Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Saswati Roy

Classics


2.1  

Saswati Roy

Classics


জীবন যেরকম (বিশ্বাসঘাতক)

জীবন যেরকম (বিশ্বাসঘাতক)

17 mins 850 17 mins 850


#এক


প্লেনে উঠে মনটা একটু খারাপ করেই বসেছিল দেবারতি। প্রতিবার মুম্বই ফেরার সময় বাবা বা দাদা কেউ না কেউ ঠিক এয়ারপোর্টে ড্রপ করতে আসে। এবার দেবারতিকে একাই আসতে হয়েছে ক্যাব বুক করে। বৌদি যদিও বলেছিল সঙ্গে আসবে। দেবারতিই মানা করেছে। বাবাকে নিয়ে কটাদিন সবারই বেশ ধকল গেছে। 


বাবা যে হঠাৎ করে এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে কেউই তা ভাবেনি। বরং মায়ের শরীর নিয়েই সবার দুর্ভাবনা ছিল। আর্থরাইটিস, সুগার, প্রেসার নিয়ে মাসের প্রায় কুড়ি দিন মা বিছানায় থাকে। তুলনায় বাবা অনেক সুস্থ সবল। বাজারহাট, ব্যাঙ্ক, পোস্টঅফিস সব কাজেই বাবা আগে ছোটে। এমনকি মায়ের শরীর খুব বাড়াবাড়ি রকমের খারাপ না হলে, ডাক্তার বদ্যিও বাবা একাই করে থাকে। দাদা বৌদির সাথে সমস্যা না থাকলেও বাবা পারতপক্ষে তাদের বিরক্ত করে না। সেই বাবা কিনা পুরো সাত সাতটা দিন নার্সিংহোমে কাটিয়ে এলো। সুস্থ মানুষ রোজকার মত বাজার নিয়ে এসে বসেছে। অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই ঘাম হচ্ছিলো। তবে কলকাতার ভয়াবহ গরমে সকলেরই এরকম হচ্ছে বলে গুরুত্ব দেয়নি কেউই। তারপরেই বাথরুমে যেতে গিয়ে পড়ে যায় বাবা। কারুর সাহায্য চাইবার সুযোগটুকু পর্যন্ত পায়নি। সেদিনটা শনিবার হওয়ায় দাদা বৌদি দুজনেই বাড়িতে ছিল। সময়েই বাবাকে নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া গেছে। নাহলে মা একা একা কি যে করতো! ডাক্তার তো নাকি বাবাকে দেখেই বলেছিলেন আর কিছুক্ষণ পরে আনলে হয়তো মারাত্মক কিছু ঘটে যেত। ভাবনাটা মনে আসতেই বুক কেঁপে উঠলো দেবারতির।


-ম্যাম প্লিজ, ফ্যাসেন ইওর সিটবেল্ট। 

গাঢ় নীল ইউনিফর্ম পরা, পরিপাটি করে চুল বাঁধা কেবিন ক্রু মাপা হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে দেবারতির দিকে। 

-ইয়াহ, সিওর।

-থ্যাংক ইউ ম্যাম। 

যান্ত্রিক ভাবে লাল ঠোঁট দুটো নড়ে উঠলো আবার। মেয়েটি চলে যেতে সিটে মাথা এলিয়ে দিল দেবারতি। গত সাত দিন প্রচুর ধকল গেছে, শরীরে মনেও।


সেদিন বাবার কন্ডিশন একটু স্টেডি হবার পর দাদা ফোন করেছিল তাদের। শনিবার রক্তিম আর দেবারতিরও ছুটির দিন। দেবারতি সেদিন একগাদা জামাকাপড় ভিজিয়েছিল ওয়াশিংমেশিনে। দাদার মুখে বাবার খবরটা শুনে প্রথমে কিছুক্ষণ তার মাথা কাজ করেনি। তারপর রক্তিমকে জানাতেই সে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল যে, সে এই মুহূর্তে নতুন প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত তাই তার পক্ষে কোনোভাবেই ছুটি নেওয়া সম্ভব নয়।

তবে দেবারতির কলকাতা যাওয়াতে তার কোনো আপত্তি নেই। হওয়ার কথাও নয়। ক্লাস ফাইভ থেকে রক্তিম বরাবর হোস্টেলে থেকেছে। একা জীবন যাপনে সে অভ্যস্ত। আর দিন সাতেকের ব্যাপার সে খুব সহজেই ম্যানেজ করতে পারবে। ছোট কিটস ব্যাগটা গোছাতে গোছাতে কাজের মেয়েটাকে ফোন করে আগামি সাত দিনের যাবতীয় কাজ বুঝিয়ে দিয়েছিল দেবারতি। 

রক্তিম এসেছিল এয়ারপোর্টে ড্রপ করতে ।

বাবার জন্য ভাবনা সেই মুহূর্তে দেবারতিকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ভেবেছিল তার এই বিপদের দিনে রক্তিম একবার অন্তত বলবে তেমন দরকার হলে সেও কলকাতা চলে আসবে। কিন্তু রক্তিমের নিরুদ্বেগ আচরণে সে খুবই আহত হয়েছিল। একসাথে পাঁচটা বছর কাটানোর পরেও স্ত্রীর ভালো মন্দে কি করে এতটা নিরুত্তাপ নিরুদ্বেগ হতে পারে রক্তিম!

