Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Partha Roy

Classics


2  

Partha Roy

Classics


বাইশে শ্রাবণে

বাইশে শ্রাবণে

12 mins 698 12 mins 698

একটু আগে রতনকাকা সব আলোগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। সুইচ অন করার শব্দে শিশিরবিন্দু বুঝতে পারল সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে। গত দুদিন ধরে আকাশ উদার হাতে পৃথ্বীকে ধারাস্নানে ভরিয়ে চলেছে। কি অদ্ভুত! ওর এখন বৃষ্টির শব্দ আর ভাল লাগে না। আজ সকাল থেকে ওর ভেতরে একটা অস্থিরতা। ব্যাল্কনির গ্রিল দিয়ে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল কার্নিশ বেয়ে অঝোরে ঝরে পড়া প্রতিটি বিন্দুকে। ভাবল স্পর্শের মায়ায় যদি ওর পুরনো ভাল লাগা জেগে ওঠে। হচ্ছে না, কিচ্ছু ভাল লাগছে না। এ যেন কোন সুর সাধকের সুর কেটে যাওয়া। এখন ওর একমাত্র আশ্রয় পিতৃদত্ত এসরাজটা। যখন মন অস্থির হয়ে ওঠে এক মনে এসরাজে সুর তুলে নিজের ভেতরের কান্নাকে আটকে রাখে। রতনকাকাকে ডেকে বলল, “আমাকে এসরাজটা দিয়ে যাও”।

এক সময় বৃষ্টি নিয়ে ওর রোম্যানটিসিজম কম ছিল না। নয়নতারা যতদিন সাথে ছিল এই বর্ষাই কত প্রিয় ছিল শিশিরবিন্দুর। উথাল পাতাল ভালবাসায় দুজনের মধ্যে এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলত কে কতো বেশী অন্যকে কানায় কানায় পূর্ণ করে নিজে পরিপূর্ণ হতে পারে। সাত বছর আগে এই দিনে নন্দন চত্বরে এক ছাতার নীচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজা নয়নতারা যখন বলল, “কাল বাইশে শ্রাবণ। তুমি কখনো বর্ষায় শান্তিনিকেতন গেছ?”। শিশির অসম্মতির মাথা নাড়াতে, আরও ঘন হয়ে এসে গ্রীবা তুলে ফিসফিস করে বলেছিল, “আমিও যাই নি কোনদিন। আমার খুউউউউউব ইচ্ছে বর্ষার শান্তিনিকেতন দেখার। কেউ কি আমাকে এক বর্ষায় রবি তীর্থে নিয়ে যাবে?”। ভারী চশমার কাঁচ রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে শিশিরবিন্দু উত্তর দিয়েছিল, “কোন এক শিশিরবিন্দু যদি এই বাইশে শ্রাবণে সেই গুরুদায়িত্ব নেয়, নয়নতারা কি খুশী হবে?”। দু চোখে হরিণ কোমল দৃষ্টি নিয়ে নয়নতারা বলেছিল, “হুউউ, নয়নতারা প্রতিটি শিশিরবিন্দুকে সযত্নে জমিয়ে ময়ূরাক্ষী হবে”। পরের দিনই শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ধরে রবি তীর্থে। তিনটে দিন একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে কেটে গেল। দুজনের মনে হয়েছিল ওদের ওখানে থাকাকালীন যদি সময় চিরতরে থমকে যেত। বর্ষার শান্তিনিকেতন যেন এক ধ্যানরতা যুবতী যার কাব্যিক রূপ কাম জাগায় না মুগ্ধ করে। প্রথমদিন ওখানে পৌঁছে হোটেল ঠিক করে কিছু খেয়ে নিয়েই নয়নতারার ইচ্ছেয় ওরা চলে গেল কোপাই এর ধারে। আকাশে ঘনঘোর মেঘ, নীচে ঝিরিঝিরি ধারার মাঝে রূপযৌবন ভারে ভারাক্রান্তা কোপাই আর নয়নতারা। “ইস! শিশির তুমি যদি এসরাজটা সাথে আনতে”। শিশিরবিন্দু মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছিল ওর উচ্ছ্বাস। এ যেন অন্য এক নয়নতারা। কোপাই এর ধারে ওর পাশে বসে বলা নেই কওয়া নেই চরাচর ভুলে গান ধরল, “একি আকুলতা ভুবনে! একি চঞ্চলতা পবনে।।…..” ইতিমধ্যে বৃষ্টির দাপট বাড়ল, আকাশের বুক চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি কিন্তু নয়নতারার ভ্রুক্ষেপ নেই, সে যেন প্রকৃতি দেবীর আরাধনায় মগ্ন এক পূজারিণী। সুললিত কণ্ঠে ধরল, “গহন ঘন ছাইল গগন ঘনাইয়া, স্তিমিত দশ দিশি…….”। বেশ মজার একটা ঘটনা হয়েছিল। আসে পাশে যারা ছিল বৃষ্টি বেড়ে যেতে যে যার মতো দুদ্দার করে এদিক সেদিক ছুটল, শুধু এক অভিজাত চেহারার বৃদ্ধ ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে নয়নতারাকে দেখে যাচ্ছিল। সেই ভদ্রলোকের সাথে থাকা উনার স্ত্রী ও অন্যরা অদূরে রাখা গাড়ীর মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। দুজন মুগ্ধ শ্রোতা তথা দর্শক, শিশিরবিন্দু আর সেই ভদ্রলোক। আঁধার ঘনিয়ে এলে আপনা হতেই ওর সম্মোহন কেটে যেতে অপ্রস্তুত হয়ে শিশিরবিন্দুর তাকিয়ে লাজুক হাসল। শিশিরবিন্দুর মনে হল ভিজে একসা নয়নতারা যেন এক কবিতা। ওই ভদ্রলোক ওদের দুজনকে জোর করে গাড়ীর কাছে নিয়ে গিয়ে ফ্লাস্ক থেকে কফি আর স্ন্যাক্স খাওয়ালেন। তারপর নয়নতারার মাথায় হাত রেখে বললেন, “এই নিয়ে প্রায় সতেরোবার শান্তিনিকেতন এলুম, বেশী বৈ কম নয়। কোপাই এর তীরে রবি কবির প্রয়াণ তিথিতে তুমি যে মুহূর্তগুলো উপহার দিলে, আমার সারা জীবনের এক সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে। মনে হল সমাপ্তির মৃন্ময়ীকে চাক্ষুস করলাম। গড ব্লেস ইউ। অলওয়েজ বি হ্যাপি”। তারপরে শিশিরবিন্দুর দিকে ঘুরে বললেন, “ইয়ং ম্যান, তোমাকে হিংসা হচ্ছে। ওকে খুব যত্নে রেখো। খুব ভালবেসো ওকে। ইউ আর ভেরি লাকি”। গাড়ীতে কিছুটা অসুবিধা করে ওদের তুলে নিয়ে হোটেলে ড্রপ করে দিয়েছিলেন। শিশিরবিন্দুর অবাক হবার আরও বাকী ছিল। হোটেলে এসে দরজা বন্ধ করে শিশিরবিন্দুকে সামান্যতম সুযোগ না দিয়ে ভেজা জামা কাপড়েই গলা জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁট নিজের ঠোঁটের ভেতরে পুরে এক দীর্ঘ আগ্রাসী চুমু দিল। গলা জড়িয়ে ধরেই বলল, “আমাকে বাইশে শ্রাবণে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসার পুরষ্কার এই মুহূর্ত থেকে শুরু হল। উউউম মনে করো এটা ডিনারের আগে স্টার্টার”। বিনা প্রস্তুতিতে এমন আপ্যায়ন পেয়ে হতচকিত হয়ে যাওয়া শিশিরবিন্দু একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, “ইট ইজ মাই প্লেজার, নয়ন। কিন্তু এখন প্লিজ এই ভেজা কাপড় চেঞ্জ করে এসো। তানাহলে জ্বর জারি হবে যে। একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা...”। ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ভ্রূ কুঁচকে বলেছিল, “উফ! ডোন্ট বি সো প্র্যাকটিক্যাল, ডিয়ার। কিচ্ছু হবে না। এখন যা বলছি তাই করো। সুইচ অফ করো”। শিশিরবিন্দু আদেশ পালন করল। “এবার চোখ বন্ধ করো। আমি না বলা পর্যন্ত খুলবে না কিন্তু”। বাধ্য ছেলের মতো তাই করল শিশির। খানিকক্ষণ পরে শুনতে পেল, “এবার চোখ খোল”। চোখ খুলে ও সম্মোহিত হয়ে গেল। রাস্তার কিছুটা আলো জানালা দিয়ে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে হোটেলের রুমে যে মায়াবী আলোছায়ার সৃষ্টি করেছে তার মাঝে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন এক অপরুপ শিল্যুয়েট, যেন কোন মহান শিল্পীর সৃষ্টি। ডান পা ঈষৎ ভাঁজ করে ডান হাঁটুকে বাম হাঁটুর কাছে এনে উভয় হাতের প্রথমা আর মধ্যমাদ্বয়কে টসটসে দুই স্তনবৃন্তের পাশ দিয়ে ইংরেজি ভি এর মতো করে রেখে দাঁড়িয়ে এক ভেনাস। প্রিয় নারীকে হাতের কাছে এমন মোহময়ী রূপে দেখে শিশিরবিন্দুর গলা শুকিয়ে এলো। এগিয়ে এলো সেই নারী, ধীর হাতে শিশিরবিন্দুকে খোলস মুক্ত করতে করতে ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,“শিশির, আমাকে ময়ূরাক্ষী করো। তারপরে প্রবল পুরুষ হয়ে এই নদীতে দাঁড় বাও। গ্রহণ করো, পূর্ণ করো, উষ্ণতা দাও আমাকে”। সম্মোহিত শিশিরবিন্দু হাঁটু মুড়ে বসে ওর পদ্মনাভিতে ঠোঁট রেখেছিল। রাতভর কখনো মাঝি হয়ে বৈঠা চালিয়েছে আবার কখনো নিজে শান্ত নদীতট হয়ে নদীকে আছড়ে পড়তে দিয়েছে। তিনটে দিন খোয়াই, আমার কুটীর, মিউজিয়াম, কলা ভবন, ছাতিমতলা, উপাসনা ঘর, কংকালিতলার বর্ষার রূপ প্রান ভরে দেখল। কংকালিতলা মন্দিরে পূজা দিয়ে বের হতে শিশিরবিন্দু জিজ্ঞাসা করেছিল, “কালী মায়ের কাছে কি প্রার্থনা করলে?”।

“বলব কেন তোমাকে?

“ঠিক আছে বোল না”

“বাবুর কি রাগ হল? দেখি মুখখানা একটু। মায়ের কাছে সারা জীবনের জন্য তোমাকে চেয়ে নিলাম। বুঝলে?” ##

নয়নতারার প্রার্থনা পূরণ হয় নি। অনেক দিন ধরেই শিশিরবিন্দুর চোখের একটা জটিল সমস্যা ছিল। চিকিৎসা চলছিল। নয়নতারা খানিকটা জানত। শান্তিনিকেতন থেকে ঘুরে আসার মাস কয়েক পরে শিশিরবিন্দুর চোখের অবস্থা আরও খারাপ হল। জটিল রেটিনা ডিটাচমেন্টের কারণে দৃষ্টি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগল। পিতৃমাতৃহীন শিশিরবিন্দুর একমাত্র ভরসা মামা ওকে ভেলরে নিয়ে গেল। কিন্তু সেখানকার ডাক্তাররাও কোন আশা দিতে পারলেন না। বিলম্ব হয়ে যাবার কারণে এখন অপারেশন করলেও আর কোন কাজ হবে না বলে জানিয়ে দিলেন ওখানকার ডাক্তারবাবুরাও। ভেলরে একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে গেছিল যে হয়তো চোখদুটো ঠিক হয়ে যাবে। সেই আশা মিলিয়ে যেতে শিশিরবিন্দুর মনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এলো। নয়নতারাকে বিয়ে করলে ওর জীবন নষ্ট করা হবে, এই ধারনা থেকে ওর সাথে সব সংস্রব শুধু বন্ধই করল না মামাকে বলে মামার কাছে নর্থ বেঙ্গলে অজ্ঞাতবাসে চলে গেল। পিতৃদত্ত বাড়ীটা ওদের বহু বছরের পুরনো ভৃত্য রতনকাকার জিম্মায় রেখে গেল। এমনকি নয়নতারা যাতে কোন রকম ভাবে যোগাযোগ করতে না পারে তার জন্য পুরনো সিম পাল্টে ফেলে নুতন নাম্বার শুধু রতনকাকাকে দিয়ে কাউকে এই নাম্বার দিতে বারণ করে গেল। নয়নতারা পাগলের মত যোগাযোগ করতে চেষ্টা করেছিল, এমনকি ওর বাড়ীতে এসে রতনকাকার হাতে পায়ে ধরে অনুনয় করে নাম্বার চেয়েছিল। অনেক কষ্টে রতনকাকা শিশিরবিন্দুকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিল। পরে রতনকাকা ফোনে বলেছিল, “এ তুমি ভাল করলে না গো দাদাবাবু। বড় ভাল মেয়ে। ওর কষ্ট চোখে দেখা যায় না”। নয়নতারার বাবা মা এই সম্পর্কের কথা জানতেন, শিশিরবিন্দুর সাথে বিয়ে দিতে তাদের আপত্তিও ছিল না। ওর আচরণে মর্মাহত হয়ে তারা মেয়ের অবস্থা দেখে ভাল ছেলের খোঁজ করতে লাগলেন। অসহায় নয়নতারা ধরা গলায় মাকে একটা কথাই বলেছিল, “আমি অনেক দূরে চলে যেতে চাই, মা। যতো তাড়াতাড়ি পারো সেই ব্যাবস্থা করো”। অনেকদূরেই চলে গেল বরের সাথে কানাডায়। ওর চলে যাবার খবর পেতে ভগ্ন মনোরথ শিশিরবিন্দু বাড়ী ফিরে এলো। মামা, মামী ওর মামাতো বোন আদ্রিজা খুব আপত্তি করেছিল, শোনে নি জেদি ছেলে। বলেছিল, “রতনকাকা যতদিন আছে ততদিন বাবা মায়ের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ীটাতে থাকি। তারপরে তো তোমাদের ঘাড়েই এসে পড়ব”। নর্থ বেঙ্গল থেকে ফিরে আসার বেশ কিছুদিন পরে এক বিকেলে ওদের বাড়ীর সামনে একটা গাড়ী এসে থামল, রতনকাকা এসে বলল, ”এক ভদ্রমহিলা এসেছেন তোমার সাথে দেখা করতে, বাইরের ঘরে বসিয়েছি”। বিষ্মিত শিশিরবিন্দু রতনকাকাকে চা বানাতে বলে নিজেই হাতড়ে হাতড়ে গেল।

“আমি নয়নতারার মা। এভাবে হাঁটছ কেন? তুমি কি চোখে একেবারেই দেখতে পাও না?”

হতচকিত হয়ে গেল শিশিরবিন্দু। ধরা গলায় বলল, “না, মাসীমা পুরো অন্ধ হয়ে গেছি। ঈশ্বর আমাকে শাস্তি দিয়েছেন।”

কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। তারপরে ভদ্রমহিলা বললেন, “এসেছিলাম অনেক ক্ষোভ নিয়ে। কিন্তু তোমার এই অবস্থার কথা আমরা কেউ জানতাম না। কি আর বলব? তবুও বলি, আমাদের মেয়েটা অনেক দুঃখ, ক্ষোভ নিয়ে বিদেশে চলে গেছে। তোমার এই অবস্থার কথা ওকে জানাতে পারতে। ওর ভালোবাসায় একটু আস্থা রাখতে পারলে না? ও ঠিক মেনে নিত”।

সময়ের সাথে সাথে যে গভীর ক্ষতের গায়ে প্রাত্যাহিক বর্তমানের প্রলেপ পড়ছিল, সেই ক্ষত আবার যেন কেউ উস্কে দিল। একটা ঢেউ বুকের ভেতরে উথলে উঠল। অস্ফুটে বলল, “জানি মেনে নিত। কিন্তু এটাতো অল্প কয়েকদিনের ব্যাপার নয়। জীবন ভর ওকে এই বোঝা বইতে হত। হয়তো এক সময় ওর আফসোস হত। আপনাদেরও কি অনুশোচনা হত না একমাত্র আদরের মেয়ের এমন জীবনসঙ্গী হলে? আমার মনেও একটা অপরাধ বোধ কুরে কুরে খেত, মা”। তারপরে একটু থেমে আবার বলল, “ও কি সুখী হয় নি? রতনকাকার কাছে শুনেছি ওর স্বামী অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার। আপনি ভাববেন না, ও খুব সুখী হবে”        

“কি জানি বাবা। ফোনে মেয়ের গলা শুনে তো সেরকম কিছু.........। ছেলেদের মন আর মেয়েদের মন কি এক?”।

ধীর কণ্ঠে শিশিরবিন্দু বলল, “সত্যিই কি তাই? প্রায় বছর ঘুরতে চলল নয়নতারার বিয়ে হয়েছে। তবু ছেলে হয়েও কি আমি পারছি ভুলে থাকতে? আমার জীবন না হয় থমকে গেছে তাই অনেক বেশী স্মৃতি ভারাক্রান্ত হবার অবসর মেলে। নয়নতারা স্বামী, সংসার নিয়ে এক সময় সব ভুলে যাবে”।

আরও কিছুক্ষণ থেকে নয়নতারার মা চলে গেলেন। যাবার আগে শিশিরবিন্দু উনার কাছে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিল উনি যেন কোন অবস্থাতে ওর অন্ধত্বের খবর ওকে না জানান। কারণ ও জানে এটা শুনলে ওর ‘নয়ন’ আরও কষ্ট পাবে। তার চেয়ে ওর প্রতি ঘৃণা, ক্ষোভ ওকে আরও বেশী স্বামী, সংসারের দিকে মনযোগী করে তুলবে। কি বুঝলেন কে জানে, যাবার আগে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রবীণা শিশিরবিন্দুর মাথায়, গালে হাত বুলিয়ে বলে গেলেন, “তুমি ভাল থেকো। নিজের খেয়াল রেখ, বাবা”। শিশিরবিন্দু কিছু বলতে গেল, এক দলা কান্না মেশানো আবেগ ওর কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিল। ভদ্রমহিলা চলে যেতে ওর অস্থিরতা বহু গুণ বেড়ে গেল। তাহলে কি ও ভুল করল? সময়ের প্রলেপ ওর স্মৃতিগুলোকে চাপা দিতে পারেনি? নয়নতারা এখনও ওকে মনে রেখে দিয়েছে। ওর মা কেন এমন বলে গেল? শিশিরবিন্দু অন্তঃকরণে প্রার্থনা করেছে নয়নতারার মনে ওর প্রতি প্রবল ঘৃণার উদ্রেক হোক। মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিল এই বলে যে ছেলে মেয়ে হলে ওর মন পাল্টে যাবে।##

বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি আর শিশিরবিন্দুর এসরাজের সুর এক হয়ে এক বিষাদময় আবহ তৈরি করেছে। আসলে ওর ভেতরের কান্না এসরাজের সুর হয়ে ঘরের প্রতিটি কোনায় ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এই সময় কারুর উপস্থিতি ওর ভাল লাগে না। রতনকাকা জানে, তাই সেও এই সময় পারতপক্ষে ওকে বিরক্ত করে না। এক মনে কোন ধ্যানস্থ ঋষির মত এসরাজে ডুবে ছিল শিশিরবিন্দু কলিং বেলের আওয়াজ শুনতে পায় নি। এক নিঃশব্দ উপস্থিতি আর অনেক কাল আগের হলেও এখনও ওর অজান্তে সজীব এক প্রিয় শরীরী গন্ধ ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে জানান দিল ঘরে কেউ আছে। ও সচকিত হয়ে এসরাজ থামিয়ে অস্ফুটে বলল, “কে? কেউ আছ ঘরে?”

“বাজানো বন্ধ করলে কেন, শিশির? এইভাবে বুঝি মনের দুঃখটাকে চাপা দাও, মহান শিশিরবিন্দু। খুব মহান সাজার শখ, তাই না?”

এই দুর্যোগের সন্ধ্যায় এ কার কণ্ঠস্বর? এক অজানা শিহরণ ওকে আপাদমস্তক ঝাঁকুনি দিল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যেন বহু দূর থেকে, বহু যুগ পরে ভেসে আসা মন কেমন করা সেই গলা যা শোনার জন্য ওর সমস্ত অন্তরাত্মা ব্যাকুল হয়ে থাকত। ঢোঁক গিলে কোন মতে উচ্চারণ করল, “নয়ন? তুমি? সত্যি কি তুমি?”

নিঃশ্বাস প্রশ্বাস গায়ে এসে লাগে এমন কাছে এসে ফিফফিস করে সেই নারী বলল, “তুমি চাইতে আমি আসি? তাহলে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলে কেন? বলো কেন? আমাকে বুঝি ভরসা করতে পার নি? মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, যাবার আগে আমাকে সব বলে গেছেন”।

ধড়ফড় করে এসরাজ রেখে বিছানার ধারে এসে বসল, উঠে দাঁড়াতে গেল কিন্তু তার আগেই নয়নতারা ওর দুই কাঁধে হাত রেখে বলল,  “মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছি, সব ছেড়ে”।

অসহায় শিশুর মত দুটো হাত দিয়ে শিশিরবিন্দু ওকে আঁকড়ে ধরে ওর বুকের মধ্যে মুখ রেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। এ যেন অনেকদিনের অবরুদ্ধ কোন জলস্রোতের হঠাৎ মুক্তির সুযোগ পেয়ে প্রবল বেগে বেরিয়ে আসা। নয়নতারা ওর মাথা নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে ওকে কাঁদতে দিল, নিজেও কাঁদল। একটু শান্ত হতে শিশিরবিন্দু বলল, “তোমার স্বামী? সংসার? আমি যে তোমাকে সুখী দেখতে চেয়েছিলাম। তোমার বোঝা হতে চাইনি, নয়ন। তোমাকে সুখী দেখতে চেয়ে নিজের মনকে খুন করে ফেলেছিলাম। কতবার আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছি, পারিনি। আমিও ভাল ছিলাম না, একটুও না।”- কোন মতে কথাগুলো বলে আবার ওকে জড়িয়ে ধরল।

“ও আমাকে প্রথম থেকেই সন্দেহ করত, ক্রমশ ওর মানসিক অত্যাচার, অবহেলা বেড়ে গেছিল। তাছাড়াও এক বিদেশিনীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। অনেক কষ্টে বিদেশ বিভূঁইতে একা একা লড়াই করে ডিভোর্স নিয়ে চলে এসেছি। সে এক দীর্ঘ কাহিনী। পরে সব বলব। ওকে দোষ দিইনা। ওকে ঠকিয়ে ছিলাম। আমার মন পড়ে থাকত এখানে। তোমার জন্য, বাবা মায়ের জন্য। শরীরটা ওখানে ছিল, আত্মা এখানে। তাই ওকে একটুও দোষ দেই নি কোনদিন, এখনও না। ও সুখী হোক”।

শুনে কষ্ট পেল শিশিরবিন্দু। নয়নতারাকে ছেড়ে দিয়ে ওর হাত ধরে পাশে বসিয়ে বলল, “সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল, নয়ন। এসবের জন্য আমিই দায়ী”।

“জানো শিশির? মেয়েটাকেও ভালবাসত না। তাই ওকে নিজের কাস্টডিতে দাবী করেনি। এতে আমার সুবিধা হয়েছে। মেয়েও আদালতে আমার কাছে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। অবশ্য, অন্যের ঔরসজাত সন্তানকে ……….” কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে থেমে গেল নয়নতারা।

নয়নতারার শেষের কথাটা শুনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল শিশির। চিৎকার করে উঠল, “হোয়াট! কি বলছ তুমি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না”।

“শিশির, তোমার মনে আছে শান্তিনিকেতনের সেই বাঁধন ভাঙ্গা সন্ধ্যে, তারপরে রাতের কথা? সেদিনই আমার গর্ভে তুমি তোমার বীজ বপন করেছিলে। আমাদের ভালবাসার ফসল এই মেয়ে। পাগলের মতো তোমার খোঁজ করেছি। কিন্তু তুমি কোথায় হারিয়ে গেলে। যখন বুঝতে পারলাম আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল। মাকে সব বলেছিলাম, বাবাকে বলতে পারিনি। জানিনা মা বলেছিল কিনা? তারপরে ঈশ্বরের অসীম কৃপা। চট জলদি বিয়ে হয়ে গেল। ভাঙ্গা মন আর তোমার প্রতি এক চরম ঘৃণা নিয়ে কানাডা চলে গেলাম স্বামীর হাত ধরে”।

“ওঁকে বলো নি? তোমার স্বামী জানতেন না?”

“নাহ! ভয় পেয়েছিলাম। লোভও হয়েছিল। ভেবেছিলাম নিজের সন্তান ভেবে নেবে। সময়টা একটু এদিক ওদিক হলেও মোটামুটি খাপে খাপে মিলে গেছিল। কিন্তু লাভ হয় নি। ওর সন্দেহ হয়েছিল। নানাভাবে আমাকে বিয়ের আগে কোন সম্পর্ক, প্রেম ভালবাসা ছিল কিনা জানতে চাইত। দাঁতে দাঁত চেপে অস্বীকার করে গেছি। প্রাণপণে ওকে আঁকড়ে ধরেছি। মেয়ে হল। ভাবলাম শিশুর মুখ দেখে মনের পরিবর্তন হবে। কিন্তু তেমন কিছু হল না। ও অবশ্য ওখানকার সেরা হাসপাতালে সব ব্যাবস্থা করেছিল, স্বামী হিসেবে যা যা করনীয় সব করেছিল কিন্তু কোন উচ্ছাস ছিল না। এইভাবে কিছু বছর কেটে যাবার পরে একদিন ফোনে অসুস্থা মায়ের কাছে তোমার সাথে মায়ের দেখা করা, তোমার দৃষ্টি হারানোর কথা, আমাকে না বলার প্রতিশ্রুতি আদায় করার কথা সব শুনলাম”। ##

বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। ঘরে দুজন মানব মানবী অথচ এক অদ্ভুত নীরবতা। ঝড়ের পরে চরাচর জুড়ে যেমন এক নিস্তব্ধতা নেমে আসে তেমনি দুজনের মনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুনামি শেষে কথা হারিয়ে গেছে। নয়নতারাই প্রথম নীরবতা ভাঙল, “শিশির, মেয়ে যেন একেবারে তোমার মুখ বসানো”। হাহাকার করে উঠল শিশিরবিন্দু, “আমি যে ওকে দেখতে পাব না, নয়ন। কি পাপ করেছিলাম? ভগবান কেন আমাকে এই শাস্তি দিল”।

ওর মুখ দুহাতে ধরে নয়নতারা বলল, “কেন? আমার চোখ দিয়ে দেখবে। পারবে না?”

“পারব। আমাকে মেনে নেবে আমাদের মেয়ে? তুমি?”

“নেব তো। ওকে আমি সব বলব। ও খুব বুঝদার। এবার তোমাকে আমরা পালাতে দেব না”।

“আমাকে একটু ব্যাল্কনিতে নিয়ে যাবে?”

দুজনে একসাথে ব্যাল্কনির মধ্য দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিকে ছুঁয়ে থাকল। সেই পুরনো ভাল লাগা খুঁজে পাচ্ছে শিশিরবিন্দু। মনের ভেতরের বর্ষার রঙ ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে। নয়নতারার কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, “ এমন কেউ আছে যে আমাকে আর আমাদের মেয়েকে এক বর্ষায় শান্তিনিকেতন নিয়ে যাবে?”

ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে নয়নতারা বলল, “একজন আছে যে আসছে বাইশে শ্রাবণে প্রতিটি শিশিরবিন্দুকে সেখানে জড়ো করে ময়ূরাক্ষী হতে রাজী”। 



Rate this content
Log in

More bengali story from Partha Roy

Similar bengali story from Classics