বেগম হজরত মহল
বেগম হজরত মহল
স্বাধীনতার ৭৫ বর্ষপূর্তির কারণে যখন আমাদের গোটা দেশ উদযাপনের আনন্দে ভেসে চলেছে, তখন স্মরণ করতেই হবে কিছু মানুষের কথা যারা সমাজের সব বাঁধাকে তুচ্ছ করে দেশের পরাধীনতার থেকে মুক্ত হতে সংগ্রামে নেমে ছিলেন।
এরকম একটি নাম হল বেগম হজরত মহল৷ গল্পটা এক রানির প্রতিরোধের, সেদিক থেকে লক্ষ্মীবাইয়ের গল্পের ছায়া খুঁজে পাবেন অনেকে। যদিও হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্রে হজরত মহল ইতিহাসে বন্দিত হলেন না লক্ষ্মীবাঈয়ের মতো।
বেগম হজরত মহল (উর্দু: بیگم حضرت محل; আনুমানিক ১৮২০ - ৭ এপ্রিল ১৮৭৯) ছিলেন আওধের বেগম এবং ওয়াজেদ আলি শাহর স্ত্রী। ওয়াজেদ আলি শাহ কলকাতায় নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি আওধের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেন। সিপাহী বিদ্রোহের সময় তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত হন। তিনি নেপালে আশ্রয় নেন। ১৮৭৯ সালে কাঠমান্ডুতে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু গল্পের আগে আরও গল্প ছিল যে!
১৮২০ সালে আওয়াধের ফৈজাবাদের গরীব পরিবারে যে মেয়ে জন্মেছিল, তার নাম ছিল মুহাম্মদী খানম। সে নাবালিকা অবস্থাতেই হারেমে বিক্রি হয়ে গেছিল। বাপ তার দাস, মা নিজেও গণিকা। খাজসিন (পরিচারিকা) হিসেবে হারেমে বিক্রিত হওয়ার পর, সেই বালিকা শীঘ্রই শেষ 'তাজদার-ই-আওয়াধ' ওয়াজিদ আলি শাহের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পরিচারিকা হলেন 'পরী' পদে উন্নীত। 'পরী' বলতে বোঝাত সুন্দরী নারীদের একটি দল, যারা নাচে গানে, শিল্পদক্ষতায় নবাবের দিল খুশ রাখবে।
'পরী' থেকে মুহাম্মদী হলেন 'মহেক পরী'। মানে আরেক ধাপ প্রোমোশন, কিন্তু সে তথাকথিত পতিতার প্রোমোশন। হয়ে উঠলেন নবাবের প্রিয় উপপত্নীদের একজন। নবাবই তাঁর নাম রাখেন ইফতারকার-উন-নিসা। এরপর বড়সড় শিকে ছিঁড়ল। উপপত্নী হলেন ওয়াজিদ আলি শাহের দ্বিতীয় স্ত্রী। তাঁরই পুত্র পরে অওয়াধের যুবরাজ ঘোষিত হবেন, নাম যার বিরজিস কদর। পুত্রগর্ভা হয়ে নাম হল তাঁর বেগম হজরত মহল (রাজকীয় যে রানি)। কিন্তু তাঁকেও নবাব তার অন্যান্য উপপত্নীর মতো তালাক দিয়েছিলেন পরে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসির প্রবর্তিত স্বত্ত্ববিলোপ নীতির মাধ্যমে অওয়াধ দখল করল, কারণ আওয়াধ তুলা আর নীলের চাষে অগ্রণী। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে নির্বাসিত করা হল। ১৮৫৬ সালে পরিবারের একটি অংশের সাথে কলকাতায় (মেটিয়াব্রুজ) এসে ভিড়লেন তিনি। এক ক্ষয়িষ্ণু রাজার শেষ জীবনের দিনলিপি লেখা হতে লাগল কলকাতারই উপকণ্ঠে। কিন্তু আওয়াধে তখন কী ঘটছিল? বেগম হজরত মহল তখন আওয়াধ তথা তাঁর বারো বছরের ছেলের দায়িত্ব নিয়েছেন একা। বিরজিস কদরকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুকুট পরিয়ে দশ মাস শাসন চালাতে পেরেছিলেন হজরত মহল রাজমাতা ও রাজ-অভিভাবক হিসেবে। অংশ নিয়েছিলেন ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে। এমনকি রানি ভিক্টোরিয়া যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বণিকসংস্থা শাসিত অঞ্চলকে রাজাধিকারের আওতায় আনলেন, তখনও হজরত মহল এক পাল্টা ঘোষণা করেছিলেন। ব্রিটেনে রানির শর্ত মেনে চলতে অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ইংরেজদের রাজস্বদানে অনাগ্রহী জমিদার ও কৃষকরা সামরিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সব জাতি ও ধর্মের মানুষ এই তওয়ায়েফ রানির উপর আস্থা ন্যস্ত করেছিল। নানাসাহেব স্বয়ং ছিলেন তাঁর গুণমুগ্ধ। হাতির পিঠে সওয়ার বেগমের যুদ্ধের গল্প আজও ফেরে মানুষের মুখে মুখে। তাঁর বিশ্বস্ত অনুগামীদের দলে আরও ছিলেন সরফাদ-দৌলা, মহারাজ বাল কৃষ্ণ, রাজা জয় লাল, মাম্মু খান, বাইশওয়ারার রানা বেণী মাধো বকশ, মহোনার রাজা দ্রিগ বিজয় সিং, ফৈজাবাদের মৌলভী আহমদ উল্লাহ শাহ, রাজা মান সিং এবং রাজা জাইলাল সিং।
ব্রিটিশরা উন্নত যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে লখনৌ-এর যোদ্ধাদের পরাস্ত করে। বেগম হজরত মহল ইংরেজ রাজপরিবারের দেওয়া পেনশন প্রত্যাখ্যান করে লখনৌ থেকে পালিয়ে আবারও ফৈজাবাদ থেকে মুহুর্মুহু গেরিলা হামলার চেষ্টা করেন। সাহজাহানপুরে হামলা তার মধ্যে একটি। স্যার হেনরি লরেন্স (অওয়াধের প্রধান কমিশনার) চিনওয়াট/ চিনহাটের লড়াইয়ে তাঁর কাছে পরাজিত হন। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী তাঁরই ছিল। ১৮৫৭ সালেরই ৫ জুন মুঘল শাসনের অধীনে তার এগারো বছরের পুত্র বিরজিস কাদেরকে মুকুট পরান। শুরু হয় দশমাসের রানি-শাসন।
উইলিয়াম হাওয়ার্ড রাসেল ''মাই ইন্ডিয়ান মিউটিনি ডায়েরি''-তে লিখেছেন:
'এই বেগম মহান শক্তি এবং ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। তিনি তাঁর ছেলের স্বার্থ গ্রহণের জন্য সমস্ত আওয়াধকে উত্তেজিত করে তোলেন। প্রধানরা তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ নিয়েছে। বেগম আমাদের বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ ঘোষণা করে চলেছেন।'
ব্রিটিশরা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল, এমনকি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে তার স্বামীর কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছিল। কিন্তু বেগম রাজি ছিলেন না। যখন বিদ্রোহের প্রধান-কেন্দ্র দিল্লি দখল করা হল, তখন আওয়াধের বেগমের পরাজয়ও ঘনিয়ে আসে। বেগম ছোট সাহেব পেশোয়া এবং অন্যান্যদের সঙ্গে নেপালে চলে যান। ব্রিটিশ শাসকরা তাঁকে লখনৌতে বিলাসবহুল জীবন দিতে রাজি ছিল। তিনি স্পষ্ট বলেন, স্বাধীন আওয়াধ রাজ্য ছাড়া আর কিছুই তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ১৮৭৯ সালের ৭ এপ্রিল নেপালের কাঠমান্ডুতে তিনি মারা যান। কাঠমান্ডুর জামে মসজিদের কাছে আজও তাঁর সমাধিতে লেখা -
