Gopa Ghosh

Romance Tragedy

5.0  

Gopa Ghosh

Romance Tragedy

শেষ চুম্বন

শেষ চুম্বন

6 mins
640


গৌরী আজ যে কথাটা শুনলো এখনো যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। এমনও হয়? বকুলকে অনেক দিন আগেই ও একটা উপায়ের পথ বার করার জন্য বলেছিল , সে যাই হোক সেলাই বা কারো বাড়ি পরিচারিকার কাজ ওসবই পারবে কিন্তু শহরে যেতে পারবে না কারণ ওর বৃদ্ধা মা পঙ্গু হয়ে বিছানা নিয়েছে প্রায় তিন মাস, আর কেউ নেই যদিও গৌরির বিয়ে হয়েছিল কিন্তু বিয়ের এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই স্বামী মারা যায় আর শ্বশুরবাড়ি ওকে নিতে চায়নি, তাই ওর পক্ষে শহরে গিয়ে থাকা অসম্ভব। বকুল ওর সাথেই স্কুলে পড়তো। গৌরীর স্কুলের পড়াশোনা সম্পূর্ণ হয়নি কিন্তু বকুল ওদের গ্রামে মাধ্যমিক পাস করা একমাত্র মেয়ে। বাড়ির অবস্থাও খারাপ নয় অন্তত দিন আনা দিন খাওয়া নয়। বকুলের দাদা এখন ওর বিয়ের চেষ্টা করছে। গৌরির বাড়িতে এমন কেউ নেই যে ওকে সাহায্য করবে। কিন্তু মায়ের অসুখ এ খরচ করতে করতে ওর এখন পিঠ ঠেকে গেছে, মানে যা পুঁজি ছিল সব শূন্য। বকুলকে যখন কাজের কথা বলেছিল তখন বকুল উল্টে ওকে বলেছিল

"তুই কাজ কি করবি ? তুই কি পড়াশোনা শিখেছিস ? আর জেনে রাখ ফাইভ পাশের কোন চাকরি এই যুগে আর হয় না। তবু গৌরী হার মানেনি বকুলের হাতটা ধরে খুব করুণ সুরে বলেছিল

"বকুল তুই কিছু জোগাড় করে না দিতে পারলে আমাকে মাকে নিয়ে আত্মহত্যা করতে হবে বিশ্বাস কর"

এবার বকুলের মুখটাও যেন একটু করুন দেখায় , বকুল বলে ওঠে

"তুই সব কাজ করতে পারবি তো মানে শহরে অনেক রকম কাজ আছে ঠিক আছে আমি তোকে সামনের সপ্তাহে জানাবো"

গৌরী যেন একটু আশা পেয়েছিল কিন্তু আজ যা শুনলো সেটা কি ও করতে পারবে? অন্যের সন্তান পেটে রেখে আবার তাকে নাকি ফেরত দিয়ে দিতে হবে বকুল বলছিল ও যদি করতে পারে তাহলে বেশ অনেকটা টাকা পেতে পারে। মাথাটা কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল গৌরির, নিজেই ঠিক করতে পারছিল না কি করবে? বকুল ওকে বলেই গেছে

"অন্যের সন্তান তোর শুধু পেটে থাকবে তোর এতে আপত্তি কিসের? আর সমস্ত খরচ ওরাই বহন করবে তুই শুধু তোর টাকাটা পেয়ে যাবি"

সেদিন সারা রাত ঘুমোতে পারলো না গৌরী তবে সকালে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে স্থির করলো সে রাজি, টাকা তাকে উপায় করতেই হবে আর এটাতো কোনো অন্যায় নয়। বলতে গেলে কাউকে ও পরোক্ষ ভাবে উপকারী করছে অবশ্য টাকাটা ওকে নিতেই হবে কারণ একমাস পরেই ওর মায়ের একটা ছোট অপারেশন হওয়ার কথা আছে। টাকার কথা বলার সময় ও ভাবলো সত্যি কথাটা বলেই দেবে কারণ কিছু টাকা অগ্রিম না পেলে ও এতে কিছুতেই রাজি হবে না। বিকেলে বকুল এল। বকুল শুনে বেশ খুশি হলো। বকুল ওকে টাকার ব্যাপারে অভয় দিলো

"তুই কিছু চিন্তা করিস না গৌরি তোর মায়ের অপারেশনের টাকা ওরা দিয়েই দেবে এদের খুব পয়সা আছে তোর কোন চিন্তা নেই শুধু ওরা যা বলবে সেটা প্রতি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবি তাহলেই হবে"

একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে গৌরী পরের সপ্তাহে বকুলের সাথে ফাইনাল কথা বলতে গেল।


