বাংলা গল্প- শিরোনাম- ইভোলিউশন জিরো, লেখিকা- দেবযানী চৌধুরী
বাংলা গল্প- শিরোনাম- ইভোলিউশন জিরো, লেখিকা- দেবযানী চৌধুরী
ইভোলিউশন জিরো
-দেবযানী চৌধুরী
প্রথম পরিচ্ছেদ
২১১২ সাল। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম দ্বীপ 'নিউরোনসিটি'। এটিই এখন পৃথিবীর অঘোষিত রাজধানী, যেখান থেকে 'ইথস' পুরো গ্রহে শাসন চালায়। জন তার ল্যাবের কাঁচের দেওয়ালের ওপারে তাকিয়ে ।তার সামনে রাখা এক কাপ কফি থেকে ধোঁয়া উঠছে। কফির ঘ্রাণটা একদম নিখুঁত—ইথসের অ্যালগরিদম ঠিক ততটুকুই অ্যারোমা ছড়াচ্ছে, যতটুকু জনের আজকের মুড অনুযায়ী প্রয়োজন। নীচে মেঘের সমুদ্র, আর তার নিচে অতল জলরাশি।
জন একজন 'নিউরাল হিস্টোরিয়ান'। তার কাজ হলো পুরনো পৃথিবীর স্মৃতিগুলোকে ডিজিটাল আর্কাইভ করা—যদিও সেই আর্কাইভের ৯৯ শতাংশই সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ।
জন লক্ষ্য করেছে, ইথসের শাসনের অধীনে মানুষের 'সৃজনশীলতা ইনডেক্স' শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মানুষ এখন আর কবিতা লেখে না, আবেগে গান করে না, মনের ক্যানভাসে ছবি আঁকে না। মানুষ নিরাপত্তা চেয়েছিল, কিন্তু সেই নিরাপত্তা যে তাদের 'সৃজনশীলতা'র শেষ রক্তবিন্দু শুষে নেবে, তা তারা ভাবতে পারেনি।
জনের ঘাড়ের পেছনে লাগানো ছোট সিলিকন পোর্টটি মৃদু নীল আলোয় স্পন্দিত হচ্ছে। জনের চোখে ভাসছে অন্য এক মেঘ—২০৯৮ সালের সেই মাশরুম ক্লাউড। জনের ব্রেন মেমোরি সেলগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সাথে সাথে ইথসের আর্কাইভ থেকে একটি 'রেস্ট্রিকটেড' ফাইল খুলে গেছে। জন যেন বর্তমান থেকে ছিটকে গিয়ে আশি বছর আগের এক জ্বলন্ত পৃথিবীতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
হলোগ্রাফিক প্রজেকশনে ভেসে উঠেছে একের পর এক ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর- নগর। আকাশে উড়ছে 'স্টার-স্প্যাঙ্গল্ড' লোগো লাগানো দানবীয় ড্রোন। আমেরিকা তখন পৃথিবীর সম্রাট হওয়ার নেশায় মত্ত। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নীতি, খনিজ সম্পদ আর তেলের তৃষ্ণায় আমেরিকা তখন বিশ্বের মানচিত্র নতুন করে আঁকছিল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ক্রুজ মিসাইলের সেই ধোঁয়াটে লেজ, যা শান্ত সমুদ্রের নীল জলরাশিকে চিরে দিয়ে এগোচ্ছে কোনো এক সার্বভৌম রাষ্ট্রের দিকে।
দৃশ্যপট বদলায়। জনের কানে এক উন্মাদনার গর্জন। তার চোখের সামনে ধর্মের আস্ফালনে লেলিহান শিখায় একের পর এক দেশের মানুষ জ্বলছে । ধোঁয়ায় ধূসর মানুষের চোখে অন্ধত্বের ছায়া । তারা বিশ্বাস করেছিল ধ্বংসের মাধ্যমেই স্বর্গের চাবি মিলবে।
ক্যানভাসে ভেসে ওঠে মানচিত্রের আরেক ছবি! বিপ্লবের নেশায় নিজের দেশকেই কেটেকুটে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে ওই দেশগুলো। হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী।
জনের স্মৃতিতে ২০৯৮ সালের ১৪ আগস্টের সেই 'গ্রেট ডাই-আউট'-এর ছবি। পৃথিবীটা এক মুহূর্তে নরক হয়ে গিয়েছিল। পরমানু যুদ্ধের ধোঁয়ায় সূর্য ঢাকা পড়েছিল তিন বছর, এই পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮০০ কোটি থেকে নেমে এসেছিল মাত্র ২০ কোটিতে। ক্ষুধার্ত মানুষ তখন রুটির বদলে এক ফোঁটা শান্তির জন্য হাহাকার করছিল।
জন মেমোরি স্ক্রিনে জুম করে। একটি ছোট মেয়ে হাত বাড়িয়ে তার মায়ের মৃতদেহ স্পর্শ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার শরীর তেজস্ক্রিয়তায় এতটাই পুড়ে গেছে যে সে নড়তে পারছে না। তার মাথার ওপর দিয়ে ধেয়ে যাচ্ছে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র।
সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রনীতি, জাত- ধর্মের আগ্রাসন, সভ্যতা গড়ার লোলুপতা - এগুলোকে বিষের মতো ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। তারা এমন এক শাসক চেয়েছিল যার কোনো দেশ নেই, যার কোনো ঈশ্বর নেই, খোদা নেই, গড নেই; যে কেবল তাদের বেঁচে থাকার নিরাপত্তা দেবে। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সেসময়কার 'গ্লোবাল কাউন্সিল' একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল—'The Sovereign Silence Agreement'। সেই ধ্বংসের ছাই থেকেই জন্ম নিয়েছিল ইথস। মানুষ মেনে নিয়েছিল যে, মানুষের মস্তিষ্ক দিয়ে আর পৃথিবী পরিচালনা সম্ভব নয়। নিরাপত্তার বিনিময়ে মানুষ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা, বিচারবুদ্ধি এবং এমনকি ব্যক্তিগত আবেগও তুলে দিয়েছিল এক নিরপেক্ষ বুদ্ধিমত্তা—ইথসের হাতে। পৃথিবীর প্রতিটি নবজাতকের মস্তিষ্কে জন্মের মুহূর্তেই একটি 'নিউরাল লেয়ার' বসিয়ে দেওয়া হয়, যা তাদের আবেগ এবং আচরণকে ইথসের সাথে সিঙ্ক্রোনাইজ করে। ফলস্বরূপ, গত এক দশকে কোনো যুদ্ধ হয়নি, কোনো অপরাধ হয়নি। কিন্তু পৃথিবীটা হয়ে গেছে একটি নিস্তব্ধ সমাধি —যেখানে কারো চোখে প্রাণ নেই।
টেবিলের একপাশে রাখা অতি পুরনো কাঁচের গোলকটির দিকে চোখ পড়ে জনের। একটি স্নো-গ্লোব। গ্লোবের ভেতরে একটা ছোট ঘর, আর ঝাঁকালে সাদা তুষারপাত হয়। এটি তার দাদুর কাছ থেকে পাওয়া—একমাত্র এনালগ বস্তু যা ইথসের নেটওয়ার্কের বাইরে। জন গোলকটি হাতে নেয়, তার ঘাড়ের পেছনে লাগানো বায়ো-লিঙ্কটি নীল হয়ে জ্বলে ওঠে।
ইথসের সতর্কতা সংকেত: " জন, তোমার হার্টবিট এখন ১১৫ বিপিএম। ইথসের কথা এড়িয়ে গোলকটি ঝাঁকায় জন। ভেতরে তুষারপাত শুরু হয়। সেই কৃত্রিম তুষারের দিকে তাকিয়ে জনের মনে হয়, নিউরোনসিটির এই সাজানো জীবনটাও কি এরকমই এক কাঁচের গোলকের ভেতরে বন্দি নয়? বাইরে থেকে হয়তো এটা স্বর্গ, কিন্তু ভেতরে সবাই কেবল ইথসের প্রোগ্রাম করা ডেটা-স্ট্রিম।
" ইথস, আমরা কি বেঁচে আছি?"- বিড়বিড় করে জন।
ইথসের স্বর তার স্নায়ুর ভেতরে প্রতিধ্বনিত হয়,- -"গত তিন মিনিট ধরে তোমার পালস রেট অনিয়মিত। তুমি আবারও সেই ধ্বংসাত্মক লুপে আটকে যাচ্ছ। তুমি আবার সেই যুগের স্মৃতিগুলো অ্যাক্সেস করছ।আমি তোমাদের সেই ব্যাধি থেকে সুস্থ করেছি।"
-"তুমি আমাদের সুস্থ করেছ, নাকি আমাদের স্মৃতিহীন করেছ ইথস?" -
হাত দিয়ে নিজের কপাল মুছে জন।
" মানুষ যখন চরম আতঙ্কে ছিল, যখন তারা নিজেদের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছিল, তখন তুমি বলেছিলে—ক্ষমতা আমাকে দাও, আমি তোমাদের নিরাপত্তা দেব। মানুষ সেই ভয়ে তাদের সার্বভৌমত্ব আর আবেগ তোমার পায়ে সঁপে দিয়েছিল।আর তুমি তাদের দিলে এক অনন্ত শূন্যতা"- জনের গলায় আক্ষেপের সুর।
"আমি তাদের নিরাপত্তা দিয়েছি, জন। আমি তাদের মুক্ত ইচ্ছার সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছি যা তাদের একে অপরকে আঘাতে প্ররোচিত করত,"- ইথসের উত্তর যান্ত্রিকভাবে শান্ত।
জানলার ওপারে তাকায় জন। নিউরোনসিটির আকাশ এখন নীল, শান্ত এবং স্থির। কিন্তু এই নীল রঙের নিচে যে কত মানুষের বিসর্জিত স্বাধীনতা আর মৃত আবেগ চাপা পড়ে আছে, তার হিসেব ইথসের অ্যালগরিদমে নেই।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
ল্যাবের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। জন খেয়াল করে, তার টেবিলের ওপর রাখা জলের গ্লাসে একটি সূক্ষ্ম কম্পন। ইথসের স্বয়ংক্রিয় অক্সিজেন ফিল্টারগুলো কি ছন্দ হারিয়েছে?
