Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sandip Das

Classics


5.0  

Sandip Das

Classics


নারী মুক্তি

নারী মুক্তি

37 mins 1.0K 37 mins 1.0K


( নারী শক্তির জাগরণে , নারীদের গল্প )


পূর্বকথা 


Come out and find yourself 

Don't be depressed , 

You move . 

And a day your existence will be searched 

by time even .

The chains surrounding you are not your clothes 

Melt it to form death for them .

You move .

And a day your existence will be searched 

by time even .

If the character is pure 

Then why is thy condition 

The impurities have no right 

To challenge you , to question you .

You move .

And a day your existence will be searched 

by time even .

Burn all into ashes 

Those what are cruel and corrupted 

You are not a holy candle light 

But an explosion of fire 

You move .

And a day your existence will be searched 

by time even .

Turn your coverings into a symbol 

Shake the whole sky 

If thou be uncovered 

The whole earth will be quaked 

You move .

And a day your existence will be searched 

by time even .


Come out and find yourself ....




জীবনের সেই দিনগুলো ভুলে থাকা , কার্যত বেলঘড়িয়া নিবাসিনি পারমিতা ও সায়ন্তনী র কাছে অসম্ভব । এখান থেকে জীবনের এই লম্বা পথ চলা শুরু করে দুজনে , অবশ্য একজন তৃতীয় জনও ছিল ; গরিমা ধর । তিনজনের মধ্যে খুবই বন্ধুত্ব এবং এমন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে পরস্পরের মধ্যে কথা হত না । খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব , এদের , যেন হরিহর আত্মা । পারমিতা ও সায়ন্তনী অবশ্য খুব বড়লোকের মেয়ে , এই বোনদ্বয়ের বাবা পেশায় উকিল ও মা একজন নাম করা ডাক্তার । সেই সুবাদে প্রচুর দুনম্বরি উপায়ে পয়সা রোজকার করেছে । নানা রকম অসাধু উপায়ে প্রচুর কালো টাকা কামিয়েছে এত দিন ধরে । দুই মেয়ের লালন পালনে কোন রকম খামতি রাখে নি , কিন্তু রক্তের দোষ যাবে কোথায় ? পারিবারিক বৃত্তি হিসাবে পরিণত হওয়া চুরিবিদ্যাটা দুজনে বেশ ভালোই শিখেছিল সময়ের সাথে সাথে । স্কুলের সময় থেকেই এর প্রতিফলন বেশ দেখা যেতে থাকে তাদের মধ্যে । বেশ কয়েকবার প্রশান্ত স্যারের হাতে ধরাও পড়েছিল কিন্তু বাড়িতে বা পুলিশে জানান হয় নি , তার দুটি কারন ছিল , এক তাদের পরিবারের সোশ্যাল স্ট্যাটাস । দুই , তারা দুজনে ছিল মেধাবী , প্রতি বছর প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান ছিল তাদের বাঁধা । স্যারেরা সেই জন্য তাদের খুব ভালবাসত ।

অন্যদিকে , গরিমা ছিল খুব শান্ত শিষ্ট । বাবার একটি ইটভাটায় কাজ করে এবং যা অল্প কামায় তা পরিবারের পিছনেই ঢেলে দেয় । গরিমার অবশ্য এ নিয়ে কোন কষ্ট নেই । গরিবের ঘরে বড় হয়ে ওঠা এই মেয়েটির একটিই স্বপ্ন , বিশ্ব দেখা । সে ঘুরতে চায় , পাহাড় , জঙ্গল , নদী , সমুদ্র ; এ সব দেখতে চায় । কিন্তু সে এটা বেশ বুঝত যে এই স্বপ্ন পূরণ করতে তার প্রচুর টাকা চাই এবং এখানেই সে চাপে পড়ে যেত বারবার কারন এ সমাজে জ্ঞান নয় , কাগজের টুকরটির দাম অনেক বেশি । বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান থাকলেও , পরীক্ষার খাতায় তার প্রতিফলন দেখা যাই নি আর তাই হয়ত বাড়ির সেরকম উৎসাহ গরিমার প্রতি জন্মায়নি । গরিমার একটি ভাই আছে , সোহাগ । তার রেকর্ডও অত ভাল নয় , কিন্তু তার প্রতি আগ্রহ কিন্তু কোন অংশে কম করে নি বাবা ও মা । এর বিরুদ্ধে দু একবার সোচ্চার হয়েছিল গরিমা , কিন্তু প্রতি বার তাকে একটাই উত্তর পেতে হয়েছিল , 

" মেয়েরা পরের ধন যখন তাকে আগলে রেখে কি লাভ !! তাও যদি গুন থাকত কিছু আর ছেলে হল আমাদের লাঠি , ওকে না যত্ন করলে হয় " !! কষ্ট পেলেও গরিমা এ সব মুখ বুজে সহ্য করে গেছে শুধু মাত্র উপযুক্ত সময়েরই অপেক্ষায় ।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর সায়ন্তনী ও পারমিতা জয়েন্টে বসে । ভাল রেজাল্ট হয়নি , কিন্তু বাপের পয়সা তো আছে , তাই বেঙ্গালুরুতে প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয় ; কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে মোটা টাকার বিনিময়ে । গরিমার তো সেই ভাগ্য ছিল না ,সে আর্টসের ছাত্রী, উল্টে রেজাল্ট ও ভাল নয় । যা পয়সা ছিল তা দিয়ে ছেলেকে কমার্সে ভর্তি করা হয় , গরিমাকে পড়া ছাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাকে বাড়ির কাজ কর্ম শিখতে হুকুম দেওয়া হয় । এমন নয় যে এদিন গরিমা মুখ বুজে সব মেনে নিয়েছিল , সে প্রতিবাদ করেছিল সেদিন মানুষের মত বাঁচবার ইচ্ছা নিয়ে ; স্বামীর কাছে পরাধীন হয়ে নয় ; নিজের পায়ে স্বাধীন ভাবে উঠে দাঁড়ানোটাই তার স্বপ্ন , তার সাথে অবশ্যই স্বামী , পুত্র ও কন্যা চলতেই পারে ।

