STORYMIRROR

Debjani Choudhury

Abstract Tragedy Classics

4.5  

Debjani Choudhury

Abstract Tragedy Classics

গল্প- উৎসবের রঙ লাল, লেখিকা-দেবযানী চৌধুরী

গল্প- উৎসবের রঙ লাল, লেখিকা-দেবযানী চৌধুরী

9 mins
13

উৎসবের  রঙ লাল

                 -দেবযানী চৌধুরী

বিশু কর্মকারের খামারে শরতের শিশিরভেজা ঘাসে যখন রোদ পড়ে, তখন সাদা বাছুর ‘ধলা’ আর কুচকুচে কালো পাঁঠা ‘কালু’র পিঠগুলো চিকচিক করে। কালুর মা চরতে চরতে ধলার ঘাড় চেটে দেয়, আর ধলা অবোধের মতো কালুর কানের পাশে গুঁতো মারে। বিশু কর্মকার বারান্দায় বসে বিড়ি টানতে টানতে দেখে—জাত আলাদা হলেও ওদের মায়ার টানটা একই সুতোয় বাঁধা।

সকাল হতেই চারটে ভাত মুখে গুঁজে টেম্পো নিয়ে তৈরি। আজ হাটবার। এরমধ্যে আগামীকাল কালীপুজো। চড়া দামে বিক্রি হবে। খামার থেকে ধলা আর কালু, সঙ্গে তাদের মা দুজনকে গাড়িতে চড়ায়। মা-গরুটা টেম্পোতে চড়তে রাজি ছিল না। বাছুরটাকে আগে বিশু গাড়িতে চড়ায়। এরপর গিয়ে গরুটা কোনমতে উঠতে রাজি হয়। গাড়ি চলা শুরু হতেই ভীত সন্ত্রস্ত বাছুর ধলা মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। ওদিকে কালুও তার মায়ের গায়ের গন্ধ আঁকড়ে কুঁকড়ে থাকে।

হাটে তখন চড়া রোদ। অবিনাশ বাবু বিশুর কাছে এগিয়ে আসেন। কালু আর তার মাকে দেখে তাঁর চোখ চকচক করে উঠে।বিশু তখন কালুর মাথায় আলতো করে হাত বুলোচ্ছিল। কালুও পরম নিশ্চিন্তে বিশুর আঙুলগুলো চাটছে—ঠিক যেমনটা সে খামারের উঠোনে করে। অবিনাশ বাবুর গলার শব্দে বিশুর হাতের তালুটা হঠাৎ স্থির হয়ে যায়। মনের ভেতরটার কোথাও যেন একটু কষ্ট হয়। খামারে  ধলা আর কালু একে অপরের গায়ের ওম নিতে কীভাবে কুঁকড়ে শুয়ে থাকত। জাত আলাদা, অথচ ওদের মায়ার টানটা দেখে বিশুর বুকটা একসময় ভরে উঠত। কিন্তু

 “বিশু প্রতিবার তোমার কাছ থেকেই নিই। এবারো জোড়া পাঁঠা নেব। মা কালীকে উৎসর্গ করবো, দেখেশুনে এনেছ তো?”

 বিশু জোর করে  মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে, -“চিন্তা করবেন না বাবু, নিয়ে যান। মায়ের নামে দিচ্ছি, পাপ-পুণ্য বলে একটা কথা আছে না! ন্যায্য দামও নেবো।”

কড়কড়ে নোটের বান্ডিল যখন পকেটে ঢুকছে, বিশু একবার কালুর দিকে তাকায়। কালু তখনো অবুঝের মতো বিশুর চাদরের খুঁটটা কামড়ে ধরে টানছে। বিশু এক টানে  চাদরটা ছাড়িয়ে নেয়। নোটের খসখসে শব্দটা তখন কালুর ‘ম্যাঁ’ ডাকের চেয়েও বেশি জোরালো মনে হয় তার কাছে। 

