STORYMIRROR

Debjani Choudhury

Fantasy

4.5  

Debjani Choudhury

Fantasy

অসমাপ্ত হিউম্যানয়েড। লেখিকা- দেবযানী চৌধুরী,

অসমাপ্ত হিউম্যানয়েড। লেখিকা- দেবযানী চৌধুরী,

8 mins
86

 অসমাপ্ত হিউম্যানয়েড


                      –দেবযানী চৌধুরী

গত কয়েক মাস ধরেই অভিরূপের শরীরটা বড় অসাড় লাগে।  ল্যাপটপের কিবোর্ডে আঙুলগুলো আগের মতো সহজে চলতে চায় না। টাইপ করতে গেলে মাঝেমধ্যেই মনে হয় আঙুলের হাড়ের জয়েন্টগুলো কেউ শক্ত আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গেলে অভিরূপ নিজের গলার স্বরে একটা সূক্ষ্ম ধাতব খসখসে ভাব টের পায়—যেন ভেতরে কোথাও দুটো জং ধরা পাথর ঘষছে। হয়তো  কাজের অতিরিক্ত চাপে এই ক্লান্তি।

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অভিরূপ গত তিন বছর ধরে দিনে আঠারো ঘণ্টা ল্যাপটপের সামনে বসে কোডিং করেছে। তার জগতটা কেবল শূন্য আর একের সমাহার।

তখনও ভোর হয় নি, তখনও পাখিদের প্রথম কলকাকলি শুরু হয় নি, ঘুম ভেঙে যায় অভিরূপের। সারা শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন একসাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। এক তীব্র যান্ত্রিক কম্পন তার অস্থিমজ্জা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এই কম্পন কোনো ব্যথার নয়, বরং এক হাড়হিম করা অস্তিত্বহীনতার অনুভব। বালিশ থেকে মাথা তোলার চেষ্টা করে, পারে না। ঘাড়ের কাছে যেন কোনো ভারি ধাতব বস্তু আটকে আছে। মেরুদণ্ড বরাবর একটা শীতল, কঠিন ধাতব অনুভূতি। হাত দুটো বিছানার ওপর ছড়িয়ে দেয়; কিন্তু চাদরের খসখসে স্পর্শের বদলে সে শুনতে পেল  ধাতুর ঘর্ষণের শব্দ— 'ক্লিং'। ওপাশ ফেরার চেষ্টা করতেই এক যান্ত্রিক কর্কশ শব্দ— 'ক্যাঁচক্যাঁচ'। 

চোখ দুটো জোর করে খুলে বিছানার দিকে তাকিয়ে হতবিহ্বল অভিরূপ। হাত নাড়াতে গিয়ে দেখে, হাত দুটো আর হাত নেই; সেখানে এখন সিলভার রঙের দুটি রোবোটিক বাহু, যার জয়েন্টগুলোতে নীলচে ইলেক্ট্রনিক তারের শিরা উপশিরার বিন্যাস। আঙুলগুলো এখন সূক্ষ্ম ইস্পাতের স্লাইডার। আঙ্গুলগুলোর জয়েন্ট থেকে নীলচে লুব্রিকেন্টের গন্ধ চুঁইয়ে পড়ছে। বুকটা এক নিরেট অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল। কোনো রক্ত-মাংসের চামড়া নয়, বরং ম্যাট-ফিনিশ ধূসর অ্যালুমিনিয়ামের একটি পাত।

মা'কে চিৎকার করে ডাকতে চায় অভিরূপ, কন্ঠনালী থেকে বেরিয়ে আসে কেবল একটা যান্ত্রিক ফ্রিকোয়েন্সি—যা শুনতে অনেকটা ভাঙা রেডিওর স্ট্যাটিক নয়েজের মতো। তার অপটিক্যাল লেন্সের সামনে ভেসে ওঠে ইন্টারফেস: Audio_Output_Error: Human_Voice_Module_Offline. Converting to default: Beep_Sound_V1.0. স্তব্ধ অভিরূপ উপলব্ধি করে, সে আর মানুষ নেই। সে এখন কেবল একরাশ সার্কিট আর ধাতব কাঠামোর সমষ্টি - এক জীবন্ত প্যারাডক্স। একটা অসমাপ্ত হিউম্যানয়েড রোবট , এক যন্ত্রমানব।