মাঝে মাঝে দেবারতির মনে হয় হস্টেলে থাকার কারণেই হয়তো রক্তিম কিছুটা হলেও আত্মকেন্দ্রিক। সব সময় না হলেও কখনও সখনও তার চরিত্রের এই বিশেষ দিকটা বেরিয়ে পড়ে। 

সম্বন্ধ করে তাদের বিয়ে হলেও রক্তিমের মায়ের কোনোদিনই দেবারতিকে তেমন পছন্দ ছিল না। তার প্রথম পছন্দ ছিল তারই এক বান্ধবীর মেয়েকে। সেইমতো নাকি কথাও এগিয়েছিল। পরে জানা যায় সেই মেয়েটি নাকি কলেজ জীবন থেকেই এক সহপাঠিকে মন দিয়ে রেখেছে।

বিয়ের পর রক্তিমের মায়ের মুখেই এই কাহিনী শুনেছিল দেবারতি। এবং তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে এও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন দেবারতি আর সেই মেয়ের মধ্যে কি কি পার্থক্য আছে। স্বাভাবিক ভাবেই এরপর শাশুড়ি মায়ের সাথে দেবারতির সুসম্পর্ক গড়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। যদিও রক্তিম কোনোদিনই এই ব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। বৌ আর মায়ের ঠাণ্ডা লড়াইয়ে সে অন্যান্য ছেলেদের মতো স্যান্ডউইচ না হয়ে বরং দু পক্ষের থেকেই ফায়দা লুটেছে। তবে বাদানুবাদের সময় দেবারতির মনে হয়েছে রক্তিম চিবিয়ে চিবিয়ে যে বিষ মাখানো কথাগুলো বলে থাকে সেগুলো আদপে তার মায়েরই শেখানো বুলি। 


রানওয়ে দিয়ে এবার জোরে ছুটতে শুরু করেছে প্লেন। দেবারতি মোবাইলটা সুইচ অফ করে হ্যান্ডব্যাগে পুরে নিলো। এখন ঘন্টা তিনেক পরিচিত মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে সে। তবু চিন্তারা তো ভীড় করে আসেই। 

বাবা এখন অনেক সুস্থ। সময়ে চিকিৎসা পাবার জন্যেই হোক বা বাবার মনের জোরেই হোক, হৃদয়ে ধাক্কা লাগলেও চিড় ধরেনি। তবে মা খুব ভেঙ্গে পড়েছে। এই কদিনে মা যেন বড্ড বেশী করে অনুভব করেছে বাবার অস্তিত্ব। বাবাকে নার্সিংহোম থেকে ছাড়ার দিন অবধি কারুর ফোন এলেই চমকে উঠেছে মা। কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করেছে ফোনটা নার্সিংহোম থেকে কিনা। দেবারতি স্বচক্ষে দেখেছে। যতই তারা দুই ভাইবোন পাশে থাকুক, মা যে বাবাকে ছাড়া কতটা অসহায় মায়ের চোখে মুখে সেই আর্তি ফুটে উঠছিল। কিন্তু একদিন না একদিন এ সত্যকেও তো মেনে নিতে হবে। একে অপরকে ছাড়া কিভাবে থাকবে বাবা মা!

অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো দেবারতির বুক থেকে। জীবন থাকলে মৃত্যুও তো অনিবার্য। না চাইলেও মেনে নিতেই হবে।

সেও কি বাবা মা কে বাদ দিয়ে পৃথিবীটাকে ভাবতে পারে! বিয়ের পর পর মনে হতো রক্তিমই তার জীয়নকাঠি। রক্তিমকে ছাড়া জীবন অসম্ভব বলে মনে হতো। রক্তিমও তো চোখে হারাতো তাকে। আর এখন এক ঘরে বাস করেও রক্তিমের সাথে যেন আলোকবর্ষের দূরত্ব। রক্তিমের অবজ্ঞা তাকেও যেন বাধ্য করছে বাবা মায়ের প্রতি নির্ভরশীল হতে।

গত সাত দিনে একটি বারের জন্যও রক্তিম তার বাবার খোঁজ নিতে ফোন করেনি। দেবারতিই সেধে সেধে ফোন করে রোজকার খবর তাকে জানিয়েছে। তবে হ্যাঁ, তার শ্বশুরমশাই রোজই ফোন করে খোঁজ খবর নিয়েছেন। নেহাত খড়গপুর থেকে একা আসা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, নাহলে হয়তো দেখাও করে যেতেন। সম্পর্কগুলো নিয়ে রক্তিম এতটা উদাসীন না হলে হয়তো দেবারতিরও শ্বশুরবাড়ির সাথে একটা সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হতো। 


চোখটা একটু লেগে এসেছিল দেবারতির। পাশের মেয়েটির ডাকে নড়ে উঠলো। 

-শুনছেন? আপনাকে ডাকছে। 

রিফ্রেশমেন্টের ট্রলি নিয়ে অপেক্ষারত সুন্দরী কেবিন ক্রু তাকিয়ে আছে দেবারতির দিকে। দেবারতি এক কাপ চা নিলো শুধু।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে পাশে বসা কপোত কপোতীর দিকে একবার দেখলো।

সদ্য বিবাহিত মনে হচ্ছে দেখে। একটা কাপ নুডলস নিয়ে দুজন দুজনকে খাইয়ে দিচ্ছে।

দেবারতি জানলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।

খুব মনে পড়ছে বিয়ের পরের দিনগুলোর কথা। হানিমুনে গোয়া গেছিল ওরা। ফেরার সময় ফ্লাইটে ওদের পাশে এক গোমড়ামুখো মাঝবয়সী ভদ্রলোক বসেছিলেন। ওনার চোখ বাঁচিয়ে রক্তিম বারবার দেবারতিকে আদর করার চেষ্টা করছিল। শেষে না পেরে বলেই বসলো

