Drishan Banerjee

Thriller


3  

Drishan Banerjee

Thriller


আইভরী মূর্তি রহস‍্য (শেষপর্ব)

আইভরী মূর্তি রহস‍্য (শেষপর্ব)

19 mins 16.5K 19 mins 16.5K

ওনার সাথে আলোক আর সাহানা গিয়ে ঢুকল বড় হল পেরিয়ে শয়ন কক্ষে।

বড় ঘরের মাঝে একটা বড় খাট। একধারে রাইটিং টেবিল। দেওয়াল আলমারি, একদিকে বিশাল ইংরেজ আমলের বেলজিয়াম্ গ্লাসের ড্রেসিং টেবিল। তার পাশের দেওয়ালে একটা হাতির পালের বাঁধানো অয়েল্ পেইন্টিং। সেটাকে ঠেলে সরাতেই দেওয়ালের গায়ে সিন্দুকটা রয়েছে। ড্রয়ার থেকে চাবি এনে আট ডিজিটের কোড দিয়ে রমলাদেবী সিন্দুক খুলতেই ভেতর ফাঁকা দেখা গেলো। আলোক কি একটা টুকরো তুলে আনল ভেতর থেকে। ভালো করে তালা আর লক্ লক্ষ্য করে বলল -"কোড জেনেই খোলা হয়েছে। "

-"আচ্ছা, মূর্তিটা কি ভাবে থাকত? কোনও বাক্সে ?...." সাহানার প্রশ্নের উত্তরে রমলা দেবী বললেন -"একটা হলুদ ভেলভেট কাপড়ে মোড়া থাকতো। " ফোন থেকে কয়েকটা ছবি বার করলেন উনি। গতবার পূজার ছবি। হাতির পিঠে বিশ্বকর্মা। মাথার ছাতা সহ সিংহাসনটা সোনা, হিরা, চুনি, পান্না খচিত। হাতির দাঁতের মূর্তির মাথায় রত্ন খচিত মুকুট। গলায় সোনার রত্ন খচিত বর্ম। আলোক ফটোটা নিজের ফোনে সেভ্ করে নিলো।

-''কিন্তু তদন্ত করতে গেলে সবার সাথে কথা বলতে হবে। আপনার ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। " আলোক বলে।

-"সে হবে জানি। তবে রিও নেয় নি। ও মাঝে মধ্যে অল্প-স্বল্প টাকা চেয়ে নেয় ঠিকই, তবে এ কাজ ও করবে না। "

-"আচ্ছা মূর্তিটা ইনসিওরেন্স করা ছিল ? মূল্য কেমন হবে? যদিও এসব জিনিসের এ্যান্টিক ভ‍্যালু হয় অনেক। " সাহানা জানতে চায়।

-"আমার স্বামী বেঁচে থাকতে ভ‍্যালুয়েশন হয়েছিল তিন লাখ। আজকের দিনে তা কত হবে জানি না। ইনসিওরেন্স করাই হয় নি। তবে বেশ কয়েক মাস আগে একটা অদ্ভুত ফোন এসেছিল দু বার। প্রথমবার মূর্তিটা কিনতে চেয়ে কেউ ফোন করেছিল। দশ লাখ অবধি দাম দেবে বলেছিল। আমি বলেছিলাম কোটি-টাকাতেও দেবো না ওটা।এর দু সপ্তাহ পর আরেকটা ফোন আসে। মূর্তিটা নাকি খারাপ, ওটা ঘরে রাখলে বিপদ এসব বলছিল কেউ। পাত্তা দেই নি আর।"

-"সেই নম্বর গুলো পাওয়া যাবে কি ? " আলোক প্রশ্ন করে।

-"না, সেভ্ করি নি কখনো। কত আননোন্ কল আসে। নম্বর চিনতেও পারবো না দেখলে। আসলে এমন হতে পারে ভাবি নি কখনো। "

-"তবুও নম্বর টা পেলে সুবিধা হতো। একটু কয়েক মাস আগের কল্ লিস্ট চেক করে যদি বলতে পারেন, ভাল হয়। আচ্ছা, আমাদের কথা কে বলল আপনাকে?"

-"আমার এক বান্ধবী আছে কলকাতায়। তার কাছে গত বছর আপনাদের গল্প শুনেছিলাম। তাকে ফোন করেই নম্বর পেয়েছিলাম। তবে মূর্তির কথা বলি নি। বাগানের কোনও ব‍্যাপার বলেছিলাম। "

সাহানা আর আলোক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরটা দেখছিল, দক্ষিণ পূর্ব কোনের ঘর। ওধারে বাগান চোখে পড়ছে। এ্যাটাচ্ বড় বাথরুম। বাথরুম থেকে বার হলেই আয়নায় সিন্দুকের দেওয়াল দেখা যাবে। চোর যদি সত্যি ঐ সময় চুরি করে থাকে, তবে অনেক ঝুঁকি নিয়েছে। রমলা দেবী কতক্ষণ বাথরুমে থাকবেন চোর জানতো তার মানে। 

প্রথমেই ছকুয়াকাকাকে ডাকা হল। বয়স সত্তর থেকে আশি, বেশিও হতে পারে। কিন্তু আদিবাসীদের চেহারায় বয়স বোঝা যায় না ঠিক। বেঁটে-খাটো চেহারা, চুল দাড়িতে সাদা ছোপ ধরেছে। রমলা দেবী বললেন -"কাকা, এরা একটু তোমার সাথে কথা বলবেন।"

বৃদ্ধ আলোকের দিকে তাকাতেই আলোক বলল -"আপনি তো সব শুনেছেন। কি মনে হয় ? কে করতে পারে এই চুরি ?"

