STORYMIRROR

Hridita Roy

Romance Others

3  

Hridita Roy

Romance Others

প্রেমের প্রায়শ্চিত্ত

প্রেমের প্রায়শ্চিত্ত

4 mins
116

রৌদ্রতপ্ত বিকেলে বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল স্বাহা। সত্যি আজকাল এত ব্যাস্ত যে নিজের দিকে তাকানোর সময়টা পর্যন্ত পায় না। পড়ন্ত বিকেলে বাইরের হাওয়াটা যেন শান্তি এনে দিচ্ছিল।এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে মন চাইছিলো না স্বাহার।বহুদিন পর আজ স্বাহা পা বাড়ালো গঙ্গা র ঘাটের দিকে। অটো থেকে নেমে গঙ্গার ঘাটে পা বাড়াতেই মনে পড়ে হাজারো স্মৃতি। কত ঘটনার সাক্ষী এই গঙ্গার ঘাট। তবে আজ আর সত্যিই এই ঘটনাগুলো ওকে মন খারাপ করায় না। আজ আর সাহাকে বাথরুমের সাবার চালিয়ে লুকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটতে হয় না। একটু ঘুমানোর জন্য কড়া ডোজের সিডেটিভ নিয়ে হাতে কালো দাগ বসাতে হয় না। আজ এই দিন গুলো সাহার কাছে শুধুই এক দুঃস্বপ্ন, শুধুই কিছু খারাপ স্মৃতি, যা আজ শত চেষ্টা করেও ওর মনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। সবটা কেমন খাওয়া হয়ে গেছে।

এসব ভাবতে যখন গঙ্গার ঘাটে এসে বসলো তখনই চোখে পড়লো সেই জায়গাটার দিকে যেখানে ও বসত প্রায় সপ্তাহের প্রত্যেক বিকেলে। মনের ঝুলি খুলে দিত একজনের কাছে। ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ দেখাত। আবার খিলখিলিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ত।ঝরণার মতো নিজের সত্তাকে উজাড় করে দিয়ে দাঁড়াতো তার সামনে। কিন্তু আজ শুধু স্মৃতির পাতায় বন্দি সবকিছু। হঠাৎ এক বহু পুরোনো চেনা এক কণ্ঠস্বরে পিছনে ফিরল সাহা। চিকনের সাদা পাঞ্জাবি পরা লম্বা চওড়া দেহধারী পুরুষটিকে আজও চিনতে অসুবিধা হয়না। আর আজও একই রকম দেখতে আছে, শুধু সময়ের চেহারায় স্থিরতা এসেছে, অভিজ্ঞতার এসেছে।


"সাহা, তুমি এখানে?"

" হ্যাঁ, ওই একটু সময় বাকি ছিল ভাবলাম একটু ঘুরে যায়।"

" ও আমি রুদ্র। আশা করি চিনতে পেরেছ।"


" হ্যাঁ, চিনতে পারব না কেন বলতো? তুমি যখন আমায় চিনতে পেরেছো আমিও পেরেছি। আর আমার স্মৃতিশক্তি এতটাও খারাপ নয়।"


" ব্যাঙ্গ করছো? যাই হোক আমরা এক জায়গায় বসে কথা বলতে পারি? "


"কেন আজ হঠাৎ? এমনিই কিছু কথা বলার ছিল।"


" তবে আমার তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।"



" নিশ্চয়ই। "


তারপর রুদ্র সাহা গিয়ে বসে পড়ে গঙ্গার পাড়ে একটা বেঞ্চিতে। সূর্য টা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে ততক্ষণে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে রুদ্র নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করে সাহা কে, 


"কেমন আছো?"


" ভালো, খুব ভালো।"


দৃঢ় গলায় উত্তর দেয় সাহা। কিন্তু কেন জানি আর ভদ্রতার খাতিরে হলেও রুদ্র কেমন আছে জানতে ইচ্ছা হয় না। সামনে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। পাশে একটা হাওয়াই মিঠাই যাচ্ছিল। রুদ্র সাহা কে বলে, 


"হাওয়াই মিঠাই খাবে?"


" না, রুদ্র "


"কিন্তু তুমিতো খুব পছন্দ করতে।"



" মানুষ বদলায় রুদ্র। সবাই চিরকাল একরকম থাকে না। আমিও বদলে গেছি।"


" সেই বদল এর কারণটা কি আমি??"


" না, সময় সময় সব পাল্টে দেয়। তুমি আমিতো শুধু নিমিত্ত মাত্র।"



" আজও একই রকম রয়ে গেলে।"


"?? কিরকম???""


" অভিমানী"


" ভুল বললে। অভিমান তো শুধু কাছের মানুষের উপরে দেখানো যায়। "


"আর আমি আজ বড্ড দূরের তাইনা?? "


"হয়তো, কখনও ভেবে দেখিনি।"


" আমি আজ তোমায় একটা কথা বলতে চাই।" "নিষেধ তো কেউ করেনি। আজীবন তো তুমি বলেছিলে। আমি শুনেছি। আজ আর কেন অন্যথা হবে। "


"আই এম সরি। আই এম রিয়েলি সরি ফর দোজ ডেস।"


" ইটস ওকে। আর আমি তোমার কাছে সেদিনের জন্য অনেক থ্যাংকস ফুল।"


অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রুদ্র। কি বলতে চাইছে সাহা?? 


