রক্তিম কলম্বিয়ার ছায়াশরীর
রক্তিম কলম্বিয়ার ছায়াশরীর
খবরের কাগজের প্রথম পাতার বিশাল কালো হরফে লেখা হেডলাইনটার দিকে তাকিয়ে কলম্বিয়ার নাগরিকদের বুক কেঁপে উঠছিল।
**"এক সপ্তাহে ১৩ জন নিখোঁজ! এক মাসে সংখ্যা ছুঁল ৬০! রাতের শহর কি কোনো নরখাদকের কবলে?"**
রিপোর্টটি অত্যন্ত ভয়াবহ। নিখোঁজ হওয়া প্রত্যেকটি মানুষ তাদের নিজেদের ঘরের বাইরে থেকে, কখনো রাস্তা থেকে, কখনো বা বাড়ির লন থেকে আচমকা গায়েব হয়ে গেছে। কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই, নেই কোনো রক্তের দাগ। শুধু পড়ে থাকছে এক চরম শূন্যতা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে কলম্বিয়া সরকার তড়িঘড়ি করে রাতে ঘরের বাইরে বেরোনোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পুরো শহরে সূর্য ডোবার পর থেকেই কার্যকর হচ্ছে এক অলিখিত, থমথমে কারফিউ। রাস্তায় শুধু টহল দিচ্ছে পুলিশের সাইরেন বাজানো গাড়ি। কিন্তু সেই অন্ধকার রাতেও যে এক আদিম, হিংস্র আতঙ্ক ওত পেতে বসে আছে, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল।
এই আতঙ্কের সুতো জড়িয়ে ছিল কলম্বিয়ার এক কোণে অবস্থিত বিজ্ঞানী রজার বেন্সের পরিত্যক্ত ল্যাবরেটরির সঙ্গে। কয়েক বছর আগে বিজ্ঞানী রজার জিনেটিক কোড পরিবর্তনের এক অত্যন্ত জটিল ও গোপন প্রজেক্টে কাজ করছিলেন। তাঁর গবেষণার সঙ্গী ছিল তাঁরই অতি আদরের পোষ্য জার্মান শেফার্ড কুকুর—**রম্যান**। কিন্তু একটি ভুল এক্সপেরিমেন্টের কারণে রম্যানের শরীরে এক অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর ট্রান্সজেনিক পরিবর্তন ঘটে যায়। রম্যান আর সাধারণ গৃহপালিত পশু রইল না; তার কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত হয়ে এক প্রকাণ্ড, হিংস্র এবং মানব সভ্যতার জন্য চরম ক্ষতিকর এক দানবীয় প্রাণীতে রূপ নিতে শুরু করল।
বিষয়টি বিজ্ঞান মহলে জানাজানি হতেই হইচই পড়ে যায়। কোর্টের নির্দেশে রম্যানকে মানবজাতির সুরক্ষার স্বার্থে 'ইউথেনেশিয়া' বা লথাল ভাইরাস ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি ল্যাবের কর্মচারীদের চরম গাফিলতি আর অবহেলার কারণে এক মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। রম্যানকে ভাইরাস ইনজেক্ট করা ঠিকই হয়েছিল, কিন্তু তার ডোজ সঠিক ছিল না। মৃত্যুর বদলে সেই ভাইরাস রম্যানের ডিএনএ-কে আরও বেশি খ্যাপাটে আর শক্তিশালী করে তোলে। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রম্যান ল্যাবের লোহার খাঁচা ভেঙে, কয়েকজন গার্ডকে জখম করে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনার সম্পূর্ণ দায় এসে পড়ে বিজ্ঞানী রজারের ওপর। বিজ্ঞান মহল থেকে তাঁর বৈজ্ঞানিক লাইসেন্স আজীবনের জন্য বাতিল করে দেওয়া হয়। সমাজ তাঁকে অপরাধীর চোখে দেখতে শুরু করে, আর তিনি একাকীত্ব ও গ্লানি নিয়ে দিন কাটাতে থাকেন।
