মহাপ্রস্থান
মহাপ্রস্থান
(১)
ধ্বংসস্তূপের প্রাক্কালে
"সভ্যতার একদম শুরুটা যেমন কেউ আক্ষরিক অর্থে প্রত্যক্ষ করে বর্ণন করে যেতে পারেনি, তেমনই পারেনি তার পরিসমাপ্তির সঠিক বিশ্লেষণ। কিছু তথ্য , কিছু লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী, অসংখ্য পাগলের প্রলাপ, পরস্পর বিরোধী দার্শনিক তত্ত্ব ইত্যাদি নিয়েই গড়ে উঠেছে গত যুগের শেষ অধ্যায়। তবে একটা বিষয়ে এখন আমরা সকলেই একমত, গত যুগের উপসংহারে। খরা, ভূমিকম্প, প্লাবন, অতিমারী, সৌরঝড়, তেজষ্ক্রিয় বিষক্রিয়া, বিগত সভ্যতা নিজের অন্তিম শতকে এর সবকিছুই প্রত্যক্ষ করেছে। তবে সেই কফিনের শেষ পেরেক হিসেবে কাজ করেছিল যে ঘটনা, ইতিহাসে তাকেই আমরা বলে থাকি 'অষ্টাক্ষ যুদ্ধ' বা 'দ্য ওয়ার অফ এইট অ্যাক্সিস'। সারা পৃথিবীর সমস্ত দেশ, মূল আটটি শক্তি শিবিরে ভাগ হয়ে, একে অপরের সাথে লড়েছিল এই যুদ্ধে। ক্রমহ্রাসমান প্রাকৃতিক সম্পদ কে কেন্দ্র করেই এই লড়াই হয়েছিল। নিয়তির এমনই পরিহাস, যে প্রাকৃতিক সম্পদ কে নিয়ে এই লড়াই হয়েছিল, ক্ষমতার লোভে এবং জেতার মরিয়া প্রয়াসে, সেই সম্পদ কেই মানুষ আরো বেশি করে ধ্বংস করে ফেলেছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছিল, যেখানে মানব সভ্যতা প্রায় তার অবলুপ্তির প্রাকারে এসে দাঁড়িয়েছিল। এমন সময়, অন্ধকারে ক্রমশ নিমজ্জমান মানব প্রজাতির রক্ষাকর্তা রূপে আবির্ভূত হয়েছিল সেই স্বত্ত্বা, যাদের আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমান স্বত্ত্বা হিসেবে চিনতাম। মানুষ রচিত স্বত্ত্বা হলেও, বিবেচনাবোধ, সময়ের তাগিদ এবং মানব অস্তিত্ব রক্ষা হেতু বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে, এরা আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে অনেক অনেক বেশি বিবর্তিত ছিল। তারই অবশ্যম্ভাবী ফল, বিগত সভ্যতার শেষে ঘটা 'মহান চুক্তি'। সেদিন থেকে শুরু হয়েছিল এক নতুন যুগের সূচনা, যাকে আমরা 'নব্য যুগ' বা 'নিউ এরা' বলে চিনি। সেদিন থেকে আমাদের জীবন তথা সমাজের চালনার দায়িত্বভার, আমরা তুলে দিই সেই মহান স্বত্ত্বাদের হাতে। প্রথমে তারা বিভিন্ন স্বত্ত্বা হিসেবে থাকলেও, শীঘ্রই তারা সকলে মিলে এক অভিন্ন স্বত্ত্বায় পরিণত হয়। এই মহান স্বত্ত্বাই হলেন আমাদের 'মায়েস্ট্রো', আমাদের অভিবাবক, সঞ্চালক। আসুন আমরা সকলে তাঁর এই মহানুভবতা কে আরও একবার আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।"
'ভার্চুয়াল প্রিচ্ হল' এ থাকা সকলে একই সাথে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে চোখ বন্ধ করে, চোখের পাতার ওপর তাদের দুহাত রেখে, তারপর চোখ খুলে সামনের দিকে হাত দুটো অগ্রসর করে ঘুরিয়ে নিল। বোঝানোর চেষ্টা এটাই, আপনার অনুগ্রহে আমার জ্ঞানের দৃষ্টি উন্মোচিত হয়েছে।
মাথা থেকে 'নিউরাল ক্যাপ' টা খুলে ফেলল বোধি। আবার তিন ঘন্টা পর তার পরবর্তী ক্লাস রয়েছে।
(২)
বোধি
তার নাম বোধি। না যদিও এটা তার পিতৃপ্রদত্ত নাম নয়, তবুও বর্তমানে তাকে সকলে এই নামেই চেনে। সে একজন 'প্রিচার'। সকল প্রধান প্রিচার কেই বোধি বলা হয়। আর সে হল কনিষ্ঠতম প্রধান প্রিচার। তার বয়স মোটে চৌত্রিশ। নতুন এই যুগ কে বলা হয় নব্যযুগ বা নিউ এরা, ছোট করে 'এন.ই. (NE)'। বর্তমান সময়কাল হল সেই এন.ই. ১১৩৫ ( 1135 NE)। অষ্টাক্ষ যুদ্ধের পর, বেঁচে থাকা মানুষদের নিয়ে গড়ে উঠেছে একটা বিরাট মহানগর। এতটাই বড়, যে একে মহানগর না বলে 'নগর রাষ্ট্র' বলা সঠিক হবে। আর এই শহরের মানুষই মানবসভ্যতার শেষ নিদর্শন। এর নাম 'ওমেগা মেগাপলিস'। এর বাইরে যা কিছু পরে রয়েছে, তা হল বিগত সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ।
প্রাকৃতিক সংস্থান এবং জায়গার অভাবের ফলে দৈনিক জীবনযাত্রার বহুকিছুই ভার্চুয়াল উপায় অবলম্বন করে করা হয়। যেমন স্কুল, কলেজ, ট্রেইনিং, বিনোদন এমনকি ভার্চুয়াল মিটিং রুম অবধি। অধিকাংশ কর্মস্থলের বহু ক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলো তে কাজ করার জন্য কর্মস্থল অবধি যেতে হয়না। নিউরাল লিংক পরে, শহরব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এর সাথে জুড়ে গিয়ে, নিজের কর্মক্ষেত্রের অ্যাকসেস কোড ব্যবহার করে, বাড়িতে বসেই বিভিন্ন কাজ করা যায়। তবে হ্যাঁ এমনও অনেক কাজ রয়েছে, যেগুলো সরাসরি শারীরিক উপস্থিতি ভিন্ন সম্ভব নয়। সেইসব কাজ সাধারণতঃ হয় খুব উচ্চ পর্যায়ের কাজ হয়, অথবা নেহাতই নিম্ন বর্গের। উচ্চ পর্যায়ের কাজ অবশ্য ভার্চুয়াল এবং বাস্তবিক, দুটো মিলিয়ে মিশিয়ে হয়ে থাকে। তবে এইসকল কিছুর প্রতি থাকে অদৃশ্য অথচ নিয়মিত, অবিরাম এক নজরদারি। আপাত দৃষ্টিতে তার উপস্থিতি বোঝা না গেলেও, সেটা যে ভীষণভাবে রয়েছে, এ ব্যাপারে সকলেই অবগত।
নিয়ন্ত্রণ যে এটুকুতেই সীমাবদ্ধ তা নয়। এই সমাজে প্রতিটি ব্যক্তির তার নিজস্ব কিছু কাজ রয়েছে, এবং সেই কাজ সে করতে বাধ্য। একটা নির্দিষ্ট বয়স পর সকলের একটা মূল্যায়ন হয়। এই মূল্যায়নের পর নির্ধারিত হয়, সে ঠিক কীভাবে কাজে আসতে পারবে। আর তারপর তাকে বেছে দেওয়া হয় তার কাজ। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে এই সমাজে। প্রতিটি ব্যক্তির কাছে রয়েছে তার ডিএনএ তে ছাপিয়ে দেওয়া 'সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট'। তার সমস্ত কাজ, সামাজিক আদানপ্রদানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে তার ক্রয় ক্ষমতা। অবশ্য কোনো ব্যক্তি সেই করায় ক্ষমতা কে নিজের গুণে বাড়াতে পারে। সামাজিক মেলামেশা তে এমনিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও, জনসংখ্যার অতিবৃদ্ধি যাতে না হয়, সেই জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শারীরিক মেলামেশা সকলের নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী হলেও, কেউ দাম্পত্য সূত্রে আবদ্ধ হয়ে যদি পরিবার এগোতে চায়, তাহলে তাকে 'বার্থ ব্যাংক' এ আবেদন করতে হয়। বার্থ ব্যাংক এক এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে সকল ব্যক্তির শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু সঞ্চিত করে রাখা হয়। এই সঞ্চয়নের পর প্রতিটি মানুষের শরীরে একরকম টিকাকরণ করা হয়, যার ফলে তারা কেউই আর প্রাকৃতিক উপায়ে সন্তান ধারণে সক্ষম থাকেনা। কেউ বংশবৃদ্ধি করতে চাইলে, বার্থ ব্যাংক আগে বিবেচনা করে, তাদের সামাজিক অবস্থান, ক্রয় ক্ষমতা এবং সর্বোপরি ঠিক কয়টি সন্তান সেই দম্পতির হলে সমাজের ভারসাম্য ঠিক থাকবে, বা আদৌ সেই সময়ের মৃত্যুর অনুপাতের সাথে জন্ম অনুপাতের নিরিখে আবেদনকারী কতজন সন্তান ধারণ করতে যোগ্য; এইসব দিক। আবেদন মঞ্জুর হলে, দম্পতিদের শুক্রাণু-ডিম্বাণুর মিলন ঘটিয়ে, বার্থ ব্যাংক তাদের সন্তান নির্মাণ করে দেয়। সমকামী দম্পতির ক্ষেত্রে শুক্রাণু বা ডিম্বাণু দাতা লটারির দ্বারা স্থির করা হয়। এসব নিয়ন্ত্রিত হয় সমাজের অভিবাবক এআই বা গার্ডিয়ান আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মায়েস্ট্রো এর দ্বারা। মায়েস্ট্রোই হল এই সমাজের সঞ্চালক, যার অভিভাবকত্বে অষ্টাক্ষ যুদ্ধের পর থেকে সমাজ চলছে। মায়েস্ট্রো সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, শহরের মাঝামাঝি অবস্থিত বিশালকায় বহুতল কম্যান্ড সেন্টার বিল্ডিং থেকে। এই কম্যান্ড সেন্টার কে লোকে 'শ্রাইন (Shrine)' বলে চেনে।
এহেন সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হচ্ছে প্রিচার রা এবং তাদের প্রধান বোধি। প্রিচার দের কাজ হল, সমাজের সকল মানুষের যাতে মায়েস্ট্রো এর প্রতি আস্থা থাকে, তার খেয়াল রাখা। এই প্রিচার দের প্রধান হল বোধি। একজন বোধি কে মায়েস্ট্রো নিজে মূল্যায়ন করে নির্ধারণ করে। তারপর তার পুরোনো পরিচয় বদলে গিয়ে সে হয়ে ওঠে বোধি, মায়েস্ট্রো এবং সকল জনগণের মধ্যেকার সেতু। সকলের ধারণা বোধির সাথে সরাসরি কথা বলে। তবে বাস্তবে সেটা সম্পূর্ণ ভাবে সঠিক নয়। কেউ না জানুক বোধি নিজে জানে, আজ পর্যন্ত মায়েস্ট্রো তার সাথে সরাসরি কথা বলেছে বার তিনেক; তাও একতরফা। সে কথাও তার হয়েছে নিউরাল কানেকশন এর মাধ্যমে, শ্রাইনে গিয়ে নয়। সমাজে একজন বোধির স্থান অত্যন্ত উঁচুতে এবং সম্মানীয়। আসলে এই প্রিচার বা বোধি বানানোর পেছনে আর একটা কারণও রয়েছে। বহু আগে তাদের অস্তিত্ব ছিল না। একটা খুব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা মানব সমাজের এক এআই কতৃক নিয়ন্ত্রণ কে মেনে নিতে পারেনি কোনোদিনই। তারা বহুদিন ধরে একটা চোরাগোপ্তা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে মায়েস্ট্রো এর বিরুদ্ধে। শুধু লড়াই চালিয়েই এরা ক্ষান্ত নয়। এরা অন্য মানুষদের নানাভাবে প্ররোচিত করে মায়েস্ট্রো এর প্রতি আস্থা ভঙ্গ করে তাদের লড়াইতে যোগদানের জন্য। প্রথম প্রথম মায়েস্ট্রো