- লোকটার হিংসে হচ্ছে বুঝলে। বৌ জোটেনি বোধহয়।

-কি করে বুঝলে তুমি? যত বাজে কথা।

 ফিসফিস করে বলেছিল দেবারতি।

-আরে বোঝা যায়। ওর চোখ মুখ বলে দিচ্ছে ও এখনো উপোস করেই আছে।

-ইশ, তোমার মুখে কিছু আটকায় না।

ঘটনাটা মনে পড়তে একামনে হেসে ফেলল দেবারতি। সত্যি ওই প্রথম কটা মাসেই যা মধু ছিল। এখন তো মনে হয় রক্তিমের বলা ভালোবাসার শব্দগুলো শুধু শব্দই ছিল। কোনো প্রাণ ছিল না তাতে। 

এখন ঝগড়ার সময় রক্তিম স্বমূর্তি ধারণ করে। দেবারতির মা, বাবা, দাদা, বৌদি কেউই ছাড় পায় না রক্তিমের কটূক্তির হাত থেকে।

আবার এই রক্তিমই বিছানায় অন্য মানুষ।

দেবারতিকে জড়িয়ে ধরে বলে 

-দ্যাখো তর্ক বা ঝগড়া মানুষ করে কেন? নিজেকে সঠিক আর প্রতিপক্ষকে ভুল প্রমাণ করার জন্য। পুরোটাই হার জিতের ব্যাপার ডার্লিং। ওই কথাগুলো মনে রেখো না। ওগুলো শুধুই জেতার জন্য বলা মিনিংলেস কথা।

-কিন্তু রাগে তো মানুষ মনের কথাই বলে ফেলে রক্তিম।

-আহ, এখন থাক না ওসব কথা। কাছে এসো। 

জোর করে কাছে টেনে নেয় রক্তিম। তার আগ্রাসী চুম্বনে দেবারতির না বলা কথাগুলো না বলাই থেকে যায়।

রক্তিম এরকমই। ভালোবাসা হোক বা ঝগড়া, সবটাই তার নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। এমনকি সন্তান হওয়া নিয়েও বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই তার । নিজের বাবা মায়ের কথা তো এক কান দিয়ে শোনে এক কান দিয়ে বের করে দেয়। আর দেবারতি কিছু বললে বলে

-তোমার সবে একত্রিশ আর আমার তেত্রিশ। এখনও এসবের জন্য অনেক সময় আছে। কদিন মস্তিতে চাকরি করে নাও, আমাকেও আমার কেরিয়ার গোছাতে দাও। তারপর ভাবা যাবে। তদ্দিন নো চ্যাঁ-ভ্যাঁ।

-কিন্তু বয়েস বাড়লে তো কমপ্লিকেশন বাড়ে।

তখন যদি কনসিভ করতে না পারি, আমাকেই তো সবাই দুষবে।

-আর তোমার চাকরির কি হবে? দিনরাত খেটেখুটে যে এত বড়ো স্কুলটায় চাকরি জোটালে, বাচ্চা নিয়ে ম্যানেজ করতে পারবে?

-ঠিক পারবো দেখে নিও। পুরো ছ'মাসের ছুটি পাবো। তারপর লোক রেখে নেব।

-বোকার মত কথা বোলো না ডার্লিং। ছোট বাচ্চা আয়ার কাছে ফেলে রেখে তুমি,আমি বেরিয়ে যাবো। আয়াকে ওয়াচ কে করবে?

তোমার মা অসুস্থ, আমার মায়ের সাথে তোমার যা রিলেশন তাতে মা মুম্বই আসবে না। তাহলে?

দেবারতি আর উত্তর খুঁজে পায় না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে খুশিতে ষোলখানা হয়ে হাতে গাড়ীর চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে অফিসের জন্য বেড়িয়ে যায় রক্তিম।


প্রতিবার দুর্গাপুজোয় বাড়ি গিয়ে দেবারতি ভাবে আর ফিরবে না। কিন্তু বাবা মায়ের মুখ চেয়ে ফিরে আসতেই হয় তাকে। ছোটবেলা থেকেই মুখচোরা সে। পরিচিতের গণ্ডীটিও তার বড়ই ছোট। স্কুল কলেজের হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধু ছাড়া তার খুব বেশি বন্ধুও নেই।


রক্তিমকে ইচ্ছে করেই বলেনি সে আজ আসছে। রক্তিম জানে দেবারতির সোমবার ফেরার কথা। গতকাল রাতেও যখন কথা হলো তখনও রক্তিম একবারের জন্য জিজ্ঞাসা করেনি দেবারতি সোমবার কটার ফ্লাইটে আসছে। এত নিস্পৃহতা দেখে দেবারতিই লজ্জা ভেঙে প্রশ্ন করেছিল

-তোমার খুব অসুবিধা হচ্ছে না গো?

