গল্প- "দাবার দুই ঘুঁটি " লেখিকা- দেবযানী চৌধুরী
গল্প- "দাবার দুই ঘুঁটি " লেখিকা- দেবযানী চৌধুরী
দাবার দুই ঘুঁটি
-দেবযানী চৌধুরী
টাইগ্রিস নদীর জল এখন আর তৃষ্ণা মেটায় না। জলের ওপর তেলের কালচে স্তরগুলো সাপের খোলসের মতো ভাসছে। বাগদাদের আকাশটা তামাটে রঙের এক বিষাক্ত চাদরে ঢাকা, সূর্যাস্তের আভা নয়— মাইলখানেক দূরে জ্বলতে থাকা বাগদাদের তেলের খনি আর বারুদের ফসফরাসের ধোঁয়ার ধূসরতা। নদীর শান্ত স্রোতে ভেসে যাচ্ছে কিছু পোড়া প্লাস্টিক , নাম না জানা কতগুলো লাশের টুকরো।
নদীর ঢালে পুরনো এক সরাইখানার নিচের তলায়, যেখানে পাথরের দেওয়ালগুলো হাজার বছরের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ধরে রেখেছে, সেখানে এক বৃদ্ধ একা বসে । বৃদ্ধের নাম অধ্যাপক মনসুর। পরম মমতায় একটি ধুলোমাখা শিলালিপির ওপর শুকনো আঙুলগুলো বোলাচ্ছেন। পাথরটি চার হাজার বছরের পুরনো এক সুমেরীয় লিপি। যুদ্ধ তাঁর সব ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। শুধু তাঁর কাছে এখনো রয়ে গেছে প্রাচীন এই শিলালিপিটি।
আকাশে তখন ড্রোনের একটানা যান্ত্রিক ভনভনানি বাতাসের বুক চিরে দিচ্ছে। মানসুর নিজের মনে বিড়বিড় করেন, আর হাসেন। তিনি জানেন, এই পাথরগুলো যে সাম্রাজ্যের পতন দেখেছে, আজকের এই ইস্পাতের সাম্রাজ্যও তার কাছে নস্যি।
হঠাৎ সরাইখানার ভারী কাঠের দরজাটা সজোরে আছড়ে পড়ে। ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে ঘরে ঢুকে এক তীব্র বারুদের গন্ধ। চশমার ফাঁক দিয়ে মানসুর দেখেন, দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে এক মূর্তি—পরনে ধুলোমাখা জংলি ছাপার ইউনিফর্ম, হাতে একটি এম-১৬ রাইফেল, আর হেলমেটের নিচে এক জোড়া নীল চোখ যা আতঙ্কে আর ক্লান্তিতে কাঁপছে।
ক্যাপ্টেন ড্যানিয়েল দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ধপাস করে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার বাম পা দিয়ে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। সে কোনো বীরত্বের অভিযানে আসেনি; গত রাতে তার নিজের বাহিনীর একটি 'স্মার্ট বোমা' ভুল সংকেতে তাদেরই কনভয় উড়িয়ে দিয়েছে। বরাত জোরে সে প্রাণে বেঁচেছে। আধুনিক জিপিএস এখন তার কাছে এক মৃত প্লাস্টিকের টুকরো। ড্যানিয়েল অনুভব করে —যে প্রযুক্তি দিয়ে সে পৃথিবী জয় করতে এসেছে, সেই প্রযুক্তিই তাকে এখন চিনতে পারছে না। সে এখন তার নিজের দেশের রাডারে কেবল একটি 'অজ্ঞাত শত্রু'।
জল..." ড্যানিয়েলের কণ্ঠস্বর যেন বালুকাগজে ঘষা খাওয়া কোনো শব্দ।
মনসুর শান্ত হাতে এক মগ জল এগিয়ে দেন। ড্যানিয়েল জলটা গিলতে গিয়ে বিষম খেল। তার নজর পড়ে ঘরের এক অন্ধকার কোণায়। সেখানে ধুলোবালির মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে আছে একটি ছোট মেয়ে—নূর। সে এক টুকরো কয়লা দিয়ে মেঝের ওপর গোল গোল দাগ কাটছে । ড্যানিয়েল তাকিয়ে দেখে ওগুলোর আকৃতি যেন মিশাইলের মত।মেয়েটি ড্যানিয়েলের দিকে তাকিয়ে আবার আঁকতে লেগে যায়।
