*পরিবর্তন*
লেখক : প্রদীপ দে
পরিবর্তন মানে ভাঙা নয়, গড়ার গান,
পুরনো ইটের ফাঁকে নতুন চারার প্রাণ,
তাই বলি, ও বাংলা, তুই থামিস না,
গঙ্গা যেমন বয়, তেমনি বয়ে চল,
শেকড় আঁকড়ে ধরে আকাশ ছুঁয়ে দেখ,
পরিবর্তনই তোর আসল মঙ্গল
ইটের পরে ইট সাজিয়ে নয় ঘৃণার প্রাচীর,
হৃদয়ের পরে হৃদয় রাখি, হোক মানবতার মিছিল।
আজানের সুরে মিশে যাক শঙ্খধ্বনি,
ঈদের চাঁদে লাগুক দীপাবলির আলোর কণা,
গির্জার ঘণ্টা ডাকুক ভোরের আজান,
বাংলার মাটি শেখাক সম্প্রীতির বন্দনা।
ইতিহাসের ক্ষত খুঁচিয়ে লাভ কী বলো?
পুরনো কাঁটায় রক্ত ঝরে, শান্তি হয় না,
তার চেয়ে চলো গাছ লাগাই একসাথে,
যার ছায়ায় বসবে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ, সবার বায়না।
মন্দির ভেঙে মসজিদ নয়,
মসজিদ ভেঙে মন্দিরও নয়,
গড়ি চলো এমন এক দেশ,
যেখানে মানুষই হবে মানুষের পরিচয়।
রাস্তার নাম পাল্টে দিলেই হয় না পরিবর্তন,
সাইনবোর্ডে নতুন অক্ষর, পুরনোই অন্ধকার।
গলির মোড়ে আজও যদি মেয়ের বুক কাঁপে,
তবে বলো, কী লাভ এই নামের অলংকার?
ইতিহাসের পাতা মুছতে ব্যস্ত যখন শহর,
রাতের বাসে, ফাঁকা রাস্তায়, ভয় তখনও জ্যান্ত।
মূর্তি বসে, ফলক ওঠে, ভাষণে ভরে মঞ্চ,
কিন্তু ঘরে ফেরার পথে মেয়েটা আজও ক্লান্ত।
পরিবর্তন চাই না ইট-পাথরের গায়ে,
পরিবর্তন চাই পুরুষের চোখের চাহনিতে,
আইনের পাতায় নয় শুধু, চাই রাস্তার আলোয়,
পুলিশের টহলে, আর তোমার-আমার মানসিকতাতে।
মেয়েদের সুরক্ষা মানে শুধু CCTV নয়,
মানে হলো ছেলেকে শেখানো—“না মানে না”,
মানে হলো ধর্ষকের ফাঁসি নিয়ে মিছিল নয় শুধু,
মানে হলো ধর্ষণ যেন জন্মই না নেয়, সেই সমাজ গড়া।
তাই নাম বদলের উৎসব থামিয়ে এবার
চলো রাতের শহরকে মেয়েদের জন্য নিরাপদ করি,
বাসে-ট্রেনে-অফিসে-স্কুলে ভয় নয়, ভরসা থাক,
এটাই হোক আসল ‘পরিবর্তন’, এটাই দরকারি।
*মেয়েরা রাস্তা চায় না, অধিকার চায়।*
*নাম নয়, নিরাপত্তা চাই।*
*ফলক নয়, স্বাধীনতা চাই।*
কথা কম, কাজ বেশি হোক। পশ্চিমবঙ্গ বদলাক মেয়েদের নিশ্চিন্ত হাঁটার শব্দে।
শুধু ফলক আর ভাষণে পেট ভরে না,
ডিগ্রির ফাইল চাপা পড়ে থাকে তোরঙ্গে।
চায়ের দোকানে জমে শিক্ষিত বেকার,
স্বপ্নগুলো মরে বাস্তবের সংঘর্ষে।
গর্ব করি ইতিহাস নিয়ে, কবিতা নিয়ে,
কিন্তু ছেলেটা আজও চাকরির ফর্ম তোলে।
দুর্গাপুরের চিমনি কবে জ্বলবে আবার?
হলদিয়া, খড়গপুর জাগবে কবে কলে?
পরিবর্তন মানে শুধু নামের খেলা নয়,
পরিবর্তন মানে কারখানার সাইরেন বাজা।
সিঙ্গুরের মাটি কাঁদে, নন্দীগ্রাম চুপ,
শিল্প যদি না আসে, তবে কিসের রাজা?