সত্যি বকুল একফোঁটাও মিথ্যে বলেনি এদের রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি, সামনে দাঁড়িয়ে ঝাঁ-চকচকে দুটো গাড়ি। বকুল সামনের দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ানকে কানের পাশে কি আস্তে আস্তে বলতেই একটু হেসে দাঁড়তে বলে ভেতরে ঢুকে গেল। আর দু মিনিটের মধ্যেই দারোয়ান এসে ওদের দুতলায় নিয়ে গেল। সত্যি এত সুন্দর ঘর গৌরী কোনদিন দ্যাখেনি। এবার পরিচারিকা দুজন কিছু সুদৃশ্য ডিশে করে খাবার নিয়ে ওদের সামনে রেখে বলে গেল

"দাদা বৌদি একটু বসতে বললেন আপনারা ততক্ষণ এগুলো খান"

বকুল খেতে আরম্ভ করলেও গৌরী কিন্তু কোন কিছুই দাঁতে কাটল না, এমনকি বকুল বলা সত্বেও না।

প্রায় মিনিট পনের পর একজন ভদ্রলোক যেন রাজপুত্তুর আর তার পেছনে সুন্দরী বললে কম বলা হবে , বলা যেতে পারে অতি সুন্দরী ভদ্রমহিলা এসে এক মুখ হেসে পাশের সোফায় বসলেন

প্রথমে বকুলের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন

"তুমি এনাকে এনেছো, আমি যে জন্যে বলেছিলাম তোমার মনে আছে তো ? আর রাজি কিনা সেটা ভালো করে জেনে ছো?"

বকুল সাথে সাথে বলে ওঠে

'হ্যাঁ দাদা বাবু কোন আপত্তি নেই গৌরির, আপনি কাজে এগোতে পারেন"

এবার গৌরির দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে ভদ্রলোক প্রশ্ন করেন

"তোমার কোন আপত্তি থাকলে এখন বলো কারণ চুক্তি হয়ে গেলে আর তোমার পক্ষে পিছিয়ে যাওয়া হয়তো সম্ভব হবে না , তাতে ক্ষতি তোমার বা আমাদের দুজনেরই হবে তাই যা চিন্তা করার এখনই করে নাও"

এবার গৌরী মাটির দিকে তাকিয়ে থাকা চোখটা সোজাসুজি ভদ্রলোকের চোখের ওপর রেখে বলে

"দাদা আমার মা খুব অসুস্থ তাই পয়সার জন্যই আমি রাজি হয়েছি আপনাকে একটাই অনুরোধ সামনের মাসে মায়ের অপারেশনের সময় আমার কিছু টাকা অগ্রিম চাই আর আমাকে নিয়ে আপনার কোন রকম চিন্তা নেই কারণ আমি কখনোই পিছিয়ে আসব না"

এবার পাশে বসে থাকা ভদ্রমহিলা বলে ওঠে

"দেখো গৌরী আমাদের নিয়ে তোমার কোন চিন্তা নেই তুমি টাকাটা মায়ের চিকিৎসার জন্য চাইছ তাই এখানে তোমার কোন কুন্ঠা করার কোন কারণ নেই আর একটা কথা সামনের সপ্তাহে তোমার মেডিকেল চেকআপ হওয়ার পরেই আমরা ঠিক করব তোমাকে দিয়ে এই কাজটা হবে কিনা তাই আর দু সপ্তাহ হয়তো লাগবে তোমার টাকা পেতে"

সেদিন আরো কিছুক্ষণ থেকে বকুল আর গৌরী বাড়ি চলে এসেছিল। গৌরী রাতে শুয়ে থাকে বটে কিন্তু চোখে ঘুম টা যেন উবে গেছে এরপর থেকে। নানান চিন্তা মাথায় আসে। শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার সহ্য করেও তিন বছর টিকে ছিল শুধু মাত্র মনুর জন্য। মনু ওর একমাত্র মেয়ে । ওর স্বামী তীর্থ মনু কে ছাড়েনি। অনেক কাকুতি মিনতি করার পরেও ওদের মন ভেজেনি। প্রায় বছর তিনেক বাদে একদিন ওর শ্বশুর বাড়ির গ্রামের এক ভদ্র লোকের মুখে শুনেছিল মনু নাকি আর নেই। এক অজানা জ্বরে মারা গেছে। সেই বুকফাটা কান্না তিনটে গ্রাম শুনেছিল, সারারাত ঘুমোতে পারত না গৌরি।

শেষে ডাক্তারি পরীক্ষায় ছাড়পত্র পেয়ে গেল গৌরী। এরপরে গৌরী রঞ্জন বাবুকে সব কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে বলেছিল

"দাদা আমি মাকে ছেড়ে বাইরে থাকতে পারবোনা কারণ আমার মা ওঠাবসাই করতে পারেন না"

রঞ্জন বাবু গৌরীর করুন চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল

"তোমাকে এত চিন্তা করতে হবে না আমরা যখন আছি তোমার কোন অসুবিধা হবে না তোমার মাকে দেখার জন্য আমি বাড়িতে নার্স পাঠাবো বুঝলে?"

