নলজাতক
নলজাতক
দ্বাদশ পর্ব
রূপেশ্বর ব্যানার্জীর মুখটি বেশ চাঁচাছোলা। গোঁফ দাড়ি তো নেইই ; ভুরু দু'টোও নিখুঁত ভাবে কামানো । দু'কান বরাবর ঘাড় পর্য্যন্ত চুল কামানো । মাথার উপরের দিকে চুলগুলো সাইজে একটু বড় হলেও লম্বা নয় ।
আলো- আঁধারিতে দেখলে মনে হবে কোন দু'পেয়ে জন্তু ; একটা লেজ জুড়ে দিলেই আমাদের পূর্বপুরুষটির মত লাগে।
স্বভাবটাও বাঁদুরে । গ্রামের কেউ তাকে তেমন পাত্তা দিত না । তাই নিজেকে মেলে ধরতে চেষ্টার কসুর করেনি। কৈশোরকালে শ্মশানে মশানে সাধু তান্ত্রিক নিয়ে পড়ে থাকত । আর তাদের কারসাজিতে নিজে হাত পাকিয়ে ফেলে ।
অবাক লাগে যখন ইংরাজি হিন্দিতে সড়গড় কথা বলে ।
আর একটা কথা না বললেই নয় ; যখন যেখানে থাকে নিজেকে সেইমত ধরে রাখার এক অলৌকিক ক্ষমতা ছিল তার ।
সঞ্চারী এবং অনিরুদ্ধের উপর বিতৃষ্ণাবশত সে ভূপেশকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । আড়াল আবডালে থেকে ভূপেশকে ম্যাসমেরাইজড করতে থাকে ।
টাকা পয়সা ছাড়া তো বাঁচা যায় না । এদিকে বাড়িতে বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো ছেলে বলে উচ্ছৃঙ্খলতা তাকে পেয়ে বসেছিল ।
সেইজন্য ব্ল্যাকমেল করা শুরু করল । কিষাণলাল ওরফে শ্যামলকে সাথে পেয়ে এখন তো টাকার রমরমা দশা ।
নইলে কলকাতার মত জায়গায় দু'দুটো বাড়ি নিয়ে রাজত্ব চালায় কি করে ! নিজে থাকে পণ্ডিতিয়া রোডে আর শ্যামলকে রেখেছে লেক টাউনে ।
ভূপেশকে যাদুবিদ্যায় কাবু করে নিজের আখের গোছাতে লাগল । গ্রামে থাকতে সঞ্চারী হয়তো তাকে ঠিক চিনেছিল; তাই ওর প্রেমের ডাকে সাড়া দেয়নি।আর সেইটাই রূপেশ্বরের কাছে ইগো হয়ে দেখা দিল ।
সেই কারণে হিলটন রোডের বাড়িতে মাঝেমাঝে যেত ঋতাভরী দেবীর কান ভাঙাতে । কখনও ভূপেশের বন্ধু সেজে, কখনও সাধুবেশে ।
ঋতাভরী দেবীর মনে এমন সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে যে তিনি নিজের ছেলেকেও এখন সন্দেহ করছেন ।
সন্দেহ নিজের স্বামীকেও করছে সঞ্চারী । অনিরুদ্ধ নিজেও দ্বিধাগ্রস্ত । শুধু ভূপেশ নিজেকে শুদ্ধচিত্ত ভেবেছে। অথচ সে যে নিয়মিত কবরস্থানে যায় ; কবরের ভেতরে শুয়ে থাকে - এমন কাণ্ডটা তার মনে থাকে না ।
আসলে হয়েছে কি বদমাশ বাঁড়ুজ্যে টো টো ফলো করে ভূপেশকে। বাড়ির বাইরে এলেই কি সব মন্ত্রটন্ত্র আওড়াতে থাকে আর ভূপেশের মনে পরিবর্তন আসে । নির্দ্বিধায় চলে যায় কবরডাঙায় । আধঘন্টার মত সেখানে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে । তারপর কবর থেকে উঠে এসে বাড়ি বা অফিসে চলে যায় ।
অফিসে অনিরুদ্ধের আণ্ডারে কাজ করে বলে কেউ কিছু বলে না । অনিরুদ্ধও নিজের ভগ্নিপতি বলে তার বিষয়ে কিছু বলে না ।
সঞ্চারীর মনে সন্দেহ দৃঢ় হতে শুরু করল । প্রতিদিন নিয়ম করে ভূপেশকে অনুসরণ করতে লাগল । ছেলে অনেকটাই বড় হয়েছে । ঋতাভরী দেবীর কাছেই বেশীর ভাগ থাকে । সঞ্চারীর এতে আরও সুবিধে হয়েছে । শাশুড়ির কাছ থেকে আর তেমন কথা শুনতে হয় না ।
ভাগ্যিস সে যাত্রা ভূপেশই বাঁচিয়ে দিয়েছিল ।
বলেছিল - মা, এই তোমার পা ছুঁয়ে বলছি আমি জ্ঞানত: কোন খারাপ কাজ করিনি । তোমরা যা ভাবছ সব ভুল । আমি কবরডাঙায় কোনদিন যাইনি।
কিন্তু সঞ্চারী ! সে তো রোজ তাকে দেখে । একদিন পরিকল্পনা করল ব্যানার্জীদাকে ডেকে এনে কিছু সুরাহা করতেই হবে ।
রূপেশ্বর এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল । ডাক পেতেই চলল হিলটন রোডের বাড়িতে ।
সেদিনটা ছিল মঙ্গলবার , অমাবস্যা তিথি । বৈঠকখানায় বসে সঞ্চারী বলল - ব্যানার্জীদা, তুমি তো আগে অনেক সাধু সন্ন্যাসীর সঙ্গে থেকেছ । অলৌকিকত্ব সম্বন্ধে কিছু ধারণা নিশ্চয় করতে পেরেছ । তোমার এই বিষয়টা এখন পুনরায় কাজে লাগাতে হবে ।
তারপর সব ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বলে গেল । বাঁড়ুজ্যে সব শুনল মন দিয়ে ।
বলল - আরে এই ব্যাপার ! তুমি এত চিন্তা কর না তো ! এ' আমি এক চুটকিতেই সমাধান করে দেব ।
সঞ্চারী কাছে এসে হঠাৎ বাঁড়ুজ্যের পায়ে পড়ে বলল- আমাকে বাঁচাও ব্যানার্জীদা, দাদাকে বাঁচাও, আমার স্বামী ,সন্তান, শাশুড়িকে বাঁচাও ।
ক্রুর হাসি খেলে গেল বদমাশ বাঁড়ুজ্যের মুখে । সঞ্চারী দেখেও যেন দেখল না । এখন তাকে নিজের কাজ গুছিয়ে নিতে হবে ।
বাঁড়ুজ্যে বলল - করে দিতে পারি এতে কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু বোন- আমাকে যে পেট চালাতে হবে ।
- কত টাকা পেলে খুশি হও বল , আমি দেব।
খলনায়ক হাসল । বলল - তুমি আমার গ্রামের মেয়ে । তোমার কাছে বেশী কিছু নিতে পারব না কিন্তু ।
- না না ব্যানার্জীদা, তুমি মন খুলে বল কত দেব ! পঞ্চাশ হাজার, এক লাখ, দু'লাখ । তুমি যা বলবে আমি দেব। তুমি শুধু আমাদের বাঁচাও ।
কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন । আর কদাকার ছেলের নাম রূপেশ্বর । হা ঈশ্বর ! এ তোমার কেমন খেলা ! দুর্বৃত্তের সহায়তা কর !
( ক্রমশ )