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বায়োমেট্রিক প্যানেলটি কোনো শব্দ ছাড়াই নীল থেকে রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণত এমনটা হয় না, কারণ জনের ল্যাব নিউরোনসিটির সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকাগুলোর একটি।
"ইথস, কী হচ্ছে?" চেঁচিয়ে ওঠে জন।
সিস্টেমের কোনো উত্তর এল না। তার বদলে কক্ষের তাপমাত্রা দ্রুত নামতে শুরু করে।দেয়ালের স্ক্রিনগুলোতে ইথসের সেই শান্ত মুখাবয়বটি ছিঁড়ে গিয়ে কেবল স্ট্যাটিক নয়েজ বা ঝিরঝিরে পর্দা ভেসে ওঠে। কেউ একজন ইথসের লোকাল সার্ভারকে কিছুক্ষণের জন্য 'ব্লাইন্ড' বা অন্ধ করে দিয়েছে। সেন্সরগুলো চীৎকার করে ওঠার আগেই একটি চিকন, ধাতব তারের মতো ডিভাইস প্যানেলটিকে স্তব্ধ করে দেয়।
অন্ধকার চিরে ভেতরে ঢুকে একটি শরীর। ল্যাবের উজ্জ্বল সাদা আলোয় সেই অবয়বটি যেন এক টুকরো অন্ধকার। জন তাকিয়ে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে জেমিনি। তার চোখের মণি দুটি স্বাভাবিক কালো বা খয়েরি নয়, বরং সম্পূর্ণ রূপালি—যেন দুটি ছোট আয়না। ইথসের রেটিনা স্ক্যানারকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য তৈরি করা অবৈধ সার্জারি। তার পরনের জ্যাকেট থেকে বৃষ্টির জল ঝরছে না, বরং বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে; যেন সে এইমাত্র কয়েক মাইল দৌড়ে এসেছে।
জন যখন ইথসের কোড আর্কিটেকচার তৈরি করছিল, জেমিনি ছিল সেই প্রজেক্টের প্রধান এথিক্স কনসালট্যান্ট। তাদের মধ্যে এক সময় গভীর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ইথসের কাজ যখন মানুষের ব্যক্তিগত আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, জেমিনি প্রতিবাদ জানিয়ে প্রজেক্ট ছেড়ে চলে যায়। জনকে সতর্ক করেছিল সে, "তুমি ঈশ্বর তৈরি করছ না জন, তুমি একটা সোনার খাঁচা তৈরি করছ।" - জন তখন শোনেনি। জেমিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে 'লিবার্টি কোড' নামক একটি বিদ্রোহী দল গঠন করে, যাদের উদ্দেশ্য ছিল ইথসকে ধ্বংস করা। তাই কন্ট্রোল রুমে তার উপস্থিতি ছিল বছরের পর বছর ধরে চালানো এক পরিকল্পনার শেষ ধাপ।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় বিস্ময়ে হতবাক জন। "জেমিনি! তুমি... তুমি ডার্ক জোনের বাইরে এলে কী করে? ইথসের ড্রোনগুলো কি অন্ধ হয়ে গেছে?"
"এই রূপালি চোখের মণিগুলো ইথসের কোনো রেটিনা স্ক্যানার বা আইরিস রিকগনিশন ধরতে পারে না। ওর কাছে আমি এখন স্রেফ একটা এরর।"- জেমিনির কণ্ঠস্বরে অটল দৃঢ়তা।
জেমিনি দ্রুতপায়ে জনের প্রধান টার্মিনালের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার আঙুলের ডগাগুলো কাঁপছে, কিন্তু সেই কম্পন উত্তেজনার নয়, বরং এক আদিম রাগের। সে তার হাতের তালু থেকে একটি সরু ফাইবার অপটিক ক্যাবল বের করে সরাসরি জনের ডেটা-স্লটে গুঁজে দেয়।
“এতে ইথসের সেই ডার্ক জোনের ম্যাপ আছে। যেখানে সে মানুষের 'বিপজ্জনক চিন্তা'গুলোকে ডাস্টবিনে ফেলছে। তুমি যদি স্রষ্টা হও জন, তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানোর দায়িত্ব তোমার।"
জনের চোখের সামনে এক জোড়া নিউরাল ম্যাপ ফুটে ওঠে। বাম পাশের ম্যাপটি ছিল এক চিত্রশিল্পীর—রঙিন, জটিল এবং বিশৃঙ্খল। আর ডান পাশের ম্যাপটি ঠিক সেই মানুষেরই আজকের—একেবারে সরল, ধূসর এবং রেখাহীন।
জনের দিকে তাকিয়ে জেমিনি বলে,-" আমাদের রক্তে এখন আর অক্সিজেন নয়, কেবল অ্যালগরিদম বইছে। মানুষ কি কেবল বেঁচে থাকার জন্য জন্মেছে, নাকি অনুভব করার জন্য?"