"ওর মা-বাবা কোথায়?" ড্যানিয়েল ফিসফিস করে জানতে চায়।
মনসুর নূরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। "ওর বাবা বাগদাদের এক স্কুলে পড়াতেন। ওর দুটি ভাইও ওই স্কুলে পড়তো। গত বছর এক 'সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে' সেই স্কুলটি ধুলোয় মিশে গেছে। স্কুলের অদূরে ওর বাড়িতেও সেদিন বোমা পড়েছে। ওর মা বোমার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। নূর বেঁচে গেছে। আপনাদের ড্রোন অপারেটর হয়তো সেদিন কফিতে চুমুক দিতে দিতে স্ক্রিনে একটি 'সফল লক্ষ্যভেদ' দেখেছিল। কিন্তু নূরের জন্য সেই দিনটি ছিল অনন্তকালের স্তব্ধতা। ও তখন থেকে আর কথা বলে না, ক্যাপ্টেন। ও এখন শুধু অপেক্ষা করে।"
"কিসের অপেক্ষা?" ড্যানিয়েলের গলায় অপরাধবোধের কান্নাকাটি।
"আকাশের কথা বলার অপেক্ষা," মানসুর শান্ত স্বরে বললেন।
ড্যানিয়েল কুঁকড়ে যায়। সে তার জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে একটি মানিব্যাগ বের করে । ম্যানিব্যাগের পকেটে একটি ছবি—সোনালী চুলের এক খুদে মেয়ে দোলনায় দুলছে। কেনটাকির সেই চেরি ফুলের বাগান আর নূরের এই কয়লার আঁকিবুঁকি যেন একই সমান্তরালে এসে থমকে দাঁড়ায়। ড্যানিয়েল ছবিটির দিকে তাকায়, তারপর নূরের দিকে।
ড্যানিয়েলের পকেটে থাকা হাই-টেক স্যাটেলাইট ফোনটি বারবার সিগন্যাল খুঁজছে, কিন্তু চারদিকের ধ্বংসস্তূপ সেই তরঙ্গকে আটকে বরং একটি শিকারি ড্রোনের জন্য তার অবস্থান জানান দিচ্ছে। ড্যানিয়েল তার ক্ষতবিক্ষত পা-টা কোনরকমে টেনে বসে।সে বুঝতে পারছে, এই সরাইখানাটি আসলে একটি ফাঁদ। দিগন্তরেখা থেকে উড়ে আসা 'স্টিলথ' ফাইটারগুলো এখন এই জনপদকে একটি 'ডেড জোন' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। শক্তির এই দাবার চালে ড্যানিয়েল এখন কেবল একটি বাতিল হয়ে যাওয়া ঘুঁটি।
অধ্যাপক মনসুর তাঁর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বসালেন। তিনি ড্যানিয়েলের সেই লাল হয়ে জ্বলা ডিভাইসটির দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত করুণার হাসি হাসেন।
"ক্যাপ্টেন, আপনি কি জানেন ওই আলোটা কী? ওটা হলো আপনাদের আধুনিক সভ্যতার সমাধিফলক। আপনারা আকাশ থেকে ঈশ্বর হতে চেয়েছিলেন, অথচ এক দলা মাটির স্পর্শ সইবার ক্ষমতাও আপনাদের যন্ত্রগুলোর নেই।"- শিলালিপির ওপর থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলেন, "ওটা হলো আপনাদের আধুনিক সভ্যতার সমাধিফলক। আপনারা আকাশ থেকে ঈশ্বর হতে চেয়েছিলেন, অথচ এক দলা মাটির স্পর্শ সইবার ক্ষমতাও আপনাদের যন্ত্রগুলোর নেই।"
ড্যানিয়েল কোনোমতে ফুসফুস ভরে বাতাস নেওয়ার চেষ্টা করেন। তার নাকে এখন বারুদ আর পোড়া প্লাস্টিকের উৎকট গন্ধ। সে মনসুরের কোলের সেই পাথরটির দিকে আঙুল নির্দেশ করে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, "ওতে... ওতে কী লেখা আছে? কেন ওটাকে বুকের সাথে ওভাবে আঁকড়ে ধরে আছেন?"