অবিনাশবাবু  গাড়ির ড্রাইভারকে বলেন, “গাড়িতে নিয়ে তোলো, দেখবে আঘাত যেন না পায়”।

অবিনাশবাবুর ড্রাইভার যখন কালু আর তার মাকে হিড়হিড় করে টেনে গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, বিশু তখন  আরেক ক্রেতার সঙ্গে গাভী আর বাছুরের দামাদামিতে ব্যস্ত ।  পাঁঠা দুটো বারবার  পেছন ফিরে তাকাচ্ছে আর একসুরে ম্যাঁ ম্যাঁ করে ডাকছে। ধলা তখন কালুর দিকে এক নিমেষে তাকিয়ে আছে।

বাজারে আজ ক্রেতার ভিড়। এসময় গরু তেমন বিক্রি হয় না। পাঁঠাই বিক্রি হয় বেশি। তারপরও বিশু দুটি গরু নিয়ে এসেছে, গরুতে দাম বেশি মেলে।  বখরা ঈদের সময় কোনো মুসলিম ক্রেতার কাছে গরু বেচে না বিশু। হিন্দু হয়ে জবাইয়ের জন্য মুসলিমের হাতে গরু কিভাবে তুলে দেবে? গরু হত্যার পাপের দায় নিতে চায় না বিশু। পাপের টাকায় পরিবারের মুখে ভাত তুলে দেবে না সে। এখন বখরা ঈদ বা মুসলিমদের বিয়ের মরসুম নয়, গৃহস্তরাই এই সিজনে গরু কেনে।  তাই ক্রেতার পরিচয় বা গরুর ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথা ঘামানোর দায় নেই বিশুর।

 বিশুর দিনটা আজ ভাল। বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় নি। মাঝবয়েসী এক ক্রেতার পছন্দ হয়ে যায় ধলাকে,  কচি আছে। গোস্তটা নরম হবে। কড়কড়ে  নোটগুলো  বিশুর হাতের তালুতে গুঁজে দিলেন, বিশু  পাঁচশ টাকার নোটগুলো মেলে ধরে ভাল করে পরীক্ষা করে ব্যাগে ঢুকোয়।  

ক্রেতা ধলার দড়িটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে ধরতেই বিশু মুখ ঘুরিয়ে নেয়। পাঁচশ টাকার নোটগুলো আঙুলে রোদের আলোয় পরীক্ষা করতে করতে  সে মনে মনে হিসেব কষে, খামার ঘরটা বড় করার সঙ্গে নতুন একটা ঘর তোলা যাবে কি না। ধলা যেন মা-কে , বিশুকে ছেড়ে যেতে চাইছে না। 

 গলার দড়িটা ধরে  ধলাকে যখন হিড়হিড় করে টেনে  ক্রেতাটি নিয়ে যায়, ধলা যেন বিস্ময়ে বিশুর দিকে তাকায়। মা-গরুটা গোঁ গোঁ করে এগিয়ে আসতে চায়। ধলা বুকফাটা চিৎকার দেয়,- ‘হাম্বা, হাম্বা…’।  চার পা দিয়ে মাটি কামড়ে ধরে মায়ের দিকে ফিরতে চায়। বিশু সরু একটা লাঠি দিয়ে  সপাং করে  আলতোভাবে একটা  মারে ধলার পিঠে। মা-গরুটা তখন যেন পাগলপ্রায় হয়ে খুঁটি উপড়ে ফেলতে চায়, তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা মোটা জলধারা। 

এসময়েই বিশুর সামনে এসে দাঁড়ায় আরেক ক্রেতা। বিশুর ধলার দিকে তাকিয়ে থাকার সময় নেই। ব্যস্ত হয়ে পড়ে গাভীটির ক্রেতা নিয়ে।  লোকটির পরনে সাদা শার্ট আর লুঙ্গি- মাথায় টুপি । গাভীটিকে ভাল করে পরখ করে বলে, - “দুধ দেয় নাকি গাভী?” ক্রেতাটি শুধোয়। বিশু বলে, - হ্যাঁ বাবু, রোজ এক থেকে দেড় লিটার দুধ দেয়, নিয়ে যান, লাভ হবে। আমার একটু টাকার দরকার, নইলে একে এখন আমি বিক্রি করতাম না।”

