বিবি আমাতুস সালাম
বিবি আমাতুস সালাম
"আমি নারী বলে আমাকে ভয় করো না? বিদ্যুৎশিখার হাত দিয়ে ইন্দ্র তাঁর বজ্র পাঠিয়ে দেন৷“
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও সমাজে বিভিন্নক্ষেত্রে নারী পুরুষের অসম্যতা বর্তমান। তাও ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, নারী কেবল পুরুষের পদধূলি না হয়ে থেকে তাঁর বীরত্বের পরিচয় দিয়ে সমাজের বা রাষ্ট্রের উন্নতিকল্পে এগিয়ে এসেছে বহুবার৷
ইংরেজদের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার গর্বের দিন। স্বাধীনতা দিবস। দিনটাকে গর্বের সঙ্গে পালন করে আসমুদ্রহিমাচল। সারা দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। যাঁদের জন্য ইংরেজদের অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। দেশকে স্বাধীন করার পিছনে যে বিপ্লবীদের নাম করা হয়, তাঁদের মধ্যে বাদ থাকেন না নারীরাও। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। দেশের জন্য় তাঁরা উৎসর্গ করেছিলেন নিজেদের জীবনও। আজ স্বাধীনতা দিবসে মনে পড়ে এমন সব বীরাঙ্গনা নারীদের কথা, যাঁরা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শত অত্যাচারের পরও ইংরেজদের কাছে হার মানেননি।ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এরকম বহু নারী বিপ্লবী আছেন যারা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন মাতৃভূমির উদ্দেশ্যে, নিজেদের রক্ত দিয়ে এঁকেছেন স্বাধীনতার স্বপ্ন৷ এদের মধ্যে অনন্য একজন হলেন—
বিবি আমাতুস সালাম ছিলেন আরেক নিবেদিতপ্রাণ গান্ধিবাদী।বিবি আমতুস সালাম (মৃত্যু ২৯শে সেপ্টেম্বর ১৯৮৫) ছিলেন একজন সমাজকর্মী এবং মোহনদাস গান্ধীর শিষ্য যিনি ভারত বিভক্তির প্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মোকাবেলায় এবং দেশভাগের পর ভারতে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।
তিনি ১৯০৭ সালে পাঞ্জাবের পাতিয়ালায় রাজপুতানা পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
বিবি আমতুস সালাম আবদুল মজিদ খানের কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি পাতিয়ালার একটি রক্ষণশীল কিন্তু সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে পরদা পালনের কারণে তাকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল যা তিনি ১৯২৫ সালে ত্যাগ করেছিলেন ।
অভিজাত পরিবারে আরামে-আয়াসে না ভেসে আমাতুস সালাম খাদি আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর বড় ভাইরা অনেকেই ছিল তাঁর সহবিপ্লবী। মহাত্মা গান্ধির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সেবাগ্রামে আশ্রমিক হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন গান্ধি দম্পতির ঘনিষ্ঠ, কন্যাসমা।
বিবি আমতুস সালাম গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং তিনি তাকে তার মেয়ে বলে সম্বোধন করতেন।অসুস্থ শরীরে ১৯৩২ সালে অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে তিনি কারাগারে যান। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি গান্ধির ব্যক্তিগত সহকারী হলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি, হরিজন ও নারীর কল্যাণও ছিল তাঁর লক্ষ্য। যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, তখন তিনি গান্ধির দূত হিসেবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, সিন্ধুপ্রদেশ এবং নোওয়াখালি পরিদর্শন করেন। দাঙ্গা বন্ধ করার ডাক দিয়ে তিনি কুড়ি দিন ধরে সত্যাগ্রহ অনশন করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে সর্দার প্যাটেলকে লেখা, গান্ধী উল্লেখ করেছিলেন যে দুর্বল সালামের "হৃদয় সোনার, কিন্তু তার শরীর পিতলের"। সালাম হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির একজন প্রবক্তা ছিলেন এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তার প্রচেষ্টাকে চ্যানেল করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে, ভারত জুড়ে দাঙ্গা শুরু হলে, গান্ধী মেজাজ শান্ত করার জন্য বাংলা সফর করেন। আমতুস সালাম সেই সফরে তার সাথে ছিলেন এবং নোয়াখালীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তার সাথে ২১ দিন রোজা রাখেন। নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য গান্ধী তাকে সেখানে রেখে যান এবং পরে পর্যবেক্ষণ করেন যে "নোয়াখালীতে যা কিছু শান্তি অর্জিত হয়েছে তার পিছনে তুমিই চলমান আত্মা। এটি ছিল এবং এখনও তোমার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ। শুধুমাত্র তুমিই টিকিয়ে রাখতে পারো । তুমি যেখানেই দাঁড়াও না কেন, আমার মেয়ের সামর্থ্যে তুমি দাঁড়িয়েছ, তাই না?"
