কোনো এক বিকেলে পর্ব : ০১
কোনো এক বিকেলে পর্ব : ০১
মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি বরাবরই ভালো লাগে রিমির। বৃষ্টির সুবাস তার কাছে স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি করে। রিমি তার বারান্দায় বসে বৃষ্টি উপভোগ করছিলো এক কাপ গরম চায়ের সাথে। এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। সে ফোন ধরতে চাচ্ছিলো না কিন্তু ফোনটা অনবরত বেজেই চলছে। তাই রিমিকে বাধ্য হয়ে ফোন ধরতে হলো।
হ্যালো। কে বলছেন?
হ্যালো, ম্যাম। আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি আপনার একজন বড় ভক্ত। আমার আপনার লিখা গল্পগুলো খুবই ভালো লাগে। ভালো লাগে ভালো কথা। কিন্তু আপনি আমার নম্বর পেলেন কি করে? আমার নম্বর তো কোনো ভক্তের কাছে থাকার কথা না।
কিভাবে পেলাম ম্যাম এটা অনেক বড় কাহিনী অন্য কোনোদিন বলবো। তো ম্যাম একটা জিনিস জানার ছিল পরবর্তী গল্প করে প্রকাশ করবেন?
আগামী মাসে আশা করা যায়। কিন্তু আপনি তো নম্বর পাওয়ার রহস্যটা এড়িয়ে গেলেন এটা তো ঠিক হলো না। এড়িয়ে যায়নি ম্যাম। একদিন সময় করে অবশ্যই বলবো। বিকেলে একদিন দেখা করি ম্যাম? সামনাসামনি বললে বেশি ভালো হতো।
রিমি চাচ্ছিলোনা দেখা করতে সে কখনোই কারো সাথে সহজে দেখা করেনা। কিন্তু এই লোকটি তার নম্বর কি করে পেলো সেই রহস্যটা জানা অতি জরুরি। তাই রিমি রাজি হয়ে গেলো। রিমিকে লোকটি লোকেশন জানিয়ে দিলো।
কিন্তু আপনাকে আমি চিনবো কি করে? আপনাকে তো আমি চিনি না বা আগে কখনো দেখিওনি।
আমি আপনাকে ঠিক চিনে নিবো ম্যাম। বলেই লোকটি ফোন রেখে দিলো।
বৃষ্টি ততক্ষনে থেমে গেছে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানি গাছের পাতার উপর পড়ছ। বৃষ্টির পানির সাথে রিমি ও তার ঘোর চিন্তার দুনিয়ায় হারিয়ে গিয়েছে।
ঘোর কাটলো তার বাসার কাজের বুয়ার কথায়। আপা খাইতে আসেন । টেবিলে আপনার খাওয়া দিয়ে দিয়েছি। খেতে ইচ্ছা করছে না উঠিয়ে ফেলো।
রিমির বাবা মা দুইজনেই বিদেশ থাকেন কাজের খাতিরে।
রিমি বাংলাদেশে একাই থাকে। রিমির বাবা মা চেয়েছিলো ওর কোনো বান্ধবী বা কাজিন এসে থাকুক। কিন্তু রিমি চায়নি। শুধু বুয়া এসে তিনবেলা রান্না করে দিয়ে যায়। কিন্তু রিমির খেতে ভালো লাগেন। বুয়ার হাতের রান্না বিস্বাদ লাগে। প্রায় সবসময় রিমি বাইরে থেকে অর্ডার করে খাবার আনে। রিমির বাবা মা দুইবেলা ফোন করে রিমির প্রয়োজন অপ্রয়োজনের কথা জিজ্ঞেস করে।
রিমির সারাদিন কেটে যায় গল্প লিখে। আগে ও শখবশতঃ গল্প লিখতো কিন্তু এটা এখন প্রফেশনাল হয়ে গিয়েছে । প্রায় প্রতিদিন ই পাবলিকেশন্স এর লোক এসে বসে থাকেন গল্প নেয়ার জন্য। গত মাসেই ওর একটা বই নিবে হয়েছে অনেক সারা পেয়েছে। বইটার নাম হলো "কোনো এক বিকেলে" বর্তমানেও সে একটি গল্প লিখছে ভাবছে গল্পের কিছু কিছু কাহিনী নিজের জীবন থেকে নিয়। আজকের আগন্তুককেও কি গল্পে যোগ করা যায়?