'লিখা হোগা হজরত মহল কি লাহাদ পার
নসিবো’ন কি জালি থি, ফালক কি সাতায়ি'
( হজরত মহলের কবরে লেখা থাকবে
নক্ষত্রের দ্বারা অভিসম্পাতিত ছিলেন,আকাশের দ্বারা নিপীড়িত)
বেগম হজরত মহলের কবর কাঠমান্ডুর কেন্দ্রে জামে মসজিদের নিকটে অবস্থিত। কবরটি বিখ্যাত দারবার মার্গ থেকে কাছেই অবস্থিত। জামে মসজিদ কমিটি এর তদারক করে থাকে। ১৯৬২ সালের ১৫ আগস্ট লখনৌয়ের হজরতগঞ্জের পুরনো ভিক্টোরিয়া পার্কে তাকে সম্মান জানানো হয়। ১৯৮৪ সালের ১০ মে ভারত সরকার তার সম্মানে ডাকটিকেট প্রকাশ করে।
ওয়াজিদ আলি শাহ যখন ১৮৫৬ সালে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখনও বেগমের বীরত্বের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন শায়রি-তে-
'ঘরোঁ পর তবাহি পড়ি শহের মে, খুদে
মেরে বাজার, হজরত মহল
তু হি বাইস এ আইশো-আরাম হেয় গরীবোঁ কি
গমখওয়ার, হজরত মহল'
অর্থাৎ যুদ্ধপীড়িত শহরে গরীবের শেষ আশা হজরত মহল।
প্রসঙ্গত, রানি হজরত মহল নিজেও ছিলেন কবি। স্বাধীন ভারতে হজরত মহলের নামে প্রকাশ হয়েছে ডাকটিকিট একটি। লখনৌ-এর ভিক্টোরিয়া পার্কের নাম বদলে হয়েছে বেগম হজরত পার্ক। ফিল্মস ডিভিশন ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে মহিউদ্দিন মির্জা তাঁকে নিয়ে অতি ক্ষুদ্র ডকুমেন্টারিও বানিয়েছেন।
এই বিস্মৃতপ্রায় 'গণিকা-রানি' যে নবাবের চেয়ে অনেক ভাল শাসক এবং নেতা ছিলেন, তা বস্তুনিষ্ঠভাবেই প্রমাণিত। কিন্তু আরও যে ইতিহাস অজানা রয়ে গেছে, তা হল, তিনি যুদ্ধের ময়দানে অন্য গণিকাদেরও আহ্বান জানিয়েছিলেন, একত্রিত করেছিলেন। শোনা যায়, তেমন নারীর সংখ্যা নাকি ছিল প্রায় দুইশো পঁচিশ। তাঁরাও সমানভাবে অংশ নিয়েছিলেন ভারতের প্রথম সেই স্বাধীনতার লড়াইয়ে। আবার অনেক আফ্রিকান নারী আওয়াধ নবাবদের হারেম রক্ষার জন্য নিযুক্ত ছিলেন। তাঁরাও ১৮৫৭ সালে লখনউয়ের যুদ্ধে অংশ নিয়ে মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশেও লেখা হয়েছিল শায়রি দু ছত্র-
'কোই আনকো হাবসিন কেহতা, কোই কেহতা নীচ আছুত।
আবলা কই আনহিন বাটলে, কই কহে আনহে মজবুত।'
(কেউ কেউ তাদের আফ্রিকান বলে, কেউ কেউ অস্পৃশ্য। কেউ তাদের দুর্বল বলে, অন্যরা বলে, তারা শক্তিশালী।)
মূলধারার ইতিহাস হয়ত তাঁদের কাউকে ভুলেছে মুসলিম পরিচয়ের জন্য, বা নারী পরিচয়ের জন্য, কাউকে আবার গণিকা পরিচয়ের জন্য। কিন্তু তাঁদের ভুলে থাকলে আমাদের ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না আর সেজন্য বিনম্র শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁদের স্মরণই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলী।
তথ্য : আন্তর্জাল, উইকিপেডিয়া এবং বিভিন্ন পত্রিকা।