সকাল প্রায় নটা, মা দরজায় নক করেন, "অভি, তোর অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে না?" মা'র ডাকে সাড়া দেবার প্রাণপন চেষ্টা করে অভিরূপ । গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না, শুধু তৈরি হয় একটা অস্ফূট যান্ত্রিক শব্দ 'বিপ'  । অসাড় যান্ত্রিক দেহ নিয়ে সে বিছানায় পড়ে থাকে।

ঘরের দেয়ালে ঝোলানো অভিরূপের শখের কেনা এন্টিক দেয়াল ঘড়ি। ঘুরছে ঘড়ির কাঁটা। টিক টিক টিক---। অভিরূপের ভেতরের প্রসেসর ন্যানো-সেকেন্ডের হিসেব কষছে। তার ডিজিটাল পালস প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করছে, কিন্তু শরীরটা এক ইঞ্চি নড়ার ক্ষমতাও হারিয়েছে। তার দৃষ্টিতে  প্রতিটি বস্তুর পাশে ভেসে উঠছে বাইনারি ডেটা: ঘড়ি (Time_Object_001. Status: Active), দেয়াল (Wall_Structure_005. Material: Brick_Plaster.), বিছানা (Furniture_Item_Bed. ID: ABH_Bedroom.). ঘড়ির প্রতিটি 'টিক' শব্দ তার প্রসেসরে এক একটি মহাকাব্যের মতো দীর্ঘ হতে থাকে।

অভিরূপ প্রিয় মুহূর্তগুলোকে মনে করতে চাইছে। বর্ষার বৃষ্টিঝরা রাতে মায়ের হাতে তৈরি গরম খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজার ঘ্রাণ, আর স্বর্গীয় সেই স্বাদ। তার প্রসেসর মেমোরি থেকে ডেটা রিট্রিভ করে - Accessing Memory: Taste_Sensors_Offline.  নাহ, বোধের গভীরে কোন অনুভব নেই। আবেগের অতলে অভিরূপ ডুবে যেতে চায়। প্রেমিকা লাবণীর আবেগের সেই স্পর্শ অনুভব করতে চায় অভিরূপ। তার চোখের কোণায় লাল সংকেত ভেসে ওঠে — Error: Corrupted File. অভিরূপ বুঝতে পারছে, সে যত বেশি যন্ত্র হচ্ছে, তার মনুষ্যত্ব ততই 'ডেটা' হিসেবে রিড-অনলি ফাইল হয়ে যাচ্ছে। এই স্মৃতিগুলো এখন কেবল কিছু অকেজো বাইনারি কোড, যা তার হার্ডড্রাইভে জায়গা নষ্ট করছে।

ঘড়ির কাঁটায় দশটা। অভিরূপের সাড়া নেই। এবার মা ভেজানো দরজা খুলে ঘরে ঢোকেন। সকালের আলো অনিমেষের ধাতব বুকে প্রতিফলিত হয়ে এক তীব্র জ্যামিতিক প্রতিফলন তৈরি করে। আর্তনাদ করে মা  মেঝেতে বসে পড়েন।

চিৎকার শুনে ছুটে এলেন বাবা, ছোটবো ঈশানী। হতভম্ভ তিনি। অভি কোথায় গেল? ছেলের বিছানায় রোবটটাকে কে রেখে গেল? কাঁচের স্থির চোখ দিয়ে অভিরূপ বাবার দিকে তাকায়, সেখানে যান্ত্রিক নীল আলো জ্বলছে- নিভছে। ছেলের চোখের দিকে তাকাতেই চমকে পিছিয়ে যেতেই দেয়ালে ধাক্কা খেলেন।ছেলের চোখের মণির গভীরে সেই পরিচিত অসহায়ত্বকে দেখতে পেলেন বাবা।আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে থাকে ঈশানী । মা আর্তনাদ করতে থাকেন, " এটা কী করে হলো!"

