Drishan Banerjee

Thriller


3  

Drishan Banerjee

Thriller


আইভরি মূর্তি রহস্য(প্রথম পর্ব)

আইভরি মূর্তি রহস্য(প্রথম পর্ব)

6 mins 16.7K 6 mins 16.7K

শিলিগুড়ি জংশন ছাড়িয়ে ট্রেন শহরের বাইরে আসতেই চোখ জুড়িয়ে গেলো। নীল আকাশে ঝকঝক করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, সামনের সবুজ পাহাড় হাসছে। দু ধারে কচি পাতায় সাজানো চা বাগান। গুলমা ষ্টেশনে ক্রসিং হবে।গুল্ম লাইন। ট্রেন দাঁড়াতেই অনেকে নেমে পড়েছে ফটো তুলতে। সামনেই ছোট্ট একটা নদী, বর্ষার জল কলকল করে বয়ে চলছে, ও ধারে ছায়া-মাখা মহানন্দা অভয়ারণ্যর হাতছানি । 

ধানক্ষেতের মাঝে উঁচু পাহারা ঘর আর চারপাশের ইলেকট্রিকের তার সাক্ষী এখানে, হাতির আনাগোনার। চারপাশে একটা মিষ্টি প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতার রেশ মন ছুঁয়ে যায়। একটু পরেই একটা প‍্যাসেঞ্জার ট্রেন পাশ কাটিয়ে গেলো। গুল্ম লাইন , এবার হেলে দুলে কাঞ্চনকন‍্যা এগিয়ে চলল ডুয়ার্সের পথে। ঘন অরণ্যর মাঝে গতিবেগ বাঁধা, দু ধারে অজস্র ময়ূর চোখে পড়ছিল। জলার ধারে শ্বাপদ পদচিহ্ন। একটা দুটো বাঁদর গাছের ডালে বসা। সেবক ষ্টেশন পার করেই তিস্তা ব্রিজে ঝমঝমিয়ে উঠল ট্রেন। চঞ্চলা কিশোরী কন্যা তিস্তা এখানে পেয়েছে যৌবনের ছোঁওয়া। তাই চওড়া হয়ে সমতলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পর পর দুটো টানেল পার করতেই দেখা পেলাম রূপসী ডুয়ার্সের। বা হাতে সবুজ নীল পাহাড় আর দু ধারে চা গাছের কার্পেট পার করে ট্রেন ছুটছে। এনএইচ ৩১ লুকোচুরি খেলছে ট্রেনের সাথে। পর পর লীস, ঘিস, চেল তিনটি নদী পার হয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে এঁকেবেঁকে। আলোক আস্তে আস্তে ট্রলি দুটো টেনে বার করে। সাহানা তখনো ফটো তুলছে দরজায় দাঁড়িয়ে। দেখতে দেখতে ট্রেন ঢুকে পড়ে নিউমাল জংশন। বেশ কিছু লোক নামতেই ট্রেন এগিয়ে চলে গেলো আলিপুরদুয়ারের দিকে। মন মাতাল করা মিষ্টি হাওয়া ভেসে আসে দূরের পাহাড় থেকে। পরিষ্কার আকাশে সাদা নীলের ছড়াছড়ি। 

এতো সুন্দর স্টেশন সাহানা আগে কখনো দেখেনি। চারদিকে সবুজের হাতছানি। চা বাগানের মাঝেই স্টেশনটা কেউ বসিয়ে দিয়েছে।

গেটের কাছে প্ল্যাকার্ড হাতে ড্রাইভার কে দেখে আলোক এগিয়ে যায়। ড্রাইভারের পাশেই নীল চেক সার্ট পরা ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দেন বন্ধন সেনগুপ্তা,গ্ৰীন হিল বাগানের ম্যানেজার।