-দূর, অসুবিধা কিসের? তুমি চাইলে আরো কদিন কাটিয়ে আসতে পারো। তোমার বাবা মায়েরও হেল্প হবে একটু। 

চোখের কোণটা জ্বালা জ্বালা করে উঠলো দেবারতির। রক্তিম কি একবারও বলতে পারতো না দেবারতিকে মিস করছে সে। পরক্ষণেই মনে হলো, থাক কলকাতা আসার সময় এয়ারপোর্টে ড্রপ করতে তো এসেছিল, সেটাই এখন অনেক পাওয়া দেবারতির কাছে।


ঘড়ঘড় শব্দে প্লেন মুম্বইয়ের মাটি ছুঁতে, দেবারতিও যেন ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবের মাটিতে নেমে এলো। এয়ারপোর্টের বাইরে বেরিয়ে ক্যাব বুক করার জন্য মোবাইল বের করতেই দেখলো সেটা অফই রয়ে গেছে। অন্যমনস্কতায় খেয়ালই হয়নি মোবাইলের কথা। ইশ, ওদিকে বাবার ওই অবস্থা আর সে কিনা এতক্ষণ ধরে জগৎ সংসারের সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ক্যাব বুক করে মেসেজ বক্স খুললো দেবারতি। মিসড কল এলার্টে মায়ের দুটো কল আর একটা অপরিচিত নম্বর। নাহ্, রক্তিমের কোনো কল নেই। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে মায়ের নম্বরে কল করলো। দুবার রিং হতেই ব্যস্ত গলায় ফোন ধরেছে চৈতালী।

- কিরে নেমে গেছিস?

- হ্যাঁ মা। তুমি ফোন করেছিলে দেখলাম। বাবা ঠিক আছে?

- হ্যাঁ রে, ঠিক আছে। তুই একা একা গেলি তাই ফোন করলাম, ঠিক মতো পৌঁছেছিস কিনা জানার জন্য।

- আমি ঠিক আছি মা। গাড়িও পেয়ে গেছি।

তোমরা সাবধানে থেকো। আমি বাড়িতে পৌঁছে আবার কল করবো। আর শোনো, ফোনটা হাতের কাছে রেখো। 

-রাখবো রে বাবা, রাখবো। তুই রক্তিমের খেয়াল রাখিস। ও হয়তো একটু রাগ অভিমান করবে, তুই যেন মেজাজ গরম করিস না। 

- ঠিক আছে মা, তুমি চিন্তা কোরো না।

ফোন কেটে দিয়ে মনটা ভার হয়ে গেল দেবারতির। বড্ড সরল তার বাবা মা দুজনেই। কাল রাতে মা যেই শুনল তাদের সুবিধার কথা ভেবে রক্তিম দেবরতিকে আরও কদিন থেকে যেতে বলেছে, ওমনি কি খুশি, কি খুশি। বাবাকে বলছে, বৌদিকে বলছে। যে বাবা তার আগের মুহুর্ত পর্যন্ত বেশ মণক্ষুণ্ণ ছিল, রক্তিম তাকে একবারও ফোন না করায়। সেও কিনা দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে রাত দশটার সময় মা কে বলছে এক কাপ চা করো তো।

হুহ্ , বাবা মা যদি জানত রক্তিম কি ধারণা পোষণ করে তাদের প্রতি!


বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে রক্তিমকে ফোন করলো দেবারতি। নট রিচেবল আসছে। বিকাল পাঁচটা বাজে। নির্ঘাত ছুটির দিন বলে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। ফ্ল্যাটের বেলে হাত দিতে গিয়েও থেমে গেলো দেবারতি।

রক্তিমের ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে হলো না। 

ফ্ল্যাটের একটা ডুপ্লিকেট চাবি সব সময়ই তার ব্যাগে থাকে। চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুললো সে। নিঝুম হয়ে আছে ফ্ল্যাটখানা। দেবারতির বিহনেই কি? আর রক্তিম! সেও কি একইভাবে দেবারতির অনুপস্থিতিতে ব্যথিত। সেই জন্যই কি কাল অত ছাড়া ছাড়া ভাবে কথা বললো! তাই হবে। তবে বাবুর রাগ আছে বটে। প্রথমে গুম হয়ে থাকবে। তারপর ঝগড়াঝাঁটি করে শান্ত হবে।

ড্রয়িংরুমের সোফায় ব্যাগ দুটো নামিয়ে বেডরুমের দিকে এগোলো দেবারতি। ল্যাচ ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই কোটি ভল্টের শক খেয়েছে সে। বিছানায় রক্তিমের সাথে নার্গিস, পরম তৃপ্তিতে ঘুমাচ্ছে যুগলে।

দুজনের শরীরের নিম্নাঙ্গ পাতলা চাদরে ঢাকা। উর্ধাঙ্গে এক টুকরো সুতোও নেই।

বহুবার রক্তিমের অফিস পার্টিতে মেয়েটিকে দেখেছে দেবারতি। ভীষণ প্রাণবন্ত মেয়ে, সব সময় রঙিন প্রজাপতির মত উড়ছে যেন। 

কয়েক সেকেণ্ড দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা হৃদয়ঙ্গম করলো দেবারতি। 

বমি পাচ্ছে খুব। সমস্ত শরীরটা যেন অবশ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে হাতের মোবাইলটা ছুঁড়ে ওদের সুখের ঘুম ভেঙেচুরে দেয়। নাহ, এই অবস্থায় নিজের উপস্থিতি জানান দেবার থেকে অসম্মানের আর কিছুই হতে পারে না। 

এত বছরের সুখী গৃহকোণ থেকে বেরিয়ে আসার আগে মোবাইলের ক্যামেরাটা অন করলো দেবারতি।

পা চলছে না, তবু কোনরকমে ব্যাগগুলো হাতে তুলে প্রায় যন্ত্রচালিতের মতো ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়ে এলো সে। সিকিউরিটি গার্ড চোখে প্রশ্ন চিহ্ন নিয়ে দেখছে দেবারতিকে।


সন্ধ্যে নেমে এসেছে। এর মধ্যে কখন যেন এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। জলে ভেজা রাস্তায় গাড়িগুলো সাপের মতো পিছলে পিছলে চলে যাচ্ছে। সামনেই একটা বাজেট হোটেল দেখে ঢুকে পড়লো দেবারতি। রাতটা কোনমতে এখানেই কাটাতে হবে। 