আজকের এই প্রতিবাদটা গরিমার কাছে একটা নতুন রাস্তা খুলে দিল । অবশেষে কলেজে ঢোকার সুযোগ পেল গরিমা , তবে ইতিহাসে অনার্স নিয়েই চুপ থাকতে হল তাকে । এমন নয় যে ইতিহাস তার পছন্দ নয় , তবে তারও তো ইচ্ছে হয় বাকিদের মত বড় কিছু নিয়ে পড়াশুনা করার , জানার । কিন্তু এখানেও তাকে সমঝোতা করে নিতে হল , কারণ সে ছিল একজন মেয়ে , উপরন্তু রেজাল্ট ভাল নয় । গাদা পয়সা একজন মেয়ের পেছনে ঢালা তার বাড়ি মেনে নেয় নি , আর যাই হোক সে তো পরের সম্পত্তি - ছোটবেলা থেকে এটাই বারবার শিখে এসেছে গরিমা ।

" না , আর তো কোন বাঁধা নেই । কলেজের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি , কলেজ পেরোলে ইউনিভার্সিটি আর তার পর চাকরি " , নিজেই নিজেকে অনর্গল বলে চলেছে গরিমা । এ সুযোগ তার কাছে যেন স্বপ্ন পূরণের একটা পালা । পরাধীন হয়ে নয় , স্বাধীন ভাবে , নিজের জীবনটা সাজাতে পারবে এবার সে । কারুর প্রয়োজন নেই আর । কিন্তু কতদিন এই একঘেয়ে ইতিহাসের পাতায় মন টিকে থাকে ? কলেজে এসেছে মাস দুয়েক হয়েছে , ইতিমধ্যে কিছু বন্ধু জুটেছে এবং তাদের সাথে বেশ ভাল ভাবেই মিশে গেছে গরিমা , শুধু দুঃখের বিষয় হল অধিকাংশ এখানে বড় লোকের ছেলে মেয়ে , সেই একমাত্র গরিব ঘর থেকে উঠে আসা এক অভাগিনী । এ বিষয় টা গরিমাকে কিন্তু বেশ ভাবায় , আর তাই জেদটাও দিনদিন আরো খেয়ে চলেছে তাকে ।

কলেজের দিনগুলো গরিমার জন্য খুবই দারুন ছিল , বন্ধুদের সাথে আড্ডা , গল্প সাথে নানা প্রকার আসর গরিমার জীবনকে একটা নতুন চলচিত্রের প্লট বানিয়ে দিয়েছিল । গরিমা সম্ভবত্ব নিজেও এ জীবনের কল্পনা কোন দিন করেনি , যদিও তার মেয়েবেলাটা খোদ কলকাতার বুকে কেটেছিল । একটা সাধারণের ঘরে বড় হওয়া , বোকা গরিমা আজ যে এই জগতে পা দিতে পারবে , তা স্বপ্নেও সে ভাবিনি কোনদিন । চিরকাল যে জিনিসগুলোকে ছাইপাশ বলে জেনে ও মেনে এসেছিল এবং কেবলমাত্র বাবা বা দাদা কে খেতে দেখেছে তা নিজের মুখে স্বাদ নিতে পেরে একটা স্বর্গ প্রাপ্তির অনুভূতি পেল সে । 

তখন দুর্গা পুজো আসতে আর হপ্তা দুয়েক বাকি । বাড়ি এসেছিল পারমিতা ও সায়ন্তনী । শনি ও রবিবার কলেজ ছুটি , তাই সেই পুরোনো তিন বন্ধু আবার এক হল । দুদিন ধরে চললো , তাদের নতুন ও পুরোনো স্মৃতিমন্থন । গরিমার এই বদলে যাওয়া রূপ দেখে দুই বোন বেশ অবাক , বললো , " তুই তো পুরো বদলে গেছিস । সেই গেঁয়ো তকমাটা পুরো মুছে ফেলেছিস দেখছি , ওয়েলকাম টু আওয়ার ওয়ার্ল্ড "। গরিমা অবশ্য সেদিন চুপ থাকি নি বা গর্ব বোধ করে গা ঢলিয়ে দেয় নি । বরং তার মুখে শোনা যায় অন্য এক ভাষা , " বদলেছি ঠিকই , কিন্তু লক্ষ্য একই আছে । গরিব বাস্তবটা আজও আমার কাছে খুবই বাস্তব "। গরিমার কাছে এ ভাবে অপমানিত হয়ে ঐখানে আর একমুহূর্ত বসে থাকা ঠিক হবে না বলে মনে করে দুই সহচরী । নিজের কিছু জরুরি কাজ সেরে বাড়ি ফিরে আসে গরিমাও ।

ভাগ্য যে গরিমার পক্ষে কোনদিন সহায় ছিল না , তা বোধহয় ভুলে গেছিল গরিমা । সেদিন রাতে সোহাগ এসে খবর দেয় , তার বোন উচ্ছ্ণে যাচ্ছে , ছাইপাশ গিলতে শিখছে কলেজে গিয়ে , পারমিতা তাকে একথা জানিয়েছে । একথা শোনা মাত্র ক্রোধে লাল চারটি চোখ গরিমার ওপর গালি বর্ষণ শুরু করে । 

" লেখাপড়ার নামে এই সব শিখেছ ? হারামি মেয়ে কোথাকার । ", মা বললেন । বাবা আরও একধাপ এগিয়ে কোষে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিলেন গরিমার গালে । গরিমা দুচোখ তখন জলে ভরে গেছে । তবু শুধুমাত্র নিজের খাতিরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠল , " বাবাকে দেখেছি , দাদাকেও দেখেছি । বড়দের থেকে শেখা কি অন্যায় ? যা খারাপ তা সবার কাছেই খারাপ , ছেলে বা মেয়ের জন্য সংজ্ঞা টা আলাদা কেন "? একথা শুনে বাবা ও দাদা আরও রেগে গেল । সে রাত থেকে গরিমা র ভাগ্য এক নতুন পথে এগোতে শুরু করল । এতদিন ঘরের লোকেরা তাকে বুঝতে চাই নি আর এখন তো তাকে ঘৃণা করতেও শুরু করল এবং এক অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল তার কলেজ যাওয়ার ওপর । বাড়ি থেকে গরিমার জন্য এবার ছেলে দেখা শুরু হল ।


