Amitava Saha

Comedy


2  

Amitava Saha

Comedy


বসন্তের ছোঁয়া

বসন্তের ছোঁয়া

4 mins 399 4 mins 399

বসন্ত আমাকে ছুঁয়েছিল খুব কম বয়সেই। না না এ গুটিবসন্ত কিম্বা জলবসন্ত নয়, এ হল বসন্ত ঋতুর খোঁচা খেয়ে মনের মধ্যে জমে থাকা ভালোবাসার উথালপাথাল ঢেউ। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি আর কুসুম নতুন অ্যাডমিশন নিয়ে আমাদের স্কুলে আমার ক্লাসেই ভর্তি হল। ওর সুন্দর হাসি, লম্বা ঘন চুল আর অপূর্ব লাবণ্য দেখে প্রথম দেখাতেই মন হারালাম। প্রথম ভালোলাগার অনুভূতিতে মৃদুমন্দ বাতাস, মিষ্টি পাখির ডাক, ফুলের মনমাতানো গন্ধ, মাঠের সবুজ ঘাস সবকিছুই খুব সুন্দর হয়ে ধরা দিল আমার কাছে।


ওর বাবা কোন সরকারী চাকরি করতেন এবং ক’দিন আগেই বদলি হয়ে আমাদের শহরে এসেছিলেন। ১৫-২০ দিন ক্লাস হয়ে গেছিল। আমি কুসুমের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, ওর পড়া বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে যেহেতু আগের ক’টা ক্লাস মিস করেছে তাই। আমি নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে ওকে হেল্প করতে লাগলাম। আগের ক্লাস নোটগুলো ওকে দিলাম। ও পড়াশোনার ব্যাপারে যথেষ্ট সিরিয়াস ছিল। আমার হেল্প ওর খুব কাজে দিল। ও ভীষণ খুশি হল আর ক’দিনের মধ্যে আমরা ভালো বন্ধু হয়ে উঠলাম। আমি কোনদিন স্কুলে আসতে না পারলে ও পরদিন আমাকে আগেরদিনের পড়া বুঝিয়ে দিত। ও যখন আমাকে পড়া বুঝিয়ে দিত, আমি হাঁ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্ক হয়ে যেতাম। ও যখন বলত, “কিরে বুঝলি কিছু?”, তখন সম্বিত ফিরে পেতাম। 

বন্ধুরাও বুঝতে পেরেছিল, ক’দিনের মধ্যে আমি কেমন যেন পাল্টে গেছি। একদিন ও ক্লাসে আসেনি। আমি টিফিন টাইমে বেঞ্চে বসে ওর কথাই ভাবছিলাম। কবি কবি ভাব আমাকে পেয়ে বসেছিল। খাতা কলম নিয়ে কি যেন লিখছিলাম, “কেন তুমি আমার জীবনটা এভাবে বদলে দিলে? আমার শয়নে স্বপনে জাগরণে শুধু তুমি, তুমি ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগে না।, ইত্যাদি ইত্যাদি। হঠাৎ বন্ধু মদন এসে ধাক্কা দিয়ে বলল, “কিরে খেলতে যাবি না?” ধাক্কায় হাতটা সরে গিয়ে কলম দিয়ে একটা ঢ্যাঁড়া পড়ে গেল লেখায়। মাথা গরম হয়ে গেল। কত মনোযোগ দিয়ে লিখছিলাম।

“একটা থাপ্পড় লাগাবো, গেলি এখান থেকে?”- বলে ওকে মারতে গেলাম।

আমার এহেন আচরণ ওর অপ্রত্যাশিত ছিল। “খেলবি না, বললেই হত, এত রাগ দেখানোর কি আছে?”- বলে চলে গেল মদন।

কুসুম ক্লাসের সবার সঙ্গেই খুব ভালোভাবে মিশত। আরেকদিন টিফিনের সময় আমার এক বন্ধুর সঙ্গে ও চালতার আচার খাচ্ছিল আর খুব হাসছিল। দেখে আমার ভারি বিরক্তি লাগছিল। পরে ওর সঙ্গে দেখা হলে বলেছিলাম, “দোকানের এসব হাবিজাবি খাবার খাস কেন? আমাকে বাড়ি থেকে বলেছে এসব আচার টাচার না খেতে, পেট খারাপ করে। আমি শুধু বাদাম ভাজা খাই। এসব আর খাবি না”