হোটেলের ঘরে ঢুকে দেবারতি বুঝতে পারলো ক্লান্তি যেন তাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরেছে।

রক্তিমকে সারপ্রাইজ দিতে এসে সে নিজেই আজ সবচেয়ে বেশি সারপ্রাইজড। উহ, ভগবান এমন দৃশ্য দেখার আগে সে মরে গেল না কেন! এত বড় অপমানের চেয়ে মৃত্যুও হয়তো অনেক বেশি সুখের। ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতেও দেবারতি যেন স্পষ্ট দেখতে পেল বাবা ডাকছে অনেক দূর থেকে "আমাদের ফেলে যাস না মণি"।


#দুই


-কি ব্যাপার এসেই গোছগাছ শুরু করে দিলে? আবার কোথায় যাচ্ছো?

- যাচ্ছি কোথাও একটা। আমার ফাইলগুলো কি তোমার ফাইলের সাথে রেখেছ? আলমারিতে তো দেখছি না। 

সুটকেস গোছাতে গোছাতে দেবারতি বলে।

- কি আশ্চর্য, কোথায় যাচ্ছো বলছো না। এসেই সুটকেস নিয়ে গোছাতে বসে গেছ। আবার ফাইল চাইছো। কি হয়েছেটা কি বলবে তো। তোমার বাবার শরীরটা কি আবার খারাপ করেছে? 

রক্তিম ভুরু কুঁচকে দেখছে দেবারতিকে।

-কারুর কিছু হয়নি।

-তাহলে হঠাৎ প্যাকিং করছো কেন?

-আমি চলে যাচ্ছি রক্তিম।

-চলে যাচ্ছো মানে? আর ইউ জোকিং?

- আমি সত্যিই চলে যাচ্ছি। তোমার যদি মনে হয় এটা জোক, দেন আই ক্যান্ট হেল্প। 

-তোমার কি হয়েছে? কলকাতা থেকে ফিরেই বলছো আবার চলে যাবে। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

-ওকে, লেট মি মেক ইট ভেরি ক্লিয়ার। আমি তোমার সাথে আর থাকতে চাই না। আই ওয়ান্ট আ ডিভোর্স।

 দেবারতির বরফের মতো ঠাণ্ডা স্বরে রক্তিমও এবার একটু যেন থমকাল।

-কারণটা জানতে পারি?

-আমি কলকাতা থেকে আজ আসিনি রক্তিম। কাল বিকেলেই এসেছি। 

-তার মানে? আমায় একবার জানাবার প্রয়োজনও বোধ করোনি? কাল সারারাত কোথায় কাটিয়েছ শুনি? কার সাথে কাটিয়েছ?

রাগে নাকের পাটা ফুলে উঠছে রক্তিমের। হাসি পাচ্ছিলো দেবারতির। নিজে ব্যভিচারী হয়েও বৌয়ের ব্যভিচারিণী হওয়া মানতে পারছে না রক্তিম। হায় রে পুরুষতন্ত্র!

না চাইতেও দেবারতির ঠোঁটের কোণে এক টুকরো ব্যঙ্গের হাসি ফুটে উঠল 

-আমার কাছ থেকে কৈফিয়ত চাইবার আগে একটু নিজের দিকে তাকাও।

-মানেটা কি অ্যাঁ? ভেবেছ কি তুমি? পরপুরুষের সাথে ফুর্তি মেরে এসে আমার থেকে ডিভোর্স চাইছো! দেব না তোমায় ডিভোর্স। কি করবে তুমি?

- আমি কি করতে পারি সেটা সময় এলেই দেখতে পাবে।

- চাকরি করো বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছ না? দাঁড়াও আগে তোমার বাপ,মা কে জানাই। তারা দেখুক কেমন মেয়ে প্যায়দা করেছে।

-ওকে, জানাও। তবে তার আগে এই ছবিগুলো দেখে নাও। দেবারতি নিজের মোবাইলটা তুলে ধরে রক্তিমের মুখের সামনে। 

-তুমি...তুমি কিভাবে এসব... তুমি কাল এখানে এসেছিলে? চুপি চুপি এসব করার মানে কি?

- একদিন আগে এসে তোমায় সারপ্রাইজ দেব ভেবেছিলাম। কিন্তু এসে যা দেখলাম...

-আয়াম সরি দেবী। ট্রাস্ট মি, তোমায় চিট করার কোনো ইনটেনশন আমার ছিলো না।

দেবারতি নির্বিকার মুখে প্যাকিং করে যাচ্ছে।

উত্তেজনায় ঘামছে রক্তিম। ফরসা মুখ লাল হয়ে গেছে।

-আমায় এক্সপ্লেন করার একটা সুযোগ তো দাও।

- সরি রক্তিম, আমার আর কিচ্ছু শোনার নেই। 

-প্লিজ একবার কি ক্ষমা করা যায় না? য়ু নো আই লাভ য়ু। 

দেবারতিকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো ঘাড়ে, গলায় মুখ ঘষছে রক্তিম।

-ছাড়ো আমাকে। ঘেন্না করছে আমার। 

দেবারতির স্বরের তীব্রতায় ছিটকে সরে গেলো রক্তিম। দু হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়েছে বিছানায় ।

- তুমি ছিলে না, আমিও যে কি ঝোঁকের মাথায়... প্লিজ ফরগিভ মি। 

- দ্যাখো রক্তিম, কাল যদি আমি অ্যাট অল না আসতাম, এসব না দেখতাম তাহলে হয়তো এভাবে একসাথেই আমাদের জীবন চলতো। কিন্তু নিজের চোখে সবকিছু দেখার পর কি করে আমি তোমার সাথে... তুমি হলে কি করতে ভেবে দ্যাখো।

-প্লিজ দেবী আমাদের সোশ্যাল স্টেটাসটা ভেবে এটলিস্ট একবার চেষ্টা করো। তুমি এভাবে চলে গেলে বাবা মা কোথাও মুখ দেখাতে পারবে না। আর তোমার বাবা পারবেন অসুস্থ শরীরে এই ধাক্কাটা নিতে?