-"আমি নিজেই বুঝতে পারছি না, বিটিয়া আর বাবুয়া ছাড়া নম্বর কেউ জানতো না। এটাই ভাবছি এই কয়েকদিন ধরে।বিটিয়া আর বাবুয়া তো নিজের জিনিস চুরি করবে না কখনো!" " ওনার বাংলায় একটা টান রয়েছে এদেশীয়। 

-"কাউকে এদিকে ঢুকতে বা বার হতে দেখেছেন কখনো? যাদের এদিকে আসার কথা নয়। " আলোক প্রশ্ন করে।

-"না এদিকে দু জন কাজের লোক, আমি আর আমার বৌ ছাড়া কেউ আসে না। সারাদিন বন্ধই থাকে এদিকটা। বিটিয়া ফিরলে খুলে দেই আমরা। বাবুয়া তো এদিকে আসেই না প্রায়। আউট হাউসেই থাকে। ম্যানেজার সাব আসলে অফিসেই বসে। সেদিন সকালেও এসেছিল ম্যানেজার। বিটিয়ার দেরি দেখে চলে গেলো। পরে দুপুরে এসেছিল আবার। "

আলোক রমলাদেবীর দিকে তাকাতেই উনি বলেন।-"আসলে আমি ভোর পাঁচটায় উঠি, একটু লনে হাটি। তারপর ছটায় স্নানে যাই। সাতটার মধ্যে অফিসঘরে ঢুকে যাই। বন্ধন বাবু সাতটায় বাগান ঘুরে একবার আসেন। সেদিন ভোরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল বলে আবার ঘুমিয়ে গেছিলাম বোধহয়। উঠে দেখি সাতটা বেজে গেছে। সোজা স্নান করে বার হতে হতে সাড়ে সাতটা, তখন আবার ঘরে ঢুকে দেখি এ অবস্থা।"

আলোক ভুরু কুচকে বলে -"সকালে যখন উঠলেন সিন্দুক বন্ধ ছিল আপনি শিওর? রাতেও চুরি হতে পারে!!"

-"তা অবশ্য মনে নেই। তবে যদি তখন ফটোটা বেঁকে থাকতো চোখে পড়ত নিশ্চই। " রমলা দেবীকে চিন্তিত দেখায়।

-"তার মানে চুরিটা রাতেও হতে পারে। " সাহানা বলে। এতক্ষণ ও মোবাইলে সব রেকর্ড করছিল।

-"রাতে আমি সেদিন গভীর-ঘুমে ছিলাম। বহুদিন পর ভাল ঘুম হয়েছিল। এতো ভালো ঘুম কিন্তু আজকাল হয় না। সে দিন বৃষ্টির রাতে এক কাপ কফি খেয়ে শুয়ে ছিলাম মনে আছে। "

-"কফি কি রোজ খান রাতে?"

-" বৃষ্টি হলে বা শীতকালে খাই।"

-"এখন কি রিও বাবুর সাথে কথা বলা যাবে?" আলোক জিজ্ঞেস করে রমলা দেবীকে।

-"দুপুরে খেতে আসবে ও। বলেছি ব‍্যবসার কাজে কয়েকজন গেস্ট আসবে। তখন কথা বলবেন না হয়। আপাতত বাকি কাজের লোকদের ডেকে দিচ্ছি। " রমলাদেবীর ইশারায় ছকুয়া কাকা বেরিয়ে গেলো বাকিদের ডাকতে। সবাই বড় হল ঘরে এসে বসলো। দু জন পরিচারিকাকে প্রশ্ন করেও কিছুই জানা গেলো না। 

বাগানে ঘুরতে ঘুরতে আউট-হাউসের কাছে চলে এসেছিল সাহানা। একটা প্রজাপতির ছবি তুলছিল মন দিয়ে। হঠাৎ একটা চাপা গলা কানে এলো , কেউ বলছে, -"কলকাতা থেকে দু জন এসেছে। " .........

-"না, আপাতত সব ঠিক আছে। ".......

-" আর কয়েকদিন লাগবে মনে হয়। ".....

সাহানা আউট হাউসের দিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। চারপাশটা ঘুরে দেখে চলে এলো। দুপুরেও রিও খেতে এলো না। ও নাকি গরু-বাথানের উপর কোথায় কাজে গেছে। রমলাদেবী বেশ বিরক্ত বোঝা যাচ্ছিল। আলোক বলল -"এবার ওনাকে জানিয়ে দিন কি হয়েছে। আমার কাজ করতে সুবিধা হবে তাতে। "

রমলাদেবী দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিলেন। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

দুপুরের খাবার খেয়ে আলোকরা বাগান দেখতে গেছিল। বন্ধন বাবু ওদের ফ্যাক্টরি ঘুরিয়ে দেখালেন। দশ বছর আগে রমলাদেবী কিছু মেশিন বদলেছিলেন। তাই প্রোডাকশন ভালোই। অন্য বাগান গুলো যখন মুখ থুবড়ে পড়ছে ওনাদের বাগানে ভালো আয় হচ্ছে।ওদের বাগানের পাতার কোয়ালিটিও ভালো। লেবারদের সাথে সম্পর্ক ভাল। রমলাদেবী নিজে সব দিকে খেয়াল রাখেন। 

বন্ধন বাবুকে ফেরার পথে রিও'র কথা জিজ্ঞেস করেছিল আলোক। উনি বললেন ইদানীং ওর বাইরে থেকে রিসার্চের টাকা ঠিকমত আসছে না। তাই ব‍্যবসার থেকে টাকা চাইছে বার বার। দু তিনবার ম‍্যাডাম দিয়েছেন টাকা। তবে বার বার বললেন এসব কথা ম‍্যাডামকে বলতে না। 

সন্ধ্যায় দেখা হল রিওর সাথে। সব শুনে ও ভীষণ অবাক। একটু রাগ হয়েছিল। বাইরে থেকে মা গোয়েন্দা আনাল অথচ চুরির খবর ও জানলো না। তবে বেশি এসব আলোচনায় না গিয়ে ও আলোক ও সাহানাকে বলল যা যা জানতে চায় ওর থেকে জেনে নিতে।

