শুণ্যতার অন্তরালে প্রিয় মুখ
শুণ্যতার অন্তরালে প্রিয় মুখ
নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার বাসনা নিয়ে এলোমেলো করে রাস্তায় হাটছিল পুরবী। সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। পাখিগুলোরও যেন ঘরে ফিরে যাওয়ার বড্ড তাড়া। শুধু ওর কোনো তাড়া নেই।এই বিশাল পৃথিবীতে পথ চলতে চলতে আজ বড্ড ক্লান্ত। তবু চলতে হবে।আজ আর অস্তিত্বকে জাহির করার জন্য নয় বরং এই সবকিছুর ভীড়েে নিজেকে হারিয়ে ফেলার জন্য।দূর কোনো মন্দির থেকে শঙ্খ ধ্বনি ভেসে আসছে।ঐ পবিত্র ধ্বনি দিন মাস তারিখ ছাপিয়ে ওকে নিয়ে যায় ওর সোনালি দিন গুলোতে।
সারাটাদিন হেসে খেলে কাটিয়ে দিত।রাতে নিশ্চিত হয়ে ঘুমাতে পারত।মায়ের আদর মাখা বকুনি দিয়ে সকাল শুরু হতো।বাবার কাছে গিয়ে সব অদ্ভুত আব্দার করতো। আর বাবা হাসি মুখে সবটা মেনে নিতো।কখনো ছোটো ভাইটির সাথে কুলের আাচার নিয়ে ঝগড়া হলে ওর ব্যাট বল লুকিয়ে ফেলতো।কতো স্বপ্ন ছিল পড়াশুনা করে অনেক বড়ো হবে।তখন আার বাবার কোনো কস্ট থাকবে না।ওরা চার জন ছোটো বাড়িতে খুব আনন্দে থাকবে। মায়ের হাতের সরষে ইলিশটার কথা বড্ড মনে পড়ছে। খাওয়ার সময় বাবার পাশে কে বসবে সেটা নিয়ে করা খুনসুটি গুলো মনে পড়লে চোখ ফেটে জল আসে।
পাচ বছর আগে হার্টঅ্যাটাক এ ওর মায়ের মৃত্যু হলে ওর সোনার স্বপ্ন ভেঙে গুড়িয়ে যায়। যখন ওরা দুই ভাইবোন মায়ের অভাবে কষ্টে কাটাচ্ছিল তখন পুরবীর বাবা ওদের জন্য দু মাসের মাথায় নতুন মা নিয়ে আাসে।
কিন্তু সে আদৌ পুরবীর মা হয়েছিল কিনা জানা নেই বাবার বউ হতে পেরেছিল তা মানতেই হবে।মায়ের তিলে তিলে গড়ে ওঠা সংসারে সে হয়েছিল একচ্ছত্র অধিপতি। সারা দিন সর্বত্র আনন্দে হেসে খেলে বেড়ানো মেয়ে পুরবী নিজের বাড়িতে অঘোষিত গৃহকর্মী হয়ে রইল।বাবাও চোখের সামনে বদলে যেতে থাকলো।যে বাবা পুরবীর একটু কষ্ট ও সহ্য করতে পারত না সে যেন চোখ থাকতেও স্ত্রী প্রেমে অন্ধ হয়ে রইল। আচ্ছা মা মরে গেলে কি বাবা পর হয়ে যায়????????