বাবা কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকেন, "অভি? তুই কি কথা শুনতে পাচ্ছিস?" মরিয়া হয়ে অভিরূপ উত্তর দিতে চায় । পারে না। কন্ঠনালী থেকে কেবল বেরোয় এক যান্ত্রিক শব্দ— 'বিপ... বিপ' । মূর্ছা যান মা ।

হিতাহিতজ্ঞানশূন্য বাবা । কী করবেন? দেশকালের পরিস্থিতি ঠিক নয়। মানুষ জানাজানি হলে যদি বিপাকে পড়েন। পরমুহূর্তেই প্রায় দৌড়ে পাশের ঘরের টেবিল থেকে মোবাইলটি হাতে নেন। চিকিৎসক বন্ধু অভিজিৎ চ্যাটার্জিকেই এসময় একমাত্র ভরসাযোগ্য মনে হয় ।

অভিরূপের ধাতব বুকে স্টেথোস্কোপ ঠেকিয়ে হতভম্ব ডাক্তার চ্যাটার্জি। "এ তো অসম্ভব! কোনো হৃদস্পন্দন নেই, শুধু মোটরের ঘূর্ণন শোনা যাচ্ছে। এ আমার চিকিৎসার বাইরে।"

এবার কী করা! খবরটা জানাজানি হলে ঝামেলা বাড়তে পারে। বিপদেরও আশঙ্কা। প্রতিবেশীর কাছে চেপে রাখতে হবে। ডা. চ্যাটার্জি বন্ধুকে বললেন, ''যতটুকু পারবে ঘটনাটা চেপে রাখো। আমার একজন পরিচিত পুলিশ অফিসার আছেন, দেখি কথা বলে।'' 

দুপুরে এলেন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর মিত্র। ঘরে ঢুকে ঘটনার ডিটেইলস জেনে নিলেন। এটি কোনো সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্র হতে পারে," বললেন অফিসার মিত্র। রিভলবার তাক করে অভিরূপের রুমে পা রাখলেন। সারা ঘর নিরীক্ষণ করে সন্দেহজনক কিছু পেলেন না। বিছানায় শুয়ে থাকা যন্ত্রমানব অভিরূপের সামনে এসে দাঁড়ালেন।  চোখের দিকে তাকাতেই স্তম্ভিত পুলিশ অফিসার। রোবটের চোখে রক্ত-মাংসের মানুষের অসহায়তার ছাপ । দ্বিধাগ্রস্ত পুলিশ অফিসার। বলেন, "ব্যাপারটা জানাজানি করবেন না। সমস্যায় পড়বেন। জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে পারে। চিন্তা করবেন না। থানা-পুলিশের দিকটা আমি সামলে নেব।" পুলিশের ডায়েরিতে লিখলেন, "এক অজ্ঞাত কারণে মানুষের যান্ত্রিক রূপান্তর'"। অভিরূপ এখন নিজের বাড়িতেই এক অবৈধ বন্দি ।

সপ্তাহখানেক কেটে যায়। প্রাথমিক আতঙ্ক কেটে গিয়ে এখন বাড়িতে থমথমে, শ্বাসরুদ্ধকর অস্বস্তি। বাবা-মা'র চোখে এখন জল নেই। মনে শুধু এক গভীর অনিশ্চয়তা। ঘড়ির কাঁটায় সময় চলতে থাকে।