বেশ তিন চার দিন গরিমার জীবন এক কারাবাসের মত কাটতে শুরু করল । সে ভেবে পাচ্ছিল না এই কারাবাস থেকে কি করে মুক্তি লাভ করা যায় । বহু বার বাড়ি থেকে পালানোর হুমকিও দিয়েছিল । এতে ফল বিপরীত হতে দেখা যায় । কড়াকড়ি ও নজরদারি বাড়তে থাকে । এদিকে যার প্রাণ ঘুরে বেড়ানোর জন্য অস্থির , তার কি আর মন টেকে বন্ধ ঘরে । রাতের পর রাত জেগে থাকে । নানা উদ্ভট চিন্তা মাথার মধ্যে জমা হয় । এরই মধ্যে ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল । জলপাইগুড়ি র একটি বেসরকারি হাসপাতালে আয়ার কাজ পেল মেয়েটি । বাড়ি থেকে লুকিয়ে বন্ধু মারফত আবেদন জমা করেছিল । দুদিন আগে দুপুরে ফোন করে জানান হয় যে তার নাম নির্বাচিত হয়েছে । আগামী পনেরো জুলাই থেকে সে কাজে যোগ দিতে পারে । মাইনে মাসে ৫০০০ টাকা , থাকা , খাওয়া ও অন্যান্য আলাদা । যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল গরিমা । নিকুচি করেছে কলেজ , চাকরি তো জুটেছে একটা । এখন সে স্বাধীন । বাড়ির লোকের প্রথমে অমত থাকলেও অবশেষে রাজি হয় এবং তাকে চাকরি করার অনুমতি দেয় । যথাসময়ে গরিমা চাকরিটি জয়েন করে । 

জায়গাটি খুব সুন্দর । পাহাড়ে ঢাকা , এক আদর্শ জায়গা । বেশ কিছুদিনের মধ্যে গরিমা জায়গাটিকে খুব ভাল বেসে ফেলেছিল । অবশ্য তার জন্য জায়গাটির সৌন্দর্য্য ছাড়াও আরও একটি কারণ ছিল ; ডক্টর সৌরভ বিশ্বাস । প্রথম দেখাতেই ডাক্তারকে ভালবেসে ফেলেছিল গরিমা । দু একবার বলারও চেষ্টা করেছিল কিন্তু বলতে পারেনি । গরিমার ভাই মাঝে মধ্যে জলপাইগুড়ি আসত এবং তখন গরিমার সঙ্গেই থাকত । ভাই বলে কথা , যতই মনমালিন্য হোক , গরিমা কোনদিন তাকে মানা করেনি থাকার জন্য ।

তখন ছিল গরম কাল । গরিমা রাতের শিফটে কাজের জন্য বেরোবে বলে রেডি হচ্ছে । সেদিন ভাইও এসেছে বাড়িতে । ঠিক বেরোনোর মুখে , গরিমাকে পথ আটকে সোহাগ বলে উঠল , " কত দিন ধরে এসব চলছে "? গরিমা কিছুই বুঝতে না পেরে বলল , " কি বলতে চাস "? 

সোহাগ হেঁসে জানাল দীর্ঘ আট মাস ধরে যার পিছনে ও ঘুরঘুর করছে , সে সায়ন্তনীর পিসতুতো দাদা । সায়ন্তনী সব জানিয়েছে তাকে । এই কথায় দুজনের মধ্যে একটা ঝগড়া লেগে যায় । সে রাত ছিল ভয়ংকর গরিমার কাছে । ভাইয়ের কুকর্ম কোনদিন কাউকে বলতে পারেনি , কারন তার ভয় ছিল সে রাতের মিলন কাহিনী কেউ বিশ্বাস করবে না । চুপচাপ খাটের ওপর পড়ে থাকা গরিমা তখন একটি মাল ছাড়া কিছু নয় । কামড়ের দাগ গুলো দেখেও তার বুক পেট পা হাত কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এগুলো তারই ভাইয়ের দেওয়া । তবে সত্য কি বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যায় । খুব জলদি হাসপাতালে সেই খবর পৌঁছল , সৌজন্যে সেই সায়ন্তনী । ডাক্তার ভাইয়ের কানে এ কথা সেই কথা বলেছিল তবে অন্য রকমভাবে । বদনাম হয়ে হাসপাতাল ছাড়তে হল তাকে । হেরে যাওয়া মুখ নিয়ে আবার বাড়ি ফিরল গরিমা , রীতিমত আহত ও পুরুষ জাতের প্রতি এক ঘৃণ্য অভিজ্ঞতা নিয়ে ।

বাড়ির অবস্থা তখন খুবই খারাপ । বাবার কঠিন অসুখ , ডাক্তার বলেছে অনেক খরচ , এদিকে আশার আলো বলতে সোহাগ । নতুন চাকরি পেয়েছে সে বেঙ্গালুরুতে , ভাল মাইনে । কিন্তু সে এই খরচ শুনে বাড়ি ছেড়েছে , তার বউ সায়ন্তনী র সাথে । দুজনের মধ্যে যে একটা কিছু চলছে সেটা কোনদিন বুঝতেই পারিনি গরিমা । কিন্তু এভাবে এতগুলো জীবনকে নষ্ট করে সে কিকরে সুখে থাকতে পারে এটাই তো ভেবে পাচ্ছে না সে । হতাশা ভরা মুখে নতুন একটা লড়াই করার জায়গা পেল সে , সবাইকে দেখিয়ে দেওয়ার এটা একটা বড় সুযোগ যে সে তার ভাই অপেক্ষা কোন অংশে কম নয় আর তারই প্রথম ধাপ হিসাবে নিজের জমানো সব টাকা মায়ের হাতে তুলে দিল । বাবাকে আবার সুস্থ করে তোলা ও অন্য দিকে বাড়ির হারিয়ে যাওয়া ভরসা ফিরে পাওয়ার এটা একটা সুবর্ণ সুযোগ তার কাছে । বাবাকে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হল সেই রাতেই । 

পুরোনো চাকরি হারানোর যন্ত্রণাটা রয়ে গেলেও , জেদ বিন্দুমাত্রও কমে নি গরিমার দুটো চোখে । সবে তো কুড়ি বছর বয়স , অনেক সুযোগ আছে এখনো , নিজেকে তৈরি করতে পারলে সরকারি একটা চাকরি জুটতেই পারে কপালে , এটা বেশ ভাল করে ছকে নিয়েছিল সে আর তাই বাড়িতে বসেই এবার গরিমা লড়াই লড়বে বলে স্থির করল । তারই প্রথম ধাপ হিসাবে সে বেছে নিয়েছে বাবা মায়ের বিশ্বাস অর্জন । কিন্তু অন্যদিকে একটি বিষয়ে তাকে এখনো বেশ ভাবায় আর সেটা হল তার প্রথম প্রেম ডাক্তার বিশ্বাস । সেই আট বছর তার জীবনে একটা বড় দাগ কেটে গিয়েছে সেটা বলাই যায় , কিন্তু গরিমা জানে এগুলো ক্ষণস্থায়ী , স্বপ্ন টাই আসল । তবু , প্রথম প্রেম তো ভুলে থাকা কি যায় ? সব মিলিয়ে গরিমার জীবন এক নতুন ভাবে প্রবাহ হতে শুরু করল , একদম রুগ্ন আকারে ।