-" আপনি কি নিয়ে রিসার্চ করছেন ?" আলোক প্রশ্ন করে।

-"এই অঞ্চলে কিছু খনিজ পদার্থর উপর , তবে এর বেশি বলা যাবে না।কোম্পানির বারণ আছে। "

-''আপনার কোম্পানির নাম জানতে পারি কি ? "

-"পিন ওয়েল্থ রিসার্চ এন্ড ডেভলপম‍্যান্ট, এটা একটা আমেরিকান কোম্পানি। সরকারের পারমিশন নিয়ে আমরা কাজ করছি। "

-"আপনার প্রয়োজনীয় টাকা ঠিকমত আসছে ? ওরা আপনার কাজে খুশি ?"আলোকের এই প্রশ্নে একটু হকচকিয়ে উঠল রিও। 

বলল, -" টাকা আসছে, তবে কখনো দেরি হয়, কখনো ঠিক সময়ে ঢোকে। তবে এসে যায়। "

-"এই বিশ্বকর্মার মূর্তিটার দাম জানতেন ?"

এবার চমকে ওঠে রিও। বলে,-" না, আমি ওটা শেষ কবে দেখেছি মনে নেই। বেশ কয়েক বছর আমি দেশের বাইরে। গত বিশ্বকর্মা পূজাতেও বাইরে ছিলাম। "

-"আপনার মায়ের কাছে ওটা কিনতে চেয়ে ফোন এসেছিল জানতেন?" আলোকের প্রশ্নে রিও একটু চুপসে যায়।

-"শুনেছিলাম বোধহয়। মনে নেই । আসলে রিসার্চটা এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, আমি অন্য কিছু ভাবছি না আপাতত। " ধীরে উত্তর দেয় রিও।

-" আপনি আর আপনার মা ছাড়া কেউ জানতো না ঐ সিন্দুকের লক্ নম্বর। ওটা লক্ নম্বর দিয়েই খোলা হয়েছিল। এই বিষয়ে কি মনে হয় ?"

আলোক আস্তে করে মোক্ষম প্রশ্নটা ছুড়ে দেয়।

-" আমি জানি না।....... ." 

রিওর কথার মধ্যেই রমলা দেবী বলেন -"নম্বরটা ছমাস আগেই বদলেছিলাম। নতুন নম্বর আমি আর রিও ছাড়া কেউ জানতো না। রিও, তোমায় মেসেজ্ করেছিলাম নম্বরটা। মনে নেই ?"

আলোক একটু নড়ে চড়ে বসে। বলে, -"হঠাৎ নম্বর বদল কেন?"

-"প্রতি তিন বছরে সিন্ধুকের কোম্পানি লোক সার্ভিসিং এ আসে। লক্ কাজ করছে কিনা বা অন্য অসুবিধা দেখতে। ওরা চলে গেলেই নম্বর বদলে ফেলি। এটা বরাবর করে আসছি। রিও বাইরে ছিল। ওকে ম‍েসেজ্ করেছিলাম কোডটা। আর ফোনে বলেছিলাম যে ওটা সিন্দুকের লক্ নম্বর।"রমলা দেবী বলেন।

-"ও , হ্যাঁ মনে পড়েছে। আমি তো কখনো সিন্দুকটা খুলি নি, তাই ওটা মনে ছিল না। " রিও বলল।

-"এই মুহূর্তে সিন্দুকের নম্বর আপনার মনে আছে?" আলোক রিও কে জিগ্যেস করে।

-" হ্যাঁ, ওটা সোজা, প্রথম চারটে ডিজিট্ আমার ইয়ার অফ বার্থ, পরের চারটে ডিজিট্ বাবার ইয়ার অফ ডেথ্। মা এভাবেই নম্বর সেট করতো প্রতিবার। আর মেসেজে নম্বর নয়, এই কথাটাই লিখত। এর আগের নম্বর ছিল দাদুর ইয়ার অফ ডেথ, আর মায়ের ইয়ার অফ বার্থ। তার আগে ছিল মায়ের ইয়ার অফ ম‍্যারেজ আর বাবার ডেট অফ বার্থ। এভাবেই চলতো লক্ নম্বর। আমিও এভাবেই সব পাসওয়ার্ড দিই সব জায়গায়।"

আলোক আর সাহানার মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হয়। আলোক বলে -"তোমার এই ম‍েসেজ্ কারো চোখে পড়েছিলো মনে হয়?"

-"না, চান্স কম। তবে এখন রিসার্চের ব‍্যাপারে অনেকেই ফোন ধরে।পুরানো কি ম‍েসেজ্ কি কেউ ঘাঁটবে ? মনে হয় না। ম‍েসেজ্ টা ফোনে আছে কিনা তাও জানি না। " বলেই রিও একটা আই ফোন বার করলো পকেট থেকে।ম‍েসেজ্ পাওয়া গেলো ফোনে। রাতের খাবার খেয়ে সাহানা আর আলোক নিজেদের রুমে এসে বসলো। সাহানা জানালা দিয়ে চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাওয়া বাগান দেখছিল। ম‍্যাডাম বলেছেন এখানে চিতার উপদ্রব আছে। রাতে বাইরে বার হতে না। একটু পরেই বৃষ্টি নামলো। বাংলোর টিনের চালে বৃষ্টির আওয়াজ দারুণ লাগছিল। সাহানা আলোকের চিন্তিত মুখ দেখে বলল,-"কি ভাবছ এতো? প্রকৃতিকে উপভোগ করো। দেখো , মাথা খুলবে তাড়াতাড়ি। " 