অভিরূপের জীবন এখন দেয়ালের কোণে সীমাবদ্ধ। সে খেতে পারে না, তাকে আর খেতে দেওয়াও হয় না। তার কোনো মলমূত্র নেই—সে কেবল ঘরে এক কোণে চার্জিং ক্যাবল দিয়ে কানেক্টেড হয়ে থাকে। কেবল একটা ইলেকট্রিক প্লাগ তার পিঠের সকেটে গুঁজে দেওয়া হয়। সে যখন চার্জ নেয়, তার পুরো শরীরে একটা মৃদু ঝংকার হয়। সে অনুভব করতে পারে তার ভেতরে এখনো একটা মানুষের হৃদয় স্পন্দিত হতে চায়, বারবার পিস্টনের ধাক্কায় থমকে সেটা যায়। তার প্রসেসর ঘরের সকলের হার্টবিট মনিটর করছে: Mother: 85bpm (Stress_Level_High), Father: 92bpm (Anxiety_Detected), Ishani: 78bpm (Disgust_Dominant). তার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন, যা এখন সিলিকন চিপে রূপান্তরিত, অতীতের স্মৃতিগুলো বিশ্লেষণ করে চলেছে। তার যান্ত্রিক শরীর সেসব স্মৃতির সাথে কোনো আবেগীয় সংযোগ স্থাপন করতে পারছে না। সে মাকে ছুঁতে চায়, কিন্তু ভয় পায়। পাছে তার শক্ত ধাতব হাত মায়ের নরম চামড়াকে ছিঁড়ে ফেলে। অভিরূপ কাঁদতে চায়, কিন্তু তার লুব্রিকেন্ট-ভরা চোখে অশ্রুর কোনো সকেট নেই।  বিষণ্ণতা প্রকাশ করার মতো কোনো ভাষা তার নেই।  নীরব কান্না কেবল তার ভেতরের সার্কিটগুলোর ক্ষীণ গুঞ্জনে পরিণত হতে থাকে। 

ধর্মভীরু মায়ের মন ভাবে সংসারের উপর কোনো অভিশাপ নেমে এসেছে। একবার গুরুদেবের কাছে যেতে হবে। গুরুদেব বাড়ি এলেন। দিনভর পূজাপাঠ করেন বাড়িতে। বলেন, " এ কলিযুগের অভিশাপ"।

ঘটনাটি চেপে রাখতে চাইলেও সময়ের সঙ্গে  পাড়ার প্রতিবেশীর মধ্যে অল্পবিস্তর জানাজানি হয়। ভয়ে কেউ বাড়ি আসেন না। জানালার ওপার থেকে পাশের বাড়ির কাকু উঁকি দেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "বেশিদিন ল্যাপটপে মুখ গুঁজে থাকলে এমনই হয়, শরীরটাও লোহা হয়ে যায়।"

পাড়ার মোড়ে কানাঘুঁষো চলে— "অভিরূপের কি কোনো অভিশাপ লেগেছে? নাকি অতিরিক্ত টেকনোলজি তাকে গিলে খেয়েছে?" 

খবরটি শুনে অভিরূপের ছেলেবেলার বন্ধু আকাশ দেখতে আসে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে উঁকি  দেয়।  যান্ত্রিক হাত দিয়ে অভিরূপ বন্ধুকে ডাকতে চায়,  শুধু  কর্কশ একটা  যান্ত্রিক শব্দই বের হয়। "বিবর্তনের পরবর্তী ধাপ এটি"- বলে বিজ্ঞানের ছাত্র আকাশ ।  দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সবার আড়ালে মোবাইলে ভিডিও ছবি তুলে। অভিরূপ শুধু তাকিয়ে দেখে।  

ধীরে ধীরে বাড়ির পরিবেশ অদ্ভুতভাবে বদলে যায়। মা আজকাল আর 'অভি' বলে ডাকেন না।  যখন ঘর গোছাতে আসেন, অভিরূপের বিছানার পাশে মেঝেতে পড়ে থাকা তার পুরনো বই-খাতাগুলো সযত্নে সরিয়ে রাখেন। কিন্তু ছেলের ধাতব হাত বা শরীরের আশেপাশে যে ধুলো জমে, সেগুলোকে স্পর্শ না করে পাশ কাটিয়ে চলে যান। সেদিন অভিরূপ চেয়ে চেয়ে দেখে, ঘরের আসবাব পরিস্কার করে মা তার ধাতব হাতের ওপর ধুলো ঝাড়ার ময়লা কাপড়টা ফেলে রেখেছেন। তার যান্ত্রিক প্রসেসরে  অসহ্য এক যন্ত্রণার 'ডেটা' প্রবাহিত হতে থাকে।

