কাপালিক পর্ব আঠারো
কাপালিক পর্ব আঠারো
অষ্টাদশ পর্ব
জগন্নাথ কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়েছে ; কিন্তু পাঁচু তখনও ঠকঠক কাঁপছে। তান্ত্রিকের হাসি থামতেই জগন্নাথ সাহস করে বলে দিল - বাবা ! রাত হয়ে যাচ্ছে , আমাদের তো বাড়ি ফিরতে হবে ! যা বলার বলুন দয়া করে ।
- সে কি রে শালা ! আমি যে আয়োজন করে রেখেছি - আজ শনিবার; রাত্রি দ্বিপ্রহর গতে অমাবস্যার প্রথম ভাগে তোর জন্য বিশেষ পূজার্চনার করব ! না না না ! তোর আজ বাড়ি ফেরা হবে না । নৈবেদ্য নিবেদন হয়ে গেলেই আমার মনোস্কামনা পূর্ণ হবে । তোরও মঙ্গল হবে ।
জগন্নাথ দেখল তার আশঙ্কাই সত্য হতে চলেছে । কাপালিকের উদ্দেশ্যই হল নরবলি দিয়ে উন্নততর সাধন মার্গে উন্নীত হওয়া । আজ কেন; কোনদিনও আর বাড়ি ফেরা হবে না ।
মনে পড়ে গেল স্ত্রী কান্তার মুখখানি। ডাক্তার দেখিয়ে আসার পর তাকে এমন আনন্দমুখর আগে কোনদিন দেখেনি। গলা থেকে দিন রাত গুনগুন করে গান গায় । ভালোমন্দ খেতে থাকে । মন মেজাজ একেবারে চাঙ্গা হয়ে আছে । তাই যখন বলল - বউ ! আজ সন্ধ্যায় সাধু বাবা ডেকেছেন ; পাঁচুকে নিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করে আসি । অন্য দিন হলে বলত - না যাবে না । ও সব তান্ত্রিক কাপালিকেরা কখনও ভালো হয় না । কোথা থেকে কি করবে বলা তো যায় না ।
কিন্তু আজ যেন মোহগ্রস্তের মত বলে দিল - ঠিক আছে । এসো কিন্তু পাঁচুকে কাছে কাছে রেখো ।
হায় রে নিয়তি ! শেষে কাপালিকের পাল্লাতেই পড়লাম !
পাঁচুর কানে ফিসফিস করে বলল - হল তো ! তোর মনস্কামনা পূর্ণ হল তো ! নে এবার মর !
পাঁচু তো ঘাবড়েই ছিল ; জগন্নাথের ফুটকড়াই শুনে কড়াইয়ের গরম তেলের ছেঁকা অনুভব করল । ভয়ে কিছু বলল না বটে কিন্তু কাঁপুনি তার অধিক মাত্রায় বেড়ে গেল ।
- কত্তা ! আর তো পালানো যাবেনি ! কি হবে এবার ?
- তোর আর কি হবে ? মরব তো আমি । তুই বরঞ্চ বাবার প্রসাদ পাবি !
সাধু বাবা সব শুনছিলেন । আধিদৈবিক জ্ঞানী পুরুষ বলে অন্যের মনের কথা সহজেই বুঝে যেতে পারেন । বললেন - একেই বলে কর্মফল । যে যেমন কর্ম করবে সেই অনুযায়ী ফল ভোগ করবেই । এটাই নিয়তি ।
জগন্নাথ বলল - বাবা ! ও সব ফল ফুল পাতা আপনি রাখুন; আমাদের এবার আসতে আজ্ঞা দিন । মন উতলা হয়ে পড়েছে ।
- শোন বেটা ! মনকে বশে আনার চেষ্টা কর । তুই না পুরুষ মানুষ ! মন তোর বশে থাকবে নাকি তুই মনকে বশীভূত করবি ?
অধৈর্য্য হয়ে জগন্নাথ বলল - আমরা নগন্য লোক মাত্র । একটু সুখ , আর এক ফোঁটা শান্তি পেলেই খুশি। এত বড় বড় তত্ত্বকথা আমরা বুঝি না ।
সাধু ধমক দিয়ে বলেন - ভীতু কোথাকার ! এই পূর্ণ যৌবনেই যদি তোর এই হাল হয় তবে বৃদ্ধাবস্থায় তো অসহায় হয়ে পড়বি রে । চল ভেতরে । পূজার আয়োজন করি গে ।
এরপর সাধু বাবা কমণ্ডলু থেকে জল নিয়ে জগন্নাথ ও পাঁচুর মাথায় ছিটিয়ে দিলেন । জগন্নাথ পাঁচুকে বলল - হয়ে গেল ।
- কি হয়ে গেল কত্তা ?