-"অঙ্কটা কেমন জট পাকিয়ে গেলো। এতক্ষণ জানতাম ওনারা দুজন জানে লক্ নম্বর , এখন দেখছি পাওয়া গেলো ফোনে। মেসেজের কল্যাণে অনেকেই জানতে পারে। রমলাদেবীর ফোনটাও তো কারো হাতে পড়তে পারে।বন্ধন বাবু সব সময় আসছেন। এখানে সবাই জানতো সিন্দুক কোম্পানির লোক এসেছে। নম্বর বদল হবে। ম‍্যাডাম নম্বর ছেলেকে জানাবে। যদি কেউ সে সময় মোবাইলটা ঘাঁটে সে এটা জেনে যাবে। এবার ছেলের ইয়ার অফ বার্থ আর ওনার স্বামীর মৃত্যুদিন জানা কোনো কঠিন কাজ নয়। "

-"ওনার ঘরে ঢুকে সিন্দুক কোথায় আছে জেনে, চাবি কোথায় জেনে, তবে চুরি করতে পারবে চোর। এ সুযোগ ম্যানেজার আর কাজের লোকদের ছাড়া কারো ছিল না কিন্তু। তবে এবার তোমায় একটা অন্য খবর দেবো। " সাহানা আউট হাউসের বাইরে থেকে যা শুনেছিল বলল আলোককে।

পরদিন সকালে ঝকঝকে কাঞ্চন ঝঙ্ঘা দেখে ওদের ঘুম ভাঙ্গল। বহু দূরে হলেও নীল আকাশ আর সবুজ পাহাড়ের মাঝে শ্বেত শুভ্র শিখর দেখতে ভালো লাগছিল। আলোক সকালের চা খেয়েই আউট হাউসে গেলো। প্রথম ঘরটায় গোটা তিন কম্পিউটার। দেয়ালে নানা রকম চার্ট, একটা ছেলে আর রিও বসে চা খাচ্ছিল। রিও বলল -" আসুন, বলুন কি করতে পারি আমি। "

-"আপনার ছেলে দের সাথে একটু কথা বলব। " আলোক বলে।

-"এ হচ্ছে শ্যাম, আজ একবছরের ওপর আমার সাথে আছে। ওর বাড়ি শিলিগুড়ি। ও ছাড়া জয় আর রশ্নি আছে। দাঁড়ান, ডেকে দিচ্ছি। রশ্নি সবে এসেছে। ও শিলিগুড়ির মেয়ে। জয় মালবাজারের। আসলে শ্যাম চলে যাবে কলকাতা, তাই রশ্নিকে রেখেছি। "

 আলোক তিনজনকেই টুকটাক প্রশ্ন করছিল। তবে রিসার্চ সংক্রান্ত প্রশ্ন হলেই ওরা রিও'র দিকে তাকাচ্ছিল। রিও মাথা নাড়লে উত্তর দিচ্ছিল। দু একটা প্রশ্নর উত্তর রিও নিজেই দিলো।রশ্নি মেয়েটা চুপচাপ,রিও পেপারে এ্যাড্ দিয়েছিল, তা দেখে জয়েন করেছে। শ্যাম আর জয় ও পেপার দেখেই এসেছিল। 

এরপর আলোক ছকুয়া কাকিকে ডেকে নেয়। বৃদ্ধা এখনো শক্ত পোক্ত। গুছিয়ে কথাও বলতে পারে। নাতনি শিলিগুড়িতে কাজ করে, মাঝে মাঝে আসে ,গত সপ্তাহে নাতনি এসেছিল বলল। অনেক পুরানো কথাও জানতে পারলো আলোক। সেই রাতে কফিটা উনি করেছিলেন এটাও জানা গেল।

সকালে বন্ধন বাবু এসেছিলেন। আলোক গিয়ে আলাপ জমালো, উনি গত পনেরো বছর এই বাগানেই আছেন।কথায় কথায় জেনে নিলো সেই শনিবার কেউ ওনার গাড়িতে বাংলো থেকে কোথাও গেছিল কিনা। আসলে মূর্তি নিয়ে যেতে হলে গাড়ি চাই। বাংলো থেকে বড় রাস্তা প্রায় আট কিমি। আর রাতে যেমন চিতা ও বন্য প্রাণীর উপদ্রব আছে দিনে হেঁটে গেলে কেউ দেখতে পাবে। গাড়িতে কে কোথায় গেছে এ খবর আলোক জোগাড় করেছিল অবশ্য।

চাঞ্চল্যকর কয়েকটা তথ্য হাতে এসেছিল। রমলা দেবীর ফোন ঘেঁটে সাহানা তিনটে নম্বর বার করেছিল, যার মধ্যে একটা সেই ক্রেতার হবে মনে হচ্ছিল। আলোক তিনটে নম্বরেই ফোন করলো। একটা নট রিচেবেল, একটা ব্যস্ত আরেকটা সুইচ অফ্। 

একটু পরেই আলোক ম‍্যাডামকে বলে একটা গাড়ি নিয়ে একটু শিলিগুড়ির দিকে বেরিয়ে গেলো। সাহানাকে বলে গেছিল সব দিকে খেয়াল রাখতে। বিশেষ করে রমলা দেবীর স্বামী সম্পর্কে খোঁজ নিতে। সাহানা বৃদ্ধ দারোয়ানকে দিয়ে শুরু করেছিল। একে একে পরিচারিকা, মালী সবার সাথে কথা হল। তবে মূর্তি চুরি হয়েছে কাউকে বলা হয় নি। সাহানা একটা উপন্যাস লিখছে এটাই জানানো হয়েছিল। সেদিন ছকুয়াকাকার নাতনী রেশমাকে আলোকের কথা মত শিলিগুড়ি থেকে ডেকে আনা হয়েছিল। ও আসায় সাহানা ওর সাথেও কথা বলে নিতে পারলো। চুরির দিন সকালে রেশমা শিলিগুড়ি ফিরেছিল , বন্ধন বাবু ওকে বড় রাস্তায় ছেড়েছিলেন। তবে ওর সাথে একটা ছোট্ট ব্যাগ ছিল।