কিন্তু রজারের মেয়ে, **বেলা বেন্স** দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না। ইউরোপের এক নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর গবেষণা শেষ করে বেলা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি তাঁর বাবার হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনবেন।
ইউরোপে বসেই বেলা দিনরাত এক করে কলম্বিয়ার সেই সরকারি ল্যাবের নথিপত্র, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আইনি লুপহোলগুলো নিয়ে পড়াশোনা করেন। অবশেষে তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, রম্যানের পালিয়ে যাওয়া এবং আরও হিংস্র হয়ে ওঠার পেছনে বিজ্ঞানী রজারের কোনো হাত ছিল না; বরং তা ছিল সম্পূর্ণভাবে সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও ত্রুটিযুক্ত ভাইরাস ইনজেকশনের ফল। বেলার অক্লান্ত লড়াইয়ের পর আদালত বিজ্ঞানী রজারকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয় এবং বিজ্ঞান মহল সসম্মানে তাঁর বৈজ্ঞানিক লাইসেন্স ফিরিয়ে দেয়, যাতে তিনি আবার আইনত তাঁর গবেষণা শুরু করতে পারেন।
এদিকে কলম্বিয়ার রাতগুলো দিন দিন আরও রক্তাক্ত হয়ে উঠছিল। রম্যান এখন আর সেই চেনা কুকুরটি ছিল না। সে পরিণত হয়েছিল প্রায় আট ফুট উচ্চতার এক বিশাল, রোমশ, রক্তপিপাসু হাইব্রিড জন্তুতে। তার পেশিবহুল শরীর, খাঁড়ার মতো ধারালো নখ আর অন্ধকারে জ্বলজ্বল করা লাল চোখ দুটো ছিল সাক্ষাৎ যমদূত।
রম্যানের শিকার করার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত চতুর ও নিঃশব্দ। রাতের বেলা যখনই কেউ কারফিউ অমান্য করে রাস্তায় বেরোত বা জানলা খোলা রাখত, রম্যান বাতাসের গতিতে এসে তার ঘাড় মটকে দিত। তার চিবুকের কামড় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মানুষের হাড় এক নিমেষে গুঁড়ো হয়ে যেত। শিকারকে মুখে করে তুলে নিয়ে সে শহরের ভূগর্ভস্থ ড্রেন বা গভীর জঙ্গলে চলে যেত। কোনো চিৎকার করার সুযোগ পর্যন্ত পেত না ভুক্তভোগীরা। পুরো কলম্বিয়া শহর এক অদৃশ্য দানবের ভয়ে কাঁপছিল।
ইউরোপে বাবার সম্মান পুনরুদ্ধারের সমস্ত কাজ শেষ করে বেলা বেন্স কলম্বিয়া ফিরছিলেন রাতের ফ্লাইটে। বিমান যখন ল্যান্ড করল, তখন ঘড়িতে রাত একটা। পুরো এয়ারপোর্ট এবং তার চারপাশ শুনশান, কারফিউর কারণে কোনো ট্যাক্সি নেই।
বিজ্ঞানী রজার নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে মেয়েকে আনতে এসেছিলেন। দীর্ঘদিন পর বাবাকে জড়িয়ে ধরে বেলার চোখে জল এসে গেল। কিন্তু আনন্দের আবহের মাঝেই ছিল এক অদ্ভুত অস্বস্তি। এয়ারপোর্ট থেকে বেরোবাত্রই রজার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলেন। চারদিকের কুয়াশা আর ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় রাস্তাঘাট জনমানবহীন, ঠিক যেন কোনো ভূতুড়ে শহর।
গাড়িটি যখন শহরের মূল ওভারব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন হঠাৎ করেই রজার ব্রেক কষলেন। গাড়িটা ঝঁকুনি দিয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
বেলা চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, "কী হলো বাবা? গাড়ি থামালে কেন?"
