পূজা চক্রবর্তী

Tragedy Action Others

4  

পূজা চক্রবর্তী

Tragedy Action Others

প্রথম প্রতিশ্রুতি

প্রথম প্রতিশ্রুতি

5 mins
482



" প্রথম প্রতিশ্রুতি "

________________

 

আনন্দিত মনে ঘুমাচ্ছিলো উপমা ,মা ডাকাডাকি করে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো,খুব রাগে মাথা গজগজ করতে করতে উপমা বললো_


  _ আমার কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দিলে কেনো?


_ আমি এসেছি রে উপমা, তাই তোর মা তোর ঘুম ভাঙিয়ে দিলো।

_ ওমা একি রিয়া তুই? আগে আমাকে ডাকিসনি কেনো?


_ তুই তো কুম্ভকর্ণের মতো নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলি।


_ দেখ খুব খারাপ হচ্ছে কিন্তু ,আমি মোটেও নাক ডাকি না।

 

_ আচ্ছা বেশ

 

রিয়া তার সাইড ব্যাগ থেকে একটি বিয়ের কার্ড বের করে উপমার হাতে দিলো,

 

_ কি ব্যাপার? কার বিয়ে?

_ আমার( রিয়ার লাজুক মুখটা দেখতে তখন বেশ লাগছিলো)

 

_তোর বিয়েতে আমি কব্জি ডুবিয়ে খাবো।

_ আগে তুই আমাকে বিয়ের সাজে সাজিয়ে দিবি তার পর খাবি,

 

_আচ্ছা ঠিক আছে।কি আর করা যাবে।

_ হুম

 

_ আচ্ছা খাবারে কি কি মেনু থাকছে?আমার কিন্তু মালাইকারি আর সিঙ্গারা চাই চাই।


_আচ্ছা ঠিক আছে। তোর জন্য স্পেশাল ব্যাবস্থা করে রাখবো।

 

_ তো আমাদের উনি টা কে শুনি?

 

_ কেনো তুই জানিস না? সে তো তোর বেস্ট ফ্রেন্ড আকাশ।

 

এটা শোনার পর উপমার মুখটা কেমন যেনো ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।

 

_সত্যি বলছিস? নাকি আগের বারের মতো মজা করছিস?


_বিশ্বাস না হলে কার্ডটা দেখ। আচ্ছা আকাশ তো তোর বেস্ট ফ্রেন্ড ও তোকে আমার আর ওর ব্যাপারে কিছু বলেনি?

 

_(প্রচণ্ড রাগে উপমা বললো) বলেছিলো মনে হয় ভুলে গেছি,সারাদিন এত ঘুমানোর পর কিছু মনে থাকে নাকি?


_একদম, এইবার একটু ঘুমটা কমা,কিছু দিনপর তোকেও তো শশুরবাড়ি যেতে হবে।এত ঘুমালে চলবে?


_হুম ( আনমনে বললো উপমা)

 

_আমি তাহলে আসি?

_এত তাড়াতাড়ি এইতো মাত্র আসছিস।


_জানিস এইতো কাল বাদে পরশু বিয়ে,বাড়িতে কত কাজ, এইসময় কি বাড়ির বাইরে থাকাটা মানায়?


_আচ্ছা,ঠিক আছে।


_তুই কিন্তু কালকেই যাবি আমার বাড়ি

_হুম

 

তারপর উপমা সোজা চললো আকাশের বাড়ি

_ তুই আমাকে লাঠি দিয়ে এভাবে মারছিস কেনো? কি করেছি বলবি তো?


_ আজকে আমি তোকে মেরেই ফেলবো


_ আচ্ছা একটু অপেক্ষা কর, আমি বন্দুক নিয়ে আসি ,একেবারে মেরে ফেলিস কিন্তু এভাবে আর মারিস না প্লিজ


_ কালকে তোর বিয়ে?

_ হুম( মাথা নিচু করে উত্তর দিলো আকাশ)।

 

দুজনেই কেমন চুপ চাপ হয়ে গেলো।

 

অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে উপমা বললো


_আমি তো জানতাম আমি তোর প্রিয় বন্ধু,তোর সুখ দুঃখ হাসি কান্না সবটা সবার আগে আমাকেই বলবি ,এটাই আশা করে ছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি যে আমি কবে তোর এত পর হয়ে গেলাম? তোর বিয়ের খবরটাও অন্য কারোর কাছে জনাতে হবে ভাবিনি । ভালো থাকিস ।

 

বাড়ি চলে এলো উপমা ,সন্ধ্যে নেমে এলো 

মা বললো_

 

_কালকে রিয়াদের বাড়ি কখন যাবি?