 সাহানাকে আলোক ফোনে বলেছিল সবার ফটো জোগাড় করে হোয়াটস আপে পাঠাতে। রিও'র সহকারীদের ব‍্যপারে খবর নিয়েছিল আলোক।আসলে সবাই ওর সন্দেহের তালিকায়। সবার মোবাইল নম্বর নিয়েছিল ও। রিওর কোম্পানির খবর জানতে বেশ কয়েক জায়গায় মেল করেছিল আলোক। 

রাতে ডিনারের পর আলোক ট্যাব্ নিয়ে বসেছিল, সাহানাকে বলল,-" রিও প্রচুর অর্থের মালিক। এই ব‍্যবসার অর্ধেক রিওর নামে। ওর টাকাও ঠিকঠাক আসে বাইরে থেকে। হয়তো কখনো একটু দেরি হয়। তাই ও চুরি করবে বলে মনে হয় না। ওর কাজ নিয়ে ও সত্যি ব্যস্ত। ওর সহকারীদের সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিলাম। সবার আর্থিক অবস্থা নড়বড়ে। এদিকে ছকুয়া দম্পতী যতই বিশ্বস্ত হোক না কেন, রেশমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ওরা কি ভাবছে কে জানে। রেশমা সন্দেহর ঊর্ধ্বে নয় কারন, ও বাগানে ছিল সেই দিন। ভোরে ফিরে গেছিল। ইদানীং ও ঘনঘন আসছিল। আবার বন্ধন বাবুও সন্দেহর আওতায়। সুযোগ ছিল প্রচুর। " 

সাহানা বলল -"আমি শুতে যাচ্ছি, আমার মতে বন্ধন বাবুই চোর। প্রমান তুমি করে দেখাও।"

-"এভাবে কল্পনার মাধ্যমে সলিউশনে আসা যায় না ম‍্যাডাম্ ," আলোকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। 

 ভোর রাতে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি এলো। সাহানা টের পেলো আলোক শুতে এসেছে। 

পরের দিনটাও আলোক দৌড়াদৌড়ি করেই কাটালো। বেশ কয়েকটা নতুন খবর ওর হাতে এসেছিল। ও থানায় গেছিল বেশ কিছু পুরানো খবর জানতে। ওর এক উচ্চ-পদস্থ পুলিশ বন্ধুর কল্যাণে অনেক খবর জোগাড় হয়েছিল। রাতে সবার কল লিস্ট চেক করতেই আলোকের চেহারায় একটা খুশির ঝলক দেখতে পেল সাহানা। 

বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। সাহানা আগেই শুয়ে পড়েছিল। আলোক সাহানাকে কাছে টানতেই সাহানা বুঝল আলোক জট ছাড়িয়ে ফেলেছে। নিজেকে উজাড় করে আলোকের কাছে মেলে ধরল সাহানা। আলোক আজ অন্য মুডে। সাহানা জানে কেস শেষের পথে, না হলে আলোক এমন করে না। 

পরদিন এক রোদ ঝলমলে সকালে আলোক রমলা দেবীর অফিসে এসে দেখল, উনি বসে কিছু কাজ করছেন । আলোক ঢুকে 'সুপ্রভাত ' বলতেই উনি বসতে বললেন। আলোক বলল -" যে কাজের জন্য আপনি আমায় ডেকেছিলেন।তা প্রায় শেষের পথে। তবে এর সাথে আপনার পরিবারের সন্মান জড়িত। অনেক পুরানো কেচ্ছা জড়িত। এখন যদি আপনি দোষীকে শাস্তি দিতে চান তাহলে অনেক পুরানো কথা উঠে আসবে। এবার বলুন আপনি কি চান?"

রমলা দেবী চুপ করে দেওয়ালে টাঙ্গানো রামকৃষ্ণের ফটোর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে রইলেন। ওনার মুখের প্রতিটা পেশি বদলাচ্ছিল ক্ষণে ক্ষণে। ঠোঁট কামড়ে নিজের সাথে এক অসম যুদ্ধ করে চলেছিলেন উনি। 

-"কিন্তু আপনি যে আমায় একটা ভুল ইনফরমেশন দিয়েছিলেন তার কি হবে? " আলোক আবার বলে। 

-"আপনি তো সব জেনে গেছেন। আর লুকাবো না কিছুই। বলুন কি জানতে চাইছেন? " রমলা দেবী মুখ খোলেন।

-"আপনার স্বামী আর সোমরা কি করে মারা যায় ? "

চুপ করে বাইরে তাকিয়ে থাকে রমলা দেবী, কিছুক্ষণ পর বলেন, -"দুর্ঘটনা, পাহাড় থেকে গাড়ি নদীতে পড়ে গেছিল।"

-"আমি যদি বলি সোমরা ওদের নিয়ে ইচ্ছা করেই আত্মহত‍্যা করেছিল। শাস্তি দিতে চেয়েছিল ওদের অপকর্মের?"

-"এছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আমার স্বামী অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে বাগান বিক্রির ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। এতোগুলো লোক পথে বসতো। অন্য বাগানের মতো আমার বাবা, দাদুর হাতে তৈরি এ বাগান ধ্বংস হয়ে যেতো। ও বদলে গেছিল। ক্ষমতা, অর্থ এসব ওর মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। অনাথ অসহায় বলে বাবার মন জয় করে একদিন ও কাজে ঢুকেছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমরা ওর স্বরূপ বুঝতে পেরেছিলাম। বাবা বহু দুঃখে হার্ট এ্যাটাকে মারা যায়। ও এমন কিছু করেছিল যা বাবা মেনে নিতে পারে নি। তবে এই কেসে এসব কথা তোলা কি জরুরি? "

-"জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ মূর্তি চুরির সাথে এসব জড়িয়ে গেছে। যদি দোষীকে পুলিশে দিতে চান এসব কথা উঠবেই। "

-" আমি এখন অবধি পুলিশ ডাকি নি। আমি চাই না এসব কথা পাঁচ কান করতে। রিও অনেক কিছুই জানে না। তাই মূর্তি ফেরত পেলেই আমি খুশি। দোষী দোষ স্বীকার করলে আমি আর কিছু করবো না। "