বাবা এখন আর ঘরে ঢুকে আগের মত অভিরূপের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন না। সেদিন আলমারি খুলে দরকারি ফাইল বের করছেন। বাবার মুখে  একরাশ ভয়, ক্ষোভ আর দুশ্চিন্তার ভাঁজ। বিড়বিড় করে বলছেন,  "এ কী বিপর্যয়!  ডাক্তাররা বলছেন,  ওটা এখন সাইবারনেটিক্স-এর বিষয়, মানুষের নয়। এভাবে কতোদিন চলবে? ও তো আর অফিস যেতে পারবে না। কীভাবে চলবে সংসার?  ব্যাঙ্ক লোনের কিস্তিটা কীভাবে দেওয়া হবে?"  

ছোট বোন ঈশানী কলেজে গেলে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়। ভয়ে বন্ধুদের বাড়িতে আসতে দেয় না। মাকে বলে, " এভাবে তো চলবে না মা। কতোদিন এসব আড়াল করে রাখা যাবে। লোহার ওই জিনিসটাকে কি পেছনের স্টোর রুমে দরজা লক করে রাখা যায় না? মাঝখানের ঘরটা জুড়ে আছে । গ্রিজের গন্ধে টেকা যায় না।"

পাশের ঘর ভেসে আসা কথা বোনের কথা, দুশ্চিন্তায় বাবার বিড়বিড় করা, মায়ের হতাশা - সব অভিরূপ শুনতে পায়, দেখতে পায়। অভিরূপের  যান্ত্রিক হৃদয় ভাঙে, কোনো শব্দ হয় না। তার প্রতিটি সেন্সর এক তীব্র শূন্যতার সংকেত দিতে থাকে। তার অপটিক্যাল সেন্সরে তখনো ভেসে উঠছে- Emotional_Response_Detected: Pain. Human_Communication_Module_Offline. Unable to process. 

সে রাতে নিস্তব্ধ ঘরে অভিরূপ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। আকাশে ভাঙা চাঁদ। চাঁদের শীতল জ্যোৎস্না তার ধাতব শরীরে পড়ে এক করুণ, নীলচে আভা তৈরি করে। সে তার সিস্টেমের একদম গভীরে প্রবেশ করে। সেখানে একটি কমান্ড পড়ে ছিল যা সে নিজেই একসময় কোড করেছিল- System.Exit(). সে তার যান্ত্রিক আঙুল দিয়ে নিজের বুকের মাঝখানে থাকা সেই স্পন্দিত লাল বাতিটি স্পর্শ করল। তার কুলিং ফ্যানগুলো শেষবারের মতো জোরে ঘুরতে শুরু করল।তার চোখের সেই কাঁচের লেন্সের পর্দায় শেষবারের মতো ভেসে ওঠে মায়ের  আবছা ছবি।  যান্ত্রিক সিস্টেম সেই ছবিটিকেও ডিলিট করতে চায়,  শেষ মুহূর্তে সেটি এক 'System Bug' হয়ে আটকে থাকে।ধীরে ধীরে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে— "Error 404: Human Soul Not Found"।

পরদিন সকালে একে একে পরিবারের সবাই  ঘরে ঢুকে দেখে, বিছানার ওপর একটা নিথর, শীতল লোহার কঙ্কাল পড়ে আছে। তার সেই কাঁচের চোখে আর কোনো আলো নেই। ঘরময় শুধু অন্ধকার আর  অফুরন্ত শূন্যতা। বাইরের পৃথিবীতে তখন রোদ উঠেছে, আর ঘড়ির কাঁটাটা যথারীতি 'টিক টিক' করে তার গন্তব্যে এগিয়ে চলেছে। ঘরের নিস্তব্ধতায় কেবল একটা দীর্ঘ যান্ত্রিক দীর্ঘশ্বাস প্রতিধ্বনিত হয়। 

একসময় ঈশানী জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে দেয়।  যাতে রোদ এসে ঘরটা পরিষ্কার করে দেয়। 






 





Rate this content
Log in

Similar bengali story from Fantasy