- উৎসর্গ । এবার চল হাঁড়িকাঠে গলা বাড়াই ।
প্রসঙ্গত বলে রাখি এই শ্মশানকালী মন্দিরে পূর্বে ছাগবলির বিধান ছিল । প্রতি অমাবস্যায়, কালীপূজার সময় অনেকে মানত করে পাঁঠা বলি দিতে আসত । তারানাথ আসার পরই ওই প্রথা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন । বর্তমানে পুরোপুরি বৈষ্ণব মতে শ্যামা পূজা হয় , যদিও মায়ের মূর্তিটি শ্যামা মায়ের নয় ; আদিকালের মহাকালী ।
পাঁচু বলল - এখানে তো বলিটলি হয় না কত্তা । ববাই তো বলিপ্রথা বন্ধ করে দিয়েছেন । অতএব ধরে রাখুন হাঁড়িকাঠে মাথা দিতে হবে না ।
জগন্নাথ বলল - বউ বলছিল এ সব কাপালিকদের ছলনা । তামসিক ভাবে সিদ্ধ । তুই কি ভাবে বলিস বলি হয় না ?
সাধু বাবা বললেন - কে বলেছে বলি হয় না? বলি না পেলে মা যে অসন্তুষ্ট হবেন রে বেটা । তাই তো তোদের ডেকেছি স্বচক্ষে বলি দেখবি বলে । নে চল । দেরী করিস না ।
পাঁচু দেখল কাপালিককে বোঝানো বৃথা । একবার মুখ ফস্কে যা বলে দিয়েছেন তা' তিনি করবেনই । যা থাকে কপালে ভেবে নিয়ে উভয়ে সাধু বাবার অনুগমন করল ।
উল্লসিত তারানাথ ওদের সামনেই মাকে জড়িয়ে ধরে উচ্চরবে বলতে লাগলেন - হে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনী দেবী কাত্যায়নী ! আজ আমি এক সঙ্গে দুই দুইটি বলি এনেছি মা । গ্রহন করে আমাকে কৃতার্থ কর মা । আমার অভীষ্ট সিদ্ধ কর ।
পাঁচু এ কথা শোনামাত্র অজ্ঞান হয়ে গেল আর জগন্নাথের হাত পা কাঁপতে শুরু করল । সাধু বাবা দু'জনের কপালে রক্ত চন্দনের তিলক পরিয়ে দিলেন ।
সঙ্গে সঙ্গে জগন্নাথ দেখল সাধু বাবার এক অত্যাশ্চর্য্য রূপ । কোথায় কাপালিক আর কোথায় এই শ্বেত বস্ত্র পরিহিত এক যোগী যিনি কৃষ্ণনামে আত্মহারা হয়ে নৃত্য করছেন ।
জগন্নাথ মনে করতে পারছে না এই রূপ বইতে কোথাও দেখেছে নাকি এও সম্ভব ! নাচতে নাচতে সাধু বাবা শিব এবং কালীর সম্মুখে হাত জোড়া করে প্রণাম নিবেদন করছেন - হে কৃষ্ণ করুণা সিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপতে.....
জগন্নাথের বোধোদয় হল । সে চোখের সামনে দেখতে পেল নদিয়ার নিমাই যেন হা কৃষ্ণ হা কৃষ্ণ করে অন্তরের আকুতি জানাচ্ছেন । মন্দির অভ্যন্তরে মৃদঙ্গ ধ্বণি শোনা যাচ্ছে । শত চন্দ্রালোকে ছেয়ে আছে অভ্যন্তর । জগন্নাথ কল্পলোকের স্বপ্ন দেখতে দেখতে মাটিতে শুয়ে পড়ল ।
সাধু বাবা কমণ্ডলু থেকে জল নিয়ে জগন্নাথের দেহে ছড়িয়ে দিলেন । জগন্নাথ উঠে বসল । এবার তান্ত্রিকে বেশে সাধু বাবা এলেন তার সামনে ।
বললেন - বলি হয়ে গেল রে বেটা ! দেখলি না ?
জগন্নাথ হতচকিত হয়ে বলল - বাবা ! এ কি দেখলাম ?
- বেটা ! বলি বলতে তোরা শুধু পশু বা নরবলিই বুঝিস । আরে বলি তো তা নয় ; তা তো হত্যা । আসলে বলি হল অন্তরের রিপুগুলো বর্জন করা । যেমন ষড় রিপু - কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ এবং মাৎসর্য্য । এগুলো যে ত্যাগ বা বলি দিতে পারে সেই প্রকৃত সিদ্ধসাধক । এই দেহটি যতক্ষণ এদের বশীভূত থাকবে ততক্ষণ মনের উচাটন ভাব থাকবে অন্যথায় ....
