Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

ঋভু চট্টোপাধ্যায়

Tragedy


3  

ঋভু চট্টোপাধ্যায়

Tragedy


না দেখা পতাকা

না দেখা পতাকা

7 mins 416 7 mins 416

দোকানের কাছে আসতেই সুজয় পুতনির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,‘কি রে আজ স্টেশন ছেড়ে এতো দূর এলি কেন? এখানে কি হবে?’

একবার কথা শোনার পর পুতনি কোন দিনও জবাব দেয় না। এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না। অন্য কেউ হলে এই রকম জবাব না দেওয়ার জন্যে অপমানে লাগতে পারে। কিন্তু এই খেপীর জন্যে আর কারোর মান সম্মান নষ্ট হবার ভয় থাকতে নেই। সুজয় তাও দ্বিতীয় বারের জন্যে জিজ্ঞেস করে। এবারেও কোন জবাব পায় না। সুজয় আর কোন কথা না বলে সামনের মিষ্টির দোকান থেকে পতাকা তোলার লাড্ডু কিনতে গেলে পিছন থেকে পুতনির গলা শোনে,‘এই, দুটো ভাত দিবি?’

–ভাত! এই সাত সকালে তোর জন্যে কে ভাত রাঁধবে, দূর হ।

পুতনির কথা শুনে দোকানদার চিৎকার করে পুতনি তাড়াতে যায়। সুজয় বাধা দিয়ে বলে ওঠে, ‘ও কমলদা ছেড়ে দাও, ক্ষিধে পেয়ে গেছে হয়ত, তুমি এক কাজ কর, কচুরি ভাজা হয়ে থাকলে ওকে চারটে দিয়ে দাও। আমি পয়সা দিয়ে দিচ্ছি।’

–ওকে অতোটা মাথায় তুলো না। পরশু ভূদেবের দোকানের সামনে সারা রাত শুয়ে ছিল।এমন বদ, ভোর বেলা ওখানেই হেগে দিয়েছে। কিছু বললে আবার হি হি করে হাসে।

–তুমিও যেমন ওর কি আর অতো বোধ বুদ্ধি আছে। থাকলে তো এখন ঘর সংসার করত।

শেষের কথাগুলো বলেই দোকান ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই শোনে পুতনি সুজয়ের দিকে করুণ ভাবে তাকিয়ে নিজের মনে কি সব বলে যাচ্ছে। সুজয় একটু কাছে এগিয়ে বলে,‘এই দোকানে টাকা দেওয়া আছে, তুই খেয়ে নিবি।’

এই স্টেশনে বেশ কয়েকটা মাস ধরেই খেপীটা এসে থাকছে। সুজয়দের ক্লাবটাও স্টেশনের কাছে। প্রতিদিন সকাল বিকাল দুবেলায় খেপীটার সাথে দেখাও হয়। কে যেন প্রথম দিকে পুতনি নাম রেখে ছিল। সেই থেকে এই নামটাই থেকে যায়। বাপ মায়ে কি যে নাম রেখে ছিল কে জানে?

–বয়স কত হবে বলতো?

প্রথম দিন ওকে দেখেই ক্লাবের সনাতন প্রশ্ন করেছিল। কিন্তু কেউ ঠিক উত্তর দিতে পারে নি।

‘কতই বা হবে তিরিশের মধ্যে। অন্তত চেহারা দেখে সেটাই মনে হয়।’ 

সন্তুর উত্তরটা শুনেই সনাতনদা বলে ওঠে,‘তাহলে ঠিক আছে, তুই আপাতত ঘরে রাখ। দুজনে জমে যাবে।’

–তারমানে আমি কি খ্যাপা!

–সেটা নিজেকে জিজ্ঞেস না করে তোর পাড়ার সবাইকে জিজ্ঞেস কর, বুঝতে পারবি। যে মানুষ গামছার উপর শার্ট পরে বাজার আসতে পারে সে খ্যাপাই।

সন্তু ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে সব থেকে ভালো পোস্টে কাজ করে, একটা ডিপার্টমেন্টের অফিসার। কিন্তু কথাবার্তায় কোন রকম কেতাবি আচরণ না থাকার জন্যে ওকে ক্লাবের সবাই সন্তু খ্যাপাই বলে। অথচ সুজয় সামান্য স্কুল শিক্ষক, কিন্তু ক্লাবের সবাই ওর সাথে বুঝে কথা বলে। যদিও খেপীটাকে সব থেকে বেশি সাহায্য সুজয়ই করে। প্রায় রাতে রুটি বা ভাত কিনে দেয়।