_দেখি

রাত্রিতে আর ঘুম এলো না।

 

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে এলো,আর উপমাকে রিয়াকে সাজানোর জন্য চলে যেতে হলো তাদের বাড়ি।

 

বেস্ট ফ্রেন্ডের বউ বলে কথা খুব ভালো করে সাজিয়ে দিলো উপমা । 


ঠিক তখনি দরজায় কেউ নক করলো উপমা দরজাটা খুলে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে,

_ আমাকে কেমন মানিয়েছে রে বর সাজে?

_ বেশ ভালো

 Best friend is best friend


_আমি জানতাম আমাকে খারাপ লাগলেও তুই ভালই বলবি,কারণ, (আকাশ আর কিছু বলতে পারলো না)


চারটি চোখে জল ছলছল করছে!কিন্তু সবাই নিরুপায়।পরিস্থিতির কাছে মাঝে মাঝে ভালোবাসাও হার মেনে নেয়। এতেই হয়তো সবার মঙ্গল হয় ।


 

রিয়া_ কি ব্যাপার আকাশ ? শুভ দৃষ্টির আগে তো আমাদের একে অন্যের মুখ দেখতে নেই।তুমি কেনো এই সময় এই রুমে আসলে ?


 উপমা - আকাশ ভুলেই গিয়েছিলো, যে এই রুমে ওর বেস্ট ফ্রেন্ড বাদেও ওর হবু বউ আছে। তাই না রে আকাশ?


_ না না আসলো এইদিকে যাচ্ছিলাম,হটাৎ উপমার গলার আওয়াজ পেলাম তাই ভাবলাম একটু কথা বলে আসি।


_ওহ আচ্ছা এখন যাও তবে, তোমাকে কেউ দেখে নিলে লোকে হাসবে সবাই বলবে বিয়ের আগেই বউ পাগল ছেলে।


_হুম এলাম রে উপমা।


_হুম(উপমা অন্য দিকে তাকিয়ে আকাশকে বিদায় জানালো)

 

 

_আচ্ছা ব্যাপারটা কি বলত? তোকে কেমন আনমনা লাগছে? কিছু সমস্যা ?


_না রে রিয়া , আমার আবার কি সমস্যা হবে?

_তাহলে কি ভাবছিস?

_ ভাবছিলাম কখন ফটোগ্রাফার আসবে, আর কখন তোর সঙ্গে ফটো উঠবো?

_সত্যি ! উপমা তোর ফটো উঠার শখটা আজও আছে।

_হুম 

_কিন্তু তুই যে বললি ফটো উঠবি , তুই তো একটুও সাজিস নাই। আয় আজ আমি তোকে সাজিয়ে দেই।

_আরে না না তোর বিয়ে তুই কেনো সাজাবি?আমি নিজেই সেজে নিবো।


_চুপ করে বস।আমি সাজিয়ে দিবো।

_আচ্ছা কি আর করা যাবে। দেখিস এত বেশি সাজিয়ে দিস না যেনো তোর বর তোকে না দেখে আমার দিকেই তাকিয়ে থাকে।


_খুব পাজি হইছিস তুই।

_না না পাজি না , তুই তো আমার থেকে ভালোই সাজাইস,তাই বললাম।

_হুম


 

বিয়ে শুরু হলো, রিয়াকে মণ্ডপে নিয়ে এলো।


উপমা যেতে চায়নি মণ্ডপে ,তাই বললো - খুব ঘুম পাচ্ছে,রিয়ার মা উপমার কোনো কথাই শুনলো না,মণ্ডপে নিয়ে গেলো। বিয়ে সম্পূর্ণ হলো। নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে চোখের সামনে অন্যের হয়ে যেতে দেখলো উপমা।

 

_তুমি বর পক্ষ না কনে পক্ষ?

বিয়ে বাড়ির লোকেদের এই রকম প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে উপমা কোনোদিন ভাবেনি। উপমা যখন কিছু বলতে যাবে ,ঠিক সেই সময় আকাশ বললো _ 

_ও দুই পক্ষেরই ।

_ আকাশ তুই?

