Participate in the 3rd Season of STORYMIRROR SCHOOLS WRITING COMPETITION - the BIGGEST Writing Competition in India for School Students & Teachers and win a 2N/3D holiday trip from Club Mahindra
Participate in the 3rd Season of STORYMIRROR SCHOOLS WRITING COMPETITION - the BIGGEST Writing Competition in India for School Students & Teachers and win a 2N/3D holiday trip from Club Mahindra

Sangita Duary

Tragedy Classics


4  

Sangita Duary

Tragedy Classics


বুদ্বুদ

বুদ্বুদ

9 mins 159 9 mins 159


"কত হলো রে?"


"বারো টাকা"...


"খুচরো নেই," বলে, বিধুর মুখের সামনে দশ'টাকার একটা ময়লা নোট ছুঁড়ে দিয়ে হনহনিয়ে হাঁটা লাগালো প্যাসেঞ্জার।


"বাকি দু'টাকা...?" 


চেঞ্জ নেওয়ার সময় বলেনা- বাকি টাকা রেখে দাও, তখন পঞ্চাশ পয়সাও আদায় করে ছাড়ে!


এরাই আবার ভদ্দোরলোক!


অটো ঘোরায় বিধু। হ্যান্ডেলে বাঁধা রুমাল খুলে গুনে নেয় উপার্জন, সারাদিনে আটশো'চল্লিশ টাকা। মালিককে পাঁচশো দিয়ে হাতে থাকে তিনশো'চল্লিশ।



পরশু থেকে ছেলেটা ফ্যাঁচফোঁচ করছে। সর্দি বুকে বসে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা, কিছু খেলেই বমি। আজ বেরোনোর আগে বউ বলে দিয়েছিল, কাল একবেলার ছুটি নিতে, ডাক্তারের কাছে যাবে। তার মানে একবেলার তিনটে রাউন্ড মিস।


ডাক্তার ছুঁলেই আড়াইশো'টা টাকা, ওষুধও রয়েছে। বরং বউকে বলবে, খোকার বুকে বেশ করে গরম সর্ষের-তেল মালিশ করে দিতে, যেমনটা বিধুর মা বিধুকে দিত ছোটবেলায়।



মালিকের কাছে টাকা আর অটো জমা করে বিধু ঘরে ফেরে।


খোকা কাঁদছে। বিধু তক্তপোষে এসে বসে। বউকে বলে, "একটু গরম তেল মালিশ করে দাওনা..."


সারাদিন অসুস্থ ছেলে, সংসার সামলে মালতী অতিষ্ট, বিধুর উপদেশে তেতে ওঠে, "তুমি বলবে, তাপ্পর দুবো? কাল কিন্তু ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। ছেলেকে একটুও রাখতে পাচ্চিনি।"


বিধু খোকাকে কোলে নেয়, "আমি সুমলে রাকচি। ভাত বাড়ো, পেট চুঁই চুঁই কচ্চে।"



সারারাত কাঁদলো খোকা, বমিও করেছে দেদার। বিধুরা নির্ঘুম কাটিয়ে, সকাল হতেই ছেলে কোলে ছুটলো ডাক্তারের কাছে।



ডাক্তার দশটা থেকে বসেন। বিশাল লাইন। খোকার নাম কুড়ি নম্বরে।

তারমানে দুপুর গড়িয়ে যাবে, ওবেলাতেও অটো নামাতে পারবেনা। একদিনের রোজ গেল বিধুর।



ডাক্তার বুক পরীক্ষা করে বললেন, "ভর্তি করে দাও, নিউমোনিয়া। দেরী করলে ছেলে ফেরাতে পারবেনা।"


মালতী হাউহাউ কেঁদে ফেললো। আড়াইশো টাকা ডাক্তারকে দিয়ে বিধু সরকারি হাসপাতালে গেল। বেড নেই। মেঝেতে এককোণে ছেলে কোলে পড়ে রইলো মালতী।


নার্স এসে স্যালাইন দিয়ে গেল। ডাক্তার আসবেন রাত আটটায়। বিধুকেও ততক্ষণ বসে থাকতে হবে, নাহলে সব বুঝে নেবে কে?