গলার দড়িটি ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় গরুটি হয়ত ভাবছে, তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার বাচ্চার কাছে।  কোনো সোরগোল না করে নতুন ক্রেতার সঙ্গে চলতে থাকলো, আর  ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক- ওদিক তাকাতে থাকল, হয়ত  বাছুরকে খুঁজছে।, ভিড়ের ধুলোয় ধলা তখন নিচিহ্ন। বিশু তখন গামছায় মুখ মুছে বাজারের ওপাশে চায়ের  দোকানে ঢুকেছে। চা এককাপ খেয়ে সে বাড়ি যাবার গাড়ি ধরবে।  

অবিনাশ বাবুর চাতালে সেদিন  ঢাকের শব্দে কান পাতা দায়। পরদিন মা কালীর পুজো। মূর্তি এসে গেছে। লাল  আলোয় মা কালীর জিভটা যেন আরও লাল দেখাচ্ছে। কালু আর তার মা নতুন পরিবেশে ভয়ে জবুথবু।  পুজো মন্ডপের একপাশে কালু আর তার মাকে বেঁধে রাখা হয়েছে, সামনে কিছু  কচি ঘাস , কিন্তু ওরা ঘাসে মুখ দিচ্ছে না।  কালু তার মায়ের পেটের নিচে মুখ গুঁজে কুঁকড়ে আছে।

সকাল থেকে পুজোর প্রস্তুতি শুরু। অবিনাশ বাবুর বাড়ি জুড়ে হুলুসূল। বাড়ির পুজো। নিয়ম মেনে সাত্ত্বিক ভাবে পুজো হয়। সন্ধ্যা হতেই পুজো শুরু। এক ফাঁকে  পুরোহিত মশাই মন্ত্র পড়ে পাঁঠা দুটোর মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেন। পড়িয়ে দেন মালা। কালু ও তার মায়ের গলায় রজনীগন্ধার মালা, কপালে সিঁদুরের রক্তিম তিলক। পাশেই রাখা বিশাল এক রামদা, যাতে সিঁদুর মাখিয়ে পুজো দেওয়া হয়েছে।রাত বারোটা বেজে গেছে। পুজো প্রায় শেষ। ভোগ নিবেদন হয়েছে। এবার উৎসর্গের পালা। 

হাড়িকাঠে প্রথম নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কালুর মাকে। কালু বুঝতে পারে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সে অবুঝের মতো ‘ম্যাঁ ম্যাঁ’ করে চিৎকার করে মায়ের পা জড়িয়ে ধরতে চায়। কিন্তু একজন তাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দেয়। গলার দড়ি টেনে কালুর মায়ের গলাটা হাড়িকাঠে চেপে ধরে একজন। আরেকজন পেছনের দুটো পা-কে। আরেকজনের হাতে দা উঁচিয়ে ধরা।-‘জয় মা!’ রামদার এক কোপে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ঘাড় থেকে মুণ্ডুটা আলগে দেওয়া হলো। আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এসে ভিজিয়ে দেয় চারপাশ। কালুর চোখের সামনে তার মায়ের দেহটা মাটিতে আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে, পা চারটে অবশ হওয়ার আগে শেষবারের মতো শূন্যে লাথি মারছে। কালুর চীৎকার তখন ঢাকের আওয়াজে স্তব্ধ। কেউ তাকিয়ে দেখে না সেই ছোট প্রাণীটার চোখে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। 

