প্রবাহমান
প্রবাহমান
আমার পথচলা শুরু হয়েছিল অনেক বছর আগে।কোন এক পাহারের গা ঘেষে জন্ম আমার।তারপর থেকেই বয়েই চলেছি আপন জীবন পথে।কারন পৃথিবীতে আসার পর থেকে চারপাশ আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিল যদি বাচতে চাই নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে চাই তাহলে চলতেই হবে।সেই থেকেই শুরু আমার পথচলা।অবিরাম ক্লান্তহীনভাবে চলেছি শুধুমাত্র নিজের অস্তিত্ত্বের সংগ্রামে।এরই মধ্যে আমি অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি।অনেকে এসেছে আমার জিবনে।অনেকে চলেও গেছে।কেউ ভালোবেসেছে। কেউ হয়তো ভালবাসেনি,কেউ হয়তো শুধু ব্যবহার করে গেছে আমার দিকে ফিরেও তাকায় নি।কিন্তু আমি ছিলাম নির্বিকার।সবার কাছ থেকে পাওয়া ভালবাসা, কষ্ট , ঘৃণা কে উপেক্ষা করে করে আমি চলেছি আমার পথে।তবে হ্যাঁ একজন ছিল যাকে আমি কোন দিনও উপেক্ষা করতে পারিনি।সে যেদিন প্রথম আমার কাছে এসেছিলতখন খুব ছোট ;ও-ই বছর সাতেক হবে।মাথায় রঙিন ফিতে মোড়ানো দুটি ঝুটি,পরনে লাল রঙের ফ্রক।
সেদিন তার খিলখিল হাসি শুনেই তাকে ভালবেসেছিলাম। তারপর থেকে প্রায়ই আসত।কখন পাশের বাড়ির সেই সম বয়সী বান্ধবী টির সাথে কখনও একা। তার সাথে যেন আমার আত্মার বন্ধন হয়েছিল।প্রায় ই আপন মনে ফুল ভাসাত আমার স্নিগ্ধ জলে।আমিও আলত ঢেউ দিয়ে তার কাছে আমার অস্তিত্বর কথা জানিয়ে দিতাম।কী জানি বুঝতে পারতো কিনা।তারপর দেখতে দেখতে মেয়েটি বড় হয়ে গেল।তাকে দেখলে তখন অন্যরকম লাগত।সে ছিল ছায়াময়ী,কোমল, মমতাময়ী।এক অন্যরকম ছন্দ ছিল তার মধ্যে। প্রত্যেক বিকেলে পাখি গুলো যখন পাখি গুলো দলবেধে নীড়ে ফিরত তখন আমার কাছে সে আসত।আমার পাড়ে বসে আমার জলে পা ডুবিয়ে সে তার সুখ দুঃখের কথা বলত।আর আমি নির্বাক শ্রোতার মতো শুধু শুনতাম।হঠাৎ করেই কী জানি হলো।বেশ কয়েক দিন প্রায়ই চার পাঁচ দিন হবে আমার কাছে সে এলনা।আমার মন প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগত।তারপর ভাবলাম প্রয়োজন ফুরিয়েছে আবার সবার মতো হয়তো আমায় ভুলে গেছে।তারপর হঠাৎ করেই সে একদিন এল,কিন্তু সে যেন পুরো এক আলাদা মানুষ।ভিতর থেকে কেউ যেন দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে। তার মুখের সেই প্রানচ্ছল হাসিটি আর নেই।চোখের নিচে কাল দাগ। খুবই দুর্বল আর ক্লান্ত লাগছিল।যেন বেঁচেও মরে আছে সে।সেদিন আর কোনো কথা বলল না।শুধু বুক ফাটিয়ে কাঁদল অনেক ক্ষণ তারপর যন্ত্রের মত উঠে চলে গেল।আমি বুঝলাম নিশ্চয়ই খুব খারাপ
কিছু হয়েছে তার সাথে।তার জিবনের এই ছন্দ পতনে যেন আকাশ বাতাস সবটা খুব ভারী হয়ে উঠে ছিলো আমার কাছে।এর পর থেকে তাকে খুব একাটা দেখা যেত না।সকাল বেলা যারা জল নিতে আসত শুধু তাদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে দু একটি কথা শুনতাম তার ব্যাপারে।তার এই আমাকে এড়িয়ে চলাটা বড্ড অস্থির করে তুলতো আমাকে একদিন পুর্ণিমা রাতে তার কথা ভাবছি।স্নিগ্ধ চাদের আলো আমায় জড়িয়ে ছিল।চারদিকে অনেক জোনাকির দল খেলছিল।হঠাৎ সে এল।হাতে একটা লাল ডাইরি। সেটা আমার জলে ভাসিয়ে দিয়ে অনেক ক্ষন ধরে আনমনে কী যেন ভাবছিল।একসময় উঠে দাড়াল।হঠাৎ ঝাপিয়ে পরে আমাতে নিজেকে বিসর্জন দিল। আমি অজ্ঞত্যাই আমার খরস্রতা বক্ষে তাকে আশ্রয় দিলাম।
আমি এখন বহমান। তার হৃদয়ের দুঃখ বেদনা,কষ্ট, তার অস্তিত্ব নিজের করে নিয়ে আমি আজ প্রবহমান। বয়ে চলেছি আপন পথে আপন উদ্দেশ্যে।