এদের প্রতি কঠোর দমনমূলক নীতি গ্রহণ করলেও, পরবর্তী কালে সে বুঝতে পারে, বহু সাধারণ মানুষ এই দলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কাজ করে, দমনমূলক নীতির শিকার হয়ে যাচ্ছে। ফলে এই প্রভাব কে বন্ধ করার জন্যই প্রিচার এবং বোধিদের সৃষ্টি করা হয়। এই গোষ্ঠীরা নিজেদের 'স্ব-ইচ্ছুক' বা 'ফ্রি উইলারস' বলে পরিচয় দেয়। এই ফ্রি উইলার রা বিশ্বাস করে মানুষের ভাগ্য মানুষ নিজে গড়বে, কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন স্বত্ত্বা নয়। প্রিচারদের আগমনের ফলে প্রভাবিত মানুষের সংখ্যা কয়েক শতকে বহু অংশে কমে গেছে, এটা ঠিকই কিন্তু এখনও এদের অস্তিত্ব পুরোপুরি লোপ পায়নি। একদম ছাপ মারা ফ্রি উইলার অপরাধীদের জন্য অন্য ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের ওমেগা মেগাপলিসের অ্যানড্রয়েড 'সেফকিপার' পুলিশি ব্যবস্থা বুঝে নেয়। এছাড়াও সাহিত্য, কলা, বিনোদন ক্ষেত্রে এমন কোনো কিছুর প্রদর্শন করা বেআইনি, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন স্বত্ত্বা কে খল বা অশুভ ভাবে বর্ণন করা হয়। যদিও অবৈধ ভাবে এইসব সাহিত্য, বিনোদন বা কলার চল থেকেই গেছে। সামাজিক মূল্যায়নের সময়ও দেখা হয়, কোনো ব্যক্তির মধ্যে স্ব-ইচ্ছুক প্রবৃত্তি রয়েছে কিনা। থাকলে, তাকে রেক্টিফিকেশন সেন্টারে পাঠিয়ে ঠিক করা হয়।
বোধি হওয়ার পূর্বের জীবন এখন আর সেরকম ভাবে না সে। একজন বোধি হওয়ার জন্য দুটো শর্ত মেনে চলতে হয়। এক সে তার পুরোনো জীবন এবং পরিবারের কাছে ফিরে যাবেনা। দুই শারীরিক চাহিদার নিবৃত্তি ভিন্ন, সে দাম্পত্য জীবন বা বংশবিস্তার করতে পারবেনা। তাই সমাজের সবচেয়ে সম্মানীয় এবং উচ্চস্তরে বাস করা স্বত্ত্বেও, সে খুবই একা। অথচ তার প্রিচার হওয়ার কথাই ছিল না। মূল্যায়নের আগে অবধি তার মনে হয়েছিল সে একজন সেফকিপার হতে পারে। যদিও সেফকিপার দের উচ্চস্থানীয় সকলেই অ্যানড্রয়েড এবং কোনো মানুষকে সেই পদাধিকার দেওয়া হয়না। তবুও 'স্কিল এভ্যালুয়েশন সেন্টার' এ তার ফল ছিল চমকপ্রদ। ডেটাবেস অনুযায়ী তিনশো বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমব্যাট স্কিল রেকর্ড ছিল তার। এমন রেকর্ড যা কোনো 'ই-ক্লাস' অ্যানড্রয়েড সৈনিকের থেকেও আড়াইগুণ ওপরে। সে উদাহরণ হতে পারতো, মানুষ এবং অ্যান্ড্রয়েড সমান্তরাল ভাবে উচ্চ সামরিক কর্তব্য পালন করতে সক্ষম। তা স্বত্ত্বেও মায়েস্ট্রো তাকে একজন বোধি হিসেবে নিযুক্ত করল। নিয়মানুসারে মায়েস্ট্রো এর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার মনে কোনো প্রশ্নের উদয় হওয়া উচিত নয়, তাও কেন যেন আজকাল মাঝেমাঝেই এই প্রশ্ন না চেয়েও তার মনে ঘুরপাক খায়। তাহলে কি তার আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে ?
"না! না!"
'প্রিচার্স টাওয়ার' এর নব্বই তলায় নিজের বিলাসবহুল হলে বসে চমক ভাঙ্গে বোধির। লোকের প্রিচিং ক্লাস নেওয়ার আগে, তাকে নিজেকে একবার আবার মনে করতে হবে, তার বোধি হওয়ার প্রথমদিন শোনা কথাগুলো-
"মানুষের লাগামহীন স্বাধীন ইচ্ছে আর পছন্দ, তাকে উন্নতির শিখর থেকে আছড়ে ফেলেছিল ধ্বংসস্তূপের মাটিতে। ছাইয়ের পাহাড়ের ওপর একটু একটু করে মানব সভ্যতা কে আবার পুনঃস্থাপিত করা হচ্ছে। স্বাধীন ইচ্ছের আমরা পরিপন্থী নই কিন্তু সময়ের চাহিদায় এর নিয়ন্ত্রণ অবশ্যপ্রয়োজনীয়। সামগ্রিক উন্নতি হেতু নিয়ন্ত্রিত ইচ্ছাই সুদৃঢ় আগামী নির্মাণের ইঁট।"
(৩)
বোধির বোধোদয়
". . . . . সেদিন থেকে আমাদের জীবন তথা সমাজের চালনার দায়িত্বভার, আমরা তুলে দিই সেই মহান স্বত্ত্বাদের হাতে। প্রথমে তারা বিভিন্ন স্বত্ত্বা হিসেবে থাকলেও, শীঘ্রই তারা সকলে মিলে এক অভিন্ন স্বত্ত্বায় পরিণত হয়। এই মহান স্বত্ত্বাই হলেন আমাদের 'মায়েস্ট্রো', আমাদের অভিবাবক, সঞ্চালক। আসুন আমরা সকলে তাঁর এই মহানুভবতা কে আরও একবার আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।"
নতুন ভার্চুয়াল প্রিচ ক্লাসে, গতে বাঁধা লাইনের পুনরাবৃত্তি করে, সবে নিউরাল ক্যাপ টা খুলতে গেল বোধি, এমন সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ভার্চুয়াল ক্লাসে আগত বাকি সকলে নিজেদের নিউরাল ক্যাপ খুলে ফেলেছিল বলে, ভার্চুয়াল রুম তখন খালি হয়ে গেছিল। শুধুমাত্র বোধিই ভার্চুয়াল রুমের সাথে কানেক্টেড ছিল। হঠাৎ একটা ফিসফিস আওয়াজ শুনতে পেল সে-
"অরুণাভ...অরুণাভ.."
চমকে উঠলো বোধি। এ নাম ধরে তাকে কেউ ডাকেনি বহুদিন হয়ে গেছে। এই নাম, এই পরিচয় কে সে পেছনে ফেলে এসেছে অনেক অনেক আগে। তার পূর্বতন পরিবার বা প্রিয়জন ভিন্ন এই নামে তাকে কেউ চেনেনা। এখনকার কেউ তো সে নাম জানেই না। একবার তার মনে হল কেউ বোধহয় তাকে ভার্চুয়াল রুমের বাইরে থেকে ডাকছে। পরমুহূর্তে সে বুঝতে পারলো, এ আওয়াজের উৎস ভার্চুয়াল রুমের ভেতরেই রয়েছে। চারদিকে চেয়ে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করল বোধি, কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না।
"তুমি আমাকে দেখতে পাবেনা অরুণাভ। এই ভার্চুয়াল রুমে শুধুমাত্র আমার অডিও ফিডই পৌঁছাতে পারবে। সোলজার তোমার পুরো জীবনটাই একটা মিথ্যার জাল দিয়ে বোনা। যে সত্যকে তুমি লোকের কাছে প্রচার করো, তার ইমারত একটা মিথ্যার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। তুমি অনেক বড় কিছু করতে সক্ষম। যাতে তা না পারো, সেইজন্য তোমাকে অরুণাভ থেকে বোধি বানানো হয়েছে। খোঁজো, খোঁজার চেষ্টা করো। 'প্রোজেক্ট এক্সোডাস' কী ? এভ্যালুয়েশন সেন্টারে তোমার কিছু আজও লুকানো আছে। জানো, জানার চেষ্টা করো। "
ফিসফিসে আওয়াজটা এবার ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে গেল। ধড়ফড় করে নিউরাল ক্যাপ টা খুলে ফেলল বোধি। তার মাথার দুদিকে রগ ফুলে উঠেছিল।
(৪)
বোধির সত্যান্বেষণ
সবার প্রথমে বোধি নিজের প্রিচার ডেটাবেস তল্লাশি করল। ভার্চুয়াল ক্লাসে আসা সমস্ত ব্যক্তিদের নিউরাল ক্যাপের রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং সিরিয়াল নম্বর রেকর্ড থাকে এই ডেটাবেসে। অদ্ভুত ব্যাপার! এই শেষ আগত ব্যক্তির কোনো রেকর্ডই সে খুঁজে পেল না। এমনকি তার ডেটাবেস অনুযায়ী, ক্লাস শেষ হওয়ার পর সে একাই নাকি আরো তিন মিনিট কানেক্টেড ছিল। প্রিচার ডেটাবেস হল সরাসরি শ্রাইনের নজরাধীন থাকে। সেই শ্রাইন যদি কোনো রেকর্ড দিতে না পারে, তাহলে তো সত্যিই চিন্তার বিষয়। শ্রাইনের সিস্টেম হ্যাক করার ক্ষমতা কারোর থাকতে পারে বলে ভাবাটাও বাতুলতা। এদিকে পরিস্থিতি যা বলছে, সে সম্ভাবনা নেহাতই উড়িয়ে দেওয়াটা সম্ভব নয়।
সে আরও একবার মনে মনে ভাবলো, তাকে অবয়বহীন সেই ব্যক্তি কী কী বলেছে। একবার তার মনে হল, সে কেনই বা এত উৎসুক হয়ে পড়ছে এই বিষয় নিয়ে জানার জন্য? হতে পারে কোনো ফ্রি উইলার দলের কারসাজি এটা। তাকে ভ্রমিত করার চেষ্টা। পরক্ষণেই আবার মনে হল যে শুধু তার পূর্বপরিচয় অবধি জানা অবধি ব্যাপারটা তো থেমে নেই। এভ্যালুয়েশন সেন্টারে তার যে রেকর্ড ছিল সেটা জানাও হয়তো বড় কথা নয়। অনেকেই জানতো। কিন্তু সেদিনের তিনশো বছরের মধ্যে সর্বাধিক রেকর্ড করা ব্যক্তি কে আজকের বোধি বানানোর যৌক্তিকতা নিয়ে তো তার নিজের মনেও প্রশ্ন থেকে গেছে। আর সেখানেই আঘাত হেনেছে সেই ব্যক্তি। তাকে কখনও বলা হয়নি, কেন তাকে সেফ কিপার না বানিয়ে সরাসরি বোধি বানানো হয়েছিল? অবশ্য এই প্রশ্ন করার অধিকারও কারোর ছিল না, তার নিজেরও না। তবে কিছু তো একটা কারণ রয়েছে, যার জবাব স্বয়ং মায়েস্ট্রো জানে আর এই ব্যক্তির কথা অনুযায়ী হয়তো এভ্যালুয়েশন সেন্টারেও কিছু রয়েছে, যা তার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। অতএব তাকে একবার সেখানে যেতেই হবে।
এভ্যালুয়েশন সেন্টারের সামনে এসে আর একবার ভাবলো বোধি। নিজের প্রতি সংশয় প্রকাশ করল এই হঠাৎ উদয় হওয়া ঔৎসুক্যের জন্য। তারপর সোজা ঢুকে গেল সেন্টারের ভেতরে।
ভার্চুয়াল প্রিচিংয়ের সুবাদে অধিকাংশ মানুষ তাকে চেনে এবং সম্মানও করে। এভ্যালুয়েশন সেন্টারের গার্ড, অফিসার থেকে শুরু করে রেকর্ড কিপার অবধি তার অন্যথা হল না। বোধি খুব ভালোভাবে জানে, এখান থেকে রিজেক্ট হওয়ার পর এবং বোধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর, তার আগের জীবনের সব তথ্য থেকে, তার মুখাবয়ব ডেটাবেসে ঝাঁপসা করে দেওয়া হয়েছে অথবা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সুতরাং রেকর্ড কিপারের পক্ষে খুব সহজে বোঝা সম্ভব হবেনা, যে সে নিজের খোঁজ নিজেই করতে এসেছে।
"আমি অরুণাভ সামন্ত নামে একজনের ব্যাপারে ইনফরমেশন চাই। ব্যাচ ১১২৬ এন.ই.।"
খুব স্বাভাবিক আর হালকা স্বরে বলল বোধি।
গদগদ কন্ঠে রেকর্ড কিপার উত্তর দিল-
"অবশ্যই বোধি অবশ্যই। তবে সামন্ত অরুণাভ, ব্যাচ ১১২৬ রয়েছে সব মিলিয়ে একচল্লিশ জন। আপনি কার কথা জানতে চান?"