জগন্নাথ ততক্ষণে বুঝে গিয়েছে যে তাদের কোন প্রাণ সংশয় নেই । বুকে সাহস এনে বলে ফেলল - সবই তো বুঝলাম বাবা ! কিন্তু আমাকে কেন ডেকেছেন - এ কথা এখনও বুঝলাম না ।
সাধু বাবা পাঁচুর দিকে দৃকপাত করে বললেন - ওই যে শালা পেঁচো - ঘুমোচ্ছে । ঘুমোক। এই ফাঁকে তোকে কেন ডেকেছি বলে দি ।
চাতালে বলেছিলাম না বাধ্য হয়ে তোর বউকে অন্তঃসত্ত্বা করেছি ! শোন সেই কাহিনী ।
তোর পত্নীর গর্ভে যে ঠাঁই পেয়েছে সে কিন্তু আসলে তোদের ওই গোপেশ্বর ঠাকুরের ঔরসজাত । মনে পড়ে বাগদী বৌকে । চরিত্রহীন গোপেশ্বর ওর সঙ্গে নিয়মিত সহবাস করত । ফলস্বরূপ বাগদী বউ গর্ভবতী হয় । কিন্তু নিয়তির নিয়মে গোপেশ্বর ও বাগদী বউকে চলে যেতেই হয় । এ কথা আমি বুঝতে পেরে অনাগত সন্তানের প্রতি মমত্ব বোধ করি । এদিকে দুলির আত্মা আমার কাছে মুক্তি চায় । তখন দুলিকে দিয়ে সেই ভ্রুণ প্রসব করিয়ে আমি পুষ্করিণী তীরে গিয়ে তোর পত্নীর দেহে প্রতিস্থাপন করি । দীর্ঘকাল তোরা সন্তানহীন রয়ে গেছিস । তাই সেই মনের কষ্ট লাঘব করতে আমি এই সিদ্ধান্ত নিই ।
জগন্নাথ বলল - আপনি ঘোরতর অন্যায় করেছেন বাবা । এভাবে আমাদের অপদস্থ না করলেই পারতেন ।
সন্ন্যাসী মৃদু হাসলেন ।
- আমি অনন্যোপায় । রামচরণকে কথা দিয়ে রেখেছি ওকে মুক্তি দেব বলে । রামচরণ প্রতিদিন আমাকে খেপিয়ে তুলছে কোথায় মুক্তি দিলে সাধক । এই কি তোমার সাধনার ফল ? আমি মাকে নিবেদন করলাম । মা স্বয়ং এই বিধান দিয়েছেন । তাই করেছি ।এখন তুই যদি সম্মত না হবি - কোন ক্ষতি নেই । কিন্তু তুই ভ্রুণহত্যার পাপে পড়বি । তাই বলছি আপাতত শান্ত মনে এটা মেনে নে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেই রামচরণ মুক্তি পাবে । তারপর না হয় যা ভালো বুঝিস করবি !
জগন্নাথ স্বীকার করে নেবে কেন ? কাকের বাসায় কোকিল ছানা ? কান্তা জানে না - ওর কোন অসুবিধা হবে না , কিন্তু আমি জেনেশুনে তা মেনে নিই কি করে ?
সাধু বাবা বললেন - আমি কিছু না বললে যেমন মেনে নিতে পারতিস ঠিক সেই ভাবেই মেনে নিবি । অসুবিধা কি? আর যদি তা না করিস তবে রামচরণ এখন ঘাস কেটে বেড়াক । আমার কি !
জগন্নাথ খুঁত খুঁত করতে লাগল । সাধু বাবা বুঝলেন আরও ভালো করে পাঠ দিতে হবে ।
বললেন - যাক পেঁচোও জেগে গেছে । ওর সামনে কিছু বলব না । তুইও বলবি না লোক জানাজানি হয়ে যাবে তখন সামাজিক কৌতুকের শিকার হয়ে পড়বি ।
জগন্নাথের হঠাৎ কি মনে হল - বাবা তো ঠিকই করেছেন । পাঁচ বছর বিয়ের পরও যখন সন্তান-সন্ততি হয়নি - সকলেই তো ধরে নিয়েছিল মেয়েটা বন্ধ্যা বা সে নিজে অক্ষম । এটা তো ভুল প্রমাণ করা যাবে ।
বলল - বাবা বুঝে গেছি । আপনার ইচ্ছারই জয় হোক ।
( চলবে )