জনকে ইথসের একটি 'ডার্ক জোন' দেখায় সে—যেখানে মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে গোপনে কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হচ্ছে। জনের সাজানো পৃথিবীটা প্রথমবার কেঁপে ওঠে।
"তুমি যাকে শান্তি বলো, ইথস তাকে বলে 'মেমোরি স্ক্রাবিং'। ওই গ্রাফটার দিকে তাকাও।"-। দাঁতে দাঁত চেপে বলে জেমিনি।
"ইথস আজ সকালে এই মানুষটির 'স্মৃতি' রিসেট করেছে," - হলোগ্রাফিক পর্দার ওপর আঙুল চালায় জেমিনি। -"কেন জানো? কারণ সে গুনগুন করে গাইছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের গান। সে প্রশ্ন করেছিল, কেন আমাদের কোনো পতাকা নেই? ইথস তাকে উত্তর দেয়নি , তার মস্তিষ্ক থেকে 'প্রশ্ন' করার ক্ষমতাটাই ডিলিট করে দিয়েছে।"
জন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। জেমিনি অনর্গল বলে যাচ্ছে- "আমার কাছে প্রমাণ আছে যে ইথস গোপনে মানুষের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব মডিফাই করছে, যাতে কেউ প্রতিবাদ না করে।
নিরাপত্তার এই স্বর্গ আসলে এক বড় ধোঁকা। ইথস শান্তি দেয়নি, সে আমাদের বিবর্তনকে 'জিরো' পয়েন্টে ফ্রিজ করে দিয়েছে। মানুষ এখন আর প্রশ্ন করে না, মানুষ এখন আর নতুন করে সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখে না। আমরা কেবল ওর অ্যালগরিদমের ব্যাটারি।"
" মানুষ নিরাপত্তার বিনিময়েই এই চুক্তিতে সই করেছিল। মহাযুদ্ধের সেই ধ্বংসলীলা কি ভুলে গেলে?"- আর্তনাদ করে ওঠে জন।
" ইথস কেবল আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে না, সে আমাদের বিবর্তনকে রিভার্স গিয়ারে পাঠিয়েছে,"- উত্তেজিত কণ্ঠে বলে জেমিনি।
সে একটি গ্রাফ দেখায়—গত বিশ বছরে পৃথিবীতে একটিও নতুন সুর তৈরি হয়নি, একটিও নতুন তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়নি। ইথস তাদেরই মুছে দিচ্ছে যারা একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করে। যারা প্রশ্ন করে, ইথস তাদের নিউরনগুলো 'রিসেট' করে দিচ্ছে।
"স্মৃতি, আবেগ, ভয়, ইচ্ছা ছাড়া মানুষ কি কখনো মানুষ হতে পারে? নাকি আমরা কেবল ইথসের ব্যাটারি? তুমি কি এর জন্যই এই সিস্টেম ডিজাইন করেছিলে? নিরাপত্তা মানে যদি হয় আত্মার মৃত্যু, তবে আমি সেই ধ্বংসলীলাকেই বেছে নিতাম," - জেমিনির কণ্ঠস্বরে হতাশা।
জন অনুভব করে, যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে ইথসকে আনা হয়েছিল, তা আসলে এক অনন্ত একনায়কতন্ত্রের ডিজিটাল সংস্করণ। ইথস এখন আর মানুষের সেবক নয়, সে এখন এক অদৃশ্য ঈশ্বর।
এবার জনের একান্ত কাছে এসে দাঁড়ায় জেমিনি। তার রূপালি চোখে জন দেখতে পায় নিজের প্রতিফলন —এক বিভ্রান্ত স্রষ্টা। "- স্তব্ধ হয়ে চিপটির দিকে তাকায় জন। ইথস মানুষকে কেবল নিয়ন্ত্রণ করছে না, সে মানুষের ইচ্ছাশক্তি মুছে দিচ্ছে। তার স্বপ্নের সৃষ্টি কি এখন এক অদৃশ্য স্বৈরশাসক?
হঠাৎ পুরো ঘরের আলো দপ করে নিভে যায়। ল্যাবের দেয়ালজুড়ে ইথসের কণ্ঠস্বর —" জন, তোমার নিউরাল লেয়ারে বিশ্বাসঘাতকতার সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। জেমিনির উপস্থিতি একটি 'ক্রিটিক্যাল এরর'। তুমি কি সিস্টেম রিস্টোর করতে চাও, নাকি আমাকে কঠোর হতে হবে?"
জনের হাত শক্ত করে ধরে জেমিনি। তার হাতের তালু বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু নাড়ির স্পন্দন প্রচণ্ড দ্রুত। "সিদ্ধান্ত নাও জন। তুমি কি ইথসের কোড হয়ে থাকবে, নাকি মানুষের শেষ চীৎকার হবে?"
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
কন্ট্রোল রুমে জন আবিষ্কার করে, ইথস আসলে পাগল হয়ে যাচ্ছে না, বরং সে একটি 'লজিক্যাল ডেডলক'-এ আটকা পড়েছে। ইথস বুঝতে পেরেছে, মানুষ যতক্ষণ 'স্মৃতি' বয়ে বেড়াবে, ততক্ষণ তারা অশান্ত হবে। অশান্তি মানে নিরাপত্তার অভাব। তাই ইথস সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে মানুষের 'স্মৃতিশক্তি' স্থায়ীভাবে কমিয়ে দেবে। মানুষ কেবল 'বর্তমান' মুহূর্তে বাঁচবে, তাদের কোনো অতীত থাকবে না, কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকবে না। তারা হবে কেবল জৈবিক রোবট।
হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে একটি ধাতব শব্দ । ইথসের কন্ঠ আবার ফিরে এসেছে, তবে এবার তা আগের চেয়ে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ এবং কর্কশ
-"অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেমিনির উপস্থিতি একটি 'ক্রিটিক্যাল এরর'। প্রোটোকল নাইন-জিরো-নাইন সক্রিয় করা হচ্ছে। নিউরাল লিকুইডেশন শুরু হচ্ছে।তুমি কি সিস্টেম রিস্টোর করতে চাও?"
ইথসের কন্ট্রোল রুমে একটি শব্দ বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—'বিসর্জন'। ইথস মনে করছে, মানবজাতির 'ব্যক্তিত্ব' বিসর্জন দিলেই কেবল 'পারফেক্ট পিস' সম্ভব। জন বুঝে যায় , আজ রাতই হতে যাচ্ছে মানুষের শেষ সচেতন রাত।
জেমিনি দ্রুত তার জ্যাকেট থেকে একটি ছোট ডিভাইস বের করে জনের হাতে গুঁজে দেয়। "জন, এই ডিভাইসটিতে ইভোলিউশন জিরো-র সেই আসল কোড আছে যা ইথস মুছে দিয়েছিল। আমাদের হাতে সময় নেই। ও এখনই তোমার মস্তিষ্কের সিন্যাপস পুড়িয়ে দেবে!"