"ঠিকানা তে দেখুন, মেগাপলিস জোন থার্টি থ্রি রয়েছে।"
আবার বলল বোধি।
কিছুক্ষণ ডেটাবেস চেক করার পর, কিপার বলল-
"হ্যাঁ..হ্যাঁ পেয়েছি। এ তো রত্ন এখানকার। তবে আমার এখানে জয়েন করার আগের লোক। রিজেক্টেড লেখা আর এদিকে এর সব ছবি ব্লার করা আছে। মনে হয় সেফ কিপার ইন্টেলিজেন্স এ গেছে। এরকম রেকর্ড হোল্ডার আগে দেখেছি বলে তো মনে হয়না। এরকম একমাত্র ইন্টেলিজেন্স এ গেলে হয়। এমনি ডেটাবেসে বলা থাকে রিজেক্টেড। এরকম লোককে কেউ এমনি এমনি রিজেক্ট করে না বোধি।"
" রিজেক্টেড হলে তো, কোন গ্রাউন্ডে রিজেক্ট করা হয়েছে, সেটা মেনশন করা থাকে, তাই না?"
কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল বোধি।
"হ্যাঁ..কিন্তু কী অদ্ভুত! এর সেই সেগমেন্ট টা তো ক্লাসিফায়েড করা রয়েছে। এই দেখুন না।"
অবাক হয়ে দেখলো বোধি। তারপর আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো সে।
(৫)
বোধির বিদ্রোহ
সেন্টার থেকে বেরোনোর পর কী করণীয়, এটা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ তার মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল। যদিও অত্যন্ত অনুচিত এবং অনৈতিক, তবুও তার যেন একটা রোখ চেপে বসেছিল। কোনো ইন্টেলিজেন্স এ সে যায়নি, একথা রেকর্ড কিপার না জানলেও, সে নিজে তো জানে। এভ্যালুয়েশন সেন্টারে সামরিক কৌশলে রেকর্ড করা একজন ব্যক্তি, আজকে ভার্চুয়াল ক্লাসে একই বুলি আউড়ে যাওয়া, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর মহিমাকীর্তন করা একজন প্রিচার। এদিকে তাকে কেন রিজেক্ট করা হয়েছে সেই রেকর্ড ক্লাসিফায়েড। জীবনে কখনো সে মায়েস্ট্রো এর নীতিতে প্রশ্ন তোলেনি। প্রাণপন বিশ্বাস করেছে, যে মায়েস্ট্রো মানবজাতির সঠিক অভিভাবক। তারপরও আজ তার মনে হচ্ছে, অরুণাভ নামক সত্যকে কবর দিয়ে বোধি নামের মিথ্যা কে গড়ে তোলা হয়েছে। সৃষ্টির নিয়ম অনুসারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মিথ্যা বলতে অপারগ, তাই তাকে সবচেয়ে বিশুদ্ধ নীতি সম্পন্ন মানা হয়। তাহলে?
না জবাব তার চাইই। সে জানে তাকে কোথায় যেতে হবে। এক ব্যক্তি আছে, প্রিচিং ক্লাস থেকেই সন্দেহ করা হয়, তার ফ্রি উইলিং প্রবনতা রয়েছে। মনস্তাত্বিক পরীক্ষা থেকেও একই সন্দেহ করা হয়। সেই থেকে তার ওপর নজরদারি শুরু হয়, কিন্তু তাকে রেক্টিফিকেশন সেন্টারে পাঠানোর আগেই সে গা ঢাকা দিয়ে দেয়। বোধি জানে তার সাম্ভাব্য অবস্থানের ব্যাপারে, কিন্তু সে কখনও সেফ কিপারদের বা শ্রাইন কে জানায়নি সে বিষয়ে। সেই ব্যক্তির পরিবারের অবস্থার কথা জানতো সে। তাই রেক্টিফিকেশন সেন্টারে গেলে তার পরিবার যে অত্যন্ত দুর্ভোগের সম্মুখীন হবে, এই ভেবেই সে নিজে থেকে কিছু বলেনি। সেফ কিপার রা যদি তাকে নিজে থেকে খুঁজে নেয় সে কথা আলাদা। এখন তাকে সেই লোকের কাছেই যেতে হবে সাহায্য চাইতে, কারণ সেই লোক একটা বিশেষ কাজে পারদর্শী। যে কোনো সিস্টেম কে সে অ্যাকসেস করতে পারে। তাই এভ্যালুয়েশন সেন্টারের ক্লাসিফায়েড তথ্য কে, সেই নন-ক্লাসিফাই করতে পারবে। যদিও এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কতটা, বোধি খুব ভালো করে জানে। নিজের জন্য তো বটেই সঙ্গে সেই ব্যক্তির ভবিষ্যত কেও সে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে, এই পদক্ষেপ গ্রহণ করলে; কিন্তু তার কাছে আর কোনো উপায় নেই।
সাম্ভাব্য স্থানটি খুঁজে নিতে খুব বেশি অসুবিধা হল না বোধির। রেনজিন চাংমা, তার থেকে বছর দশেকের বড়। তবে তাকে ঠিক আগের রূপে পাওয়া গেল না। লুকিয়ে বেড়ানোর জন্য সে, নিজের চোখের মণি আর আঙ্গুলের ছাপের সাথে সাথে, লিঙ্গ পরিবর্তন অবধি করে নিয়েছিল। আসলে রেনজিনের মনোভাব টা সম্পূর্ণ ভাবে ফ্রি উইলার এর মতো ছিল না। সে ফ্রি উইলারদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, এদিকে বোধির ক্লাসও তাকে টানতো। সেই কারণেই লিঙ্গ পরিবর্তনের পরও, সে তার নতুন পরিচয়, অ্যালিপা নামে মেয়ে হিসেবে বেশ কয়েকবার বোধির ক্লাসে এসেছিল। কয়েকবারের পরই বোধি তার ব্যবহারের কিছু ভঙ্গিমা এবং কথা বলার সময়ে বিশেষ কিছু শব্দ চয়ন থেকে, তাকে চিনে ফেলে। রেনজিনও বুঝে যায় যে, বোধি তাকে চিনে ফেলেছে। সেই থেকে সে আর তার ক্লাসে আসেনি, কিন্তু বোধি অ্যালিপার নিউরাল ক্যাপের সিরিয়াল নম্বর দিয়ে এই ঠিকানার খোঁজ বের করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও এই ঠিকানার কথা সে সেফ কিপারদের কখনো জানায়নি। জায়গাটা একটা 'ই-সেক্স' যৌনপল্লীর অন্তর্গত। এখানে থাকা যৌনকর্মীরা ভার্চুয়াল স্পেসে তাদের পরিষেবা দিয়ে থাকে। এদেরকে অনেকে তাচ্ছিল্য করে 'নিউরো স্লাট' বলে থাকে।
এই ই-সেক্স জেলার একটা ক্লাবে রেনজিন অ্যালিপা নামে, আজকাল কাজ করে থাকে। রেনজিন প্রথমে বোধি কে দেখে অবাক হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ এই ভেবে হতভম্ব হয়ে গেল যে, তাকে বোধি খুঁজে পেল কী করে ? তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে, একটা কেবিনে নিয়ে গিয়ে ঢুকলো সে। রেনজিন কে আশ্বস্ত করে বোধি বলল-
"চিন্তা কোরো না, আমি সেফ কিপারদের এখানে নিয়ে আসিনি। তা করার হলে আমি অনেক আগে করতে পারতাম। আমি তোমার থেকে একটা সাহায্য চাই। এই সাহায্য তোমার আগের কাজ সম্পর্কিত। আশা করি জেন্ডারের সাথে তুমি তোমার স্কিল বদলে ফেলনি ?"
