সামনে বসে। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অব্যক্ত কষ্ট মোচড় দিয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল কি যেন একটা মূল্যবান সম্পদ আজ হারিয়ে গেল ওর জীবন থেকে। হঠাৎই ও নিজের মাথায় পরম স্নেহের স্পর্শ অনুভব করলো। সেই স্পর্শ ওকে প্রতিটা মূহুর্তে মনে মনে অনুভব করাচ্ছিলো যে ও একা না।আর সেই স্পর্শ ওর আর এক বাবার। অশ্রু সজল চোখে অগ্নিমিত্রা তাকালো নিজের আর এক বাবার দিকে। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়লো ও। অম্বরীশ সেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন অগ্নিমিত্রাকে, " "কাঁদিস না মা। আমি আছি তো।"



এই কদিনে সমস্ত রকমের দায়িত্ব পালন করেছেন অম্বরীশ সেন। নিজের পুত্রবধূর পাশে সর্বক্ষণ ছায়ার মতো থেকেছেন তিনি। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান মিটে যাবার পর অগ্নিমিত্রাকে নিজে বলেছেন, ও যেন ওর মা কে এই বাড়িতে একা না রেখে যায়। সঙ্গে করে যেন সেন বাড়িতে নিয়ে আসে। অগ্নিমিত্রা শ্বশুরের এই আদেশ ও অমান্য করেনি।নিয়ে এসেছে সেন বাড়িতে নিজের মাকে। সত্যিই তো মা যদি আজ একা থাকতো ওই বাড়িতে, অগ্নিমিত্রা কি পারতো নিশ্চিন্তে থাকতে। ওর মা প্রথমে যেতে না চাইলেও শেষপর্যন্ত ফেলতে পারেনি অম্বরীশ সেনের অনুরোধ। উনি অগ্নিমিত্রার মাকে বলেছেন,"এটা আপনার দাদার বাড়ি। আর এই দাদা র অনুরোধ আশাকরি বোন ফেলতে পারবে না।" অগ্নিমিত্রা ও নিশ্চিন্ত বোধ করেছে। তবেই তো ও আজকের অগ্নিমিত্রা হয়ে উঠতে পেরেছে।ওর এই বাবার সহযোগিতা ছাড়া তো এটা কখনোই সম্ভব ছিল না ওর কাছে।



এরপর কিভাবে যে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল বোঝা যাচ্ছিল না। অম্বরীশ সেন একদিন এক ছুটির দুপুরে লাঞ্চ করতে করতে অগ্নিমিত্রা কে সবার সামনে বললেন,"আমার এই ছেলের তো কোনো হুঁশ নেই । কিন্তু তোর তো আছে রে মা।এই বুড়ো ছেলেটার খেলার একটা ছোট্ট সঙ্গী এনে দে এবার।"অগ্নিমিত্রা লজ্জা পেয়ে গেলো।আর অভীক ও চুপচাপ মুখ নীচু করে লাঞ্চ করছিলো। ঘরে গিয়ে অগ্নিমিত্রা ভাবছিলো, সত্যিই তো বাবা তো ঠিকই বলেছেন, এবার ওদের ভাবা উচিত এই ব্যাপারে। অভীক বোধহয় বুঝতে পারছিল অগ্নিমিত্রার মনের কথা।ওর খুব কাছে এসে প্রগাঢ় দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বললো,"মিসেস অগ্নিমিত্রা সেন ও কি তবে সেটাই ভাবছে নাকি, যেটা আমি আর বাবা ভাবছি"। অগ্নিমিত্রা হঠাৎ ধরা পড়ে গেল অভীকের কাছে। তারপর লজ্জায় মুখ লুকিয়ে দিলো অভীকের বুকের ভেতর। দুটি হৃদয় একে অপরের সম্মতিতে মেতে উঠল সৃষ্টির আদিম খেলায়।



