Exclusive FREE session on RIG VEDA for you, Register now!
Exclusive FREE session on RIG VEDA for you, Register now!

Ananya Podder

Classics Inspirational Others


4.5  

Ananya Podder

Classics Inspirational Others


গোলাপের দিন

গোলাপের দিন

5 mins 348 5 mins 348

আজ সকাল বেলা ঠাকুরের জন্য ফুল কিনতে গিয়েছি | রোজ এই কাজটা আমার শ্বশুর মশাই করেন | কিন্তু আজ উঁনার শরীরটা একটু খারাপ থাকায় আমাকেই যেতে হয়েছে | আমার শাশুড়িমা আবার বিনা ফুলে ভগবানের সেবা করতে পারেন না | অগত্যা, আমাকেই যেতে হোলো | 'অগত্যা' শব্দটা ব্যবহার করলাম, কারণ আমার ফুলে এলার্জি আছে | তাই ওই দোকানটা থেকে আমি একটু তফাৎ দূরত্বে থাকতেই সাচ্ছন্দ বোধ করি | আমার পতিদেব গতকাল ভোরে অফিসের কাজে দিল্লী উড়ে গেছেন, আজ রাত্রে ফিরবেন | ঘুম থেকে উঠে হোয়াটস্যাপের মেসেজে পতিদেবের একটা প্রেম ভরা মেসেজ পেলাম, সাথে একটা গোলাপের ছবি | ছবিটার নিচে বর মশাইয়ের মস্করা , " একরাশ গোলাপের গন্ধে তোমায় ভালোবাসা পাঠালাম | বি. দ্র. ভাগ্গিস, তোমার ফুলে এলার্জি, নাহলে অনেকখানি পকেট খোস্ত আজ আমার | "


বরের মস্করায় হা হা ইমোজি দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই আমার | কারণ, সত্যিই আমি গোলাপের কাঁটার খোঁচা খেতে পারি, কিন্তু গোলাপের স্পর্শ নিতে পারিনা |


বাজারে গিয়ে দেখলাম, ফুলের দোকান গুলি আজ গোলাপে ছেয়ে আছে !! নানা রঙের গোলাপ, তবে লাল রংটাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে আজ | হৃদয় আহত হলে যে লাল রঙটাই নিঃসৃত হয় শিরা- ধমনী থেকে, তাই বোধহয় লাল গোলাপের এতো ঔদার্য !!


দোকান থেকে ঠাকুরের জন্য ফুল আর মালা কিনে ফিরে আসছি, এমন সময় আমার ওড়নায় একটা টান খেলাম | ফিরে তাকাতেই দেখলাম, একটি বছর আট নয়ের মেয়ে, পরনে একটা ছেঁড়া জামা, হাতে বেশ কিছু গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে | কিন্তু গোলাপ গুলির সব কটাই ঈষৎ ছেঁড়া |


আমি তাকাতেই বাচ্চা মেয়েটি বলল, " আমার কাছ থেকে একটা গোলাপ নাও না গো দিদিমনি| "


পাশ থেকে দোকানদারটা উঠল তেড়ে | " তুই আবার এসেছিস!! কি জ্বালাতনই না করছে মেয়েটা সকাল থেকে!! "


আমি শান্ত স্বরে বললাম মেয়েটাকে, " আমার ফুল লাগবে না রে | আমি নেবো না, তুই অন্য কাউকে জিজ্ঞেস কর | "


"কেউ নিচ্ছে না গো দিদিমনি | আমার ফুল গুলি তো ছেঁড়া , তাই কেউ নিতে চাইছে না |... তুমি নাও না গো দুটো ফুল | "... কথাটা বলে মেয়েটি আমার ওড়না ধরে টানাটানি করতে লাগলো |


এবার আমার সামনের দোকানদারটা লাঠি নিয়ে তেড়ে উঠল মেয়েটিকে | মেয়েটি আমার ওড়না ছেড়ে কিছুটা দূরে পালিয়ে গেল | হয়তো হতাশ হোলো আমার কাছ থেকেও |


আমি দোকানদারটিকে জিজ্ঞেস করলাম, " বাচ্চাটি কে??... ওর বাবা মা নেই ?? "


দোকানদার বিরক্তির সাথে জানালো, " আরে বলবেন না দিদি | মেয়েটা একটা পাগলীর মেয়ে| আরে, ওই যে, রেল গেটের সামনে যে পাগলীটা বসে থাকে না, মেয়েটা ওই পাগলীটারই মেয়ে | আমরা যখন হাওড়া যাই, মেয়েটাও আমাদের পিছন পিছন যায় কখনো সখনো | আজও গিয়েছিলো | আমাদের কারোর কাছ থেকেই বোধহয় শুনেছে, যে, আজ গোলাপ বিক্রি ভালো হবে, তাই গোলাপ কুড়িয়ে এনেছে | এমন মূর্খ, এটাও জানে না, যে, আজ কেউ ছেঁড়া গোলাপ কিনবেই না | "


আমি সব শুনে জিজ্ঞেস করলাম, " ওর মা পাগল হোলো কি করে??..."