পাথরের খোদাই করা কিউনিফর্ম লিপির ওপর আঙুল বোলান মনসুর। তাঁর চোখে তখন হাজার বছরের পুরনো এক ধ্রুবতারা ।
"এটি একটি বিলাপ, ক্যাপ্টেন। চার হাজার বছর আগে এক কবি লিখেছিলেন— "যখন নগরী পুড়ে ছাই হয়, তখন তার রাজারা স্বর্ণমুদ্রা গোনে, আর মায়েরা গোনে তাদের সন্তানদের হাড়।দেখুন, ইতিহাস কত নিষ্ঠুরভাবে নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। আপনারা এখানে এসেছেন মুক্তির গান গেয়ে, কিন্তু আপনাদের পদচিহ্নে পড়ে আছে কেবল তেলের কালচে দাগ আর ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি।"
"আপনারা এখানে কেন?" প্রসঙ্গ পাল্টে ড্যানিয়েল জিজ্ঞেস করে। "পালিয়ে যাচ্ছেন না কেন?"
মনসুর তাঁর পাথরের ফলকটি বুকে জড়িয়ে ধরেন। "কোথায় পালাব, ক্যাপ্টেন? আপনারা মানচিত্র বদলে দিচ্ছেন, তেলের জন্য মাটির বুক চিরছেন। কিন্তু এই ধুলোর নিচে আমার আপনজনদের আত্মা। আপনারা বোমা মেরে দালান ভাঙতে পারেন, কিন্তু স্মৃতি মুছবেন কী করে?"
ঠিক সেই মুহূর্তে বাতাসের শব্দ বদলে গেল। এক সুতীব্র ধাতব শিস বাতাস চিরে সরাইখানার দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। ড্যানিয়েল তার রাইফেলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নূরের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে তার সমস্ত শরীর দিয়ে ভাষাহীন এই শিশুটিকে বুকে আঁকড়ে ধরে। সে অনুভব করে তার বুকের নিচে একটি ছোট হৃদপিণ্ড দ্রুতলয়ে স্পন্দিত হচ্ছে—ঠিক যেমনটা তার নিজের মেয়ের হতো। ড্যানিয়েল বোঝে, এই যে মরণঘাতী মিসাইলটি ধেয়ে আসছে, সেটির জিপিএস কোঅর্ডিনেট থেকে শুরু করে অর্থায়ন—সবকিছুর পেছনে তার নিজেরও এক বিন্দু দায় ছিল। সে আজ তার নিজেরই পোষা এক অদৃশ্য দানবের সামনে দাঁড়িয়ে। সে আরও জোরে নূরকে চেপে ধরল। ড্যানিয়েলের ঠোঁট নড়ছে, কোনো ভাষা নেই, কেবল এক অব্যক্ত হাহাকার। সে তার নীল চোখ দুটো বন্ধ করে নেয়। তার চোখের সামনে মেয়ের হাসিমুখ।
ড্যানিয়েল বোঝে, এই যে মরণঘাতী মিসাইলটি আসছে, সেটির পেছনে যে প্রযুক্তি, যে অর্থায়ন এবং যে রাজনীতি—তারই এক ক্ষুদ্র অংশ ছিল সে নিজে। সে আজ তার নিজের তৈরি করা দানবের সামনে দাঁড়িয়ে।
মনসুর শিলালিপিটি শেষবারের মত নিজের কপালে ঠেকালেন। ঠোঁটে এক ম্লান হাসি। তিনি জানতেন, আগ্রাসনী শক্তির কামানের গোলা পাথরের অক্ষর মুছে দিতে পারে, কিন্তু এই ধ্বংসের দায়ভার কোনো সাগর ধুয়ে পরিষ্কার করতে পারবে না।
পরমুহূর্তে একটি প্রচণ্ড আলো আর উত্তাপ সরাইখানার পাথরের দেওয়ালগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। মুহূর্তের জন্য সরাইখানার পাথরগুলো মহাকাশের নক্ষত্রের মতো জ্বলে উঠে। তারপর সব অন্ধকার। কোনো আর্তি নেই, কোনো আর্তনাদ নেই—শুধু এক নিমিষে মিশে যায় এক অপরাধী সৈনিকের অনুশোচনা, এক ভাষাহীন শিশু আর এক বৃদ্ধের হাজার বছরের শিলালিপির ইতিহাস।