-“বা রে, আমার খুব ভালো লাগে চালতার আচার। আমি খাব”।

বুঝলাম, ওকে বোঝানোর চেষ্টা অর্থহীন। আমার কথা শুনবে না। তখন বললাম, “নগেনের সাথে যে ঘুরছিলি, জানিস ও কত বাজে ছেলে। পড়াশোনা করে না। ছোট ভাইয়ের সাথে মারামারি করে, স্কুলে আসার আগে গুলি খেলে। দাঁতও মাজে না। ওর মুখে কি গন্ধ!”

-“তা হোক গে, আমার কাছে সব বন্ধুই সমান”।

মাথা গরম হচ্ছিল, কথা শোনে না।

বলেই ফেললাম, “তুই আমার চোখের সামনে থেকে যা, আমি তোর সাথে আর কথা বলব না”।

ও চলে গেল। মেয়েরা কেন যে এত নির্দয় হয়!

ওর সাথে তিন-চার দিন কথাই বলিনি। ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। ও দেখলাম দিব্যি আছে, আমি এত কষ্ট পাচ্ছি, আর ও বন্ধুদের সাথে হাহা-হিহি করছে। দেখে আরো রাগ হচ্ছিল। পরেরদিন ও স্কুলে এল না। আরেকজন বান্ধবীর কাছে শুনলাম, ওর নাকি জ্বর। দু’দিন পর স্কুলে এল। এসেই আমার কাছে বলল, “তোর নোটটা দে না”।

-“আমি কোন নোট দিতে পারব না। নগেনের কাছ থেকে নে যা”

-“আচ্ছা, তুই ছাড়া কি নোট দেবার আর কেউ নেই?”-বলে চলে গেল।

পরে ঘুরে ফিরে আমার কাছেই এল। বলল, “নগেনের হাতের লেখা কি জঘন্য! প্লীজ আমাকে নোটটা দে না। আচ্ছা যা, আর ওর সাথে কথা বলব না”।

আমি আইস্ক্রিমের মত গলে গেলাম। আমার মাথা ঠাণ্ডা হল। ও আমাকে এত কষ্ট দিত, তবু ওর ভাবনা কখনই আমার মন থেকে যেত না। আমার সমস্ত মনটা কিভাবে যেন দখল করে নিয়েছিল।

কদিন ওর সঙ্গে মেলামেশা করে আমি গভীর প্রেমজ্বরে আক্রান্ত হলাম। প্রতিদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই রেডিও চালিয়ে মধুর প্রেমের সঙ্গীত শুনতে লাগলাম। আমাদের বাড়িতে পেয়ারা গাছে খুব মিষ্টি লাল পেয়ারা হত। ওর জন্য পেয়ারা পেড়ে নিয়ে যেতাম। কুসুম পেয়ারা খেয়ে খুব খুশি হয়ে আমাকে আবার আনার জন্য বায়না করত। ওর জন্য একেবারে পাগল হয়ে গেলাম। একদিন বাড়ি ফিরে খাতা খুলে কাব্য করে লিখেই ফেললাম “কথায় না বললে কি বুঝতে পারো না তুমি...” আরো কত কি। বাবা বাজারের ফর্দ করতে গিয়ে কাগজ নেবার জন্য আমার খাতা খুলে প্রেমপত্র দেখে ফেললেন।

তারপর আমাকে ডেকে খাতা দেখিয়ে বললেন, “ইস্টুপিড! এসব কি? আজ বাদে কাল পরীক্ষা, আর প্রেমপত্র লেখা হচ্ছে?”-বলে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় কষিয়ে দিলেন। “পড়াশোনা লাটে তুলে ভালোবাসা না! ফের যদি এসব দেখি, তো চাবকে পিঠের ছাল তুলে নেব”।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। বাবার চিকিৎসা প্রেমজ্বরে খুব কাজ দিয়েছিল। বসন্তের ভূত পালাতে দিশা পেল না।

আর কোনদিন কুসুমকে মনের কথা বলা হয়নি।


Rate this content
Log in

More bengali story from Amitava Saha

Similar bengali story from Comedy