রজার কোনো কথা বললেন না। তাঁর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। তিনি আলতো করে গাড়ির হেডলাইটটা পুরোপুরি অফ করে দিলেন, যাতে চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যায়। তারপর কাঁপানো আঙুল উঁচিয়ে সামনের ওভারব্রিজের দিকে ইশারা করলেন।
বেলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। ওভারব্রিজের ঠিক মাঝখানে, চাঁদের আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে এক পর্বতপ্রমাণ বিশাল আকৃতির জন্তু। তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ বহুদূর থেকে শোনা যাচ্ছে। জন্তুটা ব্রিজের ওপর পায়চারি করছে, যেন তার শিকার খুঁজছে।
বেলা ভালো করে লক্ষ্য করলেন। জন্তুটার পিঠের দিকের লোমের রঙ, কান দুটোর গড়ন এবং তার হাঁটার ধরনে এক অদ্ভুত পরিচিতি আছে। বেলার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। তিনি ফিসফিস করে বলে উঠলেন, "বাবা... ওটা তো... ওটা তো আমাদের রম্যান!"
ট্রান্সজেনিক ত্রুটি আর ভাইরাসের মরণকামড়ে তাদের সাধের পোষ্য আজ এক নরখাদক দানবে পরিণত হয়েছে, এই সত্যটা মেনে নেওয়া তাদের দুজনের পক্ষেই ছিল চরম যন্ত্রণাদায়ক।
বেলা বুঝতে পেরেছিলেন, রম্যানকে এভাবে ছেড়ে দিলে সে পুরো শহরকে ধ্বংস করে দেবে। তাছাড়া, সে নিজে এক চরম শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বেলা নিজের ল্যাবে তৈরি করেছিলেন একটি বিশেষ ট্রান্সজেনিক মেডিসিন বা প্রতিষেধক, যা এই দানবীয় জিনের কার্যকারিতা বন্ধ করে প্রাণীকে এক নিমিষে চিরশান্তি দিতে পারে।
পরের কয়েকদিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রজার ও বেলা রম্যানকে সেই ওভারব্রিজের পরিত্যক্ত এলাকায় ট্র্যাপ করেন। রম্যান যখন তাদের গন্ধ পেয়ে হিংস্রভাবে তেড়ে আসছিল, তখন বেলা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, নিখুঁত নিশানা করে সেই প্রতিষেধক ভরা ডার্ট ইনজেকশন রম্যানের শরীরে ছুঁড়ে মারেন।
ওষুধটি শরীরে প্রবেশ করতেই রম্যানের বিশাল শরীরটা থমকে গেল। তার ভেতরের হিংস্রতা যেন এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো উবে গেল। তার লাল চোখ দুটো আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে এল। সে ভারী শরীরটা নিয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। তার মুখ দিয়ে আর কোনো গর্জন বেরোচ্ছিল না, কেবল এক মৃদু যন্ত্রণার আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল।
রজার এবং বেলা দৌড়ে গেলেন সেই বিশাল জন্তুটার কাছে। রম্যান তখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে। বেলা হাঁটু গেড়ে বসে সেই ভয়াল, বৃহৎ আকারের জন্তুটার মাথায় হাত বোলালেন, ঠিক যেভাবে ছোটবেলায় রম্যানকে আদর করতেন। রম্যানের চোখ থেকেও যেন এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, যেন সে তার পুরনো মালিকদের চিনতে পেরেছে এবং এই যন্ত্রণাময় জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।
বিজ্ঞানী রজার তাঁর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বিজ্ঞান হয়তো তাঁদের জয়ী করেছিল, তাঁদের লাইসেন্স আর সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিল—কিন্তু আজ এক নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে একসময়ের প্রিয় পোষ্যের এই পরিণতিতে দুই বিজ্ঞানীর মন বিষাদে ছেয়ে গেল। কলম্বিয়ার রাত আবার শান্ত হলো, কিন্তু এক গভীর ক্ষত রেখে গেল রজার আর বেলার বুকে।