নিজের বড় মামি পাগল হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে গেছিল। তারপর থেকে মামাও কেমন যেন হয়ে যায়। মামাতো ভাই ও বোনটা সব সময় মনমরা হয়ে থাকত। তারপর থেকে কোন পাগল বা ভিখারি দেখলেও তাদের কথা মনে পড়ে যায়। এই পুতনিকে তাই খাবার দাবার দেয়।

ক্লাবে পৌঁছেই দেখে ওখানে তখন একটা ভিড় জমে গেছে। সনাতন ও কয়েকজন মিলে পতাকাটা তোলার ব্যবস্থা করবার মাঝে পিছন দিকে এর মধ্যে রান্নাও চেপে গেছে। গত বছর থেকে এই স্বাধীনতা দিবসের দিন শ’পাঁচেক মানুষকে একবেলা ভাত তরকারি ডিম খাওয়াচ্ছে। এবারে চিকেনের কথা ছিল কিন্তু শেষ মুহুর্তে ফাণ্ডের অভাবে বাতিল করতে হল। মূলত স্টেশনের ভিখারি আর এদিক ওদিকের কয়েকটা বস্তি থেকে খেতে আসে। ক্লাবের পিছনে মাঠে খাওয়ানোর ব্যবস্থা হয়। মাঠটা খুব বড় না হওয়ায় গত বছর একটু সমস্যা হয়েছিল। পঞ্চায়েত সমিতির কৃষি ও শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষকে আমন্ত্রন জানানো হলেও পূর্ত দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষকে আমন্ত্রণ জানানো হয় নি। এদিকে সবাই বলেন বকলমে উনিই নাকি সমিতিটাকে চালান। এটা নিয়ে ওনার একটু রাগও হয়। ওনার আবার পার্টির বড় বড় কর্তাদের সাথে খুব ভাব। সেই রাতে ক্লাবে সেই নিয়ে একটু খটমট লাগে। ক্লাবের সন্তোষের আবার পূর্ত কর্মাধ্যক্ষের সাথে খুব ভাব, প্রায় ওনার অফিস এমনকি বাড়িতেও যায়। তার কথা মত ক্লাবের সবাই তারপরের দিনেই কর্মাধ্যক্ষের সাথে দেখা করলেও ওনার রাগ কমেনি, বরং সবাইকে ওভাবে দেখতে পেয়ে বেশ সুরেই বলে ওঠেন,‘এটা জুতো মেরে গরু দান নাকি গরু মেরে জুতো দান।তোমাদের ওখানে তো সব বাঘেদের আস্তানা, আমার মত শেয়াল ওখানে গিয়ে কি করবে বল?’

তাও এবছর অনুষ্ঠানের কথা শুনেই আগে ওনার কাছে গিয়ে আমন্ত্রণ করে তারপর শিক্ষা ও কৃষি কর্মাধ্যক্ষের কাছে গেলে ওনারা আবার আসতে অস্বীকার করেন।কথাগুলো ক্লাবে আলোচনা হলে সুজয়ের উপরে অনেকেই রেগে ওঠে, বলে,‘তোর জন্যেই আমাদের এই রকম সমস্যা হল।আগে বেশ ছিল, পতাকা তুলতাম বোঁদে লাড্ডু দিতাম হয়ে যেত।উনি আবার নরনারায়ণ সেবা করবার কথা বললেন, এবার বোঝ, কিভাবে সেবা করবি।এদের সব বিরাট ইগো, একে ডাকলে ওর রাগ হবে, ওকে ডাকলে এর রাগ হবে।আবার কাউকে না ডাকলে সবার রাগ হয়ে বসে থাকবে।’

সুজয় মাথা নিচু করে বসে থাকে। কিছু বলতে পারে না।সত্যিই কি আগের ব্যবস্থাটাই ভালো ছিল? শুধু একমুঠো বোঁদে, আর দুটো লাড্ডু।তিনবছর আগে এমনি এক স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে সব কিছু দেবার পরেও কয়েকজনকে ক্লাবের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তাদের সবার ছিল পরনে ছেঁড়া শাড়ি বা ধুতি।সবার আদুল গা। সুজয়কে দেখতে পেয়েই একজন খুব আমতা আমতা করেই বলে ওঠে,‘ও বাবা, আজকে নাকি কি একট বটে, আজকেও দুটো ভাত খেতে পাবো নাই?’