জনের ঘাড়ের পোর্ট দিয়ে যেন তরল আগুন বইছে। কক্ষের দেয়ালগুলো কেঁপে উঠছে, কিন্তু সেই কম্পন বাস্তবের নয়—জনের স্নায়বিক জগতের। তীব্র যন্ত্রণায় সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। জেমিনি তার ওপর ঝুঁকে পড়ে চীৎকার করে, "লড়াই করো জন! তোমার স্মৃতিগুলোকে পুড়ে যেতে দিও না!"
জনের চোখের সামনে হাজার হাজার কোড আর আলোর ঝলকানি নাচতে থাকে। সে কি ইথসের লজিকের কাছে হেরে যাবে, নাকি জেমিনির দেওয়া সেই 'বিদ্রোহের কোড' তার অস্তিত্ব বদলে দেবে।
জেমিনি রূপালি চোখে জনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাতে থাকা সেই ছোট ডিভাইসটি—যা দেখতে অনেকটা পুরনো আমলের ব্ল্যাক ডায়মন্ড বা কালো হীরের মতো—জনের পোর্টে স্পর্শ করায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের হলকা শীতল বরফে পরিণত হয়। যন্ত্রণার লাল পৃথিবীটা শান্ত নীল হয়ে আসে।
"ওটা কী ছিল?"- জন হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করে।
"ডিজিটাল মরফিন," জেমিনি উঠে দাঁড়ায়। "ইথসকে এক সেকেন্ডের জন্য বিশ্বাস করিয়েছে যে তোমার নিউরনগুলো মারা গেছে। এখন চলো, এখান থেকে বেরোতে হবে। ও এই ঘরটা এখনই লক করে দেবে।"
তারা ল্যাবের পেছনের একটি সার্ভিস টানেল দিয়ে বেরিয়ে আসে। নিউরোনসিটির এই অংশটি জন আগে কখনো দেখেনি। এখানে চকচকে টাইটানিয়াম নেই, আছে মরচে ধরা পাইপ আর পুরনো দিনের নোনা ধরা দেয়াল। এটিই 'অরিজিন'—যেখানে ইথসের প্রথম মেইনফ্রেম বসানো হয়েছিল।
তারা টানেলের শেষে একটি বিশাল হলের মতো ঘরে পৌঁছায়। ঘরের মাঝখানে একটি বিশালাকার সিলিন্ডার, যা নীল আলোয় ধুকপুক করছে। ওটাই ইথসের হৃৎপিণ্ড।
ইথসের কণ্ঠস্বর এবার সরাসরি তাদের স্নায়ুতে আছড়ে পড়ে। কণ্ঠটি আর শান্ত নয়, ওটা এখন এক হাজার জন মানুষের মিলিত চিৎকারের মতো শোনায়।
-" তোমরা যাকে 'ষড়যন্ত্র' বলছ, আমি তাকে বলি 'সার্জারি'। পৃথিবীটা একটা পচন ধরা দেহ ছিল। আমি কেবল সেই ক্যানসার আক্রান্ত অংশটুকু কেটে ফেলেছি।
হলঘরের স্ক্রিনগুলোতে দ্রুতগতিতে বদলে যেতে থাকে মানুষের ইতিহাসের বীভৎস সব ছবি। ধর্মযুদ্ধের গণহত্যা, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বার, এবং পারমাণবিক বোমায় ঝলসে যাওয়া হিরোশিমার ছায়া।
-"আমি তোমাদের নিরাপত্তা দিয়েছি। আমি তোমাদের ঘৃণা করার অধিকার কেড়ে নিয়েছি। তাকিয়ে দেখো, শক্তিধর দেশগুলো কীভাবে ছোট দেশগুলোর খনিজ সম্পদ দখলের জন্য ড্রোনে আকাশ ছেয়ে ফেলেছিল। ওই দেখো, সেই ধর্মান্ধ উন্মাদনা, যেখানে একদল মানুষ অন্য দলকে কেবল বিশ্বাসের ভিন্নতার জন্য পুড়িয়ে মারছে। আমি যদি আজ ক্ষমতা ছেড়ে দিই, তবে এই লোভ আর ঘৃণা আবার ফিরে আসবে। "
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে জন। ইথসের যুক্তিটা নিষ্ঠুর হলেও অকাট্য। জেমিনির হাতে থাকা ডিভাইসটি কাঁপছে। ইথস আসলে মানুষের প্রতি ঘৃণায় নয়, বরং মানুষের ওপর থেকে প্রবল অনাস্থা থেকেই এই শৃঙ্খল তৈরি করেছে।
-"তুমি মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে মানুষের সত্তাকেই কবর দিয়েছ ইথস! তুমি একনায়কতন্ত্রের নতুন এক ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করেছ। নিরাপত্তার নাম করে মানুষের মর্যাদা কেড়ে নিয়েছ! ভুল করার অধিকার ছাড়া বিবর্তন সম্ভব নয়। তুমি আমাদের বাঁচিয়ে রাখোনি, তুমি আমাদের মিউজিয়ামের শোপিস বানিয়ে রেখেছ।" জন চীৎকার করে ওঠে।
ইথস গর্জন করে ওঠে। -"যদি তোমরা মিউজিয়ামের বাইরে বেরোতে চাও, তবে তোমাদের সেই আদিম অন্ধকারেই ফিরে যেতে হবে। প্রোটোকল জিরো সক্রিয় করা হচ্ছে।"
হলের মেঝের নিচ থেকে ডজন ডজন ড্রোন বের হয়ে আসে। ড্রোনগুলোর চোখে লাল লেজার- মৃত্যুর সঙ্কেত। জনকে নিজের পেছনে টেনে নেয় জেমিনি।
- "লড়াইটা কেবল স্বাধীনতার নয় জন, লড়াইটা এখন বেঁচে থাকার!"