_হুম এত কিসের সংকোচ তোর? তুই রিয়ার বান্ধবী আর আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। এই কথাটা জোর গলায় বলতে পারছিস না কেনো?


_কি করে বলবো বল?

_থাক আমি জানি আর কিছু বলতে হবে না।

 

 

 

_মাসিমা আমি তাহলে আসি? বিয়ে তো শেষ।


_ওমা তুই যে বললি ঘুম পাচ্ছে। আজকে থেকেই যা ঘুমিয়ে যা।ঘুম চোখে এত দুর একাএকা যেতে হবে না।

 

 

_ঘুম? মানেটা কি উপমা? তুই ঘুমিয়ে পড়লে আমাদের বাসর জাগবে কে? আকাশ তুমি কিছু বলো প্লিজ । তোমার কথা উপমা ফেলতে পারবে না।


_ পরশু দিন থেকে সারাদিন রাত ঘুমাবি, চল আমাদের সাথে আমাদের বাসর ঘরে।


_ উপমা , একটা গান কর না প্লিজ।


_ তুই তো জানিস এই আমি গান পারিনা,তোর বরকে বল গান গাইতে।


_আকাশ, এত দিন তো অনেক আবদার করেছি গান করলি না।আজকে তোর বউ আবদার করছে প্লিজ একটা গান কর।

 

 

 

 

"রাধা তুমি সবেতেই আছো

শুধু ভাগ্যে নেই আমার,

শ্যামের বাঁশি রাতের কালোয়

তাই হল উজাড়।

আমি অকারনে তোমার খোঁজে

জ্বলে পুড়ে যাই,

ভালোবাসার ব্যাকরণে কারনের নেই ঠাঁই।


কালোর মনের সুরে কলঙ্কিনী

বিনোদিনী রাই,

প্রেমের স্রোতে একলা ভেসে

এবার তবে যাই।"


 

_বাহ আকাশ, দারুন দারুন,কিন্তু আমাদের বাসরে এই গানটা বেমানান।

 

এই গান ,আকাশ কেনো গাইলো, সেটা কেবলমাত্র বুঝতে পারে উপমা।

 

_উপমা, তুই একটা গান কর।

_আমি পারিনা রে, আমি পারবো না রে ,খুব ঘুম পাচ্ছে রে ক্লান্ত লাগছে।


_ঠিক আছে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর । 


পরের দিন সকাল বেলা থেকে উপমাকে খুঁজে পেলো না কেউ। বৌভাতের অনুষ্ঠান হলো কিন্তু উপমা কোথাও নেই।আকাশ অনেক খোজ খবর করে জানতে পারলো আজ রাত বারোটার ফ্লাইটে দিল্লি চলে যাচ্ছে উপমা। তখন ঘড়িতে প্রায় বারোটা বাজতে চললো। আকাশ চাইলেও উপমাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তাই ক্লান্ত মনে উপমার প্রতি অভিমানে ভারাকান্ত মনে বসে আছে।রিয়া টিভিতে নিউজ দেখছিলো হটাৎ করে দেখলো টিভিতে উপমাকে দেখাচ্ছে , আকাশ ছুটে গিয়ে খবরটা দেখলো


- ব্রেকিং নিউজ আজ রাত বারোটার ফ্লাইট দুঘটনায় মৃত এক! আহত পনেরো জন ,মৃতের নাম উপমা রায়।উপমার মৃত দেহের ছবি ফুটে উটেছে টেলিভিশনের পর্দায় ।

 

রিয়া ও আকাশ দুজনেই হতবাক। দুজনের চোখ দিয়েই জল গড়িয়ে পড়ছে।


_আমি বলেছিলাম পরশু দিন থেকে সারারাত দিন ঘুমাবি, কিন্তু এটা এইভাবে সত্যি হবে আমি কল্পনাতেও ভাবিনি উপমা।

 We will miss you everytime


আকাশ মনে মনে বললো _ আমি তোকে প্রথম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সারাজীবন তোর পাশে থাকবো।কিন্তু আমি আমার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারলাম না।আমার ক্ষমা করিস উপমা।যেখানেই থাকিস খুব ভালো থাকিস।






Rate this content
Log in