খোকাকে এখন কিছু খাওয়ানো বারণ, বুকের দুধও নয়। মালতীর বুক টনটন করে ওঠে। খোকা যত কাঁদে, দুধ স্তন ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। মালতী ব্লাউজের উপর আঙ্গুল চেপে ধরে। আটকাতে পারেনা। শাড়ি ভিজে যায়। ঝাপসা চোখে মালতী তাকিয়ে থাকে ছেলের মুখের দিকে। মনে মনে প্রার্থনা করে, "একঘটি বুকের দুধ দে তোমায় পুজো দুব মা'মনসা, খোকাকে আমার ফিইরে দাও!"



চারদিন পর হাসপাতাল থেকে বউ ছেলে ঘরে ফিরেছে।

এই কদিন শুধু সেদ্ধ খেয়ে বিধুর মুখ তেঁতো হয়ে গেছে। মাংস এনে রাঁধতে বলবে বউকে?


মালতী শুনে খেঁকিয়ে ওঠে, "বলিহারি আক্কেল তোমার। সবে ছেলেটা যমের দোর থিকে ফিরলো, ওমনি তোমার নোলা বেড়ে গেলো? বলি বাপ না অন্যকিচু?"


সত্যিই তো! বিধুর এক্ষুনি মাংস খেতে চাওয়া উচিত হয়নি। মাংস খাওয়া তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না, খোকা আরও একটু সুস্থ হয়ে উঠুক, তারপর না হয়...



রাতে বউকে কাছে টানার চেষ্টা করে বিধু। ছেলের শরীর খারাপ করে করে কতদিন দুজনে কাছে আসেনি! এখন খোকা ভালো আছে, আর বউএর বারণ সে শুনবেনা।


আঁচলে টান দিতেই মালতী রেগে যায়, "দেকচো ছেলেটা দুধ টেনে ঘুমোচ্চে, ঘুমোও দিকি,বয়সটা তো যথেষ্ট হইচে। ছোঁকছোঁকানিটা কমাও এবার!"



************



আচমকাই পিছন থেকে একটা চার-চাকা এসে ধাক্কা মারলো। মেজাজ চড়ে গেল বিধুর, সিট থেকে নেমে তেড়ে গেল, "শালা হারামি, গাড়ি চালানোর সময় সামনে অন্ধকার দেকিস নাকি?"

ততক্ষণে চার-চাকা ধাঁ..।

হাঁফাচ্ছে বিধু।

কোত্থাও শান্তি নেই?

ঘরে কি কারোর ছেলে নেই, নাকি ছেলের অসুখ করেনি? সারাদিন খালি ছেলে, ছেলে!

বরটা মুখে রক্ত তুলে খেটে আসে, সেদিকে একটুও নজর নেই! 

ভাল্লাগে? একদিন শখ করে ভেটকিভোলা কিনেছিল, পেঁয়াজ রসুন দিয়ে কষকষে ঝাল করতে বলেছিল বউকে।


বউ পাতে মাছভাজা তুলে দিল! কী...?

...খোকা ঝাল খেতে পারেনে!

...খোকা ঝাল খায়নে বলে বিধুও খাবেনে?


জীবনে সুখ নেই!

সব রাগ গিয়ে পড়লো অটোর ওপর। ডান পা দিয়ে এক লাথি মারলো সামনের চাকায়। বুড়ো আঙুলের নখ উঠে গিয়ে রক্ত পড়ছে, বিধু হাতের আঙ্গুল দিয়ে চেপে কঁকিয়ে ওঠে, "মাগো...!"


পাশের অটোতে কাত্তিক টাকা গুনছিলো। বিধুর চেঁচানি শুনে ছুটে আসে, "ঢ্যামনা কার ওপর রাগ ঝাড়চিস?"


বিধু তখনও আঙ্গুল চেপে," বিয়ে করিসনি বেঁচে গেচিস মাইরি! হারামি মেয়েমানুষ সব!"


কাত্তিক খ্যাকখ্যাক হেসে কানের কাছে মুখ এনে বলে, "যাবি নাকি অন্য মেয়েমানুষের বিছানায়?"


বিধুর চোখ বড়বড় করে, "পাগলা নাকি তুই? ছেলে সবে বেঁচে ফিরলো, হাত পুরো খালি।"


কাত্তিক বরাভয় দেয়, ''মাক্কালির দিব্যি! পঞ্চাশ ছাড়, পেয়ে পাবি!"