আলোক ও সাহানা গাড়িতে বসতেই গাড়ি ছুটে চলে চা বাগানের বুক চিরে, ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথে গাড়ি বেশ কিছুটা উঠে আসে। নীচে ছায়া মাখা ডুয়ার্স আবছা হয়ে আসে। একটা ছোট্ট ঝরণা ওদের পথের পাশেপাশে চলেছে। প্রায় এক ঘণ্টা পর চা বাগানের ভেতর একটা সুন্দর বাংলোর সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াতেই, এক সাদা শাড়ি পড়া ভদ্রমহিলা বারান্দায় এসে দাঁড়ান। বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে কিন্তু এই বয়সেও ওনাকে দেখলে বোঝা যায় একসময় অসামান্য রূপসী ছিলেন উনি। 

হাসি মুখে ওনাদের অভ্যর্থনা জানান মিসেস রমলা দেবী, এই চা বাগানের মালিক। ওনার মেল এবং ফোন পেয়েই হঠাৎ করে আলোকদের এসময় ডুয়ার্স আগমন।

আলোক একসময় 'আই-বি'তে ছিল। একটা বিশেষ কারণে চাকরী ছেড়ে নিজের ইনভেস্টিগেশন ফার্ম খুলেছে বেশ কয়েক বছর। ভালোই সাফল্য আসছে। এখানে আসার কারণ তেমন কিছু খুলে বলেননি রমলা দেবী। ব্যাপারটা খুব গোপনীয় বলে ওদের টুরিস্ট হিসাবে আসতে বলেছিলেন । এখানেও সবাই জানে ওরা রমলাদেবীর বিশেষ পরিচিত। আলোকরাও ডুয়ার্স ঘুরতে পারবে ভেবেই চলে এসেছিল।

একটা বড় ড্রইং রুম আর বেড রুম নিয়ে বাংলোর উত্তরদিকের এই ইউনিটে ওদের থাকার ব্যবস্থা। জানালা দিয়ে তাকালেই ছোট্ট ঝোরাটা চোখ পড়ছে। ওধারে সবুজ ঢেউ খেলানো চা বাগিচা নেমে গেছে নীচের দিকে। দূরে মেঘের আড়ালে আবছা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। আলোক রা ফ্রেস্ হয়ে আসতেই এক পরিচারিকা এসে বলে গেলো, বাইরের লনে ম‍্যাডাম ওয়েট্ করছেন জলখাবার নিয়ে।