"মানে মানে? "



"সেদিনের ঘটনার জন্য আমি আজ নিজেকে ভালবাসতে শিখেছি। মূল্য দিতে শিখেছি আমার আমিকে।"



কথা শেষ হয় না ফোনটা বেজে ওঠে। ওপাশে কি বলা হয় তা জানতে পারেনা রুদ্র। শুধু একটা কথা ওকে বিস্মিত করে দেয়।



" না সোনা, মা খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। আর টিনটিন এর জন্য সারপ্রাইজ আছে। আজ রাতে খুব মজা করব আমরা। "



ফোন কাটার পরে রুদ্র দিকে ফিরে সাহা। তারপর বলতে শুরু করে,


" আসলে কি বলতো রুদ্র, আমরা মেয়েরা না অন্যের জন্য ভাবতে ভাবতে ভালোবাসতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব তাই আস্তে করে কখন যেনো হারিয়ে ফেলি। ভুলে যাই দিন শেষে একটু নিজের জন্য বাঁচতে হয়। তোমার মাধ্যমে আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি রুদ্র। তাই আজীবন তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। আর আমি সব সময় চেয়েছি তুমি সুখী হও। ভালো থেকো। আছো নিশ্চয়ই। স্ত্রী সন্তান নিয়ে আশা করি আজ তোমার ভরা সংসার।


কথাটার উত্তর এড়িয়ে যায় রুদ্র। জিজ্ঞাসা করে,

" টিনটিন কে?? তোমার মেয়ে??? "


"হ্যাঁ, আমার মেয়ে।"


কেমন একটা না চাইতেও অস্বস্তি ঘিরে ফেলে রুদ্রকে। মনের অসন্তোষ না লুকিয়ে প্রশ্ন করে,"


" তোমার হাজব্যান্ড কি করে?? তোমার শ্বশুর বাড়ির সবাই নিশ্চয়ই ভালো।


খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সাহা। তারপর বলে,


" আজব মানুষ তো তুমি। স্বামীর শ্বশুরবাড়ি এগুলো কোথা থেকে আসলো?? আমার স্বামী শ্বশুরবাড়ি এসব নেই রুদ্র।"



" তাহলে টিনটিন। "


" ও আচ্ছা। তুমি রুদ্র আজও বোকা রয়ে গেলে। সেদিন গর্ভধারণ করতে না পারার অপরাধে তুমি আমার হাত পরিবারের এক কথায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেদিনও তুমি জানতে না আজও জানো না যে প্রকৃতির মেয়েদের মধ্যে মাতৃত্বেরবীজ আপনা-আপনিই বপন করেছে। মা হওয়ার জন্য গর্ভধারণ অত্যাবশ্যক নয় রুদ্র। ""



মাথা নীচু করে বসে থাকে রুদ্র। আর কিছু বলতে পারে না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর উঠে দাঁড়ায় সাহা। আজ ওর মুখটা অন্যরকম প্রসন্নতায় ভরে গেছে। টিনটিন বাড়িতে একা আছে। রুদ্রকে তাই বিদায় দিয়ে আর পিছন ফিরে তাকায় না। সোজা বাড়ির পথে পা বাড়ায়। 



পেছনে সব ভুলে আজ মুক্ত সাহা।অনেকদিনের চাপা কথাগুলো আজ বলতে পেরেছে। নিজেকে বড্ড হালকা লাগছে। 



আর এ দিকে রুদ্র তীব্র আত্মগ্লানিতে পুড়তে থাকে। দীর্ঘ তিন বছর আগে ওভারিতে টিউমার ধরা পড়ে সাহার। তারপর গ্রহণ লেগে যায় ওদের প্রতিনিয়ত স্বপ্নে দেখার লাল-নীল ভবিষ্যৎ সংসারের। অপারেশন, মা হতে না পারা, হতাশা, কোন কিছুতেই পাশে থাকতে পারিনি রুদ্র।সেদিন বড় পরিবারের বংশ রক্ষার দায়িত্ব, মায়ের আবদার, সবকিছু মিলিয়ে কাপুরুষের মতো সেদিন 5 বছরের ভালোবাসার হাত ছেড়ে দিয়েছিল। আজ তিন বছর পর সেই দিনের জন্য বড় ছোট মনে হয় নিজেকে। সেদিন যদি রুদ্রর সবার সাথে লড়াই করে তার পাশে দাঁড়াতে তাহলে হয়তো আজ ওরা একসাথে থাকতো। ওদের একটা ছোট্ট পরিবার থাকতো। কিন্তু আজ আর তার কিছুই সম্ভব নয়। কিছু ভুলের মাশুল আজীবন মানুষকে গুনতে হয়। রুদ্র আর সাহার মাঝে আজ হাজার যোজন দূরত্ব। হাজার চেষ্টা করেও আজ সে দূরত্ব পাড়ি দিয়ে রুদ্রর করা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করা সম্ভব নয়।




Rate this content
Log in

Similar bengali story from Romance