বিধুর চোখ জ্বলে ওঠে, শুকনো ঠোঁটে জিভ বোলায়, "সত্যি বলচিস?"


****************



বিজলী হেব্বি নেশা লাগিয়েছে। পঞ্চাশ টাকায় পুরো একঘন্টা। সঙ্গে দু'বোতল মদ। পুরো স্বৰ্গ! অটোর লাইনে নেমে প্রথম প্রথম বিধু ভালোই মাল টানতো। তখন হাতে কাঁচা টাকা, বাধা দেওয়ার কেউ নেই, ঘরে বুড়ো মা, রাতে একবোতল টেনে ফিরলে বুঝতেই পারতোনা।


মালতী বউ হয়ে আসার পর ধীরে-ধীরে নেশাটা ছেড়ে দেয়, মালতী দিব্যি দিয়েছিল যে!

দিব্যি! যে বউ সোয়ামীকেই মানে না, তার আবার দিব্যি!


বেশ করেছে মাল খেয়েছে। আবার খাবে। সেদিন প্রথম যখন কাত্তিকের সঙ্গে বিজলীর কাছে গেল, বিধু কী লজ্জাটাই না পেয়েছিল! অন্য মেয়ের কাপড় খুলতে হবে, তার সামনে নিজেকে উদোম করতে হবে!

 বিজলী মিচকি হেসে বোতল এগিয়ে দিয়েছিল। উফ! যেন ফোর-ফরটি কারেন্ট!


আর লজ্জা করেনা। পুরুষমানুষ হয়ে একটা মেয়েছেলেকে ধামসাবে, এতে লজ্জা কী?


বউটা কেমন ভিজে ন্যাতার মত পড়ে আছে!

ইচ্ছে করছে ক্যাঁত করে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিতে।


ঘেমো জামাটা খুলে ছুঁড়ে দেয় বিধু।


মালতী খোকার কাছে শুয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়েছে।

-" কোতায় ছিলে এতক্ষণ? আবার মদ গিলেচো?"

জড়ানো গলায় বিধু বলে, "বেশ করিচি। নিজের টাকায় খেইচি। তোর বাপের কী?"

-" ঘরে একটা পয়সা নেই"

-" নেই তো আমি কী করবো, তোকে পয়সা দিয়ে কী পাই আমি?"

মালতীর কান লাল হয়ে উঠলো, "কাকে পয়সা দিয়ে অনেককিচু পাচ্চো আজকাল?"


বিধুর চোখে বিজলী ভাসে...


মালতীর চোখে জল, "তুমি শেষে ওই পাড়ায়...! তুমি না কতা দেচিলে, কোনোদিন মদ ছোঁবেনে?"


বিধু মালতীকে ঠেলে দেয়, "আগে তুই বল, তুই কী দিস আমায়? সর তো সর!"


মালতীর চোখ জ্বলে ওঠে, "রোজ দিলে তুমি আর মদ ছোঁবেনে, ওই পাড়ায় যাবেনে? তবে এই নাও..."

বুক থেকে আঁচল সরিয়ে দেয় মালতী।

ছ'বছরের পুরনো বউকে আপাদমস্তক দেখে বিধু বিদ্রুপ হাসে, "ওই বেঢপ পেট দিয়ে, ঝুলে পড়া বুক নিয়ে আমায় ভোলাতে এয়েচিস? বিজলীর সামনে গে দাঁড়া, বুঝবি, তো'তে আর ও'তে ফারাক কত!"


************



"হারামজাদী! কোন সাহসে তুই মালিকের কাচে গে অটো দিতে বারণ করে এয়েচিস? অটো কি তোর বাপের?" মালতীর চুলের মুঠি ধরে মুখটা মাটিতে ঘষে দেয় বিধু।


মালতীর নির্বিকার উত্তর, "গেচি বেশ করিচি। তুমি বেশ্যাবাড়িতে ফুত্তি করে বেড়াবে, আমি ঘরে বসে তোমার হাঁড়ি ঠেলবো?"

-" তবে দূর হয়ে যা আমার ঘর থেকে মাগী!"