কথাগুলো শুনেই সুজয়ের সারাটা শরীর কেঁপে ওঠে।সামনের একটা হোটেলে টাকা দিয়ে সুজয় নিজেই তাদের খাবার ব্যাবস্থা করে দেয়।সেদিন রাতে ক্লাবে এসে এই নরনারায়ণ সেবার প্রস্তাবটা দেয়।বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন থাকলেও সবাই রাজি হয়ে যায়।তারপরের বছরেই পাঁচশজনের দুপুরের ভাতের ব্যবস্থা করে।অভুক্ত, অর্ধভুক্ত এই সব মানুষদের মুখে একমুঠো ভাত তুলে দেবার যে কি আনন্দ তা ঠিক বলে প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু এই সবের মাঝেও যে এই রকম একটা সমস্যা হয়ে যাবে এটাতো আর জানা ছিল না। সেদিন দুপুর বারোটা থেকে আরম্ভ করে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত খাওয়ানো চলে।পাঁচশজনের ব্যবস্থা থাকলেও সাড়ে ছ’শজনের বেশি মানুষ খায়। আশেপাশে অনেক গ্রাম থেকেও মানুষ আসে।সুজয় পুরো চালের খরচটা দেয়, আনন্দ লাগে।কিন্তু এতো ভিড়ের মধ্যে পুতনি এসেছিল? কে’জানে ও নিজে আজ সারাদিন খুব ব্যস্ত ছিল।কয়েকজনকে জিজ্ঞেসও করে। না, কোন জবাব পায় না।সুজয়ের প্রশ্নের উত্তরে এই প্রথম বার শুনতে হয়, ‘কেন রে ওকে বিয়ে করবি নাকি?’

সুজয় এদের কাউকে বোঝাতে পারেনা, এই নরনারায়ণ সেবার আয়োজন এই সমস্ত খেতে না পাওয়া মানুষদের জন্যে।এদের একজনও কোন কারণে না খেতে পারলে সেটা এক রকমের পাপ হবে।ক্লাবের পিছনের মাঠ থেকে একবার স্টেশনের কাছে ঘুরে যায়।না, খেপীটার দেখা পাওয়া গেল না।সুজয় সব কিছু দেখে একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি চলে যায়। রাতে ক্লাবে একটা ছোট ফিস্ট আছে ক্লাবের সদস্যরাই থাকবে।পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ সাহেবকে নিমন্ত্রণ জানানো হলেও উনি আসবেন না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন।

সুজয় স্নান করে কিছু সময়ের জন্যে ঘুমিয়ে পড়ে।একটা ফোনের আওয়াজে ঘুমটা ভাঙতেই দেখে ক্লাব থেকে রমেন ফোন করেছে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তাড়াতাড়ি আসতে বলে। সুজয় ক্লাবে চলে যায়। ততক্ষণে রান্না চেপে গেছে। ক্লাবের ভিতরে ছোট খাটো একটা পার্টিও চলছে। যে কয়েক জন এই সূরা রস থেকে বঞ্চিত তারা বাইরে বসে রান্না দেখছে।এমন সময় মাথা নিচু করে হুহু করতে করতে পুতনিকে ক্লাবের পাশটাতে এসে বসে থাকতে দেখে। সুজয় দেখতে পেয়েই জিজ্ঞেস করে,‘কি রে আজ সকালে আসিসনি কেন? কত জন খেল, তুই কোথায় ছিলিস?’ 

পুতনির কোন উত্তর নেই। সুজয় একটা পাতাতে ভাত তরকারি নিয়ে ওর সামনে নামিয়ে দিয়ে আসে।পুতনি সুজয়ের দিকে এক গাল হেসে খেতে আরম্ভ করে। ক্লাবের ভজাদা খবর দেয় ‘রান্না হয়ে গেছে যার খুশি খেতে বসতে পারে।’

ক্লাবের কয়েকজনের পরের দিন মর্নিং শিফ্টে ডিউটি আছে। কিন্তু খেতে বসবার আগে ভিতর থেকে একজন বলে ওঠে,‘হ্যাঁরে, এবছর আমাদের মিষ্টি আনা হয় নি তো।’

