এ তুমি কেমন তুমি
এ তুমি কেমন তুমি
পঞ্চদশ অধ্যায়
রাত তখন দু'টো । লাহিড়ী মশাইয়ের টয়লেট পেয়েছে বলে ঘুম ভেঙে গেল । ফিরে এসে বিছানায় বসে দেখলেন পালবাবু ঘনঘন পাশ ফিরে শুচ্ছেন । উঠে এলেন বিছানা ছেড়ে । জানালা দিয়ে বললেন - মিঃ পাল ! আপনি ঘুমোননি ?
পালবাবু উঠে এসে দরজা খুলে বললেন - না স্যার ! কি জানি হয়তো নতুন জায়গা নতুন বিছানা পেয়ে ঘুম আসছে না ।
লাহিড়ী মশাই বললেন - এমন হয় । আজ আমারও বড় একটা ঘুম আসছে না । আসুন আমরা গল্প করে বিকি রাতটুকু কাটিয়ে দি ।
লাহিড়ী মশাই পালবাবুকে নিয়ে এলেন তাঁর বেডরুমে । মধ্যবয়স্ক প্রৌঢ় । দু'বছর আগে স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে । তিন সন্তানের জনক । এক ছেলে - ডাক্তারী পড়ছে বেঙ্গালুরুতে। মেয়ে দুটিই বড় - বিয়ে হয়ে গেছে ।এখন ওরা শ্বশুরবাড়িতে ।
পালবাবু বললেন - একলা এই এত বড় বাড়িতে কি করে থাকেন স্যার ? ভয় করে না ?
লাহিড়ী মশাই হাসলেন ।
- ভয় ! ভয় কাকে বলে জানি না । আমার বাবা স্বদেশী ছিলেন । দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ রাজের চোখের বালি । অনেক অত্যাচার তিনি এবং আমাদের পরিবার সহ্য করেছেন কিন্তু কোনদিন আমরা কেউ ভয় পাইনি । তখন ছোট ছিলাম। কতই বা বয়স ছিল - ছয় কি সাত ! একদিন ব্রিটিশ পুলিশ এসে বাড়ি ঘিরে ফেলল । ভেতরে ঢুকে প্রথমেই আমাকে দেখতে পেয়ে আমাকে একটা কাঁটা ঝোপে মানে ওই বাগান বাড়িটায় ছুঁড়ে দিল । তখন সেটা একটা ফাঁকা জায়গা ছিল । আমি মুখ বুঁজে কাঁটার জ্বালা সয়েছি। কান্নাকাটি তো দূর ; একটা বাবলা কাঁটার ডাল দিয়ে একটা পুলিশকে পিটিয়েছিলাম । বিছুটি পাতা ঘষে দিয়েছিলাম ওর গলায় পেটে । সেদিনই ওরা বাবাকে গুলি করে মেরেছিল।
পালবাবু তাঁর কথা শুনতে লাগলেন আর মনে সাড়স সঞ্চয় করতে লাগলেন।
পাল বাবু বললেন - আপনাকে দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে ।
লাহিড়ী মশাই বললেন - এটাই আমাদের আভিজাত্য যে আমরা একজন স্বদেশী আন্দোলনের সক্রিয় সদস্যের সন্তান । জানেন পাল বাবু, আমরা ইচ্ছে করলেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পেনশন পেতে পারি । কিন্তু বাবা বলে গিয়েছেন দেশ একদিন স্বাধীন হবেই ; তখন যেন স্বাধীনতার উচ্ছৃঙ্খলতায় ভেসে যেও না ।
পাল বাবু বললেন - ঠিক বুঝলাম না স্যার ।
লাহিড়ী মশাই বলতে লাগলেন - দেখুন আমরা স্বাধীন হয়েছি প্রায় ঊনিশটি বছর । কিন্তু স্বাধীনতার আগে যা ছিল সবই শাসকের প্রতি বিক্ষোভ । আর এখন ? রাজনীতির নামে কত অনাচার চলছে যা ভূ-ভারতে কখনো ছিল না । যারা স্বাধীনতা পেনশন তুলছেন তাঁদের সবাই কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামী নন । আমি এমন দু'একজনকে দেখেছি অপরাধ করে পুলিশের গুলি খেয়ে মরেছে ; রাজনৈতিক নেতাদের অনুগ্রহে তাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামী বিবেচিত হয়ে প্রজন্মকে পেনশনের আওতায় এনে ফেলেছেন ।
- কোন প্রতিবাদ করেননি স্যার?