-"কিন্তু কয়েকজনকে তো ডাকতেই হবে।রিও সব জেনেও যাবে। যদি না ও জানে, মূর্তি কোথায় পাওয়া গেলো জানতে চাইবে। কে চুরি করেছিল জানতে চাইবে। কি উত্তর দেবেন তখন? "

-"আমি কি জানতে পারি কে চোর? আর কেন চুরি করলো? মূর্তিটাই বা কোথায়?" রমলা দেবী অসহায় গলায় প্রশ্ন করেন।

-"আপনি ছকুয়া কাকার পরিবার আর আপনার ছেলের লোকজনদের ডেকে নিন। বন্ধন বাবু থাকলে ভাল হয় । তবে দোষীকে শাস্তি দিতে হলে পুলিশ চাই। "

-"আমার ফ্যাক্টরির আর বাংলোর চারজন বিশ্বস্ত গার্ড কে ডেকে নিচ্ছি। তারপর প্রয়োজনে পুলিশ ডাকবো না হয়। তবে দোষ স্বীকার করে মূর্তি ফেরত দিলে কিছুই করবো না। " রমলা দেবী বললেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে সবাইকে ডেকে হলঘরে বসার ব্যবস্থা করেছিলেন উনি। কেস প্রায় শেষের পথে। রিও শ্যাম, আর জয়কে নিয়ে চলে এসেছে। রশ্নি আগের দিন আগে বাড়ি গেছে। রেশমাকে শিলিগুড়ি ফিরতে দেওয়া হয় নি। ছকুয়াকাকা আর ওনার স্ত্রী এসেছিল।বন্ধন বাবুও এসেছেন।

ঘরে সবাই বসার পর রমলাদেবী বললেন, -"আজ সবাইকে এখানে ডাকার কারণ, আমাদের বংশের বহু পুরানো বিশ্বকর্মা মূর্তি যা আমার ব‍্যবসার সৌভাগ্যর প্রতীক সেটা চুরি গেছে কয়েকদিন আগে। এই ঘরের মধ্যেই সেই চোর লুকিয়ে আছে। পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। যদি সে দোষ স্বীকার করে মূর্তি দিয়ে দেয় আমি কথা দিচ্ছি থানা পুলিশ হবে না।এই শেষ সুযোগ আমি দিলাম। " 

সবাই একটু উশখুশ করে ওঠে। পাঁচ মিনিট কেটে যেতেই রমলা দেবী আলোককে কিছু বলেন। 

এর পর আলোক উঠে দাঁড়ায়। বলে -"বহুদিন আগে অরিত্র বলে একটি ছেলে এই বাগানে কাজে ঢোকে, শিক্ষিত, সাহসী, পরিশ্রমী ছেলেটি মালিকের চোখে পড়ে, উনি কয়েক বছর ধরে ছেলেটিকে কাজ শেখান এবং নিজের একমাত্র মেয়ের সাথে বিয়ে দেন। ওদের একটি ছেলেও হয়। 

কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে অরিত্র সম্পত্তি ও ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে বদলে যায়। এক সাধারণ কর্মচারী সোমরার বৌ এর সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। ওদের একটি অবৈধ মেয়ে হয়েছিল। এ সব জানতে পেরে মালিক হার্ট আ্যটাকে মারা যান। লোকলজ্জার ভয়ে রমলাদেবী চুপ করে ছিলেন। অরিত্র নিজেকে সামলে নিয়ে ছিল কিছুদিন। কিন্তু এর কয়েক বছর পর অরিত্র বাগানের টাকা নয়ছয় করে পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করে সোমরার বৌকে নিয়ে। তলে তলে বাগানের টাকা চুরি করে ব‍্যবসা শেষ করে দিচ্ছিল অরিত্র। 

সোমরা নিজের বৌ কে ভালবাসলেও সব জানতে পেরে ওদের দুজনকে শেষ করে ফেলার পরিকল্পনা করে। বৌ কে সে যেমন ভাল বাসত, বাগানের প্রতি, মালকিন রমলা দেবীর প্রতিও সে বিশ্বস্ত ছিল। তাই একদিন সুযোগ পেয়ে গাড়ি নিয়ে নিজের বৌ আর অরিত্র বাবুকে নিয়ে এক জায়গা থেকে ফেরার পথে সে পাহাড় থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয়। "

আলোক একটু থামতেই রিও বলে ওঠে -"এ সব আষাঢ়ে গপ্প না বলে চুরির ব‍্যাপারে আলোচনা করলে হতো না !! মা তো আপনাদের চুরির জন্য ডেকেছিল যতদূর জানি। এ সব মনগড়া কাহিনী......."

রিওকে মাঝপথে থামিয়ে আলোক বলে -"এবার সে বিষয়েই যাবো। এই ইতিহাসটুকু না বললে বাকিটা বুঝত না কেউ। অরিত্রর অবৈধ সন্তান যে সোমরার মেয়ের পরিচয়ে বড় হচ্ছিল, কেউ তাকে ভালবাসত না। রমলাদেবী ওকে শহরে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। পাশ করার পর বাগানের হেড অফিসে কাজ দিয়েছিলেন। মেয়েটি কিন্তু বাবা মায়ের মৃত‍্যু ভোলে নি। হোস্টেলে অনাথের মত মানুষ হয়েছে। কারো ভালবাসা পায় নি।মাঝে মধ্যে বাগানে আসতো। বড় হয়ে জানতেও পেরেছিল নিজের জন্ম বৃত্তান্ত। এখানেই ওর জীবনে একটি ছেলে আসে কিছুদিন আগে।রিও'র সহকারী শ্যাম ।"

শ্যাম আর রেশমা দু জনেই উঠে দাঁড়ায়। শ্যাম বলে -"এসব কি হচ্ছে!! এ ভাবে অপমান...."