-" কেন যাবো? এটা আমার সংসার, নিজের হাতে গুচিয়েচি। যেতে হলে তুমি যাও।"

মালতী বাঁকা হাসে, " টাকা না দিলে তোমার সোহাগের বিজলী লিথ্থি মারবে বুঝি?"

বিজলীর কথা শুনেই বিধুর নেশা চড়ে যায়, "তাই যাবো, থাক তুই না খেয়ে। মর এখানে, মর, মর!"

চটি গলিয়ে বিধু বেরিয়ে যায়।


*********************



দুদিন পর নেপুকে ধরে মালতী,"তোদের কারখানায় মেয়েরা কাজ করে?"

"কেন গো বৌদি?"

-"আমাকে তোদের কাজে লাগিয়ে দিবি? যা যা বলবি, ঘর মোছা, ঝাঁট দেওয়া, সব পারবো।"

-"আচ্ছা, মালিকের সঙ্গে কথা বলে তোমায় জানাবো।"


নেপু চলে যেতে মা'মনসাকে করজোড়ে প্রণাম করে মালতী, "কাজটা পাইয়ে দাও মাগো, যে মানুষটা ঘরে বউ থাকতেও টাকা দিয়ে বাজারের মেয়ের কাছে যায়, তার টাকার ভাত মালতীর গলা দিয়ে নামবে নে।


রাতেও ঘরে ফেরেনি লোকটা। নিশ্চয় ওই মেয়েমানুষের ঘরেই আছে। থাকুক ওখানেই। মরুক!"



উনুনে অ্যারারুট জ্বাল দিয়ে ঘরে আনে মালতী। আজকাল বুকের দুধও বেশি থাকে না, খোকা আধপেটা ঘুমোয়।

দুধ আসবেই বা কোথা থেকে, অর্ধেকদিন পেটই ভরেনা মালতীর!


খোকাকে খাইয়ে মালতী চালের হাঁড়িতে হাত ঢোকায়। একমুঠো চাল রয়েছে। ভাত চড়িয়ে দেবে? থাক! 

লোকটা যদি রাতে ফিরে ভাত চায়?

কলসি থেকে জল গড়িয়ে ঢক ঢক গলায় ঢালে।



**************



খোকাকে নিয়েই মালতী কাজে বেরোয়। মালতী সুতো কাটে, গেঞ্জির মাপ নিয়ে কাটে, খোকা পাশে বসে থাকে, কাগজটা, সুতোটা নিয়ে খেলে। খেলতে খেলতে কোলে ঘুমিয়ে পড়ে। মালতী দুপুরে টিফিনের সময় কৌটো খুলে খোকাকে পাতলা সুজি খাওয়ায়। নিজেও খায়, মুড়ি বাতাসা।


সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফেরে, দুমুঠো চালের ভাত বসায়। নিজে খেয়ে বাকিটা হাড়িতে তুলে রাখে, যদি লোকটা ফেরে, যদি ভাত চায়!


হাঁড়ির ভাত হাড়িতেই থাকে। পরেরদিন পান্তা খেয়ে মালতী কাজে বেরোয়।


কোথায় গেল লোকটা? কতবার মনে হয়েছে মালতীর, অটোস্ট্যান্ডে গিয়ে খোঁজ নেয়, পিছিয়ে এসেছে। কেন নেবে সে? কোলের ছেলে ফেলে চলে গেল, একা বউকে ফেলে চলে গেল, একবারও সে খোঁজ নিয়েছে? মালতী ভালো আছে, অভাব নেই, দুশ্চরিত্র বর নেই!



আজ মাইনে পেয়েছে মালতী।

খোকার জন্য একটা খাদির জামা কিনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।

ঘরে ফিরে চমকে ওঠে। দাওয়ার ওপর ও কে বসে?

রোগা, জিরজিরে,চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে, হনু দেখা যাচ্ছে, যেন দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে এসেছে সবে। মালতী এগিয়ে আসে, "তুমি..!"

করুণ চোখে বিধু তাকায়, "চলে এনুন। ওরা থাকতে দিলুনি। ট‍্যাকা নেই যে! কতদিন এদিক ওদিক ঘুরলুম, মুটে বইলুম, ভিক্ষে করলুম, যা পেতুম, সন্ধ্যেবেলা বোতলে উড়িয়ে দিতুম।"


ঘঙঘঙ কাশছে বিধু। অনেকক্ষণ ধরে।

তারপর, গায়ের নোংরা চাদরে মুখ মুছে নেয়, "মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে এখন। হাসপাতালে গেনুম, বললো, টিবি হয়েচে। হয়তো আর বাচবুনি। তাই ভাবলুম, যতদিন আছি, তোমাদের কাছেই...!"


বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো মালতীর। দৌড়ে গিয়ে বিধুর মুখে হাত রাখে ,"ও কী অলুক্ষনে কতা! বাঁচবেনে কেন? আমি আচি, খোকা আচে। তোমায় কিচ্ছুটি করতে হবেনে।

আমি রোজগার করি তো, গেঞ্জি কলে। তোমার কুনো চিন্তা নেই, তুমি শুধু বলো, আর মদ খাবেনে?"

বিধু চোখের জল মোছে, "ক্ষমা করেচ বউ, সত্যি বলচো? এই, খোকাকে ছুঁয়ে বলচি, আর মদ খাবুনি। ভালোভাবে বাঁচবো আমরা, দেকো!"



*************

ওষুধ, সঠিক খাবার এবং বউএর সেবায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে বিধু। খোকা এখন বাড়িতেই থাকে বিধুর কাছে। মালতী সক্কাল সক্কাল উঠে কাজকম্ম সেরে, রেঁধে রেখে যায়। বিধু খোকাকে দেখে রাখে, চান করায়, খাওয়ায়। ছেলেটাও খুব ন্যাওটা হয়ে উঠেছে বাবার।


মালতী সন্ধ্যের মুখে ফেরে। বিধু চা বসায়, আলুর-চপের ঠোঙা খোলে।


রাতে ভাতেভাত চড়িয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে খুনসুটি করে। বিধু দেখে, মালতীর জেল্লা আরও বেড়েছে। তিরিশ পেরিয়ে গেছে বোঝা দায়।


রাতের'বেলা বিধু আদর করে মালতীকে। মালতী আর বাধা দেয়না, খোকাকে একপাশে সরিয়ে বিধুর বুক খামচে ধরে।

বিধু এখন সুখী ,খুব সুখী।


-------------------------------------------


আজ মালতী বেরিয়ে গেলে, বিধু বাজারে বেরোয়, চপ্পল কিনতে হবে। মালতী টাকা রেখে গেছে। বেশিক্ষণ লাগবেনা। বিধু খোকাকে পাশের বাড়িতে রেখে গেছে ।



মোড়ের মাথায় কাত্তিক। বিধুকে দেখে শিস দিলো, "কিব্বে! হেব্বি চিকনাই হয়ে গেচিস। বউএর পয়সায় খাচ্চিস, ঘরে আরাম কচ্চিস!"


কাত্তিকের কথা ভালো লাগছেনা বিধুর। আলগা হেসে বলে, "চপ্পল কিনবো, যাই রে!"


কাত্তিক পথ আটকায়, "বউ কি তোকে মাইনে সিস্টেমে রেখেছে নাকি বে? ঘরে ছেলে সামলাচ্চিস, আর তোর বউ... হ্যাঁক হ্যাঁক..."!


বিধুর কান ঝাঁ ঝাঁ, "ফালতু বকিসনি কাত্তিক, তোর পাল্লায় পড়ে অনেক ভুল করিচি।"


কাত্তিক তেড়ে আসে, "আমি তোকে ভুল রাস্তায় নে গেচি? আর তোর বউ? গেঞ্জি কলে একটা মেয়েছেলের কী কাজ রে? চল তো দেখি...!"


বিধুকে টানতে টানতে গেঞ্জি কলের দিকে আনে কাত্তিক।


**************



খাতা খুলে প্যাকেজিংয়ের লিস্ট দেখছিল মালতী। নেপু এসে বলে, "মালিকের বাবা এসেছেন বৌদি, তোমাকে অফিসে ডাকছে।"


মালতীর বুক ঢিপঢিপ, কাজে কোনো ভুল হলো?