অগ্নিমিত্রার বিয়ের পর থেকেই প্রত্যেক বছর পুজোর ঠিক পর থেকেই , শ্বশুর আর পুত্রবধূ মিলে মালীকে নির্দেশ দেয় ,কোন ফুল এবছর লাগাতে হবে।আর কোথায়ই বা লাগাতে হবে। এবছর ও তার ব্যতিক্রম হয়নি।দুজনে মিলে সকালে নির্দেশ দিচ্ছিলো মালী কাকা কে। হঠাৎই অগ্নিমিত্রার মাথাটা একটু ঘুরে যায়।ও বসে পড়ে গার্ডেন চেয়ারে। তারপর তাকিয়ে দেখে নেয়, কেউ দেখতে পায়নি তো। কিন্তু অগ্নিমিত্রা এটা জানতো না যে অম্বরীশ সেনের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অতটা সহজ না। তখন তো উনি কিছু বললেন না অগ্নিমিত্রাকে। কিন্তু সন্ধ্যে বেলায় অগ্নিমিত্রা কলেজ থেকে ফেরার পর, বাড়িতে ই ডাক্তার কাকাকে ডেকে নিয়েছিলেন।অথচ অগ্নিমিত্রা এর বিন্দু বিসর্গ ও বুঝতে পারেনি।সে মনে করেছিল, ডাক্তার কাকু বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। কিন্তু বাবার ঘরে ঢুকেই অগ্নিমিত্রার সে ভুল ভাঙ্গলো।যখন বাবা ডাক্তার কাকু কে বললেন,"বুঝলে ডাক্তার আজ আমি তোমাকে আমার মেয়ের জন্য ডেকে পাঠিয়েছি। আমার মনে হয় সবার খেয়াল রাখতে রাখতে ও নিজের খেয়াল রাখতে ভুলে গেছে।" অগ্নিমিত্রা অবাক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলো। তার মানে সকালে ওর যে মাথা টা অল্প ঘুরে গিয়েছিল, সেটা তার এই বাবার নজর এড়ায়নি। আর কোনো কথা না বলে বাধ্য মেয়ের মত অগ্নিমিত্রা বসে গেল ডাক্তার কাকুর সামনে। অগ্নিমিত্রা কে প্রাথমিক ভাবে দেখে ডাক্তার কাকু বললেন বাবাকে,"আমার মনে হয় তোমার খেলার সঙ্গী আসছে সেন সাহেব। তাও একটা ভালো গাইনোকলজিস্ট এর সঙ্গে কনসাল্ট করে নিও কাল।" অম্বরীশ সেন আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন ডাক্তার কাকু কে। তারপর অগ্নিমিত্রা র দিকে তাকিয়ে বললেন,"এই বুড়ো টা এর থেকে খুশি জীবনে কখনো হয়নি রে মা, বিশ্বাস কর।তুই আমাকে সেই খুশি দিলি।"



 এরপর গাইনোকলজিস্ট এর সঙ্গে কনসাল্ট করে সমস্ত রুটিন চেকআপ, খাওয়া-দাওয়া, কখন কি করবে অগ্নিমিত্রা সব , অম্বরীশ সেনের নিখুঁত তত্বাবধানে হয়েছে। সঙ্গে অগ্নিমিত্রার মা ও ছিলো অবশ্যই।অভীককে এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাতে বারণ করেছেন অম্বরীশ সেন। তাঁর কথায় ,"আমার খেলার সঙ্গীর দেখাশোনা আমি নিজের হাতে করতে চাই। এতে অন্য কেউ যেন মাথা না ঘামায়।" অভীক ও জানতো অবশ্য, তার বাবার মতো কর্তব্যপরায়ণ মানুষ সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই করবে। যতো দিন এগিয়ে আসছিল , অগ্নিমিত্রা একটা অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলো।ব্লাড প্রেসার ও ওর হাই এর দিকে ই।তাই একটু তো রিস্ক ছিলো ই। আর এ ব্যাপারে সবকিছু জানা সত্বেও অম্বরীশ সেন অগ্নিমিত্রা কে এর বিন্দুমাত্র বুঝতে দেননি।অথচ নিজে ক্রমাগত চিন্তায় ডুবে যাচ্ছিলেন।লেডি ডাক্তার সময়ের একটু আগেই সিজার করে দিতে চাইছিলেন। কারণ অগ্নিমিত্রা র শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত অবনতি হচ্ছিল।আর বেশি দেরি করলে নিঃশ্বাসের প্রব্লেম হতো।তাই আর দেরি করা সমীচিন মনে করলেন না উনি। পরের দিন ই ডেট দিলেন সিজারের।