"সে টা তো ঠিক জানিনা | তবে হঠাৎ করেই একদিন দেখলাম, পেট ফুলিয়ে বসে আছে | কেউ সুখ মিটিয়ে গেছে বোধহয় কোনো অন্ধকার রাত্রে| "


দোকানদারের কথায় আমি কোনো উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেলাম মেয়েটার কাছে | মেয়েটি আমাকে দেখে বলল, " আমায় মেরো না গো দিদিমনি| আমি তোমাকে ফুল বেচবো না | "


আমি মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলি, " তুই এই গোলাপ গুলি পেলি কোথায়?? "


" বাজারে | শিয়ালদাহ বা হাওড়াতে চলে যাই মাঝে মাঝে| ওখানে অনেক সব্জি তরকারি, ফুল ফল ট্রাক থেকে নামাতে গিয়ে ট্রাকের পাশে রাস্তায় পড়ে, যার কোনো খোঁজ কেউ রাখে না | আমার মতো অনেক ছেলেমেয়ে ওই সব জিনিস কুড়িয়ে বিক্রি করে | আজ শুনছিলাম সবাই বলছিল যে, আজ নাকি গোলাপের দিন, আজ গোলাপ অনেক চড়া দামে বিক্রি হবে, তাই আজ গোলাপ কুড়িয়েছি | কিন্তু গোলাপ গুলির পাঁপড়ি একটু ছেঁড়া হওয়ায় কেউ কিনছে না | "... মেয়েটা কাচুমুচু ভাবে বলল|


"তুই এসব বিক্রি করে কি করিস?? "


"আমি খাই, মাকে খাওয়াই | খেতে তো পয়সা লাগে গো দিদিমনি | পয়সা ছাড়া কেউ কিচ্ছু দেয় না | "


আমি অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম | এই টুকু বয়সেই কি গভীর জীবনবোধ!!


আমি জিজ্ঞেস করলাম, "ইস্কুলে যাস?? "


মেয়েটা হো হো করে হেসে উঠে বলল, " পাগলীর মেয়েকে কখনো ইস্কুলে যেতে দেখেছো নাকি ?? "


আমার মনে হোলো, আমার গালে জোরে দুটো চড় কষালো কেউ | আমাদের সরকার নাকি সমগ্র শিক্ষা মিশন শুরু করেছেন | আদতে সমগ্র শিক্ষা হচ্ছে কি??


আমি বললাম , " তুই কিচ্ছু জানিসনা | তুই ইস্কুলে গেলে রোজ দুপুরে খাবার পাবি, স্কুলের ড্রেস পাবি | ভর্তি হবি স্কুলে?? "


"কে করাবে ভর্তি আমায়?? "


"আমি করাবো ভর্তি তোকে| আমি একটা ইস্কুলের দিদিমনি | তোকে আমি আমার স্কুলে ভর্তি করাব | "


" কিন্তু আজ খাবো কি দিদিমনি??... আমি যে একটা গোলাপও বিক্রি করতে পারিনি | "


আমি ওকে ব্যাগ থেকে একশোটা টাকা বার করে দিয়ে বললাম, " এটা রাখ, কিছু কিনে মা আর তুই খাস| কাল সকাল দশটার সময় এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি | আমি আসবো এখানে | তোকে নিয়ে গিয়ে আমার স্কুলে ভর্তি করে দেবো | "


কথা গুলি বলে চলে আসছিলাম| পিছন থেকে মেয়েটি আবার চিৎকার করতে করতে ছুটে এলো | আমি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, " কিছু বলবি?? "


" এই ফুলগুলি তোমার দিদিমনি | এই গুলি তুমি নাও | গোলাপ গুলি সবই ছেঁড়া, তবুও তুমি নাও দিদিমনি | আমাকে কেউ কোনোদিন এত ভালোবাসেনি গো দিদিমনি | আজ প্রথম তুমি আমায় ভালো বাসলে | তাই, এই গোলাপ গুলি তোমার | "


আমি ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম | আমি ভুলে গেলাম, যে, আমার ফুলের রূপ - রস - গন্ধ কিছুই সহ্য হয় না| আমি হাত বাড়িয়ে ফুলগুলি নিতে নিতে জিজ্ঞেস করলাম, " তোর নাম কি রে বাবু?? তোর নামটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি | "


" আমার নাম??... পাগলীর মেয়ে| "


আমার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল| আজ গোলাপ দিবসে পৃথিবীর সব গোলাপের কাঁটা যেন আমার বুকে এক সাথে বিঁধলো |


আমি বলে উঠলাম, " এবার থেকে কেউ তোর নাম জিজ্ঞেস করলে বলবি, " আমার নাম গোলাপ| "... আজ থেকে তোর দিন শুরু হোলো| জীবনের সকল কাঁটাকে দুমড়ে মুচড়ে তুই তোর সুগন্ধীতে ভরে উঠবি | "


বাড়ি ফিরে আসলে আমার হাতে এক থোকা গোলাপ দেখে আমার শাশুড়িমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, " তোমার হাতে গোলাপ বৌমা?? "


আমি হেসে উত্তর দিলাম, " হ্যাঁ মা, এক গোলাপের কাছ থেকে পেলাম | "


ছেঁড়া গোলাপের সেই থোকা গুলিকে আমি সযত্নে সাজিয়ে রাখলাম আমার ঘরে | আজকের দিনে যখন বেশিরভাগ ভালোবাসাটাই অভিনয়ে ভরপুর থাকে, সেখানে এই গরীবের ছেঁড়া গোলাপ গুলির মূল্য থাকবে কি করে ?? ... তার চাইতে এই গোলাপগুলি আমার ঘরেই শোভা পাক | এই গোলাপে প্রেম না থাকলেও জীবনের স্পন্দন আছে অনেক খানি |


আজ রাতে আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটা আমার কাছে ফিরে এলে তাকে এই গোলাপগুলিই উপহার দেবো| পকেট না খসিয়েও যে অনেক দুর্মূল্য গোলাপ আজও জগতে পাওয়া যায়, আজ সেও জানবে |



Rate this content
Log in

More bengali story from Ananya Podder

Similar bengali story from Classics