- আমি সবার কথা ভেবেই বলছি। আমি চাই না এই বয়েসে এসে তোমার বা আমার, কারুর বাবা-মা ই কোনরকম আঘাত পান। তাই প্লিজ সব কিছু গ্রেসফুলি শেষ করো।

দ্যাখো পরকীয়া এখন আর অপরাধ বলে গন্য হয় না ঠিকই। তবে এই ছবিগুলো কোর্টে দেখালে আমি কিন্তু অনায়াসেই ডিভোর্স পেয়ে যাব।

-তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?

-একেবারেই না। তুমি আমার সাথে ভালো ছিলে না বলেই নিশ্চয়ই অন্য কারুর কাছে গেছো। এই ব্যাপারে তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগও নেই। আমি শুধু মুক্তি চাই ব্যস।

- দেবী প্লিজ আর একবার ভেবে দেখো। আমার লাস্ট রিকোয়েস্ট তোমাকে।

- আমার আর ফেরার উপায় নেই রক্তিম।

এখনও খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি। আমরা আবার যে যার জীবন নতুন করে শুরু করতে পারবো।


হোটেলে ফিরে দেবারতি প্রথম ফোনটা কাবেরীকে করলো। কাবেরী প্রবাসী বাঙালী। দেবারতির স্কুলেই কেমিস্ট্রি পড়ায়। বয়েস প্রায় চল্লিশ। এখনও বিয়ে করেনি। অদূর ভবিষ্যতেও করার ইচ্ছে আছে বলে মনে হয় না। স্কুলের মধ্যে একমাত্র কাবেরীকেই দেবারতি যা ভরসা করে। বাকি সবার সাথেই হাই, হ্যালোর সম্পর্ক। দেবারতি সব খোলসা করে না বললেও কাবেরী নিজের মতো করে যা বোঝার বুঝে নিলো। পাকাপাকিভাবে কলকাতা ফিরে যাবার আগে স্কুলেও কিছু ফর্মালিটিজ আছে দেবারতির। কাবেরী কথা দিয়েছে সে নিজে ম্যানেজমেন্টর সাথে কথা বলে দেখবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেবারতির ডিউজ ক্লিয়ার করা যায়।


অনেক ভেবেচিন্তে দ্বিতীয় ফোনটা শেষপর্যন্ত দাদাকে করলো দেবারতি।

বাবাকে নিয়ে জরুরি কথাগুলো সেরে সরাসরি নিজের প্রসঙ্গে চলে গেল সে।

- দাদা, আমি কলকাতা ফিরে আসছি রে।

দেবাঞ্জন ব্যাপারটা বুঝে উঠতে না পেরে বললো 

-এক্ষুনি আবার আসতে চাইছিস কেন? বাবা তো এখন অনেকটাই ভালোর দিকে।

দেবাঞ্জনকে কথার মধ্যে থামিয়ে দিয়েছিল দেবারতি।

-তুই বোধহয় বুঝতে পারছিস না দাদা। আমি রক্তিমকে ছেড়ে চলে আসছি।

-মানে...এ এ? দাদার গলায় বিস্ময় আর দুশ্চিন্তা একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। দেবারতি ক্ষণিকের জন্য চুপ করে গেল।

তারপর থেমে থেমে গতকালের ঘটনা দাদাকে জানালো। 

দেবাঞ্জন কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। অনেকগুলো ভাবনা এখন একসাথে তাকে ছেঁকে ধরেছে। বাবা মা এসব শুনে কিভাবে রিঅ্যাক্ট করবে। পায়েল খুবই বুঝদার মেয়ে, একমাত্র ননদকে ভালোও বাসে খুব। মণি যখনই আসে খুবই যত্নআত্তি করে। কিন্তু মণি সব সময়ের জন্য চলে এলে পায়েল সেটা কেমনভাবে নেবে?

সর্বোপরি যে চিন্তাটা মাথায় আসছে সেটা হলো মণি এখন বেশ কটা দিন মুম্বইতেই থাকবে বলছে। কিন্তু এখন তো রক্তিমের ধারে কাছেও মণির থাকা উচিৎ নয়।

রক্তিমের মধ্যে নিশ্চয়ই প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। দেবাঞ্জন পারলে এখনই বোনকে নিয়ে আসে। কিন্তু মণি যে সব আঘাত সামলে নিজেই নিজের জীবনটা গোছাতে চাইছে। শুধু বাবা-মা কে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবার জন্য দাদার থেকে একটু সাহায্য চেয়েছে। সে কি এটুকুও করতে পারবে না বোনটার জন্য! এতই অপদার্থ সে! এই মুহুর্তে কি করা উচিৎ ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছিল না দেবাঞ্জন। বাবার এই অবস্থায় কেমন করে জানাবে সে এই ভয়ানক সত্য!