এর পরেই কালুকেও টেনে আনা হয় সেই রক্তমাখা হাড়িকাঠে। ভয়ে সিঁটিয়ে কালু। ‘ম্যাঁ’ ডাকটা শেষ হওয়ার আগেই রামদা নেমে এল কালুর গলার ওপর। কালুর নিথর দেহটা যখন হাড়িকাঠ থেকে আলগা করা হলো, তখন তার মুণ্ডহীন ঘাড় থেকে ফিনকি দিয়ে বেরোনো রক্তে সিমেন্টের চাতালটা একটা ছোটখাটো লাল পুকুরে পরিণত । সেই রক্তের ওপর সকালের পুবালি রোদ পড়ে এক অদ্ভুত তামাটে আভা তৈরি করেছে। ঢাকের বাদ্যি আর মা কালীর জয়ধ্বনিতে ঢেকে যায় কালু আর তার মায়ের আর্তচীৎকার।

পুরোহিত মশাই সেই উষ্ণ রক্তের গভীরে আঙুল ডুবিয়ে অবিনাশ বাবুর কপালে রক্ততিলক এঁকে দিলেন। রক্ততিলকং শুভম!” — পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের সাথে সাথে অবিনাশ বাবুর কপালে সেই কাঁচা রক্তের দাগটা জ্বলজ্বল করে। অবিনাশ বাবু চোখ বুজে সেই উষ্ণতা অনুভব করলেন—আধ্যাত্মিকতার এক পরম আবেশ।  কয়েক হাত দূরে পড়ে থাকা কালুর কাটা মুণ্ডুটার চোখ দুটো তখনও আধখোলা। সেই স্থির চোখের মণি দুটিতে তখনো লেগে আছে সকালের রোদে চিকচিক করা আকাশের প্রতিচ্ছবি।বাড়ির ছোট বাচ্চাগুলো তখন ভয়ার্ত চোখে সেই কাটা মুণ্ডুটার দিকে তাকিয়ে। 

একপাশে পড়ে থাকা কালুর মা আর কালুর নিথর দেহ দুটোকে তখন টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হলো চাতালের এক কোণে। সেখানে শানানো দা আর বঁটি নিয়ে অপেক্ষা করছে একদল মানুষ। ভক্তি আর মন্ত্রের জায়গা নিয়েছে এখন হিসেব আর নিপুণ কাটাকাটি।

“চামড়াটা সাবধানে ছাড়াবে, এক ফোঁটা যেন মাংস নষ্ট না হয়!” — অবিনাশ বাবুর কড়া নির্দেশ।

চামড়া ছাড়ানোর সময় একটা ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ বাতাসকে ভারী করে তুলল। যে পিঠটা কাল রাতেও ভয়ের চোটে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সেই পিঠের চামড়া এখন আলাদা হয়ে ঝুলে পড়ছে। মাংসের লালচে স্তূপগুলো যখন আলাদা করা হচ্ছিল, তখন সেখানে কোনো ‘মায়া’ বা ‘প্রাণ’ অবশিষ্ট নেই। আছে শুধু ওজনের হিসেব।

“মাথার  অংশটা বামুন ঠাকুরের জন্য রেখে দিও , আর কিছু মাংস রেখে দিও ওবাড়ির জন্য। কাঁচা প্রসাদই পাঠাতে হবে ”

লোভী চোখে মানুষগুলো মাংসের সেই লাল দলাগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ একজন বালতি ভরে জল এনে রক্তমাখা চাতালটা ধুয়ে দেয়। সেই রক্তমিশ্রিত জল নর্দমা দিয়ে বয়ে যেতে থাকে, যেখানে কালুর মায়ের গলার  ফুলের মালাটা আধডুবো অবস্থায় ভাসছে।