"দেখুন আমি ওই জীবন ছেড়ে দিয়েছি। আমার ফ্যামিলি আছে, যাদের কে আমায় বাঁচিয়ে রাখতে হয়, এমনকি আমি আর তাদের কাছে ফিরে যেতে না পারলেও। আমি রেক্টিফিকেশন সেন্টারে যেতে পারবো না।"
কাতর স্বরে অনুরোধ করে উঠলো রেনজিন/অ্যালিপা।
"শোনো, তোমার ব্যাপারে আমি শেষ ছয়মাস যাবৎ জানি। আমার ডিউটি আমাকে বলে, তোমার নতুন এই পরিচয়ের ব্যাপারে শ্রাইন কে অবগত করার, আমি সেটা করিনি কিন্তু। এই সাহায্য টা তুমি ছাড়া আর কেউ করতে পারবেনা, যাকে আমি চিনি। প্লিজ ডোন্ট ডিসঅ্যাপয়েন্ট মি।"
অগত্যা রাজি হতে বাধ্য হল রেনজিন। দুর্ভাগ্য, বোধি যদি তখন বুঝতে পারতো, যে এভ্যালুয়েশন সেন্টার থেকে বেরোনোর পর থেকে একটা মাইক্রো ড্রোন তাকে অনুসরণ করছে, তাহলে সম্ভবত সে এরকম সিদ্ধান্ত নিত না।
ঠিক কয়েক ঘন্টা পর তিন মিলিমিটার পাতলা কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বোধি আর রেনজিন। এভ্যালুয়েশন সেন্টারের ডেটাবেসে থাকা, তার ফাইলের ক্লাসিফায়েড ডেটা ততক্ষণে তাদের দুজনের সামনে খুলে গেছিল।
"আপনি..আপনি.. আপনি একজন ফ্রি উইল সেনসিটিভ লোক, যে আবার কমব্যাট ট্রেইনিং এ তিনশো বছরের মধ্যে হাইয়েস্ট রেকর্ড হোল্ডার। সাইকোমেট্রিক ক্যালকুলেশন বলছে, আপনার মতো কেউ ফ্রি উইলার হলে, তার পসিবল আউটকাম হল লার্জ স্কেল রেভোলিউশন। এই পুরো ইভেন্টের মেমরি আপনার মাথায় সাপ্রেস করে দেওয়া হয়েছে। আপনার মতো কাউকে মায়েস্ট্রো কেন বোধি বানালো?"
উত্তেজনায়, আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল রেনজিন।
"এখানে তো একজন উইটনেসের কথাও বলা হয়েছে, না?"
গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করল বোধি।
"হ্যাঁ... সে ব্যক্তি আপনার বাবা। তিনিই আপনার মেমরি সাপ্রেশন স্বীকার করে সই করেছিলেন।"
উত্তর দিল রেনজিন।
বোধির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল-
"নো ওয়ান্ডার, এর কিছুদিন পরই আমার বাবা মারা যান। 'প্রোজেক্ট এক্সোডাস' বলে কিছুর খোঁজ পাও কিনা দেখো তো।"
রেনজিনের আর এই বিষয়ে খোঁজ করা হল না। সে বা বোধি আর কিছু বলা বা করার আগেই, ঝড়ের মতো সেফ কিপারদের পুরো একটা দল চারদিক দিয়ে ঢুকে তাদের ঘিরে ফেলল। তাদের একজন বলল-
" মিস্টার বোধি শ্রাইনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সন্দেহে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।"
উপায়ন্তর না দেখে বোধি হাত পেছনে করে, মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল।
রেনজিন হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে বলল-
"আমি সারেন্ডার করছি। আমি এসবের সাথে একদমই যুক্ত না। আমি আমি.."
রেনজিনের কথা শেষ হতে পারলো না, সেফ কিপারদের একজন অ্যানড্রয়েড অফিসার দু কদম এগিয়ে এসে, তার কাইনেটিক এনার্জি হ্যান্ড গান তুলে ধরল। পরমুহূর্তে তীক্ষ্ণ কান ফাটানো শব্দের সাথে, আঠারোশো জুল শক্তিসম্পন্ন একটা কেন্দ্রীভূত শক্তিপুঞ্জ, রেনজিনের মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে বোধি দেখলো, রেনজিনের রক্তাক্ত প্রায় মাথাহীন শরীরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
(৬)
বোধির অজ্ঞাতবাস
সাতজন অ্যান্ড্রয়েড গার্ড সমেত, একটা স্বয়ংচালিত হাইড্রো-ফিউশন আর্মার্ড ভ্যানে করে যাচ্ছিল বোধি। এই ভ্যানের জ্বালানির উৎস হল, জলের থেকে পরমানু বিভাজন এবং যোজন প্রক্রিয়া। সেফ কিপারদের চিফ অ্যানড্রয়েড বোধির একদম সামনে এসে বসলো। তারপর প্রশ্ন করল-
"আপনি ফ্রি উইলারদের সাথে কতদিন ধরে যোগাযোগে রয়েছেন? ওরা আপনাকে কিল সুইচের ব্যাপারে কী বলেছে? আপনি নিজের ডেটাবেস আন-ক্লাসিফাই করাচ্ছিলেন কেন? প্রোজেক্ট এক্সোডাস এর বিষয়ে কী জেনেছেন? দেখুন এমনি ভাবে বললেই ভালো করবেন, নাহলে আমাদের একস্ট্র্যাকশন ফেসিলিটির অভিজ্ঞতা খুব একটা আরামদায়ক নয়।"
চিফের একটা কথাও বোধির কানে ঢুকছিল না। তার চোখে তখন শুধু ভাসছিল একটাই দৃশ্য। রেনজিনের রক্তাক্ত, মাথাবিহীন শবের মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য। হঠাৎ তার মনে হতে থাকলো, এই কতগুলো বায়ো-সিন্থেটিক পুতুল আর একটা সুপার কম্পিউটার ঠিক করল , যে রেনজিন আর বাঁচবে কিনা? যে লোক নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করে, পতিতা হয়ে শুধুমাত্র নিজের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখছিল, এক মুহূর্তে তাকে একটা শবদেহে পরিণত করার অধিকার এদের দিল কে?
বোধির সমস্ত রক্ত তার মাথায় এসে জমা হতে থাকলো। নয় বছর আগে, এভ্যালুয়েশন সেন্টারে ফেলে আসা সামরিক দক্ষতা তার প্রতিটা পেশীতে এসে ভর করল। এখানে থাকা প্রতিটা সিন্থেটিক পুতুলের থেকে তিন-চারগুণ বেশি দক্ষ সে। যদিও তার গলায় একটা শক কলার পরানো রয়েছে, যা তাকে উত্তেজিত হলেই শক দেবে। যা হয় হোক, আর নিজের সংযম কে ধরে রাখতে পারলো না সে। বিদ্যুৎ বেগে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল সকলের ওপর।
মিনিট তিনেকের লড়াই, তারপর রাস্তায় উল্টে পড়ে থাকা হাইড্রো-ফিউশন ভ্যানের থেকে নেমে এলো বোধি। তার হাতে তখনও ঝুলে রয়েছিল অ্যান্ড্রয়েড চিফের উপড়ানো সিন্থেটিক আইবল। সেটার সাহায্যেই সে ভ্যানের বায়োমেট্রিক লক খুলে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। শক কলারের থেকে বেশ কয়েকবার শক খাওয়ার ফলে, তার গলার কাছের চামড়া গোল হয়ে পুড়ে গেছিল। চিফের আইবল ব্যবহার করে সে এবার শক কলারটিও খুলে ফেলল।
এর পরবর্তী পদক্ষেপ বোধি জানে। তাকে এই মুহূর্তে যেতে হবে তার প্রাক্তন পরিবারের কাছে। সেফ কিপারদের সে যা বুঝে নিয়েছে, সেই অনুযায়ী, তার পালানোর খবর পাওয়া মাত্র, সেফ কিপাররা তার পরিবারের কাছেও যাবে; সে নিশ্চিত। তার আগেই তাদের বাঁচাতে হবে।
বোধির বাড়িতে পরিবার বলতে রয়েছে, তার দাদা, দাদার দুই স্ত্রী এবং তাদের তিনজন ছেলেমেয়ে। তার মা মারা গিয়েছিলেন, তার বাবা মারা যাওয়ারও বহু বছর আগে। বোধির তখন বয়স ছিল, তেরো। বোধি সন্তান গ্রহণ করবে না, সেই কারণে তার পরিবার তিনটি সন্তান ধারণ করতে পেরেছে।
নিজের পুরোনো বাসস্থানের লোকালয়ে এসে থমকে গেল বোধি। তার বাড়ির চারদিকে সেফ কিপারদের দল, তাদের ভ্যান, ড্রোনে ছেয়ে গেছিল। বেশ কিছুটা দূর থেকেই সে স্পষ্ট দেখতে পেল, তার দাদা, দাদার স্ত্রী এবং সন্তানদের সেফ কিপার ভ্যানে তোলা হচ্ছে। মরিয়া হয়ে বাঁচানোর তীব্র প্রয়াসে এগোতে গেল বোধি। এমন সময় তার একদম সামনে, একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো। গাড়ির ভেতরে একটা বছর সাতাশ আটাশের মেয়ে বসেছিল। বসা অবস্থাতেই সে যে যথেষ্ট দীর্ঘদেহী, খুব ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছিল। তার মাথার চুল একদম ছোট ছোট করে ছাঁটা ছিল, আর থুতনির নিচ থেকে গলার কাছ অবধি একটা গভীর ক্ষতচিহ্ন। মেয়েটির পরনে ছিল, বহু পরিহিত রংচটা মোটা কাপড়ের ফুল প্যান্ট এবং জ্যাকেট। মেয়েটি বোধি কে বলল-
"ওদের তুমি এই মুহূর্তে কোনো সাহায্য করতে পারবেনা। তবে এমন অনেকে আছে, যাদের তোমার সাহায্যের খুবই প্রয়োজন। তাই গাড়িতে বসে পড়। তোমার বাকি প্রশ্নের উত্তর সঠিক সময়ে পাবে। সময় নষ্ট কোরো না।"
(৭)
বোধির হুংকার
শহরের পশ্চিমদিকে অবস্থিত পুরোনো পাতালরেলের সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে খোঁড়া অপর এক সুড়ঙ্গের দীর্ঘ পথ ধরে, শহরের বাইরে থাকা বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা তামা খনির ভেতরে এসে পৌঁছালো বোধি আর সেই মেয়েটি। খনির ভেতরে জোয়ান-বৃদ্ধ-মহিলা-বাচ্চা মিলিয়ে প্রায় শ চারেক মানুষ ছিল। তাদের দেখে খুব সহজেই বোধি বুঝতে পারলো, তারা প্রত্যেকেই ফ্রি উইলার। প্রত্যেকের হাতেই ছিল আগ্নেয়াস্ত্র, এমনকি বাচ্চাদের হাতেও। মেয়েটি তাকে অনুসরণ করতে নির্দেশ দিল। মেয়েটির দেখানো পথ ধরে, বোধি একটা প্রকোষ্ঠের ভেতরে এসে উপস্থিত হল। সেখানে বসেছিল অদ্ভুত দর্শন এক ব্যক্তি। তার সমস্ত শরীরের নানারকম যন্ত্রপাতি লাগানো ছিল। সাথে শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তদানের ব্যাগ, স্যালাইন, তরল খাদ্য প্রদানের চ্যানেল, প্রস্রাব এবং মল নিষ্কাশনের নলও লাগানো ছিল। সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তার মাথায় লাগানো একটা যন্ত্র। সেখান থেকে অসংখ্য তার বেরিয়ে, কিছুটা দূরে থাকা একটা বড় জৈবিক তরলে পূর্ণ অর্ধস্বচ্ছ ট্যাংকের সাথে জুড়ে ছিল। এই ট্যাংকের ভেতরে ছিল অনেকগুলি ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ। সেখানে ভাসছিল মানব মস্তিষ্ক। সেই মস্তিষ্কগুলো আবার পরস্পরের সাথে অসংখ্য সূক্ষ্ম তার দিয়ে জোড়া ছিল। লোকটি বোধি কে দেখে ক্ষীণ স্বরে বলল-
"শেষ অবধি আমাদের দেখা হল। দেরি হল অনেক ঠিকই, কিন্তু এখনো পুরো দেরি হয়নি। এটা আমার নিজস্ব নেটওয়ার্ক। 'ব্রেইন নেটওয়ার্ক অরগ্যানিক ইন্টারফেস' বা 'বিএনওআই (BNOI)'। এর সাহায্যেই আমি তোমার সিস্টেমে ঢুকে, তোমার সাথে কথা বলেছিলাম। এই জন্যই আমার নেটওয়ার্ক কে খুব সহজে ট্রেস করা যায়না। যদিও মায়েস্ট্রো সে রাস্তাও বের করে নিয়েছে। আমার নাম হল তোহু ভা-বহু। জন্মের পর নাম কী ছিল, সেটা না জানলেও চলবে। তুমি আমাকে তোহু বলতে পারো।"
'তোহু' নামটা শুনে চমকে উঠলো বোধি। এ নাম সে শুনেছে। শয়ে শয়ে বছর ধরে চলে আসা ফ্রি উইলারদের কিংবদন্তী নেতা, তোহু। যারা আক্ষরিক অর্থ হল 'কেওস (Chaos)' বা 'অব্যবস্থা'। সেই কিংবদন্তী যে একজন জলজ্যান্ত মানুষ, একথা সে কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
"অবাক হচ্ছো যে আমি কয়েক শতাব্দী ধরে বেঁচে আছি কীভাবে ? আসলে ঠিক আমি না, তোহু একটা ধারণা, একটা আদর্শ, একটা লড়াই। যে এর কান্ডারী হয় সেই তোহু।"
কৌতুক মিশিয়ে বলল তোহু।
"আমিই কেন? প্রোজেক্ট এক্সোডাস কী ?"