আলোক বলে -'বসে পড়ুন। আমার কথা শেষ হলে যা বলার বলবেন। অনেকেই জানে আপনাদের কথা। " 

সবাই বাধ্য হয়ে বসে পড়ে। আলোক বলে, -" যে মেয়েটা জীবনে কারো ভালোবাসা পায়নি যৌবনে প্রথম ভালবাসার ছোঁওয়ায় গলে গিয়ে রেশমা সব বলে ফেলে শ্যামকে। ওরা পালিয়ে যাবে ঠিক হয়। দুজনে মূর্তি চুরির প্ল্যান করে। বিশ্বকর্মা পূজায় মূর্তিটা শ্যাম দেখেছিল গতবার। রিও'র মোবাইলে সিন্দুকের লক্ নম্বর খুঁজে পেয়েছিল কয়েকমাস আগে। রিও'র হ‍্যাবিট্ ও জানতো। তাই মেসেজটা বুঝতে পারে।রিও'র ইয়ার অফ বার্থ শ্যাম জানত আর অন্য ইয়ারটা রেশমা জানত, কারণ ওর বাবার মৃত‍্যু হয় একই দিনে।

এরপর রেশমা আর তার বন্ধু ছিল সুযোগের অপেক্ষায় , চোরা বাজারে মূর্তির ফটো দেখিয়েছিল ওরা। দশ লাখের উপর দাম পাবে জানতো। রেশমা গত কয়েক মাস বেশ ঘন ঘন বাগানে আসতো বয়-ফ্রেন্ডের জন্য। আর কি করে চুরিটা করা যায় সেটা ভাবতো দুজনেই। রমলা দেবী রাতে শোওয়ার আগে এক কাপ কফি খান মাঝে মধ্যে। এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল রেশমা। সেই বৃষ্টির রাতে কফি বানানোর সময় কিচেনে ঠাকুমার সাথে ছিল রেশমা । হয়তো কফিতে কিছু ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছিল। চুরিটা ও রাতেই করে। কিন্তু দেড় ফুটের মূর্তি নিয়ে নিজের ঘরে রাখতে সাহস পায় নি।মালী সেই রাতে রেশমাকে দেখেছিল শ্যামকে একটা বড় ব্যাগ দিতে। শ্যাম ওদের আউট হাউসেই ব্যাগটা লুকিয়ে রাখে আমার ধারণা। পরদিন ভোরে বন্ধন বাবুর গাড়িতে বাস-রাস্তা অবধি লিফট্ নিয়ে ও খালি হাতেই ফিরে যায় শিলিগুড়ি। এবার দু জনে ছিল সুযোগের অপেক্ষায়।ওরা বোঝে নি এতো তাড়াতাড়ি চুরিটা রমলাদেবীর চোখে পড়বে।তাই ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। এর মধ্যে চলে আসি আমরা, এবার ওরা ঘাবড়ে যায়। রেশমা খবর পেয়ে বাগানে আসে। ওরা মূর্তিটা নিয়ে বাগান ছেড়ে যেতে সাহস পাচ্ছিল না। কারণ কেউ ইনবর্ন ক্রিমিনাল নয়। ওরা ভেবেছিল মূর্তি বিক্রি করে দূরে কোথাও চলে যাবে। তবে একসাথে নয়। আলাদা আলাদা। পরে মূর্তির ঝামেলা শেষ হলে ওরা এক হবে। শ্যাম রিও বাবুকে বলেছিলেন অন্য চাকরী পেয়ে কলকাতা চলে যাচ্ছেন, তাই তো ?"

-"আমি এখানে থাকলে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই কলকাতায় চলে যাচ্ছিলাম। এটা কয়েক সপ্তাহ আগেই স্যার কে বলেছিলাম। বাকি গল্পটা বেশ ভালো। কিন্তু প্রমান ?" শ্যাম বলে ওঠে।

-"প্রমান আপনাদের ফোন কলের লিস্ট। যা আমার এক পুলিশ বন্ধু কাল পাঠিয়েছে।" 

-"আমি রেশমাকে ভালবাসি। তাই ফোন করি। সেটা তো অপরাধ নয়। চুরিটা কি করে প্রমান হবে?" শ্যাম বলে ওঠে। 

আলোক হেসে ফেলে। বলে -"মূর্তিটাতে রেশমার হাতের ছাপ পাওয়া যাবে। "

-"না, পাবেন।না। ওটা হলুদ ভেলভেটে মোড়াা ছিল। " রেশমা বলে ওঠে।

-"বাঃ, তুমি জানলে কি করে ওটা হলুদ ভেলভেটে মোড়া?" আলোক বলে ।

-"আসলে .... আসলে....তাই থাকে। প্রতিবার দেখি তো। " রেশমা সামলাতে চেষ্টা করে। হঠাৎ মুখ ফস্কে একটা ভুল বলে ফেলেছে বুঝতে পারে।

-"পূজার সময় মূর্তি কোনো কাপড়ে মোড়া থাকে না, আর এর আগে সিন্দুক থেকে মূর্তি বার করতে বা তুলতে তুমি দেখ নি। কারণ তুমি হোস্টেলে থাকতে। তাছাড়া চোরা বাজারে যে এ্যান্টিক বিক্রেতার কাছে তোমরা গেছিলে মূর্তির ফটো নিয়ে, সেখানে সিসি টিভিতে তোমাদের ফটো আছে। ঐ কিউরিও ব্যবসায়ীও খোঁজ নিয়ে রমলাদেবীকে ফোন করেছিলেন মূর্তিটা কেনার জন্য। "

-"আচ্ছা, এবার আপনি মূর্তি বার করুন। দেখি গল্পের দৌড়....." রেশমা বলে ওঠে।

-"আমার যদি ভুল না হয় মূর্তি এখনো এখানেই আছে। ঐ আউট হাউসে শ‍্যামের ঘরটা খুঁজলেই পাওয়া যাবে। কি শ্যাম ?"

