Sucharita Das

Classics


2  

Sucharita Das

Classics


কর্মের ফল

কর্মের ফল

4 mins 506 4 mins 506

"আপনাদের নিয়ে হয়েছে যতো অশান্তি। এতটুকুও অ্যাডজাস্টমেন্ট ক্ষমতা ই নেই আপনাদের। কতবার বললাম আজ আমার জন্মদিন ,বন্ধুরা সবাই আসবে, একটা ছোট গেট টুগেদার মতো হবে। আমরা খাবার বাইরে থেকে আনিয়ে নেবো। আপনি আপনাদের দুজনের জন্য যা খাবেন , বানিয়ে নেবেন। "

"কিন্তু বৌমা রান্না করার মতো কিছুই তো রাখা ছিল না তোমার কিচেনে।ফ্রিজেও কিছু ছিল না।তাই ভাবলাম দুধ দিয়ে ই খেয়ে নেবে রুটি তোমার শ্বশুর।"

"কিন্তু কাল সকালে চা টা তাহলে কি করে করবো।সব দুধ তো রুটি দিয়েই খেয়ে নিলেন।"

"কিন্তু বৌমা , আমি তো নিইনি দুধ। তোমার শ্বশুরকে অল্প দিলাম। আসলে শুধু রুটি তো খেতে পারবে না। যদি গলায় আটকে যায়। তাই ভাবলাম..."

" আপনি তো শুধু ভেবেই অনেক কিছু করে ফেলেন। তারপর কি হবে সেটা বোঝার চেষ্টা করেছেন কখনো।"

শ্বাশুড়িকে যা মুখে আসে তাই বলে কথা শোনালো রিয়া। আর বিমলা দেবী চুপচাপ অপরাধীদের মতো মুখ করে সব অপমান সহ্য করছেন পুত্রবধূর। যেন নিজের বাড়িতে স্বামীকে একটু দুধ দিয়ে ,কি বড়ো চুরি করে ফেলেছেন।


অথচ বিমলা দেবীর মনে আছে, যখন ঋক মানে ওনার একমাত্র ছেলে ছোট ছিলো, ওর বাবা ওর জন্য দু কিলো দুধ আলাদা করে নিতো।যাতে ছেলের কোনো অসুবিধা না হয়। কারণ ছেলে তো সেভাবে শক্ত খাবার এখনো খেতে পারে না। অথচ আজ বাবা যখন খেতে পারছেনা শুধু রুটি টা। তখন শুধু মাত্র অল্প দুধ নিয়েছিল বলে ,ছেলের সামনে বৌমা যা নয় তাই বলে অপমান করলো। অথচ ছেলে একটা কথাও বললো না। নিজের অজান্তেই বিমলা দেবীর চোখটা ভিজে এলো। কতো শখ করে নিজে পছন্দ করে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, বৌমা সবাইকে নিয়ে মানিয়ে গুছিয়ে সংসার করবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। বিয়ের পর থেকেই ছোটখাটো ব্যাপার নিয়েই রিয়া অশান্তি করতে শুরু করলো। কেউ ঘরে এলেই ওর মুখ ভার।বিমলা দেবীর বোন, ননদ সব সামনে থাকে। ওরা শুরু থেকেই এখানে আসা যাওয়া করতো। কিন্তু ঋকের বিয়ের পর থেকেই, ওরা এলেই রিয়া নানা ভাবে ওদের উদ্দেশ্য করে এমনভাবে কথা বলতো যে শেষ পর্যন্ত ওরা ও আর আসতে চাইতো না। বিমলা দেবী বহুবার বলেছে, তাও ওরা আসেনি। ওরা এলে দুটো মন খুলে কথা বলতে পারতেন।এখন তো সে উপায়ও নেই। স্বামী তো চিরকাল ই ঠান্ডা স্বভাবের মানুষ। কথাও কম বলেন ।এই দুই সমব্যথী র সঙ্গেই তাই বিমলা দেবীর মনের টান ছিলো চিরকালের।তাও পুত্রবধূর দাক্ষিণ্যে শেষ হয়ে গেলো।এখন চুপ করে থেকে নিজের কষ্ট নিজেই সহ্য করেন।সমস্ত কথা নিজের মনের ভেতর সঞ্চয় করে রেখে দেন হাজার কষ্ট হলেও।