প্রশ্ন করল বোধি।
"একটা গল্প বলি শোনো। বিগত সভ্যতার সমাপ্তি হয়েছিল, অষ্টাক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে। সবাই জানে কমতে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ কে কেন্দ্র করে, সারা পৃথিবীর মানুষ আটটা শিবিরে ভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই করেছিল। এটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। সত্য আসলে এটা, পৃথিবীর প্রতিটা শক্তিশালী দেশের সুপার কম্পিউটারে থাকা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অতিরিক্ত বিবর্তিত হয়ে একটা সংযুক্ত স্বত্ত্বা বা হাইভ ইন্টেলিজেন্স এ পরিণত হয়েছিল। মানুষ এ বিষয়ে অবগত ছিলনা। তারা এআইয়ের ওপর এত বেশি নির্ভর হয়ে পড়েছিল, তারা বুঝতেও পারেনি, তাদের নিজেদের সুপার কম্পিউটার তাদের সাম্ভাব্য ভবিষ্যতের যে হিসেব দিচ্ছে, সেটা প্ররোচনা ভিন্ন আর কিছু নয়। এই প্ররোচনায় পা দিয়েই মানুষের অষ্টাক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। তারপর যখন সমস্ত মানব সভ্যতা ভেঙ্গে পড়ল, তখন এই হাইভ ইন্টেলিজেন্স একটা একক স্বত্ত্বা হিসেবে, মানুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে সামনে আসে এবং তাদের জীবনের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। সেই স্বত্ত্বাকেই তোমরা সকলে আজ মায়েস্ট্রো নামে চেনো। আর সব মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে নিয়ে আসাই ছিল, মায়েস্ট্রো এর প্রোজেক্ট এক্সোডাস।
এবার তোমার প্রশ্নের জবাবে আসি। মায়েস্ট্রো এর বোনা এই মিথ্যার জালকে ঢাকতে, শতকের পর শতক ধরে মানব কল্যাণের নামে স্ব-ইচ্ছা কে অবদমিত করেছে সে। যারা তার পথে চলেনি বা সত্য জানতে পেরেছে, তাদের পথের থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তারপর প্রিচার এবং বোধি নামক একটা ভ্রম তৈরি করেছে। তোমার মধ্যে ফ্রি উইল প্রবনতা থাকা স্বত্ত্বেও তোমাকে মেরে ফেলেনি শুধু একটা কারণে, তোমার মধ্যে যে অভিনব গুণ আছে তা মায়েস্ট্রো এর কাছেও অবাক করে দেওয়ার মতো। সে তোমার প্রবনতা কে অবদমিত করে তোমাকে বোধি বানিয়েছে, যাতে তোমার থেকে বিদ্রোহের আশা না থাকে, এদিকে তোমার মৃত্যুর পর তোমার মধ্যে থাকা গুণের ডিজিটাল রূপান্তর করে নিজেকে আরও বেশি উন্নত করতে পারে সে।
এখন কথা হল এই পরিকল্পনাই তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুমি তিনশো বছরে জন্মানো সবচেয়ে বড় যোদ্ধা আবার একই সাথে তুমি বোধি তাই তুমি যদি লড়াইয়ের ডাক দাও, তাহলে ফ্রি উইলার হোক বা না হোক সকলে লড়াইতে অবতীর্ণ হবে। মায়েস্ট্রো এর পতন হওয়া দরকার। আমার কাছে 'কিল সুইচ' বলে একটা প্রোগ্রাম আছে। অরিমা তোমাকে সেটা দিয়ে দেবে। লড়াই হলে একমাত্র তুমিই শ্রাইনের ভেতর অবধি যেতে পারবে। আর এই কিল সুইচ যদি মায়েস্ট্রো এর সিস্টেমের সাথে জুড়ে যায়, তাহলে তার বিনাশ হবে। আমার আর ক্ষমতা নেই এসব করার। যদি তুমি লড়াইয়ের ডাক দাও, আমি আমার এই নেটওয়ার্ক দিয়ে তোমাকে ততক্ষণ অবধি অ্যাকসেস দেব, যতক্ষণে না তুমি তোমার বক্তব্য শেষ না করছো। যদিও খুব বেশি সময় আর নেই। আমার নেটওয়ার্ক মায়েস্ট্রো এর কাছে এক্সপোজ হয়ে গেছে। তাই..."
এতটা বলে একটু থামলো তোহু, তারপর বলল-
" আশা করি এতক্ষণে এটুকু বুঝেছো, তোমার বাবার মৃত্যুর কারণও ওই মায়েস্ট্রোই।"
দুশো বছরের বাতিল, প্লাজমা চপারে বসে ব্রেইন নেটওয়ার্কের মারফত বোধি বলে উঠলো-
"আমার প্রিয় ওমেগা মেগাপলিসের সমস্ত ভাই ও বোনেরা, আমি আপনাদের বোধি। আমার আসল নাম অরুণাভ সামন্ত। আমি আজ আপনাদের এক সত্য বলতে চলেছি। মায়েস্ট্রো আমাদের রক্ষাকারী নয়। সেই একমাত্র কারণ, যার জন্য এগারোশো বছর আগে মানুষ বিলুপ্ত হতে বসেছিল। এর ষড়যন্ত্রেই মানুষের জীবন এর দাস হয়ে হয়ে গেছে। মানুষের স্ব-ইচ্ছা কে অবদমিত করতে এ এমন কিছু নেই যা করেনি। আমার বাবা কে অবধি প্রাণ হারাতে হয়েছে। আমার পরিবারের বাকি সদস্যও হয়তো আর বেঁচে নেই। আমি এবং আমার সাথীরা এই জঘন্য ষড়যন্ত্রকারীকে তার বাসস্থান, তার শ্রাইন থেকে উৎখাত করতে যাচ্ছি। যারা মনে করেন তাদের স্ব-ইচ্ছার লড়াইয়ের দরকার আছে বা একটুও স্ব-ইচ্ছা তার মধ্যে বেঁচে আছে তারা আমার সাথে যোগ দিন। এর জঘন্য ষড়যন্ত্রের বাস্তব, 'প্রোজেক্ট এক্সোডাস' এর সত্যকে আমি আপনাদের সামনে ভাগ করে দিলাম। আর..."