ওদিকে  পাশের গ্রামের আফজল লস্করের বাড়ির পুকুরপাড়ে একটা নিম গাছের সঙ্গে  বাঁধা ধলা।  আফজলের বাড়িতে আজ ছোটখাটো একটা উৎসবই বলা যায়। মেয়ের বিয়ে ঠিক হবে আজ। ছেলের বাড়ির মানুষজন আসবে। ভুরিভোজ করাতে হবে অতিথিদের। ধলা সারারাত একাকী  আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। চেনা খামার নেই। পাশে মা নেই।

সকাল নয়টা। বাড়ির মালিক পাঁচ-ছয়জন জোয়ান মরদ নিয়ে এগিয়ে আসেন। ধলার চোখে তখন জল শুকিয়ে দাগ পড়ে গেছে। তারা এসে ধলার  চারটে পা শক্ত দড়ি দিয়ে কষে বাঁধে । ধলা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে  ‘হাম্বা’ করে ডেকে উঠে—হয়তো মা-কে শেষ ডাক দেয়। বাছুরটি প্রথমে ভেবেছিল এটা হয়তো খামারের সেই চেনা খেলা। কিন্তু যখন তার চারটে পা দড়ি দিয়ে কষে এক করা হয়, তখন তার পশমের ভেতর দিয়ে এক হিমশীতল আতঙ্কের ঢেউ বয়ে যায়। সে মুখ তুলে একবার ডাকার চেষ্টা করে, কিন্তু একজন তার মুখটা সজোরে মাটির দিকে চেপে ধরল। তার নাকের ফুটোয় ঢুকে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ আর পচা পাতার ঘ্রাণ।

ধলার চোখের সামনে  চওড়া ছুরিটা রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠে। ধলা তাকিয়ে দেখে, মানুষগুলোর চোখে কোনো রাগ নেই, আছে শুধু এক যান্ত্রিক ক্ষিপ্রতা।

ছুরির প্রথম পোঁচটা যখন তার গলার চামড়া চিরে ভেতরে ঢুকে, ধলার সারা শরীর এক তীব্র বৈদ্যুতিক ঝটকার মতো কেঁপে উঠে। তার গলার নলি আর প্রধান রক্তবাহী ধমনীগুলো একে একে ছিঁড়ে যেতে থাকে। সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে পা দুটো ঝাড়া দিতে চায়, কিন্তু বাঁধন কাটতে পারে না।ধলা তড়পাতে তড়পাতে পুকুরপাড়ের ঘাসগুলো নিজের রক্তে রাঙিয়ে দেয়। 

গলার কাটা অংশ দিয়ে বাতাস আর রক্ত মিশে এক অদ্ভুত বুদবুদ আর ঘড়ঘড়ে শব্দ বেরোতে শুরু করে। ধলা শ্বাস নিতে চায়, কিন্তু তার ফুসফুসে বাতাসের বদলে ঢুকে যাচ্ছে নিজেরই গরম রক্ত। তার চোখের মণি দুটো উল্টে গিয়ে সাদা হয়ে যায়,  তার খোলা চোখ জোড়া স্থির হয়ে আসে। রক্ত তখন আর ফিনকি দিয়ে ছুটছে না, বরং থকথকে লাল স্রোতের মতো বয়ে গিয়ে পুকুরপাড়ের ঘাসগুলোকে কালচে করে দিচ্ছে। ধলার শরীরের প্রতিটি পেশি, প্রতিটি স্নায়ু তখন শেষবারের মতো বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সে শূন্যে পা ছুঁড়ে, মাথাটা এপাশ-ওপাশ আছড়াতে থাকে। কিন্তু প্রতিটি নড়াচড়ায় কাটা গলার ক্ষতটা আরও হাঁ হয়ে যাচ্ছে।

ধীরে ধীরে তার শরীরের সেই প্রচণ্ড আছাড়ি-পিছাড়ি স্তিমিত হয়ে আসে। তার বড় বড় কালো চোখ দুটো আধবোজা হয়ে স্থির হয়ে যায়। সেই চোখে কোনো অভিমান নেই, আছে এক জমাটবদ্ধ  বিস্ময় — শেষবারের মতো তার লেজটা একবার নড়ে উঠে স্থির হয়ে যায়। সকালের মিষ্টি রোদে ধলার নিথর দেহটা পড়ে থাকে, আর তার কাটা গলা দিয়ে তখনও ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছে—ঠিক যেমনভাবে কোনো এক উৎসবের পাত্র পূর্ণ করার জন্য জল ঝরে।