আগে আগে ছেলের জন্য, নাতির জন্য একটু আধটু রান্নাবান্না করতেন। কিন্তু খেতে খেতে ছেলে যেই মায়ের রান্নার প্রশংসা করেছিলো, তারপর থেকে বৌমা আর রান্না করতে দিতো না। খুব ইচ্ছা করতো বিমলা দেবীর, ছেলের জন্মদিনে পাঁচ রকমের ভাজা, পায়েস ,মাছ এইসব রান্না করে নিজের হাতে খাওয়ায়। এক দুবার বলেও ছিলেন নিজের ইচ্ছার কথা বৌমাকে। কিন্তু শুনেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতো বৌমা। আসলে মায়ের ধারেকাছে ছেলেকে আসতেই দিতে চাই তো না বৌমা। একবার বিমলা দেবী জিজ্ঞেসও করেছিলেন বৌমাকে এ ব্যাপারে। আর তারপর নাতি শুধু বলেছিলো ওর মা কে যে, "তুমি ও তো আমার জন্মদিনে আমার জন্য রান্না করো, তাহলে ঠামিকে কেন বাবার জন্য রান্না করতে দিচ্ছো না।"শুনে সে কি চিৎকার বৌমার ঋক অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে। বলে কিনা ,"তোমার মা আমার ছেলেকে খারাপ শিক্ষা দিচ্ছে। ছেলে আমার মুখের উপর কথা বলছে।" তারপর থেকে আর কোনো ইচ্ছাই প্রকাশ করতে চাইতেন না বিমলা দেবী।


সেদিন সকালে অফিস বেরোবার আগে ঋক কে বললেন বিমলা দেবী,"তোর বাবার শরীরটা কাল রাত থেকে ঠিক নেই একদমই। একটা ডাক্তার দেখাতে হবে। ঋক কিছু বলার আগেই বৌমা বললো, এতো অল্পতেই যদি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে তো বলবার কিছুই নেই।একটু সহ্য করতে হয়। ঋক ও বৌয়ের ভয়ে কিছু উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে গেল। সন্ধ্যে বেলা থেকে নিজের স্বামী র কষ্ট আর দেখতে পারছিলেন না বিমলা দেবী। খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। দু তিনবার ইনহেলার দেওয়া সত্বেও কম হচ্ছিল না কষ্টটা। দৌড়ে বৌমার ঘরে গিয়ে বলতে গেলেন বিমলা দেবী। কিন্তু রিয়া কোনো গ্ৰাহ্য না করে, ওর মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেই যাচ্ছিলো। বিমলা দেবী একবার বৌমা কে ফোন করে একটা ডাক্তার ডাকতে বলছিলেন। অসহায়ের মতো একবার স্বামীর কাছে আর একবার বৌমা র ঘরে দৌড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু রিয়া র কোনো ভ্রূক্ষেপ ই ছিলো না। শেষ পর্যন্ত আর পারলেন না বিমলা দেবী অসুস্থ স্বামী কে বাঁচাতে। প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট সহ্য করতে না পেরে চলে গেলেন ঋকের বাবা চিরকালের জন্য বিমলা দেবীকে একা করে দিয়ে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে এইসব ঘটনার যে একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলো। সে হলো বিমলা দেবীর একমাত্র নাতি আর ঋকের একমাত্র সন্তান ঋতম।


এরপর কেটে গেল মাঝখানে আরোও কুড়ি টা বছর। আজ ঋতম এলো তার বউ নিয়ে। রিয়া বরণডালা সাজিয়ে অপেক্ষা করছে তার ছেলের বউ কে বরণ করবে বলে।ঋতম গাড়ি থেকে নামতেই রিয়া তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল ছেলে বৌ কে বরণ করবে বলে।ঋক ঘরভর্তি লোকের সামনে মাকে হাতের ইশারায় দাঁড়াতে বললো। তারপর চিৎকার করে ঠামি কে বললো, "ঠামি তুমি কি চাও আমি আর তোমার নাত বৌ এইভাবেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। তাড়াতাড়ি এসো আর আমাদের বরণ করে ঘরে তোলো। এটা তোমার বাড়ি ঠামি। তোমার বাড়িতে তুমি ছাড়া আমাদের বরণ করবার অধিকার আর কারুর নেই।"নিজের ঘর থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলেন বিমলা দেবী।নাতির এই স্নেহের ডাক তিনি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারলেন না। বৌমার হাত থেকে বরণডালা নিয়ে এগিয়ে গেলেন নাতি আর নাত বৌ এর দিকে।আর রিয়া ছেলের এই ব্যবহারে স্তম্ভিত। কিন্তু সে এটা ভুলে গিয়েছিলো যে ,এই অপমানের চারা গাছটিকে সে নিজেই বিশ বছর আগে রোপণ করেছিলো। সেই চারা গাছই আজ বৃক্ষ হয়ে এই ফল দিচ্ছে ওকে। আর এরপর থেকে প্রতিদিন এই ফল ই তাকে ভক্ষণ করতে হবে। এটাই ওর কর্ম রূপ ফল।


Rate this content
Log in

More bengali story from Sucharita Das

Similar bengali story from Classics