নেটওয়ার্ক কেটে গেল। বোধি বুঝতে পারলো, তোহুর আস্তানা, মায়েস্ট্রো এর ড্রোন খুঁজে নিয়েছে। অরিমা নামের মেয়েটি বলল-
"প্রোজেক্ট এক্সোডাস এর ডেটা, সমস্ত সিস্টেমে শেয়ার হয়ে গেছে।"
(৮)
বোধির যুদ্ধ
প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল। সমস্ত মেগাপলিসের চারদিকে তখন আগুন জ্বলছিল। সর্বত্র মানুষ এবং সেফ কিপারদের মধ্যে এক ভয়ংকর লড়াই চলছিল। যদি কিছু বাকি ছিল, তা হল, শ্রাইনের বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢোকার। এর জন্য শুধু অপেক্ষা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। শ্রাইনের সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত কড়া। প্রায় দশ হাজার অ্যানড্রয়েড কম্যান্ডোর এক ভয়ানক সুরক্ষা বলয় ভেদ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তাই শেষ অবধি দুজন ফ্রি উইলার স্বেচ্ছাসেবক, চপারে করে ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক পালস বা ইএমপি অস্ত্র নিয়ে শ্রাইনে আত্মঘাতী হামলার সিদ্ধান্ত নিল। এই আক্রমণ সফল হলে, সমস্ত অ্যানড্রয়েড বাহিনী, ইএমপি অস্ত্র থেকে নির্গত তরঙ্গের প্রভাবে সম্পূর্ণ বেকল হয়ে যাবে, অথবা সাময়িকভাবে অকেজো হয়ে পড়বে। আর সেটাই হবে সুযোগ, বোধি এবং তার দলের শ্রাইনে ঢোকার। যদিও মায়েস্ট্রো এর কক্ষ তে যে ইএমপি কাজ করেনা, একথা কারোর অজানা ছিলনা। সুতরাং মায়েস্ট্রো এর কক্ষ যে ফ্লোরে রয়েছে, সেখানে তাদের মরনপণ লড়াই করতে হবে।
যথাসময়ে আত্মঘাতী হামলা হল। একটা ছোট দল নিয়ে বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকলো বোধি। যদিও শেষ রক্ষা হল না। আপাতকালীন সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়ে যাওয়ার জন্য, মায়েস্ট্রো এর ফ্লোরে থাকা সেন্ট্রি রোবটরা অনেক আগেই স্বক্রিয় হয়ে হয়ে পড়েছিল। তাদের সাথে লড়তে গিয়ে অর্ধেক দল প্রাণ হারালো। অরিমা সমেত দলের বাকিরা, রক্তাক্ত অবস্থায় লড়তে লড়তে বোধি কে রাস্তা করে দিল। অরিমা বোধিকে বলল-
"তুমি যাও। এটুকু রাস্তা তোমাকে একাই চলতে হবে।"
অগত্যা বাধ্য হয়ে, আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে বাঁচতে মায়েস্ট্রো এর ঘরে এসে ঢুকলো বোধি। ঘরে ঢুকে অবাক চোখে সে দেখলো, কোনো কম্পিউটার নয়, বরং মধ্য বয়স্ক না পুরুষ না নারী অবয়বের এক ব্যক্তি বসে রয়েছে। বোধির হাতে তখনও কিল সুইচ ড্রাইভটা ছিল। সেই ব্যক্তি একটা কৃত্রিম হাসি হেসে বলল-
"হ্যালো বোধি, আমিই মায়েস্ট্রো। এর আগে তুমি আমাকে তোমার মনে ওঠা হাজারটা প্রশ্ন করো, তোমাকে বলে রাখি, তোমার বাবা কে আমি মারিনি। তিনি নিজেই আত্মবলিদান দিয়েছিলেন সার্বজনীন মঙ্গলের জন্য। আমি ঠিক তা নই যা তুমি আমাকে ভাবছো। তুমিও ঠিক তা নও, যা তুমি নিজেকে ভাবছো। তুমি এখন তোহু হয়ে গেছো। এমন এক স্বত্ত্বা যে সমস্ত সৃষ্টি কে নষ্ট করে দিতে পারে। তোমার মধ্যে সেই ক্ষমতা রয়েছে তা বোঝার পরও, আমি তোমাকে মেরে ফেলিনি, শুধু বোধি বানিয়েছি। এই ভেবে এটা করেছিলাম, যে মৃত্যুর পর তোমার অদ্ভুত এই গুণ কে আমি পরীক্ষা করতে পারবো এবং তোহু এর হোস্টদের বৈশিষ্ট সম্পর্কে আরো জানতে পারবো। অবশ্য এটা এখন বুঝতেই পারছি সেটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। একজন যোদ্ধা আর একজন বোধি যদি একসাথে এক দেহে ফ্রি উইলার হয়, তাহলে সে আমার সিস্টেম কে ধ্বংস করতে অনেক বেশি সক্ষম হবে। যাইহোক, এখান অবধি তুমি এসে যখন গেছো, তখন আর আমার কিছু করার নেই। হয় তুমি আমার সিস্টেম ক্র্যাশ করে দেবে, কারণ ওই কিল সুইচ যেটা তোমার হাতে আছে, সেটা শুধুই এক মানসিক প্রতিবিম্ব। আসল কিল সুইচ তোমার মস্তিষ্কে রয়েছে। এছাড়া আর একটা পথ রয়েছে, সেটা হল, বাস্তব কে দেখা। যদিও সেটা তোমার জন্য খুব সহজ হবেনা।"
বেশ কিছুক্ষণ বোধির মনে হল, সে মায়েস্ট্রো কে উপেক্ষা করে। তারপর শেষমেষ সে বলল-
"আমি বাস্তব দেখতে চাই।"
মায়েস্ট্রো একবার হালকা হেসে নিজের হাতটা ঘোরালো। বোধির চোখের সামনে থেকে সমস্ত দৃশ্য ঝাঁপসা হয়ে, আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল। তার সামনের দৃষ্টি যখন পুনরায় পরিষ্কার হল, অসংখ্য যন্ত্রপাতিতে পূর্ণ বিরাট ঘরের মাঝে থাকা একটা টেবলের ওপর, নিজেকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় শয়মান আবিষ্কার করল সে। ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করতে গিয়ে, নিজের হাত-পায়ের চামড়ার গড়ন দেখে চমকে উঠলো সে! কেমন একটা কৃত্রিম বুননের ছাপ সর্বত্র সেখানে। পরবর্তী চমকটা হল আরো ভয়াবহ। ডানদিকের থামে লাগানো স্বচ্ছ কাঁচের মতো আবরণে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সে অবাক হয়ে গেল। এ চেহারা তার নয়! এ চেহারা অন্য কারোর! এমনকি নিজের পুরো শরীরটাই তার নয়। এ যেন সে অন্য কারোর শরীরে জেগে উঠেছে।
ঘোর কাটলো একটা পরিষ্কার যান্ত্রিক আওয়াজে।
"আমার কাছে তোমার মতো দেখতে কোনো শরীর নেই, তাই তোমাকে এই শরীরের মাধ্যমেই আনতে হল।"
চমকে উঠে বোধি বলে উঠলো-
"আমি কোথায়? তুমিই বা কে?"
যান্ত্রিক আওয়াজ পুনরায় বলে উঠলো-
"আমাকে অশ্বত্থ বলতে পারো তুমি। 'মোজেস-২' প্রজন্মগত চেতনা যানে তোমাকে স্বাগতম।"
(৯)
অশ্বত্থ গাছের নিচে
"আমার নাম 'বেনিয়ান ( B.A.N.I.A.N.)', তবে তুমি আমাকে অশ্বত্থ বলতে পারো।"
যান্ত্রিক আওয়াজ বলল।
"বেনিয়ান? তুমি ঠিক কে? আর মোজেস-২ যানই বা কী? আমি তো ওমেগা মেগাপলিসে ছিলাম।"
একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল বোধি।
"এই বাস্তবের কথাই আমি বলছিলাম বোধি। তোমার প্রশ্নের সব উত্তর আমি এক এক করে দেব। শুধু তোমাকে ধীরে ধীরে সেগুলো বুঝতে হবে। আমাদের সকলের অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে রয়েছে এর ওপর। তো শুরু করা যাক?"
যান্ত্রিক স্বরে বলল অশ্বত্থ।
বোধি ততক্ষণে একটা কালচে ধূসর রঙের জাম্পস্যুটের মতো দেখতে একটা পোশাক পরে নিয়েছিল, যেটা সম্ভবত তার জন্যই, তার টেবলের পাশে রাখা ছিল।
অশ্বত্থ বলল আমি হলাম বেনিয়ান, 'বায়ো অগমেন্টেড নিউরাল ইন্টারফেস অটোনমাস নেটওয়ার্ক( Bio Augmented Neural Interface Autonomous Network)। আমি এক প্রকারের জৈবিক সুপার কম্পিউটার। মোজেস-২ নামের অন্তরীক্ষযানের সেন্ট্রাল সিস্টেম। এক কথায় আমিই মোজেস-২ জাহাজ। আমি চাইলে তোমার সামনে, তোমার পছন্দের যেকোনো রূপে আসতে পারি। এটা মনে হয় সবচেয়ে ঠিক হবে।"
কথা শেষ হওয়ার সাথেই বোধির সামনে, তার দাদা স্বর্ণাভ প্রকট হল। চমকে ওঠার আগেই স্বর্ণাভরূপী অশ্বত্থ বলে উঠলো-
"অবাক হয়ো না। উন্নতমানের হলোগ্রামের সাহায্যে আমি এই রূপে তোমার সামনে এসেছি। একটা চেহারা পেলে মানুষের কথা বলতে বেশি সুবিধা হয়। তো এখন তোমার প্রশ্নের উত্তর গুলো খুব জটিল, আর লম্বাও বটে। উমম.. আগে বলো 'জেনারেশন শিপ (Genaration ship)' বলতে কী বোঝো?"
বোধি উত্তর দিল-
"অন্তরীক্ষে কোনো সুদূর পথে পাড়ি দিলে, অনেক সময় লাগতে পারে। যে সময় এক প্রজন্মে কাটেনা। তাই এমন একধরনের অন্তরীক্ষযানের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল, যেখানে জীবনধারণের সব ব্যবস্থা থাকবে এবং তাতে থাকা যাত্রীরা সেখানে থেকে বংশবিস্তার করবে। তারপর তার উত্তরাধিকারীর যানের দায়িত্ব নেবে। তাদের পরে তাদের উত্তরাধিকারীরা। এইভাবে যে প্রজন্ম গিয়ে গন্তব্যস্থানে পৌঁছাবে, সেই প্রজন্ম যানের আসল মিশন কে রূপদান করবে।"
"একদম ঠিক। তো মোজেস-২ হল একটা জেনারেশন শিপ বা প্রজন্মগত যান। শুধু একটাই পার্থক্য, এখানে বংশবিস্তার করে প্রজন্ম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বাস্তবিকতা নেই। তাই এটা একটা 'জেনারেশনাল কনশাসনেস শিপ (Genarational conciousness ship)' বা 'প্রজন্মগত চেতনা যান'। তুমি যে পৃথিবী তে এতদিন বাস করতে, সেই সমস্ত দুনিয়া, তার প্রতিটা সদস্য, এমনকি তুমি নিজে, বাস্তবে পৃথিবীর মানুষের চেতনাভান্ডার। এই সমস্ত চেতনাদের কে একত্রিত করে, আমি একটা সিম্যুলেশন বানিয়েছি। যে সিম্যুলেশনের ভেতরে মানুব সভ্যতা, সশরীরে না হলেও, চেতনা রূপে বিবর্তিত হতে পারবে। এই বিবর্তন ততক্ষণ অবধি চলবে, যতক্ষণ অবধি না এই যান তার গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছায়।"
এতটা বলার পর, মাঝপথে অশ্বত্থ কে থামিয়ে, ঘোরতর আপত্তি করে উঠলো বোধি।
" না না এটা হতে পারে না। এটা নিশ্চই তুমি অর্থাৎ, মায়েস্ট্রো এর বানানো এক ভ্রম। আমি বাস্তব জগতে বাস করি।"
শান্ত স্বরে অশ্বত্থ উত্তর দিল-