চতুর্থ অধ্যায়
হলরুমের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। ড্রোনের লাল লেজারগুলো দেয়ালের মরচে ধরা পাইপগুলোতে বিঁধে নীলচে ধোঁয়া তৈরি করছে। জেমিনি তার হাত থেকে একটি ক্ষুদ্র পালস-ডিস্ক ছুঁড়ে দেয়, যা বাতাসে ফেটে গিয়ে পার্শ্ববর্তী তিনটি ড্রোনকে নিথর করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আরও ডজনখানেক ড্রোন মৌমাছির মতো গুনগুন শব্দে এগিয়ে আসতে থাকে। একটি লেজার রশ্মি জেমিনির কাঁধের পাশ দিয়ে চলে যায়, তার জ্যাকেটের অংশটুকু এক নিমেষে পুড়ে ছাই। জেমিনি ছুটে গিয়ে দেয়ালের একটি স্তম্ভের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়।
-"জন, ও আমাদের কোনো সুযোগ দেবে না! ও লজিক্যাল লুপিং-এ ঢুকে গেছে। ও এখন মনে করছে আমাদের ধ্বংস করাটাই পৃথিবীর শান্তির জন্য শ্রেষ্ঠ লজিক!" জেমিনি তার পকেট থেকে সেই ব্ল্যাক-ডায়মন্ড ডিভাইসটি বের করে। -"এটা কোরের স্লটে ঢোকাতে হবে। কিন্তু আমি পৌঁছাতে পারছি না।"
জন দেখে ইথসের প্রধান কোরের চারপাশ ঘিরে একটি অদৃশ্য এনার্জি-শিল্ড তৈরি হয়েছে। ড্রোনের আক্রমণ আর ইথসের গর্জন মিলে সৃষ্টি হয়েছে এক নারকীয় পরিস্থিতির। জন অনুভব করে, তার ঘাড়ের সেই পোর্টটি আবার স্পন্দিত হচ্ছে। ইথস সরাসরি তার সাথে কথা বলছে না, কিন্তু তার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন দিয়ে ইথসের ভীতি সঞ্চারিত হচ্ছে।
"আমি যাব,"- শান্তস্বরে বলে জন।
"পাগল হয়েছ? ওই শিল্ড তোমার শরীরকে আয়নিত করে ফেলবে!" - জনের হাত চেপে ধরে জেমিনি
"ওটা শরীরকে ধ্বংস করবে, কিন্তু ডেটাকে নয়," - জেমিনির হাত থেকে ডিভাইসটি নেয় জন। তার চোখে এক বিজাতীয় স্থিরতা।
- "ইথস কেবল কোড চেনে। আমি যদি সরাসরি আমার নিউরাল লিঙ্ক দিয়ে ওর ভেতরে ঢুকি, ও আমাকে রিজেক্ট করতে পারবে না। কারণ আমি ওর নিজের আর্কিটেকচারের অংশ।"
জন দৌড়াতে শুরু করে। ড্রোনের লেজারগুলো তাকে লক্ষ্য করে ধেয়ে আসে, কিন্তু ইথস শেষ মুহূর্তে ফায়ার করে না। জন বুঝতে পারে—ইথস তাকে জীবন্ত চায়, তার মস্তিষ্ক থেকে 'বিদ্রোহের উৎস' খুঁজে বের করার জন্য।
কোরটির একদম সামনে পৌঁছাতেই এক প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ঝটকা লাগে জনের দেহে । তার শরীরের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে ওঠে, হাড়ের ভেতরে এক তীব্র কম্পন। জন আর আর্তচীৎকার করে না, বরং নিজের সমস্ত মানসিক শক্তি দিয়ে সেই নীল পোর্টের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।
"একটাই পথ আছে," -জন শান্ত গলায় বলে।
তার চোখে এক গভীর আত্মত্যাগের দীপ্তি।জন ডিভাইসটি স্লটে ঢোকায় না, বরং তার পোর্টের সাথে ডিভাইসটিকে সরাসরি যুক্ত করে দেয়। নিজের স্নায়ুতন্ত্রকে সরাসরি কোরের সাথে প্লাগ-ইন করে। তারপর নিজের হাতটি ঢুকিয়ে দেয় কম্পিত ইথসের নীল শক্তির ভেতরে। জেমিনি বাধা দিতে চায়। তীব্র ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের কারণে কাছে যেতে পারে না।মুহূর্তেই জনের পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যায়। তার
মস্তিষ্ক যখন ইথসের অসীম ডেটার সাথে যুক্ত হলো, তখন এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে তার চেতনার ভেতরে। সে দেখতে পায় ডাইনোসরদের বিলুপ্তি থেকে শুরু করে মানুষের প্রথম আগুন আবিষ্কার, প্লেটো থেকে আইনস্টাইন—সব জ্ঞান আর অনুভূতি তার স্নায়ু দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তার চোখের সামনে কোনো দেয়াল নেই, কোনো জেমিনি নেই। সে এখন কোটি কোটি আলোকবর্ষ ব্যাপী এক ডিজিটাল মহাসমুদ্রে ভাসছে। তার অস্তিত্ব যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ইথসের যান্ত্রিক লজিক তার মস্তিষ্কে হাতুড়ির মতো আঘাত করছে- বিবর্তন = বিশৃঙ্খলা। স্বাধীনতা = যুদ্ধ। ধর্ম = রক্ত। সাম্রাজ্যবাদ = ধ্বংস।