দেওয়ালে টাঙানো দুই ভাই-বোনের ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো দেবাঞ্জন। মণির আট বছরের জন্মদিনে তোলা হয়েছিল ছবিটা। সে তখন ক্লাস নাইনে পড়ে, মণির ক্লাস থ্রী। ওই বছরই মণি একটা ক্লাস টেস্টে অঙ্কে কুড়িতে নয় পেয়েছিল। বাড়িতে ফিরে খাতাটা মা কে দেখায়নি মণি। রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখিয়েছিল। 

-দাদা, তোকে একটা কথা বলবো? 

-বল।

-আগে বল বাবা মাকে বলবি আমায় যেন না বকে।

-কেন কি দুষ্টুমি করেছিস আবার?

-আমি ম্যাথস টেস্টে নয় পেয়েছি রে দাদা। মা জানলে পিঠের চামড়া তুলে নেবে।

-আচ্ছা, আমি মা কে বলবো তোকে যেন না বকে। কিন্তু তুই প্রমিস কর এবার থেকে ভালো করে পড়বি? 

দাদার গলা জড়িয়ে ধরে মণি বলেছিল

- প্রমিস। প্রমিস। পাক্কা প্রমিস। 

কথা রেখেছিল মণি। শেষ অবধি সেই অঙ্কেই মাস্টার্স করেছিল।

চোরা কান্নায় বুক ফেটে যাচ্ছে দেবাঞ্জনের। বিয়ের পর থেকে বুকে এত যন্ত্রণা চেপে ঘুরে বেরিয়েছে মণি। কাউকে কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি। দাদাকেও না। এত বড় কবে হয়ে গেল তার ছোট্ট বোনটা। 


স্কুল ছুটির পর মাঝারি মাপের একটা চীনে রেস্তরাঁতে এসেছে দেবারতি আর কাবেরী। দেবারতির অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলতে। রেস্তরাঁটা ছোট হলেও ভারী পরিচ্ছন্ন এবং কেতাদুরস্ত।

দেবারতিরা ঢুকতেই স্যুট টাই পরিহিত এক 

ওয়েটার এগিয়ে এসেছে।

কাবেরী গম্ভীর মুখে বললো 

-টেবল ফর টু।

-প্লিজ কাম দিস সাইড ম্যাম। রেস্তরাঁর কোনার দিকের একটা ছোট্ট টেবিলে বসেছে দুজনে। কাবেরী ভারী ব্যাগখানা পাশের চেয়ারে রেখে মেনু কার্ড হাতে তুলে নিয়েছে।

-আমার জন্য শুধু ফ্রেশ লাইম সোডা বল, কাবেরীদি। আমি আর কিছু খাবো না।

-চুপ কর। না খেলে লড়বি কি করে? 

ওয়েটারকে ডেকে এক প্লেট হানি চিলি পটেটো আর চিকেন ডিম সাম অর্ডার করলো কাবেরী। 

- এখন কি করবি কিছু ঠিক করলি?

কাবেরীর প্রশ্নে ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে, দুদিকে মাথা নাড়ল দেবারতি।

- দ্যাখ দেবু, আমি ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম ওরা একেবারেই চাইছে না তোর মতো ডেডিকেটেড টিচারকে ছেড়ে দিতে। ওদের কলকাতা ব্রাঞ্চে তোকে ট্রান্সফার করতে ওরা আদৌ কোনো হেল্প করবে কিনা গড নোজ।

এদিকে তোর অ্যাকচুয়াল সিচুয়েশনও ওদের বলা যাচ্ছে না। তাও আমি প্রিন্সিপাল ম্যামকে একটু আভাস দিয়েছি। উনি বলেছেন এটাকে স্পেশাল কেস হিসাবে কন্সিডার করার চেষ্টা করবেন।

পুরো ব্যাপারটাই এখন দেখি, দেখছি, চেষ্টা করছি এর ওপর দাঁড়িয়ে। 

-হুম।

ওয়েটার খাবার রেখে গেছে দুজনের মাঝে। 

দেবারতির প্লেটে ডিমসাম তুলে দিতে দিতে কাবেরী বললো 

- হু হু করছিস কেন? তোর যা কোয়ালিফিকেশন তাতে যেখানে অ্যাপলাই করবি পেয়ে যাবি। অতো চাপ নিস না তো।

- চাকরি ছাড়া আমার একেবারেই চলবে না রে কাবেরীদি। 

- সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি তো তোর পাশে। 

-জানি। সেটুকুই তো ভরসা আমার। মলিন হাসলো দেবারতি।


#তিন


বাড়িতে আজ রীতিমত গোল টেবিল বৈঠক বসে গেছে দেবারতিকে ঘিরে। বাবা, মা, দাদা, বৌদি সবাই হাজির। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। ধূমায়িত কফির মগ সবার হাতে হাতে। তবে কেউই বোধহয় আজ ওই কফির তাপ স্বাদ টের পাচ্ছে না। চৈতালী মেয়ের মুখোমুখি সোফায় বসেছে

-এখনও ভেবে দ্যাখ মণি, যা করছিস ভেবে চিন্তে করছিস তো? বেয়াই কিন্তু বারবার অনুরোধ করছেন এমন ডিসিশন না নিতে।

বেয়ান যে বেয়ান অতো রুক্ষ মানুষ, তিনিও তো নরম হয়ে পড়েছেন। তোর সাথে এখন মন কষাকষি তো দূরের কথা বরং আলাপ আলোচনা করে মিটিয়ে নিতে চাইছেন ব্যাপারটা।

মায়ের কথায় হেসে ফেললো দেবারতি। 

-সেটা ওরা করছেন নিজেদের স্বার্থে মা। সমাজের কথা ভেবে। তোমার বা আমার কথা ভেবে নয়। এই ঘটনাটাই যদি আমি ঘটাতাম, ওনারা কিন্তু আমাকে বাড়িছাড়া করার আগে দুবার ভাবতেন না।

-ঠিক আছে। ওরা নাহয় ভুল, তুই ঠিক। কিন্তু ওরা ক্ষমা তো চাইছে, বলছে আর এরকম হবে না। তারপরেও এত শক্ত হয়ে আছিস কেন?