বাবার চিকিৎসার জন্য যে পয়সা গরিমা মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিল তা কখনই যথেষ্ঠ ছিল না , সে কথা গরিমা বেশ ভাল ভাবেই জানত আর তাই নিজের প্রেম , শখ , ইচ্ছে সব কিছু বিসর্জন দিয়ে শুধু একটা চাকরির খোঁজে নেমে পড়ল গরিমা । সে জানত কাজটা খুব সোজা নয় , তবে বয়স তো কম তাই কাজটা অসম্ভবও নয় । আফসোস হত তার নিজের মেধা ক্ষমতা নিয়ে , খুব তাড়াতাড়ি সে পড়া ভুলে যেত , আর এই জন্য নানা বিষয়ে জ্ঞান থাকলেও তার প্রতিফলন পরীক্ষার খাতায় দেখা যায় নি কোনদিন । তার ওপর বাবা হাসপাতালে ভর্তি , তাই সে দিকের দায়িত্বটাও তাকেই দেখতে হত । এরই মাঝে রাত জেগে পড়াশুনা , পুরোনো নেশাগুলো আবার আপন হতে শুরু করল আর তারই সাথে এক অন্য গরিমা কে দেখতে পেল সবাই । এক নতুন গরিমা , যার সাজগোজের বাহার নেই , খাওয়ার সময় নেই , শুধু কাজ আর কাজ , দায়িত্ব আর দায়িত্ব । কখনো বাড়ির দায়িত্ব ; বাজার হাট করার দায়িত্ব , হাসপাতালের দায়িত্ব আর শেষে নিজের পড়ার দায়িত্ব । এত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের দিকে দেখবার বিন্দুমাত্র সময় দিতে পারত না সে । শরীরের নাম আর যাই হোক মহাশয় নয় , সেটা গরিমাকে দেখলে বেশ বোঝা যাচ্ছিল । এত খাটনির জন্য গরিমার শরীর ভেঙে পড়তে শুরু করল । তবে তাতে বিন্দু মাত্র থেমে যায় নি গরিমা । অনেকের অনেক ভুল ভ্রান্তি সংশোধনের জন্য এটুকু করতেই যে হবে তাকে । আর তাছাড়া কিসের শরীর !! এতো অনেক আগেই নিজের ভাইয়ের হাতে নষ্ট হয়েছে । সে শরীর নিয়ে বিন্দুমাত্র আর মায়া নেই গরিমার । এখন তার একটাই স্বপ্ন , মনের ইচ্ছে গুলো পূরণ করতে হবে । স্বামী , সংসার এসব তার নয় , একথা বহুবার মাকে জানিয়েছিল সে , কিন্তু তার পিছনের সে অন্ধকার গল্পটা জানানোর সাহস তার ছিল না , যদি কেউ কিছু বলে আর তাছাড়া কেউ কি তাকে বিশ্বাস করবে ??

সেদিন শুক্রবার । বাইরে আকাশে কাল মেঘ করেছে , ঝড় উঠবে মনে হচ্ছে , তাই আগে ভাগে বিদ্যুৎ দফতর থেকে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে । অন্ধকার ঘরে একমনে গান করছে গরিমা , " একদিন ঝড় থেমে যাবে , পৃথিবী আবার শান্ত হবে " ... নচিকেতার এই গানের মধ্যে যেন নিজেকে খুঁজে চলেছে সে । তখন রাত দুটো, সব শান্ত হয়ে গেল । হাসপাতাল থেকে ফোনে জানান হল মি.ধর আর নেই । নিয়তির এ খেলা যেন বিন্দুমাত্র আন্দাজ করতে পারেনি গরিমা । গান থেমে গেছে অনেকক্ষণ , সাথে ঝড় ও থেমে গেছে । তবে বৃষ্টির জলে সব ভেসে যাচ্ছে আজ , বাইরে ও ভিতরে দুদিকেই ।

সকালের সূর্যের আলো পরেরদিন সকলের ঘরে কড়া নেড়ে গেলেও , একটি পরিবার সেই আলো থেকে আজ সম্পূর্ণ বঞ্চিত , ধর পরিবার । সকালের প্রখর রোদে বাবার মৃত দেহ আনার জন্য প্রস্তুত হল গরিমা । কিন্তু তার আগে মায়ের নির্দেশ এল খবরটা সোহাগকে জানানোর জন্য । এ ইচ্ছা মোটেও ছিল না গরিমার । কোন মুখ নিয়ে তাকে ফোন করবে সে !! সে এখনো ভোলে নি আর কোনদিন ভুলতেও পারবে না জলপাইগুড়ির সেই রাতটা । যে ভাইয়ের কাছে বোনের ইজ্জতের দাম নেই , যে ছেলের বাবার প্রতি কোন কর্তব্য বোধ নেই , তার কি কোন অধিকার আছে বাবার মারা যাওয়ার পর তার সঙ্গী হওয়ার ? এই প্রশ্নগুলোর মাঝেই জর্জরিত হয়ে , পাগলির মত একটা মেয়ে শুধু মাত্র মায়ের আদেশ পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল । 

সোহাগের ফোন সুইচ অফ আসছে । গরিমা মনে মনে নিজেকেই বললো , " লাড সাহেব কি এখন উঠেছে ? দেখ মহারাজ ঘুমাচ্ছে পড়ে পড়ে "। শেষমেস হাজার অনিচ্ছা থাকা সত্বেও সায়ন্তনীর ফোনে ফোন করতে বাধ্য হল সে । ফোন বাজল এবার .... তিনবার ---

~ " হ্যালো , কে বলছেন "? ওপাশ থেকে ভেসে এল সেই চেনা গলাটা । 

~ " আমি , গরিমা "। কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল সে , " বাবা .... নেই , সোহাগকে ..." ।