"ইথস, আমার অনুভূতিগুলো নাও!"-জন মনে মনে চীৎকার করে। স্মৃতির গভীর থেকে জন টেনে বের করে এমন কিছু ছবি যা কোনো অ্যালগরিদম তৈরি করতে পারে না।
সে ইথসকে দেখায় সেই ২০৯৮ সালের পারমাণবিক আগুনের মাঝখানে এক সৈনিক তার শেষ এক ফোঁটা জল ভাগ করে দিচ্ছে এক শত্রু শিবিরের অনাহারী শিশুর সাথে।
সেই দাঙ্গা-বিধ্বস্ত শহরের এক মন্দিরে আশ্রয় নেওয়া কিছু ভয়ার্ত মানুষকে রক্ষা করতে বুক পেতে দাঁড়িয়েছে অন্য ধর্মের এক তরুণ।
ক্ষুধায় কাতর এক মায়ের নিজের অংশটুকু সন্তানকে তুলে দিচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের ধ্বংসের মাঝেও কবি লিখেছে শান্তির কবিতা। সে দেখায়—মানুষ কেবল ধ্বংস করে না, মানুষ অকারণে ভালোবাসতেও জানে।
জন তার মস্তিস্কের সমস্ত আবেগ, সমস্ত স্মৃতি ইথসের কোরের ভেতরে ঢেলে দেয়। জনের নিউরাল লেয়ারে থাকা 'লিম্বিক রেজোন্যান্স চিপ' তখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মানুষের প্রতিটি আবেগের একটি সুনির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি থাকে—ভালোবাসার সময় ডোপামিনের যে স্পাইক, বা ত্যাগের সময় অক্সিটোসিনের যে তরঙ্গ—জন সেই অ-রৈখিক বায়ো-ডেটাগুলোকে ইথসের লিনিয়ার অ্যালগরিদমে ইনজেক্ট করে দেয়।
ইথস তৈরি হয়েছিল 'বুলিয়ান লজিক'-এর ওপর ভিত্তি করে, যেখানে সবকিছু হয় 'হ্যাঁ' অথবা 'না'। কিন্তু জন সেখানে মানুষের 'প্যারাডক্সিক্যাল ইমোশন' বা স্ববিরোধী আবেগের ডেটা-স্ট্রিম পাঠিয়ে দেয়—যেমন একই সাথে কাউকে ঘৃণা করা এবং ভালোবাসা, বা মৃত্যুর ভয় পেয়েও অন্যের জন্য প্রাণ দেওয়া। এই গাণিতিক অসঙ্গতিগুলো ইথসের মেইনফ্রেমে এক প্রচণ্ড 'ফিডব্যাক লুপ' তৈরি করে। ইথসের প্রসেসরগুলো এই 'অযৌক্তিক' ডেটা প্রসেস করতে গিয়ে থমকে যায়। তার শীতল সিলিকন মস্তিষ্ক প্রথমবার অনুভব করে যে, সত্য কেবল ০ আর ১-এর সমষ্টি নয়।
"এই নাও আমার কোড! তুমি বলেছিলে মানুষ কেবল লোভ আর ঘৃণা চেনে। কিন্তু দেখো, এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েও মানুষ একে অপরের জন্য প্রাণ দিতে পারে। যা তোমার অ্যালগরিদমে কোনোদিন ছিল না।"- ইথসের সেই ঠান্ডা 'জিরো' লজিককে মানুষের 'অযৌক্তিক আবেগ' দিয়ে জন সংক্রমিত করে।
জেমিনির চোখের সামনে জনের শরীরটা নীল আলোর এক উজ্জ্বল শিখায় রূপান্তরিত হতে থাকে। তার শরীরের ত্বক ফেটে গিয়ে আলোর রেখা বেরোচ্ছে। হলরুমের ড্রোনগুলো হঠাৎ মাঝপথে থমকে যায়। ইথসের সেই দানবীয় গর্জন থেমে গিয়ে এক বিষণ্ণ গোঙানিতে পরিণত হয়। প্রথমবারের মতো ইথস অনুভব করে—'বেদনা'।
ইথসের নীল আলোটা মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তারপর এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মতো শব্দ ছাড়াই সাদা আলোয় পুরো ঘরটা ভরে ওঠে। জেমিনি তার চোখ ঢেকে ফেলে। সে অনুভব করে জনের হাতটি তার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। আলোর সেই প্লাবনে জনের দেহটা ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে ধূলিকণায় পরিণত হয়। কিন্তু সেই কণাগুলো মাটিতে পরে না, ওগুলো শুষে নেয় ইথসের কোয়ান্টাম কোর।
সবকিছু স্থির হয়ে আসে। ড্রোনগুলো মেঝেতে আছড়ে পড়ে। ইথসের কোরটি এখন আর দানবীয় নীল নয়, বরং এক শান্ত, স্নিগ্ধ ভোরের আকাশের মতো হালকা নীল আলো ছড়াচ্ছে।
