Ariyam Bhattacharya

Abstract Crime Thriller


3  

Ariyam Bhattacharya

Abstract Crime Thriller


আমি রজত

আমি রজত

13 mins 30 13 mins 30


বিষয়বস্তু : Trueman Capote এর উপন্যাস " In Cold Blood " দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা আমার এই গল্পে উক্ত উপন্যাসের কোনো ছায়াই নেই। গল্পের প্রধান চরিত্র রজত বিশ্বাস হয়ত ঘৃণার উর্ধে পাঠকের মনোগ্রাহিতার পাত্র হয়ে উঠতে পারেন।


আমি রজত। রজত বিশ্বাস। নিবাস উত্তর কলকাতার ফরিয়া পুকুর।বয়স ৪২। বৃদ্ধা অবিবাহিতা পিসিমা আর সারাক্ষনের কাজের লোক বীরেন কে নিয়ে আমার পরিবার।বন্ধুবান্ধব বলতে বিশেষ কেউই নেই এবং সেজন্য মূলত আমিই দায়ী। জীবনে বন্ধু জিনিসটার সেরকম প্রয়োজন আমার কোনোদিনই হয়নি। কয়েকজন এর সাথে ছাত্রজীবনে বিশেষ সুসম্পর্ক থাকলেও গরজ এর অভাবে তার কোনোটাই টেকেনি। নিজেকে নিয়ে থাকতেই আমি পছন্দ করি। লোক চরাচরের অগোচরে আমার মনের গভীরে একটা মস্ত জগৎ আছে। সেই বিচিত্র জগতের অকৃত্রিম মায়া আমাকে আবিষ্ট করে রাখে সারাটা ক্ষণ। কাজকম্মো বলতে আমি একটি বীমা কোম্পানির একজন মাঝারি মাপের কেরানি। মাস গেলে যা আয় হয় তাতে আমার আর আমার ছোট্ট পরিবার এর দিব্যি চলে যায়। খরচাপাতি বড় একটা নেই। তবে দুটি জিনিস ছাড়া বস্তুত আমি পঙ্গু। উত্তম মানের স্কচ সেবন এবং ভ্রমণ । ভ্রমণের ক্ষেত্রে দুটি ব্যাপারে আমি বিশেষ খেয়াল রেখে চলি। প্রথমত এক যাওয়া এবং দ্বিতীয়ত এমন কোনো জায়গা বাছা যা বেশিরভাগ মানুষেরই অজানা।ভিড় ব্যাপারটা আমি একেবারেই বরদাস্ত করতে পারিনা।বলা বাহুল্য নিয়মিত ভাবে এই দুটি শখ পুরোমাত্রায় বজায় রাখতে হলে একটা ভালো অংকের টাকা থাকা প্রয়োজন। বাবা যা রেখে গেছেন তাতে ছোটোখাটো বিপদ আপদ সামলে দেওয়া যায় ঠিকই কিন্তু এই পিপাসা নিবৃত হয়না। এই অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের একটা খুবই চাঞ্চল্যকর উপায় আমার আছে এবং এই গল্পের (যদিও যা বলতে চলেছি তার প্রতিটি বর্ণ খাঁটি সত্য) মূল বিষয় সেইটে ঘিরেই। আমি একজন শখের খুনি। পেশাদার ঘাতক দের মতো সাংঘাতিক বা ভয়ঙ্কর কিছু না। আসলে আমি মানুষ মারতে ভালোবাসি। কাজটা শুরু করেছিলাম নিছক ভালোবাসা থেকেই তবে ওই দুই শখের কথা ভেবে নিজের প্রয়োজন মতো পারিশ্রমিক আমি নিয়ে থাকি। এমনিতে আমি বাস্তবিক ভীষণ ভীতু ও নিড়বিড়ে একটা লোক। পথে ঘাটে কোনোরকমের কোনো জটলা বা সোরগোলেও বেজায় অস্বস্তিতে পড়ি। ধাক্কাধাক্কি চিৎকার চেচামেচি পারতপক্ষে এড়িয়ে চলি। রক্ত দেখে রীতিমতো মূর্ছা যাই। তাই আমার খুনের ধরনও আমি নিজের সুবিধে মতো ঠিক করে নিয়েছি। বিশেষ আগ্রহ থাকার জন্য এই বিষয়ে বেশ গভীরে পড়াশুনো করে জানতে পারি মানুষের মস্তিষ্কের সামনের দিকে ফ্রন্টাল লোবের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশে একটা যুৎসই আঘাতেই মোটামুটি মৃত্যু সুনিশ্চিত ধরে নেওয়া সম্ভব। পূর্ণাঙ্গ মানুষের কাঠামো কল্পনা করে সঠিক জায়গাটা মনোযোগের সাথে ইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করি।তারপরে গবেষণা করে স্থির করে আঘাতের তীব্রতা। এই অক্লান্ত অনুশীলন চলেছিল প্রায় বছর তিন এক। আর তারপর ২০১১ সালের ২২এ নভেম্বর এসে পড়ে সেই চিরস্মরণীয় দিন। প্রথম অপারেশন,শিকারের হাতেখড়ি। সত্যি বলতে গেলে ভয় আমি পাইনি। একটা অদম্য কৌতূহল ছিল। দুপুরের শেষাশেষি যখন ঠিক ঠিকানায় পৌঁছে কলিং বেল এ আলতো চাপ দি তখন তার গল্ফগ্রীণ এর বাসায় প্রৌঢ়া পূর্ণিমা বসু বিকেলের চা পর্বের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সদ্য ছাপানো রঙিন ভিসিটিং কার্ড দেখিয়ে kitchen chimney রুটিন মেইনটেনেন্স এর অছিলায় এন্ট্রি পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। তারপর প্ল্যান মাফিক এক গেলাস জল চেয়ে সুযোগের অপেক্ষা এবং মাহেন্দ্রক্ষণে মোক্ষম আঘাত। বাকিটা ইতিহাস।কোনো রক্তপাত নয়,ধস্তাধস্তি নয়,নির্ঝঞ্ঝাট পরিপাটি কাজ। ম্যাডাম বসুর নিথর দেহটা দেখে যে কেউ তাঁকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বলেই মনে করতো। এর পর ধীরে ধীরে এই ক'বছরে শিকারের সংখ্যা পৌঁছেছে ১২ এ।


গৌরবময় উজ্জ্বল অধ্যায়। পুলিশ এর পাল্লায় পড়ে টানাটানি আর হেনস্থা হবার টেনশন বয়ে নিয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর মতো মনের জোর আমার নেই। তাই শিকার আমি সেই ভাবেই বেছে এসেছি যাতে বিশেষ তদন্ত বা থানা পুলিশের জটিলতা না থাকে। জায়গায় একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই আসে যে শিকার আমার অবধি এসে পৌঁছয় কিকরে। এই উপায় খুঁজে বের করতেও খরচ করতে হয়েছে বহু সময়। শেষটায় আমি কল্যাণের সন্ধান পেলাম।ভূপেন বোস এভিনিউ ধরে সোজা এগোলে যে একহারা গলিটা শ্যামপার্ক এর দিকে ডাইনে ঘুরেছে তার শেষ মাথায় একটা পান এর দোকান চালাতো কল্যাণ। নারায়ণ পান ভান্ডার। আমি নিয়মিত ছুটির দিন গুলোতে ওই পথে বিকেলের দিকে হাঁটতে যেতাম এবং অভ্যেস বশত কল্যাণের দোকান থেকে একটা করে পান মশলার পুরিয়া কিনে চিবোতে চিবোতে বাড়ি ফিরতাম। একদিন ওর দোকানে আমি পৌঁছনোর আগে থেকেই কয়েকজন লোক জটলা করে টালা চত্বরে ঘটে যাওয়া একটা বিশ্রী এক্সিডেন্ট নিয়ে কথা বলছিলো। হঠাৎই আমার দৃষ্টি কল্যাণের মুখের ওপর স্থির হয়ে গেলো। এক্সিডেন্ট এর বিশদ বিবরণ এবং আঘাতের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ যেভাবে লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে সে শুনছিলো এবং প্রশ্ন করে চলেছিল তাতে আমার কিরকম যেন মনে হলো ওর মনের মধ্যেও কোথাও মৃত্যু নিয়ে একটা ভীষণ উদ্দীপনা একটা দুরন্ত আগ্রহ বদ্ধমূল হয়ে আছে। আস্তে আস্তে আলাপ জমিয়ে ফেললাম।খুব ভিতর থেকে কে যেন সাহস জুগিয়েছিল।নিজের অদ্ভুত খেয়ালের কথা নিঃসংকোচে অথচ রয়ে সয়ে কল্যাণ কে বলতে শুরু করলাম। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গতা তৈরী হলো আমাদের মধ্যে। এই বিষয়ে একে অন্যকে আমরা নিজেদের মতো বিশ্বস করতে শুরু করলাম। বিশ্বাস যখন চরমে পৌঁছলো তখন আমরা একটা রফায় এলাম। শিকার আমার দরজায় পৌঁছে দেবার দায়িত্ব নিলো কল্যাণ। তবে যাকে তাকে নয়। এমন মক্কেল যাদের নিয়ে আমাকে পুলিশি মামলার ভয় পেতে হবেনা। অর্থাৎ হয় ভিক্টিম এতটাই নগন্য মানুষ,যার তিন কূলে কেউ নেই এবং সে নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো কারণ পুলিশের থাকতে পারে না , না হয় যিনি কাজটা দিচ্ছেন তিনি এতটাই প্রভাবশালী যে সমস্ত আইনি জটিলতা থেকে আমাকে নিরাপত্তা দেবার ক্ষমতা রাখেন। তার পরিবর্তে ওর জন্য একটা নির্ধারিত অংকের কমিশন। অস্ত্র হিসেবে বেছে নিলাম পেপার ওয়েইট। এতবড় শহরে এতো এতো বেওয়ারিশ অলি গলি ঝোপ ঝাড় নর্দমায় একটা ছোট্ট পেপার ওয়েইট নিশ্চিন্তে গা ঢাকা দিতে পারে। কাক পক্ষী তেও টের পাবার কোনো প্রশ্ন নেই। অর্থাৎ আর কোনো বাধাই রইলো না। 


এ যাবৎকাল যা যা বললাম সে সবই যাকে বলে পূর্বকথা। এবারে আসি আসল ঘটনায়। আমার সর্বশেষ অর্থাৎ ১২তম মক্কেল ছিলেন Mrs বেলা মল্লিক। কাজটি আমি পাই আজ থেকে মাস ৪এক আগে। সে পর্যন্ত যে এগারো জনকে আমি পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ভবসাগর পার করে দিয়ে এসেছি তার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আমার একটি মোক্ষম আঘাতই যথেষ্ট প্রমাণিত হয়েছিল। ক্লিন এন্ড ক্লিনিকাল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে গভীর তৃপ্তি আমি পেয়েছিলাম তা এক কথায় অনির্বচনীয়। কিন্তু সমস্ত হিসেবে গোলমাল হয়ে গেলো এই শেষ বারে। ছকে রাখা পথেই এগোচ্ছিলাম অথচ জানিনা কেন আঘাত টা নিখুঁত হলোনা। প্রথম বার। প্রথম বার আমি সফল হলাম না। আশ্চর্য ব্যাপার হলো এই যে এবারে কেন যেন মনে হচ্ছিলো পরিস্থিতি একটু বেশি ই সুবিধেজনক।


মহিলা যেন আমার আসার অপেক্ষাতেই ছিলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে এর আগে যতবার ভিক্টিম দের বাড়িতে ঢুকেছি প্রাথমিক ভাবে তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টিতে একটা সন্দেহের ভ্রুকুঞ্চন দেখেছি। একটা খটকা। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাকে প্রায় কোনো কথাই বলতে হলোনা। এবারে নির্বাচন কমিশন এর তরফে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সার্ভে করতে গিয়েছিলাম। ভদ্রমহিলা নিজেই চা অফার করলেন। তারপর অনেকটা সময় আমার দিকে পিছন ফিরে কিচেন এ ব্যস্ত থাকলেন Mrs মল্লিক। আমাকে তৈরী হয়ে নেবার সুযোগ দিলেন যেন। অথচ এতো বেশি রকম অনুকূল পরিস্থিতি পেয়েও আমি ফেল করি। যে আমি আদতে চোখ বন্ধ করেও লক্ষভেদ করতে পারি সেই আমার হাত শেষ মুহূর্তে কেঁপে গেলো।আঘাতের পর সম্ভবত জ্ঞান হারান Mrs মল্লিক। নিঃসাড় ঘুমন্ত শিকারের ওপর আক্রমণের অনুমতি দেয় না আমার হান্টিং কোড। অথচ কোনো উপায় ও ছিল না। চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়েই দ্বিতীয়বারের জন্য আঘাত করতে হয়। কাজ শেষ করে কোনোরকমে জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে আসি রাস্তায়। ধূমপান আমি করিনা বললেই চলে। তবে কিজানি মনে হতে সেদিন একটা সিগরেট ধরিয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাটতে থাকি বিবেকানন্দ রোড এর ক্রসিং পেরিয়ে সোজা কলেজ স্ট্রিট এর দিকে। কতক্ষন এভাবে হেটে গিয়েছিলাম মনে নেই। প্রায় ভোর রাতে ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন। তারপর টানা একসপ্তাহ ঘুমোতে পারিনি। চোখ বুজলেই সেই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। সমস্ত ঘটনাটা চোখের সামনে ভেসে উঠতো বারবার। Mrs মল্লিকের সেই নিথর দেহ , পাশে হাঁটু ভাঁজ করে বসা আমার হতভম্ব মুখ, হাতে ব্যর্থ পেপার ওয়েইট , চূর্ণ বিচূর্ণ চা এর কাপ ,মেঝের ঢাল বরাবর গড়িয়ে যাওয়া গাঢ় লাল তরল এই সবকিছু একসাথে যেন আমাকে গিলে খেতে আসতো। খাওয়া দাওয়ায় তীব্র অনীহা।


ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলার বহু চেষ্টা করেছিলাম। শোবার ঘর বদল করা থেকে শুরু করে দুদিনের ছুটিতে তাজপুর ঘুরে আসা। শেষে কিছুতেই কিছু না হওয়ায় অফিস এ অসুস্থতার কারণে লম্বা ছুটির দরখাস্ত দিয়ে নিজেকে ঘরবন্দি করে ফেললাম। এভাবে চললো আরো একটা মাস। ধীরে ধীরে মন শক্ত করলাম। স্থির করলাম এভাবে এই বিশ্রী যন্ত্রনা ভোগ করার চেয়ে পুলিশের কাছে সবকিছু বলে সারেন্ডার করাই শ্রেয়। খুন টা আমার কাছে ভীষণ পবিত্র একটা নেশা। খুনের প্রক্রিয়ায় সেই নিখুঁত শৈল্পিক ছোঁয়া টা না থাকলে জিনিসটা শুধুই একটা অপরাধ এ দাঁড়ায়। এমনটা তো আমি কোনোদিন চাইনি। এরপর আর এই জিনিস টেনে নিয়ে বেড়ানোর কোনো মানে থাকতে পারেনা। এখন আমার সাথে একজন দুষ্কৃতীর কার্যত আর কোনো তফাৎ নেই। এইভেবে ঠান্ডা মাথায় নিজের স্বীকারোক্তি যথা সাধ্য গুছিয়ে লিখে ফেললাম। আত্মসমর্পনের ঠিক একদিন আগে হঠাৎই আমার নাম পোস্ট এ দুটো বেশ মোটাসোটা খাম এসে হাজির হলো। একটাতে মিনিস্ট্রি অফ হোম অ্যাফেয়ার্স এর সিলমোহর আর অন্যটা হাতে লেখা একটা চিঠি। সেটাতে কোনো পোস্টঅফিসের উল্লেখ নেই। সাতপাঁচ না ভেবে চিঠিটাই প্রথমে পড়া স্থির করলাম। বড়োসড়ো ৭টা পাতা জুড়ে যা যা লেখা ছিল তার মোটামুটি খসড়া যতটা সম্ভব একইভাবে তুলে দেবার চেষ্টা করছি। সাথে এটাও বলে রাখি চিঠিটা পড়ার সময় আমার মনের অবস্থা যা হয়েছিল তা ব্যক্ত করার ভাষা আমার জানা নেই। অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতে আমার বিশ্বাস কোনোদিনই ছিলোনা। তবে যে ঘটনা সেদিন আমার সাথে ঘটে তার ব্যাখ্যা এজীবনে আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। 


মাননীয় রজত বাবু ,

আমি Mrs বেলা মল্লিক। আমাকে যে ভোলেননি আপনি সেটা আমি ভালো করেই জানি। তাই এর চেয়ে বেশি বিশদে নিজের পরিচয় দেবার দরকার দেখিনা।শুধু একটাই অনুরোধ। দয়া করে ভয় পাবেন না। আমার প্রতিটা কথা আপনার জানা বিশেষ জরুরি। না, কোনোরকম ভুল আপনার হচ্ছেনা। আমি সত্যি ই মারা গিয়েছি। কাজটা আপনি আপনার স্বভাব সিদ্ধ দক্ষতায় করতে পারেননি ঠিকই তবে যেভাবেই হোক শেষ করেছিলেন। আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার কাজটা অন্য কেউ নয় ,আমিই দিয়েছিলাম। হয়তো অবাক হবেন। কিন্তু নিয়তিকে খণ্ডানো চলেনা। এরকমটাই ছিল আমার ভাগ্যে। আমার হাসব্যান্ড মৃনাল বরাবরই খুব খোলামেলা স্বাধীন স্বভাবের মানুষ। আজ থেকে প্রায় ৮বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর আমি আসল মানুষ টাকে চেনার সুযোগ পাই। মৃনাল যা ই করতো ভীষণ মন থেকে করতো। কোনো জড়তা বা ভণিতার লেশ মাত্র ছিলোনা ওর মধ্যে। আর ওর এই প্রাণ খোলা ব্যাপারটাই সব থেকে বেশি আকৃষ্ট করতো আমায়। খিদিরপুর অঞ্চলে একটা মাঝারি গোছের প্রাইভেট ফার্ম এ সেলস এর চাকরি করতো মৃনাল। কাজটা ভালোবেসে না করলেও আমাকে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করার ক্ষেত্রে ওই চাকরি ই ছিল প্রধান ভরসা , এটা একপ্রকার মেনেই নিয়েছিল ও। মাইনে যা পেতো তাতে আমাদের ছোটোখাটো শখ আল্হাদ দিব্যি মিটে যাচ্ছিলো। স্বপ্নের মতো ছিল সেই দিনগুলো। এম্বিশন ব্যাপারটা আমাদের দুজনের ধাতেই ছিলোনা, জানেন? কিন্তু ওই, সুখ তা সে যে যেভাবেই দেখুক না কেন সবার জন্য পরিমান মতো আগে থেকেই বরাদ্দ থাকে। বেশি ,কম কোনোটাই সয় না কপালে।একটা সময়ের পর থেকে মৃনালের মধ্যে একটা পরিবর্তন বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকলো। চাকরি জীবনের এই নিয়মানুবর্তিতা,টানাপোড়েন এ ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগলো মৃনাল। ওর প্রাণখোলা হাসি,উদাত্ত গলায় গান ,ছোটছোট খুনসুটি,ছেলেমানুষি যেন আমার থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে লাগলো। ও যেন একটা অন্য মানুষ যাকে আমি চিনিনা। অথচ একসাথে এক ছাদের তলায় বসবাস। প্রথমটায় কিছু বলতে চাইতোনা। জিজ্ঞাসা করলে এড়িয়ে যেত। স্বাভাবিক আচরণ দেখানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু সেই চেষ্টা তো আর চিরস্থায়ী হতে পারে না।


ক্রমে সবকিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠলো। বেশ বুঝতে পারলাম এভাবে চলতে থাকলে মানুষটার যেটুকু অবশিষ্ট আছে তও হারিয়ে ফেলবো আমি। মৃনাল চায়নি। তবু একপ্রকার বাধ্য করলাম ওকে চাকরিটা ছাড়তে। আমাদের জয়েন্ট সেভিংস আর আমার নিজস্ব যা পুঁজি ছিল তাই দিয়ে আর ওর এক বাল্যবন্ধু তাপস এর সাহায্য নিয়ে নিজেদের মতো করে কিছু শুরু করার চেষ্টা করলাম। জন্ম নিলো "readers point " .একটা ইন্টারেক্টিভ লাইব্রেরি বলতে পারেন। কলকাতার বুকে এখনো এই ধরণের প্রচেষ্টা বিশেষ চোখে পড়েনা। আইডিয়া টা অবশ্য মৃনাল এরই। সুস্থ রুচির কিছু মানুষ একজায়গায় একত্রিত হয়ে পড়াশুনো এবং সাথে সাথে আলাপ আলোচনা, তর্ক বিতর্ক করবেন কফি সহযোগে। অল্প খরচায় এইরকম অভিনব একটা পদক্ষেপ শিক্ষিত তরুণ তরুণী দের কাছে ভয়ঙ্কর সাড়া ফেলে দিলো। যেরকম আমরা ভেবেছিলাম তার চাইতে বেশ কম সময়ের মধ্যে বহুগুন বেশি জনপ্রিয়তা পাই আমরা। কিন্তু আবার ফিরে যেতে হয় সেই পুরোনো কথায়।কতটা সুখ কপালে সইবে তা আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। সব ব্যবসার-ই গোড়ার দিকে বাজারে উদ্যোক্তাদের বেশ কিছু দেনা থাকে। সেসব ঠিকঠাক শোধ করে ওঠার আগেই নিজের অংশ বুঝে নিয়ে সরে গেলো তাপস।


মৃনালের কাছে এটা শুধুই রুজি রোজগারের জন্য একটা ব্যবসা ছিলোনা। reader's point ছিল ওর ধ্যান জ্ঞান,বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন।তার ওপর ব্যবসার কোনো অভিজ্ঞতাও ছিলোনা। তাই কাজসংক্রান্ত অনেক শর্তই মুখের কথায় বিশ্বাস করে স্থির করা হয়। ছোটবেলার বন্ধু এইভাবে এক লহমায় অচেনা হয়ে যেতে পারে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিলোনা ওর। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করেও একটা সময়ে দুজনেই বুঝলাম আমাদের পক্ষে এ জিনিস টেনে নিয়ে যাওয়া আর সম্ভব নয়। readers point বন্ধ হয়ে যাবে? তাহলে তো শেষ হয়ে যাবে মৃনাল ও। খুন হয়ে যাবে ওর স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্খা সবকিছু। একবার ওকে হারাতে হারাতে ফিরে পেয়েছি আমি। দ্বিতীয়বার সবকিছু তলিয়ে যাওয়া আমি সহ্য করতে পারবো না। পাগলের মতো সারা দিন রাত ভেবে যেতে লাগলাম কিকরে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব। একজন সৎ মানুষের নিষ্পাপ একটা স্বপ্ন কে কিকরে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া যায়। হঠাৎই মাথায় এলো ভাবনা টা। আমার নাম এ একটা হেভি ইন্সুরেন্স ছিল যার একমাত্র নমিনী মৃনাল। কিন্তু পলিসির শর্ত অনুযায়ী অপঘাত মৃত্যু ছাড়া সেই টাকা কিছুতেই আদায় করা সম্ভব না। তার ওপর কেস টা পড়তে হবে হোমিসাইড শাখায়। বিশ্বাস করুন আর কোনো রাস্তা আমার মাথায় এলো না। মন শক্ত করতে শুরু করলাম। জানতাম আমি চলে গেলে সে ধাক্কা মৃনাল এর পক্ষে সহ্য করা খুবই কঠিন। কিন্তু বিশ্বাস করতাম সময় ঠিক ভুলিয়ে দেবে সবকিছু।


ওর স্বপ্নই ওকে আবার মনের মতো করে বাঁচতে শেখাবে। মনস্থির করার পর কিকরে যে নারায়ণ পান ভান্ডার এর কল্যাণের সাথে যোগাযোগ হলো আর আপনার হদিশ পাওয়া গেলো সেকথা সবিস্তারে না বললেও চলে। আপনার কাজের ধরণ আগে থেকেই জানা ছিল। তাই যাতে আপনার সুবিধে হয় সেই মতো সবকিছু সাধ্যমতো সহজ করে দেবার চেষ্টা করেছি।আপনার প্রথম আঘাত যথাযথ হয়নি। অস্বাভাবিক যন্ত্রনায় আমার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা আর অন্ধকার হতে শুরু করে। হয়তো খেয়াল করেন নি পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছিলো আমার। বিশ্বাস করুন রজত বাবু সেটা মাথার সাংঘাতিক ব্যথায় নয়। আমি আপনাকে হেরে যেতে দেখছিলাম চোখের সামনে। আর আপনার হার মানে যে মৃনালের হার। কিন্তু সেই অর্ধচৈতন্য অবস্থাতেও আপনার চোখের যে অসহায় চাহনি আমি দেখেছি তাতে এটা স্পষ্ট যে আপনি ভীষণ খাঁটি একজন মানুষ। আপনার কাজের ধরণ সমাজের কাছে ভয়াবহ ও ঘৃণ্য হলেও পৃথিবীর কোনো পাপ আপনাকে স্পর্শ করতে পারেনি, তা আমি জানি। কতটা সৎ ও আন্তরিক হলে কোনো মানুষের মুখে অবিশ্বাস ও ব্যর্থতার ওই রূপ অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে তা সত্যি ই ভাষায় প্রকাশ করা ঈশ্বরের অসাধ্য।


তবে দ্বিতীয়বার আপনাকে পেপার ওয়েইট হাতে তুলে নিতে দেখে স্বস্তিতে চোখ বুজেছিলাম। তারপর কতক্ষন ওই অবস্থায় পড়েছিলাম জানিনা। যখন জ্ঞান হলো বেশ বুঝলাম আমি আর আমার আগের পৃথিবীতে নেই। আমার শান্ত সমাহিত দেহ তা কে আঁকড়ে ধরে পাথরের মতো বসে আছে মৃনাল। আরো কত লোকের ভিড়। সবাই কে খেয়াল ও করিনি। অনুভব করলাম আমার অস্তিত্ব ও যাবতীয় অনুভূতি বহু বহু গুন্ সুক্ষ হয়ে গিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝলাম বেশ কিছু অদ্ভুত অতি লৌকিক ক্ষমতাও জন্মেছে আমার ভিতর। তার বেশ কিছুটা কাজে লাগিয়ে অকুস্থল কে এমন চেহারা দিলাম যাতে এটা লুটপাটের ঘটনা বলে প্রমাণিত হয় এবং কারুর মনে কোনো সন্দেহ না থাকে।ইন্সুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে টাকাটা পেতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। মৃনাল এর স্বাভাবিক হতে আরো অনেক সময় লাগবে। তবে আগামী দিন গুলোতে আমি আমার যথাসাধ্য দিয়ে ওকে আগলে আগলে রাখবো। নতুন উদ্দমে ও আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখবে এ বিশ্বাস আমার আছে। কিন্তু জাগতিক বন্ধন মুক্ত হবার আগে আরো একটা কাজ বাকি থেকে গেছে আমার। সেই জন্যই এই এতো লম্বা চিঠি। উপায় যেমনি হোক না কেন তা সফল ভাবে সম্পন্ন হতো না যদি আপনি না থাকতেন।


আমার জীবনে আপনার ঋণ অশেষ। অর্থের নিক্তিতে তার ওজন স্থির করা চলে না।তবু ইন্সুরেন্স এর টাকার একটা অংশ অবশ্যই আপনার প্রাপ্য। এটাকে আমার আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতার একটা সামান্য নিদর্শন ভাবতে পারেন। ক্লেম সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে আপনাকে একটা বিনিয়োগী সংস্থার কিছু শেয়ার পাঠালাম। কাগজ গুলোয় সই করে আগামী মঙ্গলবার সকাল সকাল ১৭/বি ,পোলক স্ট্রিট পৌঁছে যাবেন।ক্রসিং থেকে ডান হাতে হলুদ দোতলা বিল্ডিং এর ফার্স্ট ফ্লোর এর দরজায় নক করবেন। মাঝারি গড়নের এক ভদ্রলোক আপনার কাছ থেকে কাগজ নিয়ে আপনাকে ক্যাশ টাকা দিয়ে দেবে। ভদ্রলোক নিজের নাম বলবেন পার্থসারথি নস্কর। টাকা আপনার হাতে পৌঁছনোর এক ঘন্টার মধ্যে সেই কোম্পানির ও র কোনো অস্তিত্ব থাকবেনা। সব গুলিয়ে যাচ্ছে? ঘাবড়াবেন না। এরকম বহু অদ্ভুতুড়ে ব্যবসা আছে এই শহরে। বিশদ আপনার না জানলেও চলবে। আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছিলেন তো? বাধা দেবোনা। মন থেকে যাতে সায় দেয় সেইটেই করবেন। তবে আমার একটাই কথা। নিজেকে কখনো পরাজিত ভাবেন না। সবসময় মনে রাখবেন একটা মূল্যহীন প্রাণের বদলে আপনি একটা নতুন স্বপ্ন আর তাকে ঘিরে বেড়ে ওঠা আরো অনেক অনেক সুস্থ সম্ভাবনাকে পুনঃজীবন দিয়েছেন। শুধু আপনার পথ টা আলাদা ছিল। এই দীর্ঘ পত্রালাপ আমার মতো হয়তো আপনিও ভুলতে পারবেন না কখনো। এটি আমাদের বন্ধুত্বের সাক্ষর হয়ে থেকে যাবে। 


                                                                                        ইতি ,

                                                                                        Mrs বেলা মল্লিক। 


বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝের দাগ টা ফিকে হতে হতে প্রায় মিলিয়ে এসেছিলো আমার কাছে। অন্য খাম টা খুলে দেখি share এর যাবতীয় কাগজপত্র এবং আমার সই ও ঝকঝকে নতুন ছবি দেওয়া পাসপোর্ট। তাতে আমার সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য স্পষ্ট অক্ষরে মুদ্রিত। সেসব তথ্য Mrs মল্লিক কিভাবে পেলেন ,কিভাবেই বা আমার অবিকল সই সেই কাগজে জায়গা পেলো তা জানতে চাইবার চেষ্টা করিনি আমি। কারণ সেগুলো স্বাভাবিক যুক্তি বুদ্ধির এক্তিয়ারে পড়েনা। 

এরপর আরো একমাস কেটে গেছে। কারুর জন্য ভালো কিছু করার আনন্দ যে কতটা পবিত্র তা আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন বেলা মল্লিক। আপাতত সিঙ্গাপুর হয়ে ব্রিসবেন এর পথে। ঘুরেই আসি। এতগুলো টাকা আর তাছাড়া পাসপোর্ট টার ও একটা গতি করা দরকার। ৬ঘন্টার লে ওভার। সেই ফাঁকে লেখাটা শেষ করলাম। এবার নতুন দেশ। নতুন মানুষ জন। বলা যায়না তাদের কেউ কেউ হয়তো বেলা মল্লিকের মতোই আমার অপেক্ষায় আছে। শুনেছি এখানে নাকি এই খুন টুন্ এর ব্যাপারে আইন বেশ মজার। ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট এর বালাই নেই। ধরা পড়লে জেল এর আদর আর মনস্তাত্ত্বিক কেন্দ্রগুলোর গবেষণার স্যাম্পল হয়ে ই না হয় বাকি জীবন টা কাটিয়ে দেওয়া যাবে।


Rate this content
Log in

More bengali story from Ariyam Bhattacharya

Similar bengali story from Abstract