বাড়িতে এসে সারারাত জেগে ছিলেন অম্বরীশ সেন। নিজের মেয়ের থেকেও বেশি স্নেহের পুত্রবধূর কথা ভেবে, তার অনাগত সন্তানের কথা ভেবে। সকালে আর উঠতে পারেননি অম্বরীশ সেন। বিশ্বনাথ চা দিতে এসে দেখে, তার মালিক অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। চিৎকার চেঁচামেচিতে অভীক দৌড়ে আসে। তাড়াতাড়ি বাবাকে নিয়ে যায় নার্সিং হোমে। ডাক্তার কাকু র নার্সিং হোম এই ভর্তি আছেন অম্বরীশ সেন আর তাঁর পুত্রবধূ অগ্নিমিত্রা সেন। অগ্নিমিত্রা অপারেশন রুমে ঢোকার আগে দেখতে চায় তার বাবাকে।কাল রাতের সমস্ত ঘটনা তার কাছ থেকে গোপন করা হয়েছে, তার শরীরের অবস্থার কথা ভেবেই। কিন্তু অগ্নিমিত্রা বাবার সঙ্গে দেখা না করে কিছুতেই যেতে চাইছে না। কারণ সে জানে, বাবা তাকে এই অবস্থায় একা কিছুতেই ছাড়বেন না। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না দেখে অগ্নিমিত্রা বুঝতে পারে , কিছু তো একটা সমস্যা হয়েছে, নইলে বাবা এই সময় তার কাছেই থাকতেন। নাছোড়বান্দা অগ্নিমিত্রা কে শেষ পর্যন্ত ডাক্তার কাকু সব বললেন। অগ্নিমিত্রা একটিবার তার বাবার কাছে গিয়ে দেখা করে আসবার অনুমতি চাইল ডাক্তার কাকু কে। ডাক্তার কাকুর সঙ্গে অগ্নিমিত্রা গেল তার বাবার কাছে। অচৈতন্য অবস্থায় শুয়ে আছেন অম্বরীশ সেন।ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো অগ্নিমিত্রা। বাবার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বললো,"তোমার খেলার সঙ্গী আনতে যাচ্ছি,আর তুমি আমাকে আশীর্বাদ করবে না বাবা। আজ পর্যন্ত কোনো কাজে তুমি আমাকে একা ছেড়ে দাওনি।আজ ও ছাড়বে না। আমার এই বুড়ো ছেলেটাকে ছেড়ে যে তার মা থাকতে ই পারবে না। এটা বুঝতে পারোনি এখনও। ফিরে এসো বাবা, পারবো না তোমাকে ছাড়া থাকতে।"ধীর পায়ে বেরিয়ে যায় অগ্নিমিত্রা অপারেশন রুমে ঢোকার জন্য।



ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় অপারেশন রুমের দরজা। ওদিকে ডাক্তার কাকু কে এসে ডাকলেন একজন নার্স। "স্যার মিস্টার সেন রেসপন্স করছেন। তাড়াতাড়ি চলুন।" দৌড়ে গিয়ে ডাক্তার কাকু দেখলেন অম্বরীশ সেনের সেন্স ফিরে এসেছে। আনন্দে তাড়াতাড়ি অভীককে ডেকে পাঠালেন। অভীক ও বাবার কাছে এসে দেখলো, তার বাবা বিপদ মুক্ত।অল্প চোখ খুলে তাকালো। ওদিকে অপারেশন রুমের দরজা খুলে গেল। নার্স এসে বলল, মিসেস অগ্নিমিত্রা সেন এর মেয়ে হয়েছে।মা আর বাচ্চা দুজনেই ভালো আছে। অম্বরীশ সেনের দু চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে এলো। তার খেলার সঙ্গী এসে গেছে। এবার তো তাকে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে। ডাক্তার কাকু কে বললেন আস্তে আস্তে,"ডাক্তার এবার দেখব তোমার ওষুধের কতো জোর। আমাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে তোলো তো।" ঘরের সবাই হেসে উঠল।



অম্বরীশ সেন এসেছেন তাঁর খেলার সঙ্গীর সঙ্গে দেখা করতে। অগ্নিমিত্রার কাছে এসে বললেন, "পারলাম না রে মা তোকে আর আমার এই ছোট্ট খেলার সঙ্গী কে ছেড়ে চলে যেতে। তোদের জন্য ফিরে এলাম মৃত্যুর কাছ থেকে। স্বয়ং যমরাজ ও পারলেন না এই বুড়ো ছেলেটাকে তার মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিতে।" অগ্নিমিত্রা কপট রাগ দেখিয়ে তার বাবাকে বললো,"যমরাজ ও জানেন যে তোমার মায়ের নাম অগ্নিমিত্রা। আর যার নামের প্রথমে অগ্নি আছে, তাকে তো স্বয়ং যমরাজ ও ভয় ই পাবেন।"

ঘরে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। আর অম্বরীশ সেন নিজের খেলার সঙ্গীর সঙ্গে আলাপ জমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পুরাতন প্রজন্ম দুহাত বাড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আহ্বান করছিলো। যে সম্পর্কের বন্ধনে অম্বরীশ সেন অগ্নিমিত্রাকে জড়িয়েছিলেন, বাবা-মেয়ের সেই সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হলো অনাগত এই ছোট্ট অতিথির আগমনে। সম্পর্ক আজও আছে, আগেও ছিল,আর ভবিষ্যতেও থাকবে। শুধু সঠিক সময়ে সেই সম্পর্ককে চিনে নেবার অপেক্ষা।তবেই তো প্রত্যেকটি সম্পর্ক পূর্ণতা প্রাপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে।


Rate this content
Log in