সুজয়ের মনে পড়ে যায়।প্রতি বছর পনেরোই অগাস্টের নরনারায়ণ সেবার চাল দেবার পাশে ক্লাবের সব সদস্যদের দই আর মিষ্টির খরচটা ও দেয়। নিজেই পছন্দ মত কমলদার দোকান থেকে মিষ্টি কিনে আনে।এই অঞ্চলে কমলদার দোকানের মিষ্টির খুব নাম। ক্লাবের ভিতর থেকে মিষ্টির কথা শুনে নিজেই বলে ওঠে,‘ঠিক আছে তোমরা মিনিট দশ অপেক্ষা কর, আমি এক্ষুণি মিষ্টি কিনে আনছি।’

কমলদার দোকান ক্লাব থেকে খুব বেশি দূর নয়। সুজয় দোকানের দিকে যাবার সময় গলির মুখে হঠাৎ করে বেশ কয়েকটা বাইক ঢুকতে দেখে। গুনতে না পারলেও বারো পনেরোটা হবে। সব কটা বাইকেই দুজন করে বসে আছে, সবার মুখেই হেলমেট। ঠিক বুঝতে না পারলেও কয়েকজনের হাতে বড় বড় লোহার রডের মত কিছু দেখতে পায়। সুজয় একটু চমকে ওঠে। এ’পাড়াতে তো এই রকম মারামারি বহুদিন বন্ধ হয়ে গেছে। আগে পাড়াতে প্রায় বিভিন্ন কারণে ক্লাবে ক্লাবে মারপিট হত। সে সময় অবশ্য সুজয়রা খুব ছোট ছিল। বড় হয়ে এই ক্লাব করবার সময় সেসব অতীত হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ আজকে এমন ভাবে লোকজন এল কেন? সুজয় মিষ্টির দোকানের দিকে না গিয়ে বাইকগুলোর পিছন পিছন কিছুটা গিয়েই চমকে ওঠে। সব কটা বাইক ওদের ক্লাবের সামনে গিয়ে পর পর দাঁড়ালো।বাইক থেকে লোকগুলো নেমে কোন কথা না বলে প্রথমেই সব আলোগুলো ঢিল ছুঁড়ে ফাটিয়ে দেয়।গলির মুখের বাড়িগুলোর আলো নিভে যায়, দোকান বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ক্লাবের ভিতর ঢুকে কি করল দেখতে না পেলেও চিৎকারের আওয়াজ কানে এল,বাসনপত্র ফেলার আওয়াজ কানে এল। ভয়ে সুজয়ের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল, শরীর কাঁপছিল। তারমানে মিষ্টি কেনার ব্যাপারটা না থাকলে ওকেও মারত। কিন্তু কেন? এই ক্লাবের কেউ তো কোন ঝামেলাতে থাকে না।

সুজয় একটা সরু গলিতে দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখতে থাকে। চোখের সামনে সব কিছু ধোঁয়া হয়ে যায়। এমন সময় একটা মেয়ের গলার আওয়াজ পায়। তারমানে কি পুতনিকে কিছু করল? সুজয় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সরু গলিটা দিয়েই আস্তে আস্তে নিজের বাড়ি গিয়েই পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ সাহেবকে ফোন করে সব কিছু জানায়।

আস্তে আস্তে চারদিকটা শান্ত হয়। কিছু সময় পরে সুজয়কে কর্মাধ্যক্ষ সাহেব নিজে ফোন করে ক্লাবে আসতে বলেন। উনিও নিজে পুলিশ নিয়ে পৌঁছে যান। সুজয়কে দেখতে পেয়েই বলেন,‘আমি সব বুঝে গেছি, সব ঐ দু’জনের কাজ। এবারে বলো নি, সেই রাগে এটা করল। আমিও পুলিশকে বলে দিয়েছি, কাল সকালের মধ্যে সব কটাকে তোলাবো, তোমরা নিশ্চিন্তে থাকো।’

 ক্লাবের সদস্যদের প্রায় সবাই কম বেশি আহত হয়, কয়েকজনের একটু বেশিই লেগেছে। কর্মাধ্যক্ষ সাহেব অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে সবাইকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যাবস্থা করেন।পুলিশের গাড়ির আলোতে সুজয় পুতনিকে দেখতে পায়। বেচারা একপাশে শুয়ে আছে। কোনো এক পাষণ্ড ওর পরে থাকা এক ফালি শাড়িটাও টেনেছিল। সুজয় আরো কাছে গিয়ে ওর ঠোঁটের কোনে রক্তের দাগ দেখতে পায়। বেচারার ডান হাতটা তখনো ভাতের থালাতে রাখা ছিল।


Rate this content
Log in

More bengali story from ঋভু চট্টোপাধ্যায়

Similar bengali story from Tragedy