আলোকরা এসে বসতেই দু জন পরিচারিকা গরম গরম আলুর পরোটা, আচার, সস্, ডিমের অমলেট্‌,কয়েক রকম কাটা ফল আর মিষ্টি সাজিয়ে দিল। সাথে রূপার টি সেটে বাগানের তাজা সুরভিত চা। রমলা দেবী সকালে শুধুই ফল খান। খেতে খেতে টুকটাক কথা হচ্ছিল। উনি গত পনেরো বছর ধরে বাগান চালাচ্ছেন। ধুঁকতে থাকা চা শিল্পর মধ্যে এখনো ওনার এই বাগান ভালোই চলছে। তবে একমাত্র ছেলে ভূ-বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে কি সব রিসার্চ নিয়ে মেতে আছে। তার এসব ব‍্যবসায় মন নেই। এখানেই আছে গত একবছর ধরে। তবে নিজের রিসার্চ নিয়ে ব্যস্ত। রমলা দেবী শীতকালে কলকাতায় থাকেন। বাকি সময় বাগানে। ছেলেও মাঝে মাঝে কলকাতায় যায় কাজে। একটু পরে রমলা দেবী ওদের নিয়ে গেলেন নিজের অফিস ঘরে। বাংলোর একধারে ছোট একটা অফিস করে নিয়েছেন উনি। সবসময় ফ্যাক্টরি যেতে হয় না তাই। দরজা বন্ধ করে আলোকদের বসতে বললেন। নিজের চেয়ারে বসে বললেন -" আপনাদের একটা বিশেষ কাজে ডেকেছি আগেই বলেছি। এবার সেই ঘটনায় যাবো। আমাদের তিন পুরুষের এই চা এর ব‍্যবসা। এটা আমার বাপের বাড়ির ব‍্যবসা। আমার দাদুর বাবা ছিলেন মহীশূরের মহারাজের চিকিৎসক। সারাজীবন ওখানেই কাটিয়েছেন। প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন উনি। দাদু ভাগ্যের খোঁজে সে সময় এই উত্তর বঙ্গে এসে দুটো চা বাগান কিনেছিলেন। রমরমিয়ে চা এর ব‍্যবসা চলছিল। প্রথমবার ধুমধাম করে বিশ্বকর্মা পূজার আয়োজন করলেন। বড়দাদাই মানে আমার দাদুর বাবা মহীশূর থেকে অবসর নিয়ে চলে আসেন সেই সময়। সারা জীবন মহারাজের সেবা করায় খুশি হয়ে মহারাজ নিজের খাস শিল্পীকে দিয়ে একটা হাতির দাঁতের কারুকার্য করা দেড় ফুটের বিশ্বকর্মার মূর্তি গড়ে দিয়েছিলেন। সোনা,হিরা আর চুনি পান্নায় সেই মূর্তিকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। সিংহাসনটাও সোনা, চুনি, পান্না আর হাতির দাঁতের কাজ। মাথায় রত্নখচিত ছাতা। অপূর্ব সেই মূর্তি আর প্রচুর উপহার নিয়ে দাদাই ফিরেছিলেন। ঐ হাতির দাঁতের রত্ন খচিত মুর্তিতেই পূজা শুরু হয়েছিল। ঐ মূর্তিকে আমাদের ব‍্যবসার সৌভাগ্য মানা হয়। এক বিশেষ সিন্দুকে মূর্তি থাকতো। পূজার আগের দিন বের করা হত। পূজার পর দিন ঘট বিসর্জন হলে আবার তুলে রাখা হতো। আশেপাশের সবাই আগে ঐ মূর্তি দেখতে আমাদের বাগানে আসতো পূজার দিন। গত সপ্তাহে শনিবার সকালে স্নান সেরে আমার ঘরে ঢুকেই দেখি সিন্দুকের চাবিটা মাটিতে পড়ে রয়েছে। আর সিন্দুকের উপর একটা ওয়াল হ‍্যাঙ্গিং টাঙ্গানো থাকে যেটা সিন্দুকের দেওয়ালকে ঢেকে রাখে , সেটা বেঁকে আছে। সাথে সাথে আমি সিন্দুক খুলি। সব ফাঁকা, আমাদের এতদিন-কার পারিবারিক মূর্তি নেই!! "

উনি একটু থামতেই আলোক বলে -" ঐ চাবি কোথায় থাকত? কে কে জানত চাবির খোঁজ?"

-"চাবি থাকত আমার খাটের পাশের ড্রয়ারে। তবে চাবি ছাড়াও নম্বর লক্ ছিল । সেই কোড্ আমি আর আমার ছেলে ছাড়া কেউ জানতো না। এই সিন্দুকটা আধুনিক। বাবা তৈরি করেছিল আমার বিয়ের পর। কেউ দু বার ভুল নম্বর টিপলে লক্ হয়ে যাবে। ভাঙ্গতে হলে কোম্পানির লোক ডাকতে হবে। "

-"আপনি পুলিশে খবর দিয়েছেন?"

-"না, একটা বিশেষ কারণে থানা পুলিশ করতে চাই না। সব বিশ্বস্ত লোকদের নিয়ে টানাটানি হবে। আমি মূর্তি ফেরত চাই শুধু।"

-"কিন্তু পুলিশের প্রয়োজন পড়তে পারে। অপরাধ বলে কথা!!" সাহানা বলে।

-"আপনারা আগে খুঁজে দেখুন ...." 