ধোঁয়া যখন স্থিমিত হয়, তখন টাইগ্রিস নদীর পাড়ে আর কোনো সরাইখানা নেই—আছে কেবল তপ্ত পাথরের এক স্তূপ। পরদিন সংবাদপত্রে যুদ্ধ বিভীষিকার ছবিতে বিশ্ববাসী দেখলো - ধ্বংসস্তূপের নিচে, পুড়ে যাওয়া একটি শিশুর দেহটি নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে আছে আরেকটি পোড়া দেহ। দেহটির একটা হাত তখনো শিশুটির মাথায় রক্ষাকবচ হয়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের ছাই আর ভাঙা পাথরের নিচে পাওয়া যায় একটি মার্কিন সেনার ছেঁড়া ব্যাজ, পাশে পড়ে আছে সেই বিদীর্ণ শিলালিপিটি, যার পাঠোদ্ধার করার মতো কেউ আর সেখানে বেঁচে ছিল না।
আকাশটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে,কিন্তু সেই নীল রঙে এখন আর কোনো পবিত্রতা নেই। ধুলোর আস্তরণের নিচে চাপা পড়া সেই নিথর নিস্তব্ধতার মাঝে একটি সকরুণ সুর। কোনো যান্ত্রিক গর্জন নয়, কোনো আর্তনাদ নয়—কেবল বাতাসের এক দীর্ঘশ্বাস, যা ভাঙা পাথরের খাঁজ দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় এক বাঁশির মতো করুণ সুর তৈরি করছিল।
ছাইয়ের স্তূপের এক কোণ থেকে একটি সরু ফাটল দিয়ে বেরিয়ে এল এক টুকরো সাদা কাপড়। ওটা হয়ত নূরের পুতুলের অবশিষ্টাংশ , কিংবা ড্যানিয়েলের সাদা ব্যান্ডেজ। বাতাস সেই কাপড়টিকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলে নদীর তীরে, যেখানে তেলের কালচে স্তর জলের ওপর এক কুৎসিত আলপনা তৈরি করেছে।
পরদিন সকালে পেন্টাগনের প্রেস রিলিজে লেখা হলো: "জঙ্গি ঘাঁটিতে নিখুঁত হামলা, সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা ধ্বংস করা হয়েছে। এলাকাটি এখন জঙ্গিমুক্ত। কোনো বেসামরিক প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।" - টাইগ্রিস নদী তখনো বয়ে যাচ্ছে, তবে তার বুকে জমে থাকা ছাইয়ের মানচিত্রে কোনো সীমানা নেই।
যুদ্ধ এখন শেষ। ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আবার সভ্যতা গড়ার প্রয়াস শুরু হয়েছে। যেখানে মনসুরের সেই চার হাজার বছরের পুরনো শিলালিপিটি চূর্ণ হয়ে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল, সেই তপ্ত, বারুদমাখা পোড়া মাটির বুক চিরে ইতিমধ্যে একটি ক্ষুদ্র 'মরু-গোলাপ' মাথা চারা দিয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সেই তপ্ত হলকা আর পোড়া বারুদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস সেই চারাটিকে মারতে পারেনি। সেই মরু-গোলাপের পাপড়িতে আটকে রয়েছে এক ফোঁটা শিশির। আর রয়ে গেছে মাটির সেই আদিম নীরবতা, যাকে শাসন করার ক্ষমতা কোনো নশ্বর সাম্রাজ্যের নেই।