পরের উত্তরটা সে আসা করেনি এরকম আসতে পারে সায়ন্তনীর থেকে । ওপাশ থেকে শুধু এটুকু বলে ফোন কেটে দেওয়া হল , " বুড়ো মরেছে , সো স্যাড , কত লাগবে জানিয়ে দিস "। মাকে কি বলবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না গরিমা । সায়ন্তনী ও তো একজন মেয়ে !! ওর মুখে এসব কি ভাষা সে শুনল আজ । এদিকে বাবার শেষ কৃত্য , সংসার খরচ , কোথা থেকে আসবে এত টাকা !! সব মিলিয়ে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল গরিমার । তবু শান্ত মুখে মাকে সমস্ত কথা জানাল সে । মায়ের মুখে রা টুকুও নেই । বেশি কিছু না ভেবে বাবার বডিটা আনার জন্য হাসপাতালে রওনা দিল গরিমা । 

ছেলের অনুপস্থিতে বাবার শেষ কৃত্য তাকেই করতে হল , যদিও সে কাজটা অত সহজ ছিল না । শাস্ত্র মতে মেয়েদের শ্মশানে যাওয়া নিষেধ , সে কথা অনেকেই বলেছিল সেদিন । কিন্তু তখন গরিমার মাথায় প্রবল জেদ , পাড়ার সমস্ত লোকের সামনে সে জোর গলায় ঘোষণা করল , " আমার বাবা মারা গেছে । ছেলে যদি মুখে আগুন দিতে পারে , মেয়ে হয়ে আমি পারব না কেন "? সেদিন কোন বাঁধাই তাকে আটকাতে পারে নি বাবার শেষ কৃত্য করার থেকে । বাবার সমস্ত কাজ যথাসম্ভব নিয়মের সাথে সম্পূর্ণ করল গরিমা । কিন্তু একটি চিন্তা থেকে সে মুক্ত হতে পারছিল না , সংসারটা চলবে কি ভাবে ? সংসার খরচের টাকা কোথা থেকে জোগাড় করবে সে ? তাহলে কি পথেই ভেসে যাবে একটা গোটা পরিবার ? এরকম নানা চিন্তার মধ্যে গরিমা মানসিক ভাবে প্রচন্ড ভেঙে পড়ল । দিনের পর দিন ঘরের এক কোনে চুপচাপ বসে থাকত । এসবই মায়ের চোখ এড়ায়নি কিন্তু তিনিও যে অসহায় , তাই ঘরের দেওয়ালের আড়ালে বসে কাঁদা ছাড়া আর কোন পথই তিনি খুঁজে পাননি ।

এভাবেই হপ্তা দুয়েক পার হল । সদ্য পিতৃহারা একটি মেয়ে এবার শুধু পরিবারের তাগিদে নিজেকে সাজিয়ে তুললো । শুরু হল গরিমার এক নতুন অধ্যায় , এক জীবন যুদ্ধ ।


যুদ্ধ তো লড়বে বলে ঠিক করে ফেলেছে গরিমা , কিন্তু কি ভাবে ? ঢাল , তরোয়াল হীন নিধিরাম সদ্দার হয়ে কোন লাভ আছে বলে তার মনে হয় না , কারণ এ পৃথিবীতে সবাই লড়াই করে চলেছে , কেউ একটুকরো মাটি এই অভাগী কে ছেড়ে তো আর দেবে না , কেড়ে আদায় করে নিতে হবে । কিন্তু তার যোগ্যতা কি আছে !! এরকম হাজার চিন্তা ঘুরতে থাকে সদ্য বাবা মারা যাওয়া মেয়েটার মাথায় । 

সেদিন রবিবার , ছুটির দিন । রাস্তায় সন্ধের পর ভিড়টা বেশ কম । একলা একলা একটা ফাঁকা রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে গরিমা । মাথায় হাজার চিন্তা তার , দুটো পয়সা চাই , সংসার চালাতে হবে , এরকম হাজার কথা মাথায় ঘুরে চলেছে অনবরত তার । অনেক সমাধান মাথায় আসছে , কিছু ভাল আর কিছু খারাপ । একবার ভাবছে , বাবার ইটভাঁটায় যাবে একবার । একবার ভাবছে , লোকের বাড়িতে কাজ করবে আর সবথেকে বাজে ভাবে যেটা মাথায় আসছে তা হল দেহ ব্যবসার জগৎ । এই শরীর তার নষ্ট তো আগেই হয়েছে , সেই নষ্ট মাল বেচে পেট তো চলবে .... আর যদি কেউ বলে , সে বলে দেবে , তার পেশা নিয়ে কার কি আসে যায় ? কেউ তো তার পরিবারের খাওয়া পড়ার দায়িত্ব নেবে না । তাহলে তারা এত কথা কোন অধিকারে শোনাবে ? আস্তে আস্তে অন্ধকার সেই ফাঁকা পথে দু পা বাড়াল গরিমা । তারপর থামল , আবার এগোল কিন্তু শেষ মেস যেতে পারল না গভীর অন্ধকার সেই নরকে এই চিন্তায় যে ওখানে গেলে তার স্বপ্নের কি হবে ? বরফের পাহাড় , দেশ , বিদেশ সব কি চুলোয় যাবে তাহলে ? সুতরাং , ওই পথে তার এগোনো চলবে না । ঠিক করল , পরেরদিন বাবার ইটভাঁটায় দেখা করবে সে একবার ।

সকাল হল । পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী বেরিয়ে গেছে নিজেদের কাজের ব্যস্ত জীবনে । বাজারে বিকি কিনি শুরু হয়ে গেছে আজ অনেক আগেই । স্কুলের ছেলে মেয়েরা পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলেছে বিদ্যালয়ের পথে । দিনটা যেন একটু বেশিই ব্যস্ত আজ , ঠিক যেন জানান দিচ্ছে গরিমার জেদের সঙ্গে এক হাড্ডা হাড্ডি লড়াই করতে তারাও প্রস্তুত । গরিমা রোজের মতই সকাল বেলায় উঠে , স্নান সেরে , পুজো করে এসে তৈরি হতে শুরু করল । তাকে এত সকালে তৈরি হতে দেখে মা বেশ আশ্চর্য হয়ে বলল , " গরি , এত সকাল সকাল কোথায় চললি "!! গরিমা সে কথায় তেমন ভ্রুক্ষেপ না করেই চলে গেল , শুধু বলল , " কাজে "... সে জানত তার মা ওই ইটভাঁটার নাম শুনলে কোনদিন যেতে দেবে না । বাড়ির সামনে থেকেই বাস ধরে যেতে হয় , ঘন্টা দেড়েকের পথ । ভিড় বাস , কিন্তু গরিমা একটুও ভয় না পেয়ে এগিয়ে গেল সে দিকে । ইটভাঁটা পৌঁছল যখন , তখন দশটা বাজে । অনেকেই সেখানে মুখ চেনা । গরিমাকে দেখে তারা ছুটে এল সেখানে , হাজার প্রশ্নের ভিড় মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ধরল গরিমাকে । 