আমতুস সালাম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য একজন তরুণী এবং অবিবাহিত মুসলিম মহিলা হিসেবে দেশভাগের সময় সহিংস পাতিয়ালায় থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি ভারতে থাকতে বেছে নিয়েছিলেন এমনকি তার ভাই এবং তার বর্ধিত পরিবারের অধিকাংশই পাকিস্তানে চলে যাওয়া বেছে নিয়েছিল এবং তাদের পদক্ষেপ উভয়ই তাকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছিল। গান্ধী তাদের নিরাপদে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
তার ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম-এ, মৌলানা আজাদ উল্লেখ করেছেন যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কায়েদ-ই-আজম (মহান নেতা) উপাধিটি প্রথম গান্ধী দ্বারা জনপ্রিয় হয়েছিল,যিনি আমতুস সালামের পরামর্শ অনুসরণ করে তিনি জিন্নাহকে এইভাবে সম্বোধন করেছিলেন যেহেতু উর্দু সংবাদপত্র তাকে এই উপাধি দ্বারা উল্লেখ করেছিল। আজাদ লিখেছেন যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তার চিঠির পরিণতি বিবেচনা না করেই সালামের পরামর্শ অনুসরণ করে গান্ধী ভারতীয় মুসলমানদের সামনে কায়েদ হিসেবে জিন্নাহর ভাবমূর্তিকে বৈধতা দিয়েছিলেন।
১৯৪৭-৪৮ সালে, তিনি দেশভাগের পর হাঙ্গামা চলাকালীন অপহৃত হাজার হাজার নারীকে সরিয়ে নেওয়া এবং পুনর্বাসনে কাজ করেছিলেন। তখন তাকে কংগ্রেস এবং সর্বভারতীয় মহিলা কংগ্রেসের সদস্য লজ্জাবতী হুজা সাহায্য করেছিলেন এবং শরণার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য সালাম পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি সফর করেছিলেন।
তিনি কস্তুরবা সেবা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাজপুরায় বসতি স্থাপন করেন যেখানে তিনি বাহাওয়ালপুর থেকে আগত হিন্দু অভিবাসীদের পুনর্বাসনে কাজ করেন। ভারত সরকার যখন শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য রাজপুরায় একটি টাউনশিপ নির্মাণ শুরু করে, তখন তিনি হিন্দুস্তানি তালিমি সংঘের সাথে সেখানে কাজের সাথে জড়িত ছিলেন যারা শরণার্থী শিবিরে শিশুদের শিক্ষার জন্য কাজ করেছিল।
আবার ১৯৬১ যখন খান আবদুল গাফফার খান যখন ভারত সফর করেন, তখন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। যখন ১৯৬২ সালে চীন, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ বাধে, তখনও তিনি সৈন্যদের সেবা করতে দুর্গম অঞ্চলে পাড়ি দিতেন।
১৯৮০-এর দশকে, আমতুস সালাম জেল সংস্কার সংক্রান্ত সর্বভারতীয় কমিটিতে স্থায়ী আমন্ত্রিত হিসাবে কাজ করেছিলেন।১৯৮৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অফুরান তাঁর প্রাণশক্তি শেষ হয় শেষমেশ।
এছাড়াও জানা অজানা বহু নারীরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন, যাদের সকলের মহান আত্মত্যাগের কথা আমরা হয়ত জানিনা ৷ তারা নিজেদের নিঃশেষ করে ছিলেন দেশের পরাধীনটা থেকে মুক্তির জন্য - নিজেদের নাম বা প্রচারের জন্য নয়।
নারী স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অতীতে যে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল সেই বীরত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে এখনকার নারীরা সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলেছে পুরুষের পায়ে পা মিলিয়ে৷ শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিক বা শুধুমাত্র নারীবাদী দিয়ে সমাজ এগোয় না, সমাজ এগোয় যখন আমরা সবাই সবাইকে সম্মান দিয়ে একসাথে দিনগুলোতে বেঁচে থাকার লড়াইটা জারি রাখি৷
আজ ৭৫-তম স্বাধীনতা দিবসে দেশের সেই বীরবালাদের আমরা সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই৷