- বাহ, ওরা ক্ষমা চাইলেই হয়ে গেলো? ক্ষমা করবো কি করবো না সেটা তো আমার ব্যাপার।

- তাহলে কি করতে চাইছিস তুই? কারুর সম্মানের কথা ভাববি না? মেয়ের একগুঁয়েমি দেখে এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো চৈতালীর।

- আর কতবার একই কথা বলবো মা? ক্লান্ত গলায় বলে দেবারতি।

- ও তাহলে তুই ডিভোর্স করে ড্যাংডেঙিয়ে ঘুরে বেড়াবি আর আমরা লজ্জায় মাটিতে মিশে থাকবো। এই পাড়া দিয়ে ঢুকবি, বেরোবি আর আমরা ঘরে লুকিয়ে থাকবো। অসুস্থ বাবার কথাও একবার ভাববি না? এরপরেও বিশ্বাস করতে বলিস যে তুই আমাদের ভালোবাসিস।

- আহ মা, মণিকে এসব কি বলছো? ওর মনের অবস্থাটা তো একবার বোঝো।

 অসহায় আর্তির মতো লাগে দেবাঞ্জনের কণ্ঠস্বর।

- মা কে বলতে দে দাদা। 

চৈতালী গোঁজ হয়ে বসে সোফার এক কোণে। দেবারতি উঠে এসে মায়ের পাশে বসলো। পরম মমতায় হাত রেখেছে মায়ের শিরা বেরিয়ে থাকা হাতের ওপর। মেয়ের স্পর্শে গলার কাছে জমে থাকা যন্ত্রণা অশ্রু হয়ে নামছে চৈতালীর দু গাল বেয়ে। মেয়ের এই দুর্দিনে সে কোথায় ছায়া দিয়ে আগলাবে মেয়েকে তা নয়, আরও আঘাত দিচ্ছে সে মেয়েটাকে। কিন্তু সে ই বা কি করবে। সে নিজে তো অসুস্থ ছিলোই তার ওপর এখন রাজেনের যা অবস্থা তাতে ছেলের ওপরই সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব এসে পড়েছে। এর মধ্যে মণি এখানে এসে উঠলে... বাইরের লোকজনের কথা নাহয় বাদই দিলো। বৌমা... বৌমা কি সহজভাবে মেনে নেবে মণিকে? আর সব হারানো মেয়ের দিকে কেউ যদি আঙ্গুল তোলে তা যে বাবা মায়ের কাছে কত যন্ত্রণার কি করে বোঝাবে চৈতালী। কোনোরকমে বলতে পারলো

-একটু বোঝ মণি। অন্তত তোর বাবার কথা ভেবে...

- আমি জানি মা, আমি এখানে এসে থাকলে তোমাদের অনেক সমস্যা হবে। আমি থাকবো না এখানে।

রাজেন এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিলো। এবার ধৈর্য হারিয়ে বলে উঠলো 

- তার মানে? এখানে থাকবে না, ও বাড়িতেও ফিরবে না তাহলে যাবে কোথায় তুমি? আমি লোকের কথার পরোয়া করি না। আমার মেয়ে এই বাড়িতেই থাকবে।

-হ্যাঁ মণি, বিয়ে গেছে তো কি হয়েছে? এই বাড়িতে তোরও সমান অধিকার। 

দাদার কথায় হাসিও পাচ্ছিলো, কান্নাও পাচ্ছিলো দেবারতির। কি বলতে চায় দাদা। তাদের স্নেহ, ভালোবাসার সম্পর্কটাকেও কি আইনি স্বীকৃতি দিতে চাইছে দাদা? অজান্তেই বুক থেকে একটা শ্বাস গড়িয়ে এলো তার।

- আমি কোনো কিছুর অধিকার নিতে আসিনি রে দাদা। যেদিন বিয়ে হয়ে এ বাড়ির বাইরে পা রেখেছি সেদিন থেকেই এই বাড়ির চৌকাঠ আমার জন্য উঁচু হয়ে গেছে। আর সময়ের সাথে সাথে সেটা আরও আরও উঁচু হয়েছে। এত উঁচু চৌকাঠ পেরোবার সাধ আর সাধ্য কোনোটাই আমার নেই। আসলে কি জানিস আমাদের মেয়েদের কোনো ঠিকানাই নেই। বাপেরবাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, বদলে যাওয়া পদবী সবের আড়ালে আমরা নিজেরাই যে কবে নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলি বুঝতেই পারি না। 

-কি করতে চাস তবে? 

গলা ধরে আসে রাজেনের।

- একবার নিজেকে খুঁজে দেখার চেষ্টা করতে চাই বাবা। শুধু দেবারতি হয়ে বাঁচার সুখটা অনুভব করতে চাই। তোমরা আমাকে বাধা দিয়ে আর দুর্বল করে দিও না।


কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে পড়লো দেবারতি। কখন যেন বৃষ্টি থেমে গিয়ে রোদ উঠে গেছে খেয়ালই হয়নি। বাইরে এক ঝলমলে দিন অপেক্ষা করছে শুধু তারই জন্য।


Rate this content
Log in

More bengali story from Saswati Roy

Similar bengali story from Classics