কেমন আছে ? কি ভাবে চলছে ওদের পরিবার ? এরকম নানা প্রশ্ন গরিমাকে আরও বিরক্ত করে তুললো । তার মনে একটা কথা ঘুরছিল যে এই যারা এত কৌতুহল দেখাচ্ছে তাদের কোন দিন তো দেখে নি সে বাবার মৃত্যুর পর , তাহলে এরা এই মিথ্যা আগ্রহ আজ হঠাৎ কেন দেখাচ্ছে ? কারুর কোন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উপযুক্ত মনে করল না গরিমা । ভিড় ঠেলে সোজা অফিসের দিকে এগিয়ে চললো সে । তার এই ব্যবহারে সকলেই বেশ অবাক । যতই যাই হোক , গরিমার বাবা যথেষ্ট ভদ্র লোক ছিল । কেউ কেউ বলে উঠল , " এমন অসভ্য মেয়ে জীবনে দেখিনি । ভালবাসা পেতে জানে না এরা । কানাকরি নেই , অথচ অহংকার দেখ "!! গরিমা কিন্তু কারুর দিকে আজ ফিরেও তাকায় নি একবারও , নিজের জেদে হেঁটে ঢুকে গেল ঘরের ভিতরে , যেখানে ইটভাঁটার মালিক বসেন । সবাই তাকে সাহেব বলেই ডাকে , সেটা বাবার মুখ থেকে বহুবার শুনেছিল আগেই । দরজার সামনে দু মিনিট দাঁড়াল মেয়েটি , তারপর আস্তে করে মাথা ঝুকিয়ে দরজা ঠেলে হালকা গলায় প্রশ্ন করল , " ভিতরে আসতে পারি , সাহেব "? ভিতর থেকে প্রথমে কোন উত্তর না এলেও , দু মিনিট পর একটা বয়স্ক গলায় উত্তর এল , " কে ? কাম ইন ..."।

গরিমার মুখে অপরিচিত একজনের সাথে দেখা করার কোন ভয় ডর কিছুই নেই । মনে তখন একটাই চিন্তা তার , চাকরিটা হবে তো ? নাহলে পুরো পরিবার ভেসে যাবে । আর এখানেও যদি কিছু না হয় , তাহলে শুধু মায়ের মুখ চেয়ে কাল রাতের ওই অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যেতে হবে গরিমাকে , যেমন অসংখ্য গরিমাকে রোজ হতে হয় । পরক্ষণেই নিজেকে বাস্তবে ফিরিয়ে নিয়ে এল সে , চোখ বন্ধ করে রইল দুমিনিট , হয়ত ভগবানের নাম নিল একবার । তারপর দরজা ঠেলে যুদ্ধ ক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে ।


কাজে রাখবে কিনা এসব সাত পাঁচ না ভেবেই , নিজের কথাগুলো বেশ গুছিয়ে বলতে শুরু করল গরিমা । " সাহেব , আমার বাবা মি. ধর আপনার এখানে চাকরি করতেন । মাস খানেক আগে মারা যান । উনার চাকরিটা যদি আমি পেতাম তাহলে খুব ভাল হত , একটা পরিবার বেঁচে যেত । প্লিস সাহেব , একটু দয়া করুন "। 

ভিতর থেকে সাহেবের মেজ ছেলে সব মন দিয়ে শুনছিল গরিমার কথাগুলো । বাবা কিছু বলত সে সামনে এসে দাঁড়াল । ওই প্রকান্ড একটা চেহারার মানুটি গরিমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো , " তুমি শিক্ষিত মেয়ে , বয়স অনেক কম । তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এভাবে নষ্ট করার কোন মানে হয় না । তুমি ভাল কোন চাকরির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাও আর তোমার মা কে বল কাল থেকে , না পরশু থেকে কাজে জয়েন করতে । থাক তোমায় বলতে হবে না , আমি নিজে কাল তোমার বাড়ি যাব "। একথা শুনে গরিমা এক প্রকার আনন্দে নেচে উঠল । তার সমস্ত স্বপ্ন আবার সত্যি হবে এটাই তার কাছে একটা বড় স্বপ্ন । দুবার প্রণাম ঠুকে গরিমা ওখান থেকে বেরিয়ে গেল ।


গরিমার কাছে যে সুবর্ণ সুযোগ আজ হাতছানি দিয়েছে তার জন্য গরিমা ধর এত বছর ধরে তপস্যা করে আসছে । এর মধ্যে অনেক উত্থান পতন সে দেখেছে । হারিয়েছে জীবনের মূল্যবান সময় । নিজের দাদার হাতে তাকে বেআব্রু হতে হয়েছে । বাবাকে হারিয়ে জীবনের এক অন্য ছবি সে জানতে পেরেছে । এক কথায় বলা যায় গরিমা আজ প্রকৃত জ্ঞানী - এই জীবন , এই সমাজ , এই ভ্রান্ত সম্পর্কগুলো নিয়ে । 

পরেরদিন সকাল বেলা একটা সাদা গাড়ি এসে থামলো এদো গলিটার ভেতরে । গরিমা তখন সবে ঘুম থেকে উঠেছে এবং নিজের স্বভাব মতোই বাড়ির বাইরের বাগানটায় পায়চারি করছিল । মুখে নিমের দাঁতন গোঁজা । গায়ে তখনও তার রাতের ছোট জামাটি পড়ে আছে , যা হাঁটুর ওপরে এসে থেমে গেছে । আগের রাতেই সে ইঁটভাঁটার সব কথা মাকে বলে রেখেছিল , তবে এত সকাল সকাল সাহেবের মেজ ছেলে এসে হাজির হবে এটা সে ভাবে নি । গাড়ি থেকে স্যুট বুট পড়া সাহেবের ছেলেকে নামতে দেখে সে এগিয়ে এলো আসতে আসতে । সাহেবের ছেলে একবার আড় চোখে তাকালো তার দিকে আর তারপর হাত নেড়ে কাছে ডেকে বললো , " গাড়িতে উঠে পড় । " গরিমা বললো , " কেন ? " ওপাশ থেকে উত্তর এল ওঠো সব বুঝতে পারবে । 