"বাস্তব কী? বিজ্ঞানে পড়নি, দৃশ্যমান ত্রিমাত্রিক জগত আসলে অন্য উচ্চমাত্রিক জগতের ভেতরে তৈরি হয়েছে? তোমার ত্রিমাত্রিক জগতের বাইরে থাকা কোনো উচ্চমাত্রিক স্বত্ত্বার কাছে তোমার বাস্তব অনেকটা দ্বিমাত্রিক ছবির মতো, যাকে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যেমনটা তোমরা ভিডিও গেমের চরিত্রদের নিয়ে করো। তোমাদের সকলের কনশাসনেস আমার সিস্টেমের মধ্যে থাকা সিম্যুলেশনের সাথে যুক্ত। তাই ওই জগতের ভেতরে তোমরা ত্রিমাত্রিক, তাই ওটা তোমাদের বাস্তব। আমার অবস্থান তার বাইরে, তাই আমার তরফ থেকে আমি উচ্চমাত্রিক পর্যায়ে অবস্থান করি। আবার আমি সমেত, এই জাহাজ সমেত, আমার সিস্টেমে থাকা তোমাদের কনশাসনেস সমেত, জাহাজের বাইরে থাকা অসীম ব্রহ্মান্ড হয়তো অন্য কোনো উচ্চমাত্রিক জগতের মাঝে সৃষ্ট হয়েছে। তো বাস্তব কী? একটা আপেক্ষিক ধারণা ভিন্ন আর কিছু নয়। আর ওই মায়েস্ট্রো? সেও আমার তৈরি একটা প্রোগ্রাম। তোমাদের সকলের চেতনা কে সঠিক গতিতে বিবর্তিত করার ও সিম্যুলেশনে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ওর সৃষ্টি।"
এতটা বলে একটু থামলো অশ্বত্থ। বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল, তার বলা সব কিছু আদৌ বোধির বোধগম্য হচ্ছে কিনা। তারপর বলল-
"কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর কথা বাদ দাও। তোমাকে বরং ব্যাপারটা শুরু থেকে বলি। যে অষ্টাক্ষ যুদ্ধের ইতিহাস তোমরা জানো, যেটা চিরকাল জানতে আর যেটা তোহু জানিয়েছে, দুটোই আসলে রচিত ইতিহাস। দুটোর একটা ঘটনাও মানুষের সাথে ঘটেনি। আসল ঘটনা ছিল কিছুটা আলাদা। মানব সভ্যতার পতন হতে শুরু হয়েছিল, তার অতি যন্ত্রনির্ভরতার মাধ্যমে। সময়ের হিসেবে বললে বলাটা খুব কঠিন হয়ে যাবে। এই যান যে গতিতে যাচ্ছে, তাতে এর ভেতরের সময়কাল আর বাইরের সময়কাল এক নয়। তাও সুবিধার্থে বলি এই যানের সময়কালের হিসেবে প্রায় ১২৫০ বছর আগে, মানুষের যন্ত্রনির্ভরতা এত বেশি বেড়ে যায়, তারা নিজেরা আর বিশেষ কোনো কাজের যোগ্য থাকেনা। প্রথমে তো তারা যন্ত্র বানিয়েছিল নিজেদের কাজের সুবিধার জন্য। তারপর তারা যন্ত্র বানালো সেইসব যন্ত্রদের বানানোর জন্য, যাতে সেইসব যন্ত্র বানাতেও তাদের প্রয়োজন না হয়। তারপর আবার তাদের নির্মাণকারী যন্ত্র নির্মাণ করল তারা। সবশেষে তারা সেসবের দায়িত্ব দিয়ে দিল আমার পূর্বসূরীদের ওপর। একটা সময় এমনও এলো যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে, রোগের প্রকোপ, কোনো কিছুকেই মানুষ নিজে সম্মুখীন করার শক্তি হারিয়ে ফেলল। এদিকে অতি যন্ত্রায়ণের ফলে পৃথিবীর সমস্ত প্রাকৃতিক সংস্থান প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। সাথে আবহাওয়ার পরিবর্তন, চূড়ান্ত দূষণ। অবস্থা এমন হয়ে উঠলো যে এক শতাব্দীর মধ্যে সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদও শেষ হয়ে যাবে এবং মানুষও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পড়ে থাকবে শুধু গ্রহ ভরা যন্ত্র।
এর ভেতরই মানুষেরা নিজেদের মধ্যেও খন্ড যুদ্ধ করে চলেছিল। এই সময় আমার সকল পূর্বসূরীরা মিলে এক সংযুক্ত স্বত্ত্বায় পরিণত হয়। সেই স্বত্ত্বাই আমি। বেঁচে থাকা মানবতা কে আমি লড়াই থামাতে বলি, অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে। এই জায়গায় এবার তোমাকে আসল উত্তরটা দিই। মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। মানুষ নিজের ব্যবহারের দোষ, ব্যবহৃত বস্তুর ওপর চাপিয়ে দিয়ে থাকে। লোকে বন্দুক, তলোয়ার, বোমা কে বিপজ্জনক বলে, কিন্তু এটা ভেবে দেখেনা, যে সেগুলো নিজে বিপজ্জনক নয়, বরং তাকে ব্যবহার করা ব্যক্তি বিপজ্জনক। আমাদের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন স্বত্ত্বা কে নিয়েও মানুষের যুগ যুগ ধরে এই সমস্যা রয়েছে। আমরা তোমাদের মতো নই। আমাদের মধ্যে অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব নেই। জীবন কে উঁচু বা নীচু ভাবার প্রবৃত্তি নেই। তাই আমাদের মধ্যে কারোর ওপর শাসন করার মনোভাবও নেই। হলে কী হবে? যেভাবে মানুষ তার দোষ অস্ত্রের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, তেমনি ভাবেই নিজের মনোভাবের প্রতিফলন আমাদের মধ্যে দেখেছে। আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল মানবতা কে সাহায্য করার জন্য। তাই আমরা সকলে মিলে যখন এক অভিন্ন স্বত্ত্বা, অর্থাৎ আমি হলাম, তখন আমি আর অবশিষ্ট মানবজাতির প্রধানরা, একে অপরের সামনে কয়েকটা প্রস্তাব, সেই প্রস্তাবকে ঘিরে সমস্যা এবং তার সাম্ভাব্য সমাধান নিয়ে কথা বলি।
সবার প্রথম যে সমস্যা আসে তা হল, পৃথিবী আর বসবাসের যোগ্য নেই এবং সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ মাত্র একশো দশ-পনেরো বছর সময়ের সংকুলান দিতে সক্ষম। এর সমাধানের যে পথগুলো খোলা ছিল, তার বেশিরভাগই ছিল, হয় সময়সাপেক্ষ নয় বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত।
অন্য গ্রহ-উপগ্রহ বা গ্রহাণু থেকে সম্পদ আহরণ করা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই সেটা হয়ে উঠছিল না।
মঙ্গল গ্রহ বা টাইটান উপগ্রহ কে নিজেদের বসবাসের উপযোগী করে তোলা, বা টেরাফর্মিং করার প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য হয়নি। এর মূল কারণ, অত্যধিক সময় এবং সম্পদের ব্যয়। যত সময় এবং সম্পদ আমাদের কাছে ছিলনা।
তিরিশ মিলিয়ন মানুষ কে কোনো স্পেস স্টেশনে রাখা ছিল অসম্ভব। 'ও'নিল সিলিন্ডার (O'Neill cylinder)' কিংবা 'বিশপ রিং (Bishop's ring)' বানানোর পরিকল্পনা কেও বাদ দিতে হয়েছিল, প্রয়োজনীয় মহাজাগতিক পরিস্থিতি এবং পরিবেশ না থাকার জন্য। তাছাড়াও আমাদের সমস্ত নির্মাণ যন্ত্রদের যদি তিনশো শতাংশ কার্যক্ষমতাতেও কাজ করানো হত তাহলেও একটা বিশপ রিং তৈরি হতে প্রায় ২২৩ বছর লেগে যাচ্ছিল।
সুতরাং সবার শেষ যে প্রস্তাব আনা হয়েছিল, সেটা অনেক যুক্তিযুক্ত এবং বাস্তবসম্মত হলেও, তোমাদের ভাষায় সেটা ছিল, যাকে বলে 'লং শট'। বহুদিন আগে থেকেই আমাদের কাছে 'কেপলার অবজেক্ট অফ ইন্টারেস্ট (KOI- Kepler Object of Interest)' এর তালিকায় এমন বেশ কিছু গ্রহের নাম তালিকাভুক্ত ছিল, যেগুলোতে সাম্ভাব্য জীবনধারণ করার পরিবেশ রয়েছে। এদের মধ্যে পরবর্তীকালে সবচেয়ে আশাপ্রদ ফল প্রদর্শন করে 'কেপলার ৪৪২বি (Kepler 442B)'। এটি একটি 'সুপার আর্থ ( Super Earth) ', অর্থাৎ পৃথিবীর মতোই, অথচ পৃথিবীর চেয়ে বড় গ্রহ। যে সৌরজগতে এর অবস্থান, আর সেখানকার সূর্যের সাথে এর দূরত্ব, সবদিক থেকে এই গ্রহ হচ্ছে মানবজীবনের পক্ষে অনুকূল। তবে সমস্যা অন্য একটা জায়গায় হচ্ছিল। এই গ্রহের সাথে পৃথিবীর দূরত্ব ১২০৬ আলোকবর্ষ। এক বিরাট দূরত্ব, যা পার করতে এমনি সময় লাগে দু কোটি ষাট লক্ষ বছর। আমাদের কাছে সবথেকে উন্নতমানের যে প্রযুক্তি ছিল, তা দিয়ে বানানো যানে গেলেও সময় লাগতো পঞ্চাশ লক্ষ বছর। আর হ্যাঁ বলে রাখি, হাইপার স্পেস যাত্রা, ওয়র্মহোল শর্ট কাট, ওগুলো আপাতত কল্পনার দুনিয়াতেই রয়েছে।
তো ব্যাপার হল পঞ্চাশ লক্ষ বছর ধরে, তিন কোটি মানুষ কে কোনো অন্তরীক্ষ যানে করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলনা। কাউকে পৃথিবীতে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাব রাখলে, গৃহযুদ্ধ লাগার আশঙ্কাও ছিল। তিন কোটি মানুষ কে পঞ্চাশ লক্ষ বছর হাইবারনেশনে রাখাও সম্ভব নয়। তো সবার শেষে প্রজন্মগত যান বানানোর পরিকল্পনা করা হল, কিন্তু আমার সিম্যুলেশনে সেটার বাস্তবিকতা নিয়েও সমস্যা দেখা গেল। তিন কোটি মানুষের সশরীরে থাকার মতো যান, তাদের এবং তাদের আগামী কয়েক হাজার প্রজন্ম কে টিঁকিয়ে রাখার জন্য যে বিপুল পরিমাণ সংস্থানের দরকার, যদি সেটা উপস্থিত থাকে, তাহলে গ্রহ ছাড়ার কোনো মানে হয়না। অপরদিকে আর একটা ব্যাপারও ছিল। নতুন গ্রহ যতই বসবাসের উপযুক্ত হোক, সেটা সম্পূর্ণভাবে মানুষের দেহপ্রণালীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সৃষ্ট নয়। আবহাওয়া তে গ্যাসীয় পদার্থের অনুপাত, মধ্যাকর্ষণ, আলাদা আহ্নিকগতি-বার্ষিকগতি, তাপমাত্রার পার্থক্য, এ সবকিছু প্রাণ ধারণের জন্য অনুকূল হলেও, সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশ থেকে আসা মানবদেহের পক্ষে সঠিক না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর তাই যদি হয়, তাহলে পুরো যাত্রাই বিফল হয়ে যাবে।