চাই না আমরা রঙিন ফেস্টুনের মেলা,
চাই ছেলের হাতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার।
চাই মেয়েটা কোড লিখুক সল্টলেকে বসে,
চাই বাংলার গ্রামে গড়ে উঠুক ডেটা সেন্টার।
শিল্প মানে শুধু ধোঁয়া নয়, প্রযুক্তিও হয়,
কৃষির সাথে শিল্পের হোক শুভ পরিণয়।
চপ-শিল্পের ঠাট্টা থামিয়ে এবার
গড়ি চলো আসল শিল্প, ঘোচাই বেকারত্বের ভয়।
গর্ব করব সেদিনই, যেদিন
বাংলার ঘরে ঘরে থাকবে কাজের খবর,
ডিগ্রি হবে না বোঝা, হবে হাতিয়ার,
বেকারত্ব শব্দটাই যাবে ইতিহাসের কবর।
লাল-নীল-গেরুয়ার ঝান্ডা উড়িয়ে কী লাভ,
যদি পেটে ভাত না থাকে, চাকরি না পায় যুবক?
হিন্দু-মুসলিম বিভাগের অঙ্ক কষে কী হবে,
যদি ভাগ হয়ে যায় আমার সোনার বাংলার বুক?
রাজনীতির রঙে রাঙিয়ে দিলেই হয় না উন্নয়ন,
মিছিলের স্লোগানে পেটের জ্বালা মেটে না।
মন্দির-মসজিদের ইট গুনতে গুনতে ভুলে গেছি,
স্কুল-হাসপাতাল-কারখানার ইট কে গাঁথবে, জানে না।
গর্ব করব সেদিন, যেদিন লাল মানে হবে রক্ত নয়,
লাল হবে বিপ্লব কর্মসংস্থানের, শিল্পের জোয়ার।
নীল মানে হবে বিভাজন নয়, নীল হবে আকাশ,
যেখানে ডানা মেলবে বাংলার বিজ্ঞান, মেধার বিস্তার।
গেরুয়া মানে হবে ঘৃণা নয়, ত্যাগের প্রতীক,
গেরুয়া হবে সন্ন্যাস দুর্নীতির, গড়বো সৎ সরকার।
হিন্দু ঘরে জন্মে কী গর্ব, মুসলিম ঘরে জন্মে কী লজ্জা?
গর্ব তো সেদিন, যেদিন দু’জনেই একসাথে পাবে কাজ।
আজানের সাথে শাঁখ বাজলে যেদিন কেউ ভ্রু কুঁচকাবে না,
সেদিনই জন্ম নেবে আমার স্বপ্নের ‘নতুন বাংলা’।
বিভাগ নয়, সংযোগ চাই—
ব্রিজ চাই গ্রামে-গঞ্জে, মনেরও সেতু চাই।
ধর্ম থাকুক ঘরে, কর্ম থাকুক মাঠে,
মানুষের পরিচয় হোক শুধু মানুষ, এটাই বড়াই।
*লাল-নীল-গেরুয়া শেষে, এসো মানুষ হই।*
*হিন্দু-মুসলিম ভুলে, বাঙালি হই।*
*বিভাগের গল্প থামিয়ে, উন্নয়নের গান গাই।*
*এটাই হোক গর্ব, এটাই নতুন বাংলা, ভাই।
*
পরিবর্তন কখনো চিরস্থায়ী নয়,
সে আসে হঠাৎ, বাতাসের মতো—
জানলা খুলে দিয়ে যায় এলোমেলো ঘর,
আবার কখন চলে যায়, বুঝতেই পারো না কত।
সে ক্ষণস্থায়ী, বিদ্যুতের ঝলক,
এক পলকে দেখায় নতুনের আলো,
পরের পলকেই আঁধার যদি গ্রাস করে,
পুরনো অভ্যাস টেনে ধরে কালো।
তাই তো তাকে ধরতে হয় শক্ত মুঠোয়,
যেমন ধরে রাখি জোনাকির আলো,
হাতের তালুতে যত্নে, ভয় হয় উড়ে যাবে,
তবুও বিশ্বাস—এইটুকুই ভালো।
নদী বয়, স্রোত বদলায় প্রতি বাঁকে,
তবুও পাড় ভাঙে যদি আগলে না রাখি,
মনের ভেতর যে বিপ্লব জাগে একদিন,
চর্চা না পেলে সে-ও যায় ফাঁকি।
স্বাধীনতা একদিনে আসে না, জানি,
রোজ তাকে শান দিতে হয় রক্ত দিয়ে,
তেমনি পরিবর্তনও রোজকার লড়াই,
তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় স্বপ্ন দিয়ে।
রাস্তার নাম বদলালে হয় না বদল,
মানুষের মন বদলালে হয় দেশ,
শিল্প এলে তবেই তো ঘোচে বেকারত্ব,
নইলে সবই ক্ষণিকের আবেশ।
তাই এসো, ক্ষণস্থায়ী এই আলোটুকু
বুকের ভেতর জ্বালিয়ে রাখি,
পরিবর্তনকে শুধু ডাকলে হবে না,
তাকে রোজ খেতে দিতে হবে, তাকে রাখি।
চিরস্থায়ী নয় বলেই তো তার দাম বেশি,
হারিয়ে ফেলার ভয়েই তো আগলে রাখি,
চলো, প্রতিদিন একটু করে গড়ি,
যেন কালকের বাংলা বলে—আমিই সাক্ষী।
পরিবর্তন অতিথি নয়, সন্তান। তাকে বড় করতে হয় রোজ।