" তাহলে পোশাকটা চেঞ্জ করে আসি " , গরিমা বললো । সাহেবের ছেলে এবার বেশ গম্ভীর হয়ে বলল , " তার প্রয়োজন নেই । ঘন্টাখানেক এর তো ব্যাপার । গরিমা আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলো । ভদ্রলোকটি তার পাশে উঠলো আর গাড়ি রওনা দিল এক অজানা গন্তব্যে । 

দুদিকে ফাঁকা মাঠ , তার মাঝখান দিয়ে গাড়ি ছুটছে । মেজ সাহেব এবার গরিমার কাছে এসে বললো , " জামাটা খোলো । গরিমার বুঝতে বাকি রইল না কি হতে চলেছে তার সাথে । কিন্তু এই ভেবে সে নিজেকে সমর্পণ করলো , যদি মাকে চাকরিটা না দেওয়া হয় । সেই সকালে গাড়ির মধ্যে দুটো উলঙ্গ শরীরের উত্তাপ আজ বেশ বুঝতে পারছিল গরিমা । কিন্তু শুধু বাড়ির কথা ভেবে যন্ত্রণাটা সে নীরবে সহ্য করে গেল । প্রায় ঘন্টাখানেক পর গাড়ি ফিরে এলো তার বাড়িতে । মেজ সাহেবের কথা অনুযায়ী তার মাকে চাকরির জয়েনিং লেটার দেওয়া হল আর গরিমাকে ফিসফিস করে বলা হল , " ডাকলেই চলে এসো । খুব মিষ্টি মেয়ে তুমি । " 

গরিমা আজ সত্যিই বুঝে উঠতে পারছিল না জীবন তার কোন ধারায় প্রবাহিত হতে চলেছে আজ থেকে । গাড়িটা যখন আজ তাকে মাকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল এক ধুলোর অন্ধকারে তখন সে বারবার চিৎকার করে বলতে চেয়েছিল , " মা , তুমি যেও না ওর সাথে । ওটা দুষ্টু লোক । " কিন্তু বলতে পারেনি শুধুমাত্র একটা পরিবার আর নিজের স্বপ্নগুলোর কথা ভেবে । 

মেজ সাহেবের গাড়িটা এসে দাড়ালো ইঁটভাঁটার পাশে একটা বিশাল বাড়ির গেটের ভেতরে । গাড়িতে আস্তে আস্তে নেমে এলেন মেজ সাহেব ও গরিমার বিধবা মা । সম্মান এর সঙ্গে তাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসা হল , যেখানে সাহেব অপেক্ষা করছিল । মহিলাকে দেখে সাহেব এগিয়ে এলেন তার দিকে । করজোড়ে নমস্কার জানালেন তাকে । তারপর সেই গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন , " আপনার স্বামীর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত । আপনাকে তাই আমরা এই কাজে নিযুক্ত করছি । আপনি মাসে ২৫০০০ টাকা পাবেন । সাধারণত আপনাকে আঠ ঘন্টা কাজ করতে হবে প্রতিদিন , সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা , মাঝে ১ঘন্টা মানে ২টো থেকে ৩টে খাবার বিরতি থাকার জন্য সন্ধ্যে ৭টায় ছুটি হবে । তবে কোন কোন দিন আপনাকে নাইটে কাজ করতে হতে পারে , ইঁটভাঁটার চাহিদা অনুযায়ী । তখন প্রতি ঘন্টা হিসাবে ৪০০০ টাকা অতিরিক্ত মাইনে পাবেন আপনি । আশা করি আমার কথা আপনার কাছে পরিষ্কার হয়েছে । "

হ্যাঁ .... মহিলাটি ঘাড় নেড়ে উত্তর দিল । 

" বেশ । তাহলে কাজ বুঝে নিন আপনি । " , গম্ভীর স্বরে সাহেব এটুকু বলেই ঘরে ঢুকে গেলো আর মেজ সাহেব তাকে নিয়ে এগিয়ে গেল ইঁট ভাঁটার দিকে । 

এভাবেই বেশ কাটছিল গরিমা ও তার মায়ের দিনগুলো । কিছু কিছু সকাল মিষ্টি মেয়েটার জন্য অন্ধকার নামিয়ে আনতো ঠিকই , কিন্তু সে এসবে এখন আর পাত্তা দিত না কারন সে বেশ বুঝতে শিখে গেছিল জীবনে কিছু পেতে গেলে কিছু হারাতে হবে । আর এই যে টাকা পয়সা , মাঝে মধ্যেই দামি দামি উপহার গরিমা পাচ্ছিল সাহেবের মেজ ছেলে অভিজিতের কাছ থেকে তার বদলে সামান্য কাপড় খোলা সকালবেলাটা এমন আর কি ! আর তাছাড়া ভাইয়ের হাতে যে মেয়ে কলঙ্কিত হয়েছে অতীতে তার জন্য বেশ্যাগিরির সওদা অনেক সস্তা । 

আর অন্যদিকে এই সওদার কথা না জেনেই সেই বিধবা মহিলা পরিশ্রম করে চলেছে রোজ মেয়ের জন্য , মেয়ের স্বপ্নের জন্য । এভাবেই এক অন্য ধারার স্রোতে গরিমা ও তার মায়ের জীবন বয়ে চললো যার একদিকে ছিল হাড়ভাঙা পরিশ্রম , অন্যদিকে প্রাপ্তির জোয়ার , তৃতীয়দিকে একটি শারীরিক সেক্সুয়াল ছোট গল্প আর চতুর্থদিকে একটা গোপন প্রেম যার অনেকাংশ জুড়ে রয়েছে লোভ । 