পরদিন দুপুরের রোদে দুই বাড়িতেই উৎসবের মেজাজ। একদিকে পুজোর প্রসাদী মাংসের সুগন্ধে ম ম করছে চারপাশ।অন্যদিকে, মেহমানদের পাতে ধোঁয়া ওঠা উপাদেয় গোশতে দুটি প্রাণের  নতুন জীবনের সূচনার প্রস্তুতি । 

অবিনাশবাবুর বাড়িতে মানুষের ভোগের থালায় যখন  কষা মাংসের সুগন্ধ ছড়ায়, তখন কারোর মনে পড়ে না সেই হাড়িকাঠের ঘড়ঘড়ে শব্দটার কথা। মশলার তীব্র ঘ্রাণে চাপা পড়ে যায়  মৃত্যুর সেই বোটকা গন্ধ। শালপাতার থালায় গরম ভাত আর কষা মাংস মুখে তুলে অবিনাশ বাবু তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলেন, “মায়ের আশীর্বাদ! মাংস রান্নাটা বেশ ভাল হয়েছে।”

আফজলের লস্করের বাড়িতে রান্না প্রায় শেষ। গোশতের গন্ধে চারপাশ ম’ ম’ করছে। বাড়ি উঠোনে ছোটখাটো একটা প্যাণ্ডেল বাঁধা হয়েছে। অতিথিরা সবাই খাচ্ছে। পোলাওয়ের সঙ্গে গরুর গোশত। রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ আফজলের মেয়ের হবু শ্বশুরবাড়ির মানুষজন। 

মেয়ের হবু শ্বশুর পেটপুরে খেয়ে এখন পানবাটা নিয়ে বসে আফজলকে বলেন, -“খাওয়াটা বড় ভাল হয়েছে। বাজার থেকে কাটা মাংস কিনে আনলে মাংস সুবিধের হয় না, বাড়িতে এনে জবাই করে তাজা গোশত রান্না হয়েছে, তাই স্বাদটাও অপূর্ব হয়েছে। এবার বিয়ের দিনক্ষণটা ঠিক করা যাক”।

 বিশু কর্মকার মাছের ঝোল দিয়ে দুপুরের ভাত খেয়ে দাওয়ায় বসে বিড়ি টানছে। ধোঁয়াটা পাক খেয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। পকেটটা আজ বেশ ভারী। সে খামারের দিকে তাকায়। শূন্য খুঁটিটা দুলছে। ওই খুঁটিতেই ধলা আর কালু একে অপরের গা চেটে দিত। বিশুর চোখের সামনে দৃশ্যটা একবার ভেসে উঠেই মিলিয়ে যায়। সে একবার নিজের হাতের তালুর দিকে তাকায়—বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে আরেক আঙ্গুলের কড়ে গুণে টাকার হিসেব মেলাতে থাকে।  একটা নতুন ঘর তুলতে হবে।  বিড়িতে জোরে একটা টান দিয়ে বিশু বিড়ির আগুনটা মাটিতে ঘষে নিভিয়ে দেয় ।

  বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে, যেন দূরে কোথাও থেকে একটা অস্পষ্ট ‘হাম্বা’ ডাক ভেসে আসছে।  গামছাটা কাঁধে ফেলে ঘরের ভেতরে পা বাড়ায়। খামারের  সেই ধুলোমাখা কাঁঠাল গাছটা তখন  শূন্যতায় আকাশের দিকে তাকিয়ে। বাতাসে যেন ভাসছে এক আদিম হাহাকার। 








Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract