আকাশের রঙ ফ্যাকাশে
আকাশের রঙ ফ্যাকাশে
ষষ্টিতম অধ্যায়
হাজির গ্রেপ্তারিতে তদন্তের নতুন দিগন্ত খুলে গেল । শিয়ালদা থানার ওসি পরমেশ্বর ভট্টাচার্য্য ভেবেছিলেন বড় কাতলা জালে আটকা পড়েছে; কিন্তু উত্তম রূপে উত্তম-মধ্যম দিতেই হাজি গড়গড় করে বলে দিয়েছে সে ত্রিলোকেশ্বরের ইশারায় সব কিছুই করেছে ।
মিঃ ভট্টাচার্য্য বললেন- ওঁরা কে কোথায় আছে বল?
পরমেশ্বর প্রথম থেকেই ত্রিলোকেশ্বরের প্রতি কঠোর মনোভাব নিয়েছিলেন। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন কি ভাবে তাঁকে আইনানুগ জব্দ করা যায় । প্রতিবারই বিফল হয়েছিলেন। ত্রিলোকেশ্বরকে না পেলেও তার সহযোগীকে ধরতে পেরে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালেন ।
হাজি বলল - ত্রিলোকেশ্বর মল্লিকপুর গ্রাম থেকে একজন বিবাহিতা মহিলাকে ধরে এনে সোনাগাছিতে পাচার করে দিয়েছেন । তারপর থেকে তিনিও উধাও । ফোন করলে ফোনও ধরছেন, বলছেন তিনি বাড়ীতেই আছেন ।
মিঃ ভট্টাচার্য্য রেডি হয়ে চললেন তাঁর বাড়ীর দিকে । ওদিকে মিঃ সন্তু মুখার্জীর নেতৃত্বে একদল বাহিনীও ২৬/২ বাড়ীটা ঘিরে রেখে ঊৎসব রায়চৌধুরীর সঙ্গে অন্দরমহলে গিয়ে ত্রিলোকেশ্বরকে পাকড়াও করেছেন ।
ধরার সঙ্গে সঙ্গে উৎসব রায়চৌধুরী তাঁর মোবাইল বাজেয়াপ্ত এবং ল্যাণ্ডফোনের তার কেটে যোগাযোগের মাধ্যম ছিন্ন করে দিয়েছেন ।
মিঃ রায়চৌধুরী বললেন - বাঁ দিকের জামার হাতাটা তুলুন তো মিঃ ছোট রক্ষিত ।
আস্তিন গোটাতেই বাবলুদার বয়ান মিলে গেল । একটা কালো লোমশ জড়ুল দেখতে পেয়ে বড়দা নি:সন্দেহ হয়ে গেলেন লোকটি ত্রিলোকেশ্বর রক্ষিতই। মিঃ মুখার্জীকে বললেন - এরেস্ট হিম । হি ইজ ত্রিলোকেশ্বর রক্ষিত এণ্ড লেট আস এনকোয়ার এবাউট দ্য কিডন্যাপড উইম্যান ।
তারপর ত্রিলোকেশ্বরকে বললেন - জ্যোৎস্না কোথায়?
- কে জ্যোৎস্না ? আমি কোন জ্যোৎস্না চাঁদনীকে জানি না ।
সন্তু মুখার্জী হাত মুচড়ে দিয়ে বললেন - চলুন, মেয়েটিকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন দেখাবেন।
বলে টানতে টানতে ওঁকে গাড়িতে তুললেন।
ত্রিলোকেশ্বর মৃদু হেসে বললেন - তোমরা তো জানো আমি কে । তা সত্ত্বেও যদি অসভ্যতা কর তবে ধরে নাও তোমাদের লাইফ আজই ডুম হয়ে গেল ।
অমনি এলোপাথাড়ি কিল চড় পড়তে শুরু করল তাঁর উপর। গুরুতর আঘাত পেয়ে বললেন - ওকে কি আর পাওয়া যাবে ; এতক্ষণে সে অনেক দূরে পাড়ি দিয়েছে। বাবলুদা কান্নাকাটি শুরু করল । বড়দা ওকে চিমটি কেটে জানিয়ে দিলেন এ সব বাজে কথা । আমরা ঠিক খুঁজে বের করব ।
পথে পরমেশ্বর ভট্টাচার্য্যের পল্টনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল । দুই থানার পুলিশ হাজির কথামত চলল সোনাগাছির দিকে । গণিকাপল্লীতে এত পুলিশের আগমন দেখে যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে । হাজি বলল - অনিমামাসীকে ধরুন স্যার । দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হো যায়েগা । মিঃ ভট্টাচার্য্যের সঙ্গে সন্তু মুখার্জীর কথা হল ।
পুলিশের গাড়ি ঘিঞ্জি গলি পেরোতে পারল না দেখে ত্রিলোকেশ্বরের মুখে হাসি ফুটল। কিন্তু পুলিশের দল পায়ে হেঁটে কিছুটা ভেতরে ঢুকে অনিমা মাসীকে পেয়ে গেল ।
- এই যে মেয়ে !
পরমেশ্বর বললেন - কাল যে নতুন মুখটি এখানে জয়েন করেছে তাকে ডাকো ।
- কি আমার পেয়ারের নাগর গো ! বলি আমি কি জানি কত মেয়েই তো আসে - কোনটা তোমাদের মেয়ে ।
সন্তু মুখার্জী বললেন - জানবে জানবে । দু'চার ঘা পিঠে পড়লেই সব বুদ্ধি বেরিয়ে আসবে । নাও শিগগির বল দেখি মেয়েটি কোথায়? নইলে তোমার গুষ্ঠিশুদ্ধ সবাইকে থানায় তুলে নিয়ে যাব ।
- আ: মিন্সে ! মেয়েটার নাম বলবে তো ?
বাবলুদা ঝটিতি বলে দিল জ্যোৎস্না । অনিমা মাসী ওর মুখের দিকে চেয়ে বলল- তোমারই ইস্তিরি বুঝি ?
পরমেশ্বর বললেন - এত কথা কিসের? ডাক ওকে ।
মাসী ভেতরে গেল । বড়দাও পিছু নিলেন । একটা অন্ধকার ঘরে বসে জ্যোৎস্না ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। খপ করে জ্যোৎস্নার হাত ধরে বললেন - কোন ভয় নেই জ্যোৎস্না । ওই দেখ বাবলু এসেছে তোমাকে নিয়ে যেতে।
জ্যোৎস্না যেন প্রাণ ফিরে পেল । বড়দা বললেন - তোমার উপর কি কি অত্যাচার হয়েছে পুলিশকে বল।
মাসী বলল - কিছু হয়নি রে ড্যাকরা । কেউ ছোঁয়নি। এই তো সবে আজই এসেছে । এখনও তো পোষ মানানো যায়নি ।
বড়দা লাল লাল চোখ পাকিয়ে মাসীকে বললেন - চুপ কর। তোমাকেও থানায় যেতে হবে । মিঃ মুখার্জী একেও এরেস্ট করুন ।
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েপুলিশ এসে হাতকড়া পরিয়ে দিল ।
পরমেশ্বর বললেন - আজ সকালে কার মুখ দেখে উঠেছি যেন ...
মিঃ মুখার্জী বড়দাকে অজস্র ধন্যবাদ জানালেন । আসামীরা কোন থানায় যাবে তা' নিয়ে পরমেশ্বর এবং সন্তু মুখার্জীর মধ্যে তর্ক হল । এক সময় বিতর্ক এমন পর্য্যায়ে উঠল যে বড়দাকে হস্তক্ষেপ করতে হল ।
বড়দা বললেন - আমার স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনারা বিতর্কে জড়াবেন না । এই কেস লালবাজারে তুলে দিন ।
বলে তিনি রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরে ফোন করলেন । সচিব বসুমিত্র চক্রবর্তী নির্দেশ দিলেন সব আসামীদের নিয়ে ভবানী ভবনে সি আই ডির হাতে তুলে দিতে ।
আর তো কিছু বলার নেই । ওঁরা চললেন কালীঘাটের পথ ধরে ।
ভবানী ভবনে সি আই ডি জেরা করতে লাগল । প্রথমে ডাক পড়ল অনিমার । মধ্যবয়সী এই মহিলা যে যৌবনে জৌলুসপূর্ণ ছিল এই বয়সেও তার ছাপ থেকে গেছে।
- তোমার এই ব্যবসা কতদিনের ?
- বছর দশেক হবে ।
- তুমি কোথাকার মেয়ে ? কে তোমাকে এই ব্যবসায় এনেছে।
- আমি চুয়াডাঙার এক গরীব কৃষকের মেয়ে । ষোলো বছর বয়সে মা চলে যায় বাবাকে ছেড়ে দিয়ে। আমার বাবা আমাকে খেতে দিতে পারত না । রোজগারের আশায় কলকাতায় আসি । শিয়ালদায় নেমে কোথায় যাব ঠিক করতে না পেরে পথে পথে ঘুরছি দেখে একজন আমাকে তার বাড়ী নিয়ে যায় ।
- কি নাম তার ?
- আ মলো যা ! আমি কি অতশত জানি । খাচ্ছি দাচ্ছি রাতে লোকটার বিছানায় ঘুমোচ্ছি - ভেবেছিলাম এমনিই কেটে যাবে । কিন্তু যখন জানতে পারলাম লোকটা মোছলমান ; পালিয়ে গেলাম । সে কিন্তু আমাকে বলেছিল নিকে করবে । আমি রাজী হইনি । বাড়ী ফিরতে আবার শিয়ালদা এলাম । লোকটা আবার ধরে ফেলল । এবার আমাকে সোনাগাছির এক দালালের কাছে পঞ্চাশ হাজারে বিক্রি করে দিল । ওই দালাল আমাকে খদ্দের জোগাড় করার ভার দিল এবং বলল ' এই মধুচক্রের তুই মক্ষীরাণী । মাসে চল্লিশ হাজারে রফা করে নিল । প্রথমে যে লোকটা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল ; সেও মাঝে মাঝে আসত । বিনি পয়সায় মজা লুটে চলে যেত । কিছু বলতে গেলেই বলত জানে মেরে দেব । জানিস আমি কে ? মুর্তজা । বিখ্যাত রক্ষিত বাড়ীর চিফ সিকিউরিটি।
- মুর্তজা ? আরে এ কি সেই মুর্তজা - যে কিছুদিন আগে রথীন সমাদ্দারকে খুন করেছে ?
- হতে পারে । চামারটা ওই রকমই ছিল হিংস্র।
এবার সি আই ডি অফিসার বললেন - তার এক সাগরেদকে ধরেছি । ওর নাম হাজি মস্তান । চেন নাকি ওকে ?
- দেখলে বলতে পারব বাবু ।
হাজিকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল । অনিমা ওকে দেখে বলল - এই হতচ্ছাড়াটা এখনও আমার ডেলি খদ্দের । তবে ওর আবার রোজ রোজ নতুন মাল চাই । সেজন্যই ছোটকত্তা যখন জ্যোৎস্নাকে দিয়ে গেলেন আমি ওকে ফোনে ডেকেছিলাম । আসেনি । কেন তা' জানি না ।
- ছোটকত্তাটি কে ? দেখ তো ওই যে বুড়োটা গুড়িসুড়ি মেরে বসে আছে ও কি ?
অনিমা দেখল । চিনতেও পারল । কিন্তু বলল - না । ওঁকে তো কখনও দেখি নাই !
- ভালো করে দেখ । মুখটা দেখাব ?
অফিসারটি ত্রিলোকেশ্বরকে ডেকে পাঠালেন। সামনে আসতেই অনিমা ছলছল চোখে তাঁকে বললেন - এবারকার মত বাঁচাও কত্তা । আমি তো কোন দোষ করি নাই । এরা শুধু শুধু আমাকে ধরে এনেছে।
ত্রিলোকেশ্বর রক্ষিত কিছু না বলে বাইরে যাবার জন্য যেই মুখ ঘুরিয়েছেন সি আই ডি অফিসারটি বাধা দিয়ে বললেন - উঁহু ! আগে ওর সঙ্গে কথা বলে যান ।
ত্রিলোকেশ্বর তখনও স্ব মেজাজেই রয়েছেন ।- কি বলব ? আর একটা বেশ্যার সঙ্গে আমার কি আলোচনা থাকতে পারে ? তোমরা এবার কর্মফল ভোগ কর । আমাকে এরেস্ট করে যে পাপ করলে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না ?
- সে আদালতে দেখা যাবে মিঃ রক্ষিত । চলুন এবার আপনার পালা । কিছু খাতিরদারি না করলে চলে !
( চলবে )
-