-"এই ব‍্যবসা আপনার বাবার, আর কোনও উত্তরাধিকারী নেই ?" আলোক প্রশ্ন রাখে।

 -" না, দাদু একমাত্র পুত্র, বাবাও তাই, আমার এক দাদা ছিল, বারো বছর বয়সে অজানা জ্বরে মারা যায়। বাবা আমায় নিজের বাগানের এক ম্যানেজারের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। তার ও কেউ ছিল না। ব‍্যবসা বাবার অবর্তমানে আমাদের হাতে আসে। আমার একমাত্র পুত্র যখন বারো ওর বাবা এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। তখন থেকে আজ অবধি আমিই দেখাশোনা করছি। "

-" এই মূর্তি হারানোর খবরটা কে কে জানে? "সাহানা প্রশ্ন করে।

-"আমি আর আমার বিশ্বস্ত কাজের লোক ছকুয়া কাকা আর তার বৌ। এই ছকুয়া কাকা আদিবাসী। আমার মা মারা যায় আমি যখন চার বছরের। এই ছকুয়া কাকা আর ওর বৌ মুনাই কাকি আমায় মানুষ করেছিল। ওরা বাবার আমলের লোক। বাবাকে দু বার বাঘের হাত থেকে বাঁচায় ছকুয়া কাকা। ওদের একটা ছেলে ছিল সোমরা, বাবা ওকে স্কুলেও দিয়েছিল। কিন্তু ছেলেটা পড়তে চাইতো না। পরে বাবা ওকে ফ্যাক্টরিতে কাজে ঢুকিয়েছিল। ওর বিয়েও দিয়েছিল। আমার স্বামীর সাথে গাড়ি দুর্ঘটনায় সোমরা আর ওর বৌ ও মারা যায়। ওর মেয়েকে আমি পড়িয়েছি, এখন শিলিগুড়িতে আমাদের অফিসেই কাজ করে। মাঝে মধ্যে আসে বাগানে। চুরির ব‍্যপারটা ছকুয়া কাকা আর কাকি ছাড়া আর কাউকে জানাই নি। এক মাস বাদে পূজা। তারমধ্যে আপনারা ওটা খুঁজে দেবেন আমার বিশ্বাস। "

-"আপনার ছেলে ..." 

-" রিও পড়াশোনায় ভালো, ভূবিজ্ঞানী, বিদেশে কাজ করতো। দু বছর আগে দেশে ফিরে কি এক রিসার্চ শুরু করেছে। এক বছর ধরে এখানেই আছে, এখানেই নাকি মাটির নিচে অনেক খনিজ আছে। এ সব নিয়ে মেতে আছে। বিদেশি কোম্পানির টাকার ওর রিসার্চ চলে। দুটো ছেলে ওকে সাহায্য করে। গত দু সপ্তাহ থেকে একটা মেয়েকেও রেখেছে। ও পাশের আউট হাউসে থাকে ওর লোকজন নিয়ে। ওটাই আগে গেস্ট হাউস ছিল। ওর সাথে আমার দেখা হয় ডিনার টেবিলে। ওকে বলিনি কিছু। ও বাড়ির বা ব‍্যবসার ব‍্যপারে থাকে না। "

-"আপনার কি মনে হয় ? কে করতে পারে এই চুরি ?" আলোক জিজ্ঞেস করে।

-" দেখুন, কোড্ না জানলে সিন্দুক খুলবে না। কোড্ জানতাম আমি আর ছেলে। আমার ঘরে ছকুয়া কাকা, কাকি আর দু জন পরিচারিকা ছাড়া কেউ ঢোকে না। রিও শেষ কবে এসেছিল মনে নেই। তাই আমি কি বলবো? চলুন, আপনাদের ঘরটা আর সিন্ধুকটা দেখাই।"

ওনার সাথে আলোক আর সাহানা গিয়ে ঢুকল বড় হল পেরিয়ে শয়ন কক্ষে।

চলবে....


Rate this content
Log in

More bengali story from Drishan Banerjee

Similar bengali story from Thriller