চন্দ্রবিন্দু থেকে চ - ২
চন্দ্রবিন্দু থেকে চ - ২
চন্দ্রবিন্দু থেকে চ - ২
শুভময় মণ্ডল
আমি খবরটা শুনে বেশ হতাশ হলাম। ঘাটে নেমে সিঁথির মোড়ের অটো ধরবো বলে হাঁটছি, হঠাৎ রাজীবদার সঙ্গে দেখা। বললো- কোথায় যাচ্ছিস রে এ'দিক দিয়ে?
বললাম - বেলুড় থেকে ফিরছি, ব্যারাকপুর যাবো। কিন্তু তুমি এখানে?
বললো - আমরা তো এখানেই ফ্ল্যাট নিয়ে চলে এসেছি, তাও প্রায় বছর সাতেক হলো। ঐ তো আমাদের ক্লাবে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, তোকে দেখে বেরিয়ে এলাম। আয়, একটু চা খেতে খেতে গল্প করি, বহুদিন পর দেখা হলো তোর সঙ্গে। তোকে দমদম থেকে ট্রেন ধরিয়ে দিলেই হবে তো? চল একটু বসা যাক।
অগত্যা, কুঠিঘাটের গায়েই চায়ের দোকানটা থেকে দু'কাপ চা নিয়ে গঙ্গার ঘাটে বসলাম। একথা ওকথার পর সেই মেয়েটার কথাও উঠলো। ঠিকানাটা নাকি ফেক বেরিয়েছে বলতেই, রাজীবদা বললো - তোর কি মনে হচ্ছে, ইচ্ছে করেই পুলিশ কেসটা থেকে গা এড়িয়ে যাচ্ছে?
বললাম - পুলিশের অনেক কাজের চাপ। একটা বেওয়ারিশ লাশের জন্য তারা মাথা ঘামাতে কেন যাবে বলো তো? তাদের কি কাজ কিছু কম আছে?
রাজীবদা - কিন্তু আমরা ক্লাব থেকে যে কেসে ডায়রী করেছি, এত সহজে তো ক্লোজ হবে না সেটা! জানতে হচ্ছে ব্যাপারটা! তুইও চল, একবার থানাটা হয়েই তোকে স্টেশনে ড্রপ করে দেবো।
নিরুপায় হয়ে যেতেই হলো থানায়। দেখি বড়বাবু, মেজবাবু নেই। ডিউটিতে এএসআই যিনি ছিলেন, বললেন - আজই তো ঐ কেসের পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট নিয়ে বড়বাবু কথা বলছিলেন। শুনলাম, শ্বাসরোধ করেই খুন করা হয়েছে মেয়েটাকে, স্যুইসাইড নয়। তবে যে ওড়নাটা পাওয়া গিয়েছিলো সেটা নয়, ব্যাগের ফিতে জাতীয় কিছু দিয়ে, তার গলাটা পিছন থেকে পেঁচিয়ে ধরে খুনটা করেছে! ঘাড়ে ঐ ফিতের ক্রস মার্ক ডিটেক্ট করা গেছে। বডিটা ফাঁস দিয়ে ঝোলায়নি, উপুড় করে শুইয়ে, তার গলাটা ফিতের ফাঁসে চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে খুন করেছে।
এর বেশি তথ্য তার কাছে ছিলো না। আমাদেরও আর বিশেষ কিছু করারও ছিলো না। তাই চলে এলাম। রাজীবদা ওর বাইকে বসিয়ে স্টেশনে ছেড়ে গেলো আমায়। পরে শুনলাম, ঐ ক্লাবের জোরাজুরিতে, বড়বাবু নাকাশীপাড়া থানায় মেয়েটার একটা ফটো পাঠিয়েছেন, ফার্দার এনকোয়ারীর জন্য।
মেয়েটার সেই আই-কার্ডের ঠিকানায় আরও খোঁজ খবর নিলো পুলিশ, ফটোটা নিয়ে। বরানগরের এমএলএ সাহেবের ক্লাব বলে পরিচিত হওয়ায়, বড়বাবু বোধ হয় একটু বেশিই গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছিলেন এই কেসটায়! যাই হোক, পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারলো, মেয়েটা ঐ গ্রামের নয় কিন্তু ওখানকার মেলায় হয়তো গিয়েছিলো সে কারও সঙ্গে, কিন্তু কার সঙ্গে জানা যায়নি।
কল্যাণীর কৃষিবিদ্যালয়ের স্টুডেন্টদেরও কেউ হতে পারে সে। কারণ, ওখানকার একদল ছাত্রছাত্রী, কোন একটা ফসল চাষের ব্যাপারে কোনো এক্সপেরিমেন্ট বা রীসার্চের জন্য কিছুদিন ছিলো সেখানে। ওখানে গঙ্গার একটা বিরাট অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ আছে, ভরা জোয়ারে সেখানে জল ঢোকে এখনও! তাই ওদের আনাগোণা চলে সেখানে প্রায়ই। সেও হয়তো তাদেরই কেউ অথবা তাদেরই সঙ্গে গিয়ে থাকবে ওখানে!
মেয়েটির কপালে একটা রোমশ কালো ছোট জড়ুল ছিল। সে'জন্যই লোকে ছবিটা দেখে চিনতে পারছিলো তাকে। নয়তো মেলার ভিড়ে, বাইরে থেকে আসা একটা সাধারণ মেয়েকে লোকে অকারণ মনে রাখতে যাবেই বা কেন? যাই হোক, এরপর খোঁজখবর নিল পুলিশ কল্যাণীতেও। মেয়েটি সেখানকার স্টুডেন্ট ছিল না! অগত্যা, তাকে অন্তত চেনে এমন কাউকে খোঁজা হলো, কিন্তু প্রথমে সে'রকমও কাউকে পাওয়া গেলনা!
পরের সপ্তাহে ফেরার পথে রাজীবদার কাছে শুনলাম, ওখানকার স্টুডেন্ট ইউনিয়নের এখন জিএস যে মেয়েটা, তা'কেই ওদের ক্লাবের এক দাদা সেই মেয়েটার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে বলেছিল। মেয়েটার যে ফটো তারাও তুলেছিলো সেদিন, তারই একটা কপি পাঠিয়েছিলো তাকে। সেখান থেকেই জেনেছে যে, ওখানকার এক পার্টটাইম লেকচারারের গার্লফ্রেণ্ড ছিলো মেয়েটা। তিনি পার্মানেন্ট লেকচারার হিসাবে পরে শ্রীরামপুর কলেজে জয়েন করেছেন, তাই আর কল্যাণী আসেন না। তাঁর মোবাইলে যোগাযোগ করে ক্লাবের ছেলেরা, উত্তরপাড়ায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখাও করেছিলো।
স্যারের নাম অভিরূপ রায়। মেয়েটিকে তিনি ছবি দেখে শনাক্তও করেন, কিন্তু আসল খবরটা শুনে, ওদের সামনেই হাউ হাউ করে নাকি কেঁদে ফেলেন। কিছুক্ষণ পর, নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলেন- এমএসসি করে, নেট দেবে বলে কলকাতায় এসেছিলো স্বপ্না। ওর নাম স্বপ্না দাস, সেই আইকার্ডে যে নামটা ছিলো সেটা না!
-চলবে-