অফিসের চেয়ারে বসে আছেন মালিকের বাবা, বয়স সত্তর পেরিয়েছে। সাদা চুল, ধবধবে গায়ের রঙ, মালতীকে কাছে ডাকেন, মাথায় হাত রেখে বলেন, "খুব ভালো কাজ করছো তুমি। নেপুর কাছে তোমার ব্যাপারে সব শুনলাম, বড় মনের মানুষ তুমি। আজ থেকে গোডাউনের দায়িত্বে থাকবে। কেমন?"


মালতীর চোখে আনন্দ ধরেনা। ঢিপ করে প্রণাম করতে যায় মালিকের বাবাকে। ভদ্রলোক মালতীর কাঁধ ধরে চিবুক নেড়ে দেন। তারপর তাকে নিয়ে গোডাউনে ঢোকেন।



অফিসের বাইরে বাগান। বাগানের প্রাচীর টপকে এতক্ষণ ভিতরের কান্ডকারখানা দেখছিল কাত্তিক আর বিধু। কথা কিছুই শোনা যায়নি, শুধু দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছিল।


"এব্বের বিশ্বাস হলো তো?", বিধুর হাত টেনে ধরে কাত্তিক।


বিধু যা দেখলো তা সত্যি? বিধুকে আবার ঘরে জায়গা দেওয়া হয়েছে যাতে সে খোকার দেখাশোনা করতে পারে, আর মালতী কাজের নাম করে... ছিঃ ছিঃ ছিঃ!


সেদিন মালতীকে গালমন্দ করে বিধু যখন বিজলীর কাছে গেল, বিজলি তখন অন্য খদ্দেরের সঙ্গে। বিধুকে দেখে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, "ভাগ শালা, আগে টাকা নিয়ে আয়!"


মালতী তো বিধুর বউ, সতী লক্ষ্মী বউ। সেও...!


বুকের ভিতরটা আবার জ্বলছে, ঠান্ডা চাই, কিছু একটা ঠান্ডা চাই, ''ওই কাত্তিক, ওই, মাল খাওয়াবি? এই নে পঞ্চাশ টাকা। আরও লাগবে? কাল দেবো। সিন্দুক ভেঙে দেব, শালি বাইরে ঢলাঢলি করবে আর আমি করলেই দোষ? খাওয়ানা ভাই....!"



বুকের জ্বালাটা ঠান্ডা হয়ে পেটে নামছে। চিনচিন করছে। নাড়িগুলো সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বোধহয়। বমি পাচ্ছে বিধুর। খুক খুক!


চারিদিকটা ঘুরছে! আহ! কী আনন্দ! পায়ে ধুলো লাগছেনা, তাহলে চটির কী দরকার?


চাইনা চটি, মদ চাই মদ, মদ খেলে বিধু পিছনে ফিরে যায়। সেই যে তার বুড়ি মা রোয়াকে বসে রয়েছে!


সেই যে... মাথায় ঘোমটা দিয়ে বিধুর বউ ভাত বাড়ছে।


সেই যে... সিঁথি ভর্তি সিঁদুর পরে মালতী জয় মঙ্গলবারের ব্রতকথা শুনছে!


সেই যে বিজলী... গা এলিয়ে শুয়ে পড়ছে বিধুর ওপর।


আর ওই তো মালতী, ওই বুড়োটার সঙ্গে... ঘরের ভিতর... বিধু চিৎকার করে," হারামজাদী, এই জন্য তুই আমায় এখন সোহাগ করিস, এই জন্য?"


বমি পাচ্ছে বিধুর, ঘুমও পাচ্ছে ,গভীর ঘুম। ওই তো ওইখানে কালো মত, না... নীল মত, কী যেন? বিছানা? নাহ! ওটা তো পুকুর ছিল।


না না পুকুর কেন, পুকুর কিকরে হবে? বিধু তো এখন... কোথায় যেন...?

হ্যাঁ, বিজলী... বিজলীর বিছানায়, "দাঁড়া বিজলী, আমি আসছি। ওকি! বিজলী কই, তুই তো... তুই তো... বউ... তুই... বিজলী...!

 বিজলী আর বউ এক হয়ে গেছে...

দাঁড়া আসছি...আসছি!! খুক্ খুক্...!! "


রাস্তার ধারে বোজা পুকুরটায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বিধু। পচা পুকুরের কালো জলে তখন লাল বুদ্বুদ!!










Rate this content
Log in

More bengali story from Sangita Duary

Similar bengali story from Tragedy