এরপর গৌরী আর কিছু বলেনি। ও বুঝেছিলো রঞ্জনবাবু আর বৌদি খুবই দয়ালু প্রকৃতির তাই এদেরকে কিছু বলার দরকার নেই। মায়ের অপারেশনের টাকা কথামতো অগ্রিম পেয়েছিল গৌরী।

এখন মাঝে মাঝে পেটে হাত দিলে ওর মনে হয় মনু আবার ওর ভেতরেই আছে। এটা মনে হতেই চমকে ওঠে। এ তো অন্যের জিনিস, এতে ওর কোন অধিকার নেই। ও শুধু ওর গর্ভ কে টাকার বিনিময় বিক্রি করেছে তাই এতে ওর কোন অধিকার থাকার কথা নয়। মনে পড়ে যায় শেষবার যখন মনুকে রেখে ওরা ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল তখন ঘরের ভেতর থেকে মনু খুব জোরে কেঁদে কেঁদে বলছিল

"মা আমি যাব মা আমি যাব"

না ওকে নিয়ে আসতে পারেনি গৌরী। শুধু একটা শেষ চুমু খেতে চেয়েছিল মেয়ের কপালে কিন্তু ওর বর ওকে এক লাথি মেরে উঠোনে ফেলে দেয়। ও উঠার আগেই দরজা বন্ধ হয়ে যায় ওর শ্বশুরবাড়ির। শেষ চুমুটা আর খাওয়া হয়না মনুর কপালে।

মাঝে মাঝে গৌরী ভাবে তবে কি মনু আবার আসছে ওর কাছে ? ক'দিন ধরে শরীরটাও ওর ঠিক ভালো যাচ্ছে না। চিকিৎসার কোনো অভাব নেই কিন্তু তাও শরীরটা ক্রমশ ভেঙে আসছে ও বুঝতে পারছে। আর বেশি দেরি নেই সেই দিনটা আসার। ওর চেয়েও বেশি উত্তেজনা দাদা আর বৌদির। নিঃসন্তান দম্পতির ঘরের প্রদীপ আসছে,আনন্দ তো হবেই। মাঝে মাঝে বৌদি কাছে মায়ের খবর নেয় । যখন শোনে অপারেশনের পর মা আগের থেকে অনেকটাই সুস্থ আছে তখন ওর দুচোখ দিয়ে আনন্দের জল বের হয় বৌদি ওর হাতটা ধরে সান্তনা দেয়

"এত চিন্তা করো না দেখো মাসীমা ঠিক ভালো হয়ে যাবেন"

মাসিমা হয়তো ভালো হয়ে উঠছে কিন্তু ডাক্তাররা ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন গৌরীর অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর কয়েকদিন পরেই ডেট তাই ওরা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আসলে গৌরী নিজেও বেশ ভালো করে বুঝতে পারছিল ও আর বেশিদিন নেই। তাই বৌদি কাছে আসতেই ও হাতটা শক্ত করে ধরে বলল

"বৌদি তোমায় একটা কথা অনুরোধ করবো?"

"হ্যাঁ করো , কি বলছো বলো"

"আমি যদি না থাকি তাহলে আমার মায়ের খেয়াল রেখো আর যে আসছে তাকে আমি শেষ বেলায় একটা উপহার দিয়ে যেতে চাই"

গৌরী এই শেষ কথাটা শুনে একটু অবাক হলেও বৌদি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে চুপ করে থাকলো

সেই আকাঙ্খিত দিন এলো। গৌরী এক ফুটফুটে মেয়ে সন্তানের জন্ম দেয়। দাদা-বৌদি খুশিতে আত্মহারা হলেও গৌরির অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকেই যেতে থাকে। বৌদি বাচ্চাকে নিয়ে ওর খুব কাছে গিয়ে কানে কানে বলে

"এবার তোমার উপহার টা দেবে ওকে এনেছি"

গৌরী আর কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলো না। শুধু ইশারায় বাচ্চাটার মুখটা একটু কাছে আনতে বলে ওর ঠোঁটটা কপালে ছোঁয়ায় । কেউ না বুঝলেও বৌদি বোঝে ওটাই ওর শেষ চুম্বন।



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Romance