এতো কষ্ট স্বীকার করেও হাল ছড়েনি পুরবী।পড়াশুনাটা চালিয়ে রেখেছিল শত অপমান ও বঞ্চনা সত্বেও। সারাদিন ঘরের কাজ করে রাতে মোমের আলোয় পড়াশোনা করত। ভাগ্য বিধাতা বোধ হয় মুখ তুলে চেয়েছিল। আজি সে জানতে পারল তার একটি চাকরি হয়েছে। খুশিতে চোখটা ভিজে গেছিল। দৌড়ে বাড়ি এসেছিল বাবাকেখুশির খবরটা দেবে বলে।কিন্তু সদর দরজায় ঢোকার পথে ভাইয়ের মুখে যা শুনল তাতে তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়।মোটা টাকার বিনিময়ে তার সৎ মা ও বাবা এক মাঝবয়সী লোকের সাথে তার বিয়ে ঠিক করেছে। তার ভাই তাকে বলে এখান থেকে পালিয়ে যেতে।কিন্তু সে ভাইকে ছেড়ে আসতে চায়নি কিন্তু ওর ভাই বললো ওরা তার কিছু করতে পারবে না কিন্তু পুরবীর অনেক বড়ো ক্ষতি করে দিতে পারে।অগত্যা বাড়ি থেকে এক কাপড়ে পালিয়ে আাসে
সে।
"অন্ধ নাকি চোখে দেখেন না???" মালবাহী ট্রাক থেকে ছুড়ে ফেলা বস্তার মতো ধপাস করেই যেনো বাস্তবের এই পোড় খাওয়া বর্তমানে ফিরে আসে পুরবী।অতীতের সমুদ্র সেচে সে যে প্রবাল বের করে এনেছিল তা আবার সমুদ্রের ঢেউ এসে নিয়ে গেল অতলে গভীরে। সন্ধ্যা নামছে।চাকরির appointment letter টা জলে ভাসিয়ে সেও নিজেকে বিসর্জন দেবে গঙ্গার বুকে।নদীর অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে সে।
।হঠাৎ দেখে সামনে ডাস্টবিনের কাছে একটা জটলা।জনতা গোল হয়ে কী যেন খুজছে। অমোঘ টানে ভীড় ঠেলে মাথা বাড়ায় পুরবী।নিজেকে হতভাগিনী শ্রেণির মানুষের তালিকায় শীর্ষে স্থান দেওয়া পুরবী দৃশ্যটি দেখার পর সমাজের এক জন বলে নিজেকে পরিচয় দিতে ঘেন্না বোধ করে।কালো একটা পলিথিন ছিড়ে বেরিয়ে এসেছে পাচটি করে আঙ্গুল সহ ছোট দুটি হাত,দুটি পা।দুর্গন্ধ হওয়ার ভয়ে মানুষ পলিথিনে মুড়ে ময়লা, আবর্জনা, পচা গলা জিনিস ডাস্টবিনে ফেলার পাশাপাশি টিক টিক করে চলতে থাকা হৃৎপিন্ড বাহককেও ছুড়ে েফেলতে পারে তা জানা ছিল না পুরবীর।
বাচ্চা টাকে কোলে তুলে নেয় পুরবী।মুখটা দেখে অলিন্দনিলয়ের কাজকর্ম যেন হঠাৎ একটু ধাক্কা খায়।মায়ের মৃত্যুর পর স্বপ্নে মা আসত তারপর ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যেতো।মায়ের অবয়বটা এখনো কল্পনায় আাসে। লোকে বলে প্রিয়মুখ নাকি কখনো হারিয়ে যায় না।ফিরে ফিরে আসে বারবার।পুরবীর কোলের মাঝে নিস্তেজ হয়ে পড়া এই বাচ্চাটার মুখও ফিরে এসেছে পুরবীর কাছে। আশেপাশের জনস্রোত এ জোয়ার এসেছে এবার," এই বাচ্চা কি আপনার নাকি??""আপনি আবার ছেলে ধরা নাতো"" আপনি মা?? তাহলে ফেলে গেছিলেন কেনো???"""এসব প্রশ্ন ছুতে পারে না পুরবীকে,বাচ্চাটার শ্বাস ওঠানামা করছে।বাচাতে হবে তো ওকে।বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ছুটে চলে পুরবী।প্রিয়মুখ গুলোকে তো আার বারবার হারাতে দেওয়া যায় না।