- অনেকবার করেছি। উল্টে বাড়ি বসে অপমানিত হয়েছি। যাক ও নিয়ে মাথা ঘামাব না । এবার আপনি বলুন তো আপনাকে হঠাৎ চাকরি ছেদ করে দিলেন গোরা সাহেব অথচ আপনি মুখ বন্ধ করে মেনে নিলেন কেন ?
ভয়ে কুঁকড়ে যাবার মত অবস্থা হল তাঁর । এই কয় মাসে সাহেবের সাথে থেকে তিনি যতটুকু তাঁকে জেনেছেন তাতে সাহেবের মনে আপাত ভদ্রতা থাকলেও অন্তর তাঁর বিষে পূর্ণ ।
বললেন - স্যার ! আমার বলতেও ভয় করছে।
তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কিছু বললেন । ভাবান্তর হল লাহিড়ী মশাইয়ের। লোকটাকে তিনি বিনয়ী ভদ্র বলেই ভাবেন । তাঁর হৃদয়ে এত কেচ্ছা ভাবা যায় না ।
বললেন - এই তো সময় প্রতিরোধ করবার । প্রতিবাদী কন্ঠ যখন বন্ধ হয়ে যায় প্রতিরোধই তার প্রতিষেধকের কাজ করে ।
- মানে ? আপনি কি বলতে চাইছেন স্যার ?
- ওই আদিবাসী মেয়েটিকে এবং তার বাবাকে সাহেবের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে । আর তার দায়িত্ব নিতে হবে আপনাকে । আমি প্রডিউস করব । ডাইরেকশনও দেব। অভিনয়টা করতে হবে আপনাকে ।
- অর্থাৎ আপনি আমাকে সাহেবের বিরুদ্ধাচরণ করতে বলছেন ?
- এক্জাক্টলি নট দ্যাট । বাট সামহাউ ইটস দ্য সেম । আপনি কি কালীচরণ এবং তার মেয়েকে আমার বাড়িতে আনতে পারবেন ? আমি একবার বাজিয়ে দেখে নিতাম লোকটা আসলে কে ?
- আমি বলছি স্যার । সাহেব একটা আস্ত শয়তান। মুখোশ পরা ভদ্রলোক যার আসল মুখটা কেউ কখনও দেখতে পায় না।
- তার মানে ওর মধ্যে সুপারনেচারাল কিছু পাওয়ার আছে বলছেন ?
- অবশ্যই । নইলে আগেভাগে তিনিই সব ঘটনা জানতে পারেন কি ভাবে ? আমার তো ভয় করছে এই ভেবে যে এখন আপনার সাথে যে কথা বার্তা চলছে ; আই ফিয়ার ; সাহেব তা সব শুনতে পাচ্ছেন। সেই জন্যই তো মুখ বন্ধ রেখে চলে এলাম ।
লাহিড়ী মশাই কেমন যেন ডিটেক্টিভ ভাবতে শুরু করলেন নিজেকে ।
- আমাকেই ফ্রন্টে নামতে হবে দেখছি । ওকে সকাল হয়ে গেছে । আপনি কি করবেন ঠিক করে নিয়ে আমাকে জানিয়ে তারপর বাড়ি ফিরে যাবার ডিশিসন নেবেন। ঠিক আছে ?
পাল বাবু সম্মতি জানিয়ে রুমে চলে গেলেন ।
( ক্রমশ )