-"এতেও প্রমাণ হয় না মূর্তি আমি নিয়েছিলাম। যে কেউ আমাদের ফাঁসানোর জন্য ওর ঘরে রাখতে পারে ওটা।" রেশমা আবার বলে।

-"কিন্তু লকারের ভেতর একটা কাচের চুড়ির টুকরো এখনো রয়েছে। যার বাকি গুলো তোমার হাতে। " আলোক বলে।

রেশমার হাতে লাল সবুজ কাচের চুড়ি কয়েক গাছা করে। ও নিজের হাতের দিকে তাকায়। 

আলোক বলে-"সেই রাতে তাড়াহুড়োয় ঐ চুড়ির একটা ভেঙ্গে লকারের ভেতর পড়ে গেছিল। আর ঐ ফটো ফ্রেমেও তোমার হাতের ছাপ পাওয়া যাবে। "

রেশমা দু হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ে। শ্যাম কিংকর্তব‍্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছকুয়া কাকা, জয় আর রিও উঠে যায় আলোকের ইশারায়। একটা ছোট আলোয়ান জড়ানো মূর্তিটা শ্যামের ঘরের কোনায় একটা বড় ব্যাগে ছিল। ওরা ওটা নিয়ে আসে। টেবিলে মূর্তিটা রাখতেই আলোয় ঝকমক করে ওঠে আইভরির বিশ্বকর্মা। নানারকম মনি-মুক্তা আর সোনার সিংহাসনের কারুকার্য দেখার মত। সাহানা আর আলোক অভিভূত । 

রমলা দেবীর চোখে জল। বলে ওঠেন -"দশ লাখ টাকার জন্য রেশমা তুই এই কাজ করতে পারলি!! তোকে আমি পড়িয়েছি, মানুষ করেছি .... রক্তের রঙ দেখিয়ে দিলি তুই!!"

-"চুপ করুণ। আমার বাবা, মা সবাই মরে যাওয়ার পর দয়া আর তাচ্ছিল্য ছাড়া কি পেয়েছি ? রিও বাগানের মালিক, আর আমি? সোমরা, যাকে আমার বাবা বলে জেনেছিলাম, যে এতো বড় ত্যাগ করে বাগান বাঁচালো, ব‍্যবসা বাঁচাল, তার মেয়ে সাধারণ কর্মচারী। আর অরিত্র যদি আমার আসল বাবা হয় তবে তো এই বাগানে আমারও দাবী থাকে !!......" 

ছকুয়া আর থাকতে না পেরে উঠে এসে রেশমাকে একটা চড় মারতে উদ্যত হয়। তবে রিও হাতটা ধরে ফেলে ঠিক সময়। রেশমা একটানা কথা গুলো বলে হাঁপাতে থাকে। 

রিও আস্তে আস্তে ছকুয়া কাকাকে নিয়ে বাইরে চলে যায়। রমলা দেবী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন রেশমার দিকে। ঘরে সবাই চুপ। 

শ্যাম বলে -"তাহলে এবার পুলিশে ধরিয়ে দিন আমাদেরকে। আর ওয়েট করছেন কেন?" ওর গলায় শ্লেষ মিশ্রিত ঘৃণা। রেশমার পাশে গিয়ে ওর হাতটা শক্ত করে ধরে দাঁড়ায় ও। 

আলোক আর সাহানা উঠে দাঁড়াতেই রমলা দেবী ওদের একটু দাঁড়াতে বলেন। রেশমা আর শ্যামের দিকে তাকিয়ে বলেন, -" পুলিশে দেব না। তবে তোমাদের আমি কিছু টাকা দেবো। না, দান নয় ঠিক। একটা সুযোগ ভালো করে বাঁচার। কিন্তু কথা দিতে হবে এই বাগানে তোমরা আর কখনো আসবে না। নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছিলে মূর্তি বিক্রি করে। এই টাকায় নতুন জীবন শুরু কর অন্য কোথাও গিয়ে। আমাদের এখানে শান্তিতে থাকতে দাও। 

আর বাগানটা রিওর বাবার নয় আমার। তাই অরিত্রর মেয়ের এখানে কোনো দাবী নেই । সোমরার কোনো মেয়ে ছিল না। এবার তোমরা আসতে পারো।"

রেশমা আর শ্যাম বেরিয়ে যায় ধীরে ধীরে। 

আলোক আর সাহানা বাইরে এসে দাঁড়ায়। আলোক বলে -"দুদিন এখন ডুয়ার্স ঘুরবো ভাবছি। কলকাতার গরমে এত তাড়াতাড়ি ফিরতে মন চাইছে না আর।"

সাহানাও এটাই ভাবছিল। কি করে যে আলোক ওর মনের কথা টের পায়!! ওর মুখে তখন খুশির ঝলক।

রমলা দেবী যে বন্ধনবাবুকে নিয়ে পেছনে এসেছেন ওরা টের পায় নি। উনি পিছন থেকে বলেন, -"ঘোরার সব ব্যবস্থা বন্ধন করে দেবে। গাড়িও দিয়ে দেবে। আপাতত অফিসে চলুন। "

রমলা দেবী আর বন্ধন বাবুর সাথে অফিসে গিয়ে বসতেই রমলা দেবী একটা খাম এগিয়ে দিলেন। বললেন , -"আপনাদের প্রাপ্য চেকটা , আর ফেরার টিকিটটা কবে করবো সেটাও বলবেন। তবে আগামী বিশ্বকর্মা পূজায় আপনাদের আসতেই হবে।এটা আমার দাবী। "

বন্ধন বাবুও সায় দেয় ওনার কথায়। সাহানা আর আলোক থানা পুলিশ ছাড়া এ ভাবে একটা কেসের সুন্দর সমাপ্তিতে খুব খুশি। এই প্রথম রক্তপাত বা পুলিশি সাহায্য ছাড়া এতো সুন্দর ভাবে একটা অপরাধের নিষ্পত্তি হল। 

সমাপ্ত


Rate this content
Log in