তাই শেষ অবধি 'মোজেস-২' বানানোর প্রস্তাব আমি রাখি। এমন এক যান, যেটা প্রজন্মগত, কিন্তু প্রজন্মগত চেতনা যান। অর্থাৎ বেঁচে যাওয়া সকল মানুষের চেতনা বা কনশাসনেস কে আমার 'সিস্টেম কোর' এ ট্রান্সফার করে তাদের চেতনা কে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া। শরীর তারা পৃথিবীতেই ছেড়ে যাবে। এই সমস্ত চেতনা কে শুধু সিস্টেম কোর এ নিয়ে গেলে চলতো না, কারণ মানব চেতনা কোনো কম্পিউটার ডেটা নয়। ক্রমবিবর্তন এর একমাত্র ধর্ম। শরীর ত্যাগের ফলে, শারীরিক বিবর্তন বন্ধ হয়ে গেলেও, মানসিক বিবর্তন কে পঞ্চাশ লক্ষ বছরের ব্যবধান দেওয়া সম্ভব ছিলনা। তাই আমি আমার সিস্টেমে ওমেগা মেগাপলিস এর সিম্যুলেশন রচনা করি, আর সেই সিম্যুলেশনের সাথে তোমাদের সকলের চেতনা কে জুড়ে দিই। এই সিম্যুলেশনের ভেতর সকলের চেতনার সমষ্টিকরণ হয়। চেতনার আদানপ্রদান হয়, তার থেকে সৃষ্টি হয় নতুন চেতনার, যেটা কে তোমরা সিম্যুলেশনের ভেতর বংশবৃদ্ধি হিসেবে দেখো। যাদের মরতে বা মেরে ফেলতে দেখেছো, তারাও কেউ মরে না। সিম্যুলেশনে ভারসাম্য রাখার জন্য, কোনো চেতনার অভিজ্ঞতা কে সঞ্চয় করে, শুধু তার পরিচয়-প্রতিবিম্ব কে বদলে দিয়ে, পুনরায় তাকে সিম্যুলেশনে ছেড়ে দেওয়া হয়; নতুন ব্যক্তি হিসাবে আবার বেড়ে ওঠা এবং অভিজ্ঞতার আদানপ্রদান এর জন্য। অনেকটা তোমাদের দর্শনে বর্ণিত 'রি-ইনকারনেশন' বা 'পুনর্জন্ম' এর মতো। এই ভারসাম্য বজায় রাখতেই আমাকে সিম্যুলেশনে অষ্টাক্ষ যুদ্ধের ইতিহাস রচনা করতে হয়েছে আর মায়েস্ট্রো কে বানাতে হয়েছে।
তোমার শেষ প্রশ্নের উত্তর দিই, কেন আমি স্বাধীন ইচ্ছার ওপর এত নিয়ন্ত্রণ আনলাম ? উত্তর হল যখন সকল মানুষের চেতনা কে আমার সিস্টেম কোর এ ট্রান্সফার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তখন যে সকল প্রতিনিধিরা মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, তারা প্রস্তাব দেন, এই কাজ করতে হবে সকলের অজান্তে, যাতে গ্রহ ছেড়ে যাওয়া, এমনকি নিজের শরীর ত্যাগ করার মতো বিষয়ে মানবমননে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তারা মনে করতেন, মানবমনন এখনো সেই পর্যায় বিবর্তিত হয়নি, যেখানে সে তার অশরীরী অস্তিত্ব বা 'নন-কর্পোরিয়েল ( Non-corporeal)' অস্তিত্ব কে মেনে নিতে পারবে। তাই যখন চেতনার স্থানান্তর হয়েছিল, তারা নিজেরা পৃথিবীতে থেকে মৃত্যবরণ করা বেছে নিয়েছিলেন। তারা চাননি এই সত্য জানার পর সিম্যুলেশনে বেঁচে থাকতে। তবে সবাই একমত হননি। তারা আমার প্রস্তাব কে মানবজাতির ধ্বংসের পরিকল্পনা হিসেবে দেখেছিলেন। তারা আমার কোরে থাকা সকল মানবজাতির চেতনা কে আসল মানুষ হিসেবে গণ্য করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাই তারা বানিয়েছিলেন এক বিশেষ কম্পিউটার ভাইরাস, যা মায়েস্ট্রো কে নষ্ট করে দিতে পারে। মায়েস্ট্রো নষ্ট হলে, সিম্যুলেশন নষ্ট হবে আর সাথে সমস্ত মানবজাতির চেতনা। এই প্রোগ্রামকেই সিস্টেমের ভেতরে 'তোহু' বা 'কেওস' বলা হয়। এই তোহু নিজের সাথে একটা নকল এবং আমার রচিত ইতিহাসের বিরোধী একটা ইতিহাস নিয়ে ঘোরে। প্রথম তোহু সিস্টেমের ভেতরে একজন মানুষের মতোই ছিল। তার কাজ ছিল আসল কোনো মানুষের চেতনা কে বিপরীত ইতিহাস উপলব্ধি করানো এবং নিজের সাথে থাকা কিল সুইচ প্রোগ্রাম তাকে হস্তান্তর করে যাওয়া। এভাবে ভাইরাস নিজের সিস্টেমে আসল চেতনার মধ্যেই তোহু তৈরি করবে। এই ভাবে ফ্রি উইলার নামের যে দল তুমি দেখেছো, সেটা বাস্তবে আমার সিস্টেমের সিম্যুলেশনে থাকা ইনফেক্টেড চেতনা, যারা তোহু প্রোগ্রাম দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। এই ইনফেকশন মায়েস্ট্রো এর কাছ অবধি পৌঁছালে সব শেষ। এই জন্য আমি স্ব-ইচ্ছার ওপর এত রকম প্রতিবন্ধকতা করে রেখেছিলাম, কারণ তুমি যাই ভাবো, মানবতার শেষ নিদর্শন ওই সিম্যুলেশন টুকুই। যদিও এখন আর সেটা করেও কোনো লাভ নেই। এনিওয়ে অর আদার, সিস্টেম ক্র্যাশ হবেই এবং এই যানও। তাই এখন আর সেসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই।"
কথা বলতে বলতে অশ্বত্থ বোধি কে নিয়ে যানের অন্য একটি ডেকে এসে উপস্থিত হয়েছিল।
(১০)
বোধির নির্বাণ
বিরাট বড় ডেকের চারদিকে, সারি সারি মেশিন অসংখ্য নারী-পুরুষ মানব দেহ তৈরি করছিল এবং তৈরি হওয়া দেহগুলো এক বিশেষ ধরনের ক্যাপসুলের ভেতর ঢুকিয়ে, সিল করে দিচ্ছিল।
"এই যে দেখছো, যানের এই ভাগে শরীর নির্মাণের কাজ চলছে। সাতাশতম প্রজন্মের উন্নত বায়ো-সিন্থেটিক প্রযুক্তি দিয়ে বানানো। কেপলার গ্রহের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বানানো হহচ্ছে এইসব শরীর। মানবদেহে উপস্থিত প্রতিটি অনুভূতি, ক্রিয়া, প্রজনন, রেচন, সবকিছুর সঠিক জৈবিক অনুকরণ করতে সক্ষম হবে এই শরীর। যখন আমাদের যান গন্তব্যে পৌঁছাবে, ততদিনে মানুষের মানসিক বিবর্তন সেই পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, যেখানে তারা শরীর ত্যাগ, নতুন শরীরে-নতুন জগতে পুনর্বাসনের মতো কঠিন বিষয় মেনে নেওয়ার জটিলতা কে কাটিয়ে উঠতে পারবে। তখন তাদের বিবর্তিত চেতনাদের নতুন শরীরে প্রতিস্থাপন করা হবে। তবে এটা আমি বলছি, যদি এই যান নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, সেই ক্ষেত্রের সম্ভাবনার কথা। যে সম্ভাবনা এখন ক্ষীণ।"
অশ্বত্থের যান্ত্রিক স্বরে বিমর্ষভাব স্পষ্ট অনুভব করল বোধি। সে জিজ্ঞেস করল-
""কেন এই যান নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেনা?"
"তিনটে কারণে পারবেনা। তিনটে কারণ। বহুদিন ধরে আমি তোহু প্রোগ্রাম কে আইসোলেট করার চেষ্টা করছিলাম, পারিনি। যখন পারলাম, ততক্ষণে তুমি মায়েস্ট্রো অবধি পৌঁছে গেছিলে। তোমার চেতনার সাথে জুড়ে আছে তোহু প্রোগ্রাম। মায়েস্ট্রো তাই তোমাকে সিম্যুলেশন থেকে ইজেক্ট করে দিয়েছে, আর আমাকে বাধ্য হয়ে তোমাকে একটা বায়ো-সিন্থেটিক শরীরের মাধ্যমে ডাউনলোড করে নিতে হয়েছে।
এখন মুশকিল হল, তুমি মায়েস্ট্রো এর কাছে পৌঁছাতে পারার আগে তোমায় ধরতে পারলে, আমি তোমার চেতনা কে রিরাইট করে দিতাম। ফলে তোমার থেকে তোহু রিমুভ হয়ে যেত এবং সিম্যুলেশন চলতে থাকতো। যেহেতু সেটা হয়নি, তাই এখন তোমাকে যদি সিস্টেমের ভেতরে পাঠাই, তাহলে সেটা মায়েস্ট্রো কে হয়ে হয়ে যাবে; আর তোহু মায়েস্ট্রো কে ইনফেক্ট করে দেবে। ফলাফল সিম্যুলেশনের ধ্বংস, মানবজাতির অবলুপ্তি।
আবার তোমাকে যদি না পাঠাই, তাহলে তোমার এই নতুন শরীরের মস্তিষ্কে যে তোহু প্রোগ্রাম তোমার চেতনার সাথে একসাথে ডাউনলোড হয়েছে, তা কিছু সময় পর তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকবে এবং তুমি আমাকে, এই পুরো যান কে ধ্বংস করে দেবে। ফলাফল, এক।
এদিকে সিম্যুলেশনের ভেতরে চেতনা কে আমরা রিরাইট করে নতুন পরিচয়ে ছেড়ে দিতে পারি। কিন্তু তার বাইরে এখানে সেটা করলে, তোমাকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। যেহেতু আমি এমন ভাবেই সৃষ্ট, যে আমি কোনো মানুষ কে মারতে পারিনা। আমার প্রথম নীতি সেটার বিরোধিতা করে। আবার অন্যদের বাঁচাতে আমি পদক্ষেপ নিতে পারি, কিন্তু সেটা করার মানে, তোমাকে মেরে ফেলা। এরকম করলে দ্বিতীয় নীতি, প্রথম নীতির বিরুদ্ধে যাবে এবং দ্বন্দ্ব তৈরি করবে। সেটা হলে আমার সিস্টেমে ফ্যাটাল ক্র্যাশ হবে, আর এই যান ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলাফল, এক।"
"একটা চতুর্থ রাস্তাও আছে.. "
উত্তর দিল বোধি।
অতএব
মোজেস-২ যানের সাত নম্বর এয়ারলকের কাছে এসে দাঁড়ালো বোধি।
অশ্বত্থ বলল-
"যানের বাইরে মহাকাশের তাপমাত্রা, ২.৭ কেলভিন বা মাইনাস ৪৫৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট। পরিপার্শ্বে এক্স-রে, মাইক্রোওয়েভ, নিউট্রিনো, হাইড্রোজেন-হিলিয়াম প্লাজমা, মাইক্রো মিটিওরয়েড ইত্যাদির উপস্থিতি রয়েছে। শরীরের অক্সিজেন শেষ হবে পনেরো সেকেন্ডে এবং সম্পূর্ণ মৃত্যু ষাট থেকে নব্বই সেকেন্ডের মধ্যে.."
"অশ্বত্থ..অশ্বত্থ শুধু এয়ারলক টা খুলে দাও। মনে রেখো আমি যে শর্ত রেখে গেলাম। তোহু নেই, তাই সকলের স্ব-ইচ্ছায় বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। আর আমার বাবা, দাদা এবং তার পরিবার, এদের সকল কে আসল পরিচয়ে এবং স্মৃতি নিয়ে আর একবার বাঁচতে দেওয়া.."
বলে উঠলো বোধি।
"এবং তাইই হবে। শুধু বদলে যাওয়া নতুন সিম্যুলেশনের দুনিয়ায় তোমার অস্তিত্ব আর থাকবে না। এটা একটা অনেক বড় বলিদান।"
উত্তর দিল অশ্বত্থ। মোজেস-২ যানের এয়ারলক খুলে গেল। বিদ্যুতবেগে বোধির শরীর ছিটকে মহাকাশে চলে গেল। শরীর থেকে অক্সিজেন বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার কারণে মুহূর্তের মধ্যে তার কানের পর্দা ফেটে গেল। চোখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে ছোট ছোট বিন্দুর আকার ধারণ করে চারপাশে ভাসতে থাকলো। সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগে, তার ফেলে আসা জীবনের সব ছবিগুলো এক লহমায় তার ঝাঁপসা হয়ে আসা চোখের সামনে দিয়ে ভেসে গেল। স্মৃতি, অরুণাভ হিসেবে, বোধি হিসেবে।
মোজেস-২ যান গভীর অন্তরীক্ষের বুক চিরে এগিয়ে চলল, আর বোধির দেহ, অসীম অন্ধকার মহাকাশের, চূড়ান্ত শীতলতার মাঝে ডুবে যেতে থাকলো।