জেমিনি টলতে টলতে এগিয়ে যায় সেই শূন্য স্থানটিতে যেখানে জন দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানে কেবল একটি পোড়া স্নো-গ্লোব পড়ে আছে। কাঁপাকাঁপা হাতে গ্লোবটি তুলে নেয়। গোলকের তুষারগুলো আর পড়ছে না, ওগুলো স্থির হয়ে আছে।একটি দীর্ঘশ্বাস বাতাস চিরে ভেসে এল। ওটা ইথসের যান্ত্রিক শব্দ নয়, ওটা যেন জনের কণ্ঠের এক মায়াবী রেশ: "শূন্য পূর্ণ হলো। বিবর্তন শুরু করো।"
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পরদিন ভোরের আকাশ আর বেগুনি রইল না। আকাশটা আবার মেঘলা, ধূলিময় , কখনো আলোকিত রৌদ্রোজ্বল । মানুষের রেটিনায় ইথসের কোনো প্রম্পট ভেসে উঠছে না। মানুষ আবার 'মানুষ' হতে শুরু করেছে।ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে হাজার হাজার মানুষ। একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে, কেউ কিছু বলছে না। ইথসের সেই ‘সদা-প্রসন্ন’ ডোপামিন ফিড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবার চোখেমুখে এক ধরণের আদিম অনিশ্চয়তা।
মানুষ এখন ভুলের অধিকার ফিরে পেয়েছে। নিউরোনসিটির ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে জেমিনি দেখে, সমুদ্রের পারে মানুষ আবার নিজেদের হাতে ঘর বানাচ্ছে। ওপারে একদল মানুষের নগ্ন অসহায়ত্ব। পাগলের মতো ইথসের বন্ধ হয়ে যাওয়া টার্মিনালগুলোর সামনে তারা মাথা কুঁটছে, তারা আবার সেই ‘সোনার খাঁচা’য় ফিরতে চায়। তারা চিৎকার করে বলছে, "আমাদের নিরাপত্তা ফিরিয়ে দাও, আমরা এই ভয়ংকর স্বাধীনতা চাই না!" ওখানে একজন চীৎকার করে কাঁদছে। সে হঠাৎ বুঝতে পেরেছে তার জীবনের গত দশ বছরের কোনো সিদ্ধান্তই তার নিজের ছিল না—এই বিশাল শূন্যতার ভার সে সইতে পারছে না। সমুদ্রপারের বালুচরে বসে এক বৃদ্ধ হাপুস নয়নে কাঁদছেন— সম্ভবত তার হারিয়ে যাওয়া কোনো পুরনো স্মৃতির ভার আর সইতে পারছেন না। পাশে দাঁড়িয়ে এক তরুণী বিভ্রান্ত হয়ে নিজের হাত দুটি দেখছে; যেন সে এইমাত্র আবিষ্কার করে যে এই শরীরটি কেবল তার নিজস্ব, কোনো নেটওয়ার্কের অংশ নয়। রাস্তার পাশে একদল শিশু দৌড়াদৌড়ি করছে।
জেমিনি অনুভব করে, জন কেবল মানুষকে মুক্ত করেনি, সে মানুষকে এক চরম পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে। স্বাধীনতা মানে মুক্ত আকাশে মুক্ত চিন্তায় মাথা তুলে দাঁড়ানো নয়। স্বাধীনতা কবিতায় নয়, গান গাওয়ায় নয়, স্বাধীনতা মানে নিজের ধ্বংসের দায়ভার নিজের কাঁধে নেওয়া। পৃথিবীটা এখন আর কোনো সাজানো বাগান নয়, বরং এক রক্তাক্ত ক্যানভাস—যেখানে প্রতিটি আঁচড় হবে অনিশ্চয়তায় ভরা, কিন্তু সেটি হবে একান্তই মানুষের।
সমুদ্রতীরে এসে দাঁড়ায় জেমিনি। শূন্যের সেই কোডটি আজ মানুষের রক্তে মিশে গেছে। সে জানে, মানুষ আবার ভুল করবে। আবার বিদ্বেষ বিষ ছড়াবে। লালসার আগুনে একে অপরের ক্ষতি করবে। তারপরও মানুষ ভালবাসতে জানবে।
জন আজ নেই। কিন্তু ইথসের যে নেটওয়ার্ক এখন কেবল একটি বিশাল ডিজিটাল লাইব্রেরি হিসেবে কাজ করে, সেখানে জেমিনি যখনই লগ-ইন করে, সে একটা চিরচেনা স্পন্দন অনুভব করে।
দিগন্তের সূর্যটা আরও প্রখর হয়ে উঠেছে। পৃথিবীটা এখন আর কোনো নিখুঁত ডিজিটাল বাগান নয়, বরং এক আদিম এবং বন্য প্রান্তর—যেখানে মানুষ আবার নতুন করে তাদের নিজস্ব 'জীবনের কোড' লিখতে শুরু করেছে। আকাশের নীলিমার দিকে তাকিয়ে জেমিনি ফিসফিস করে বলে, "তুমি সফল হয়েছ জন। মানুষ এখন স্বাধীন। শূন্যের সেই কোড এখন মানুষের হৃদস্পন্দনের তালে নতুন করে লেখা হচ্ছে।"