লোকটির কথামতো রিমি সেই লোকেশন এ গেলো। জায়গাটা হলো নদীর পারে একটা জায়গা প্রকৃতি উপভোগ করার মত। কিছুক্ষন পর লোকটি এসে বললো, দুঃখিত ম্যাম আপনাকে এতক্ষন অপেক্ষা করানোর জন্য। আসলে বাসা থেকে এই জায়গাটা অনেক দূরে তো তাই আসতে দেরি হয়ে গেলো।
সমস্যা নেই। আপনি কিভাবে আমার নম্বর জানলেন সেই রহস্যটা বলুন জলদি ! আরে ম্যাম আগে তো একটু বসি একটা জায়পেলেন এসেই জেনে নিতে চাচ্ছেন?আদেখুন এমনিতে আমি কারো বলাতে কখনো কোথাও যাইনা কিন্তু আপনার বলাতে আসলাম কারণ আপনি কিভাবে আমার ফোন নম্বর পেলে এটা আমার জানে হবে। তাছাড়া আমার সময়ের অনেক মূল্য আছে অনেক দরকারি কাজ জমে আছে কথাটা সেরেই বাসায় যেতে হবে। তাই জলদি করে ঘটনাটা বললে খুশি হবো।
জি ম্যাম তা আমি জানি আপনি অনেক ব্যাস্ত মানুষ তাও আমার মতো সামান্য একজন ভক্তের জন্য সময় বের করে আসলেন তার জন্য আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছিনা । আমি আপনার সময় নষ্ট করবোনা কিন্তু ঘটনাটা বলার জন্য একটু ধীর হয়ে মনশান্ত করে বসতে হবে এবং আরেকটি অনুরোধ গল্প শোনার সময় আপনি কোনো প্রশ্ন করবেন না আমার কথা শেষ হলে আপনি আমাকে যত ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পারবেন। রিমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো ঠিক আছে বলুন আমি কোনো প্রশ্ন করবোনা আপনার কথার মাঝে। পাঞ্জাবি পড়া রহস্যময় চশমা পড়া লোকটা তার রহস্যময়তার জট খুলতে শুরু করেছে । আমার নাম সাফান রহমান। আমি একটা এনজিওতে অনেকদিন ধরে কাজ করছি প্রায় তিন বছর। কাজের প্রয়োজনে অনেক জায়গায় যাওয়া হয়েছে। তেমনি একদিন রিসার্চের কাজে একটা পাবলিকেশন্স এ গিয়েছিলাম। াসেখানে বিভিন্ন বই নিয়ে পড়ছিলাম সেগুলোর রিভিউ শুনছিলাম লাইব্রেরিয়ানের কাছ থেকে তখন আপনার বইটা চোখে পড়লো উনি বললো এই বইটা তেমন কোনো নামকরা লেখকের নয় স্যার কিন্তু উনি খুব ভালো লিখেন ওনার গল্পে প্রাণ আছে আপনি পড়ে দেখতে পারেন। ওনার কথা শুনে আমি বইটা নিয়ে কয়েক পাতা পড়লাম তারপর পুরোটা পড়ার আগ্রহ হলো বইটা বাসায় নিয়ে যাই এবং পুরো বইটা পড়ে শেষ করি। জানেন কোন বইটা পড়েছিলাম আপনার? "আমার দিনগুলো" এই বইটি পড়ে আমি আপনার লিখার ভক্ত হয়ে যাই এর পর থেকে প্রতি সপ্তাহেই ওই লাইব্রেরি থেকে আপনার প্রতিটি বই নিয়ে পড়েছি। প্রতিটা গল্পই এতটা মায়ামমতায় ঘেরা কোনো জটিলতা ছাড়াই সহজ সরল ভাষায় লিখা প্রতিটা কথা যেন আপনার মনের কথা জানান দিচ্ছিলো। রিমি খুব মন দিয়ে লোকটার কথা শুনছিলো। তার লিখার প্রশংসা অনেকেই করেছে আগে কিন্তু এভাবে সামনাসামনি কখনোই শোনা হয়নি তাই মনের অজান্তেই রিমির দু চোখের কোনায় অশ্রু জমে গিয়েছে সেটা রিমি খেয়ালই করেনি। লোকটি আরো বললো এভাবে আপনার লিখা পড়তে পড়তে আপনার সাথে দেখা করার কথা বলার অনেক ইচ্ছা হলো। জানি এটা হয়তো অন্যায় ইচ্ছা কিন্তু যার লিখা এতো সুন্দর তার কথা না জানি কত সুন্দর কতটা মমতা সেই চোখে মুখে সেই জন্য লাইব্রিয়ানের কাছ থেকে আপনার বইগুলো যেইসব পাবলিকেশন্স এর মাধ্যমে প্রকাশ হয় তাদের সাথে যোগাযোগ করলাম। সবার কাছ থেকে আপনার নম্বর চাইলাম কেউ দিতে রাজি হলোনা। শেষে ভাবলাম সাংবাদিকের অভিনয় করি। তাদের বললাম যে আমি আপনার ইন্টারভিউ নিবো। তখন তারা আপনার নম্বর দিলো। জানি এই কাজ টা করা আমার একদম ই ঠিক হয়নি কিন্তু এরকম অসাধারণ লেখকের সাথে দেখা করার ইচ্ছাটা প্রবল হয়ে উঠেছিল নিজের অবুঝ মনকে কিছুতেই মানাতে পারছিলাম না। আমাকে ক্ষমা করবেন ম্যাম।
নাহ এখানে ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। আপনি আমার একজন ভক্ত আপনার ইচ্ছা করতেই পারে। আপনার জায়গায় আমি হলে হয়তো আমিও এরকমটাই করতাম। কিন্তু আপনার জন্য আমার লিখার প্রশংসা সামনাসামনি শোনার সৌভাগ্য হলো। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমার সামনের আগত বইগুলো পড়ার অনুরোধ রইলো। জি ম্যাম অবশ্যই। এটা বলতে হবেনা আমি আপনার সব বই ই পড়ি। ম্যাম আপনি কি কিছু খাবেন চা , কফি ? একটা কিছু খেয়ে যান অর্ডার করি।
নাহ ধন্যবাদ সাফান সাহেব। অন্য কোনো দিন যদি দেখা হয়।
তার মানে ম্যাম আমাদের কি আবার দেখা হবে ?
জানিনা হতেও পারে। আজ আসি। ভালো থাকবেন। রিমি উঠে চলে আসলো। একটা রিক্সা নিয়ে তার বাসার দিকে রওনা দিলো। আজকের দিনটা সত্যি অন্যরকম সুন্দর ছিল কেননা রিমি সারাদিন ঘরে নিজেকে বন্দি করে রাখতো আজ অনেকদিন পরে ঘর থেকে বের হয়েছে এবং সাথে এতগুলো সুন্দর প্রশংসা শুনেছে মনটা একদম ভালো হয়ে গেছে রিমির। ...