দিন কেটে যাচ্ছিল । সকাল ৬টায় মা কাজে বেড়িয়ে যেত । গরিমা একাই ঘরের দায়িত্বে তখন । ঘর দুয়ার ঝাঁট দেওয়া , ঘর মোছা , রান্না করা আর তারপর দুপুর এর মধ্যে সেই রান্না করা খাবার মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসা । এই প্রত্যেকটা যেন হয়ে উঠেছিল গরিমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । নতুন এক জীবনের মধ্যে এসে পড়া গরিমা আজ অনেক কিছুই দিব্যি ভুলে গেছে । ভুলে গেছে তার দাদা র অসহ্য অত্যাচার । ভুলে গেছে বাবা হারানোর যন্ত্রণা । ভুলে গেছে মাঝে মাঝেই নিজের উন্মুক্ত যৌবনের যে অংশটুকু পাইয়ে দেয় সে তার মেজ সাহেবকে । ভুলতে পারে না তবু তার স্বপ্নগুলোকে । সেই স্বপ্ন যা আজও রাত জাগিয়ে রাখে গরিমাকে । অবশ্য রাত জাগা তার দুটো চোখে স্বপ্ন ছাড়াও আরো একজন দায়ী ছিল - তার একটি পুরোনো অভ্যাসের ধোঁয়া । তার সখা ফ্লেক অথবা গোল্ড ফ্লেক । 

সেদিন শুক্রবার । বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝমঝমিয়ে । আকাশের গর্জন আর বিদ্যুতের ঝলকানি র মধ্যেও পথ ঘাট অন্ধকার । কারেন্ট নেই যে । অন্ধকার দালানে একা গরিমা , মায়ের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে । ভেতরে যাওয়ার একদমই মন নেই তার । কেমন যেন একটা অস্বস্থি ভাব । মনে হচ্ছে পৃথিবীর কোন কোনায় কোন কিছু ভুল হচ্ছে অথবা হতে চলেছে । কিন্তু কি ? তার মনটাই বা আজ এত কু ডাকছে কেন ? তবে কি নতুন কোন বিপদ আসতে চলেছে তার জীবনে । এমনই সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে তার সাধের গোল্ড ফ্লেকএর প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরালো । দুটো সুখটান সবে দিয়েছে কি দেয় নি একটা সাদা আই টেন গাড়ি এসে থামলো তাদের গেটের সামনে । মুখ তুলে ভালো করে দেখলো গরিমা । সে নিশ্চিত এটা মেজ সাহেবের ছেলে অভয়ের নয় । তার গাড়িটা সে খুবই ভাল করে চেনে । আর তাই তার মাথায় আরও চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠলো এবার । 

সাদা জামা , কালো প্যান্ট আর কালো জুতো পড়া দুই ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নামলো । দুজনের বয়স ওই পঞ্চাশ বাহান্ন হবে । একজনের হাতে একটা হলুদ ফাইল দেখা যাচ্ছে । গরিমা হা করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে , ভাবছে এরা কারা ? খুব চেনা পরিচিত নয় অথচ তাদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে হন হন করে । মুখে অবাকের স্পষ্ট ছাপ নিয়ে গরিমা এবার এগিয়ে এলো তাদের দিকে ।

 কি ব্যাপার । আপনারা কারা ?, গরিমা দুই ব্যক্তির দিকে সপাটে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বললো , কারা আপনারা ? আমার বাড়িতে হঠাৎ কি মনে করে ? 

ওদের মধ্যে কেউইইই ওই বাচ্ছা মেয়েটিকে প্রথমে সেভাবে পাত্তা দেয় নি । উল্টে তারা ব্যাস্ত হয়ে পড়লো নিজের কাজ করতে । ওদের হাতে কিছু কাগজ ছিল যেগুলো ওরা প্রত্যেকের দেওয়ালে লাগিয়ে চলেছিল । গরিমা আর কোন কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলো সেগুলো পড়তে । ইতিমধ্যেই ওই এলাকা জুড়ে একটা ভিড় জমে গেছে । সকলের মুখে মুখে একটাই কথা ঘুরছে তখন , ওগুলো কী ? সরকারি স্ট্যাম্প লাগানো দেখে তাদের মুখে অারও চিন্তার ভাঁজ জড়ো হচ্ছে ।

সর্বনাশ করেছে , চিৎকার করে উঠলো গরিমা । সরকারি আদেশে প্রত্যেকের বাড়ি অধিগ্রহণ করার নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে দুজনে । এর অর্থ হল তাদের থাকার সম্বলটুকু সরকার থেকে কেড়ে নেওয়া হবে । গরিমার মুখে এই কথা শোনা মাত্রই সারা এলাকা জুড়ে একটা হুলুস্থুলু কান্ড বেঁধে গেল । কেউ কেউ চিৎকার করে পুরো পাড়াকে এক করতে ছুটে গেল আর কেউ কেউ আবার মুখ বেঁকিয়ে বসে পড়লো গভীর চিন্তায় । 

তৎক্ষণাৎ একটা মিটিং ডেকে ফেলা হল পাড়ায় । লোকের ভিড় উপচে পড়লো সরকারি আদেশনামাকে কেন্দ্র করে । দূরে নিজের ঘরের বারান্দায় গরিমা এমন অবস্থায় ঠাঁয় বসে , ভেবে চলেছে যেন কিছু । যেহেতু গরিমা বিষয়টি সকলের সামনে তুলে ধরেছিল তাই তাকেই তাদের জীবন বাঁচাও কমিটির নেত্রী বানানো হল সকলের সম্মতি নিয়ে । 

ওদিকে গরিমা তখনও চিন্তায় মগ্ন হয়ে বসে নিজের দালানে । মুসলমান চাচা তার কাছে এসে বসলো এবার । মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো , " কি রে বেটি , কি ভাবছিস এত ? সভায় যাবি না । এলাকার মানুষেরা তোর মুখ চেয়ে বসে আছে যে " । 

মুখটা একটুখানি ওপরে তুলে চাচার দিকে ঘুরে তাকালো সে এবার । চোখটা মুছে বললো , নেত্রী হওয়ার যোগ্যতা নেই আমার । ওটা তোমাদের থাক । আমি শুধু চাই এতগুলো মানুষের পেটে লাথি না পড়ে যেন । কিন্তু.... , কি যেন বলতে গিয়েও থেমে গেল গরিমা । 

কিন্তু কি ? বল ... করুন স্বরে চাচা প্রশ্ন করলো তাকে ।

গরিমা শান্ত গলায় কয়েক মিনিট চুপ থেকে গরিমা বলে উঠলো আবার , ভাবছি । এই সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণ সরকারের তো ! তার এই চিন্তার কারন অথবা উৎস কোনটাই মুসলিম চাচার মাথায় ঢুকলো না , তবে প্রশ্নটা তাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে এটা তার মুখ চোখ দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল । 

আর কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো গরিমা ও এগিয়ে গেল মানুষের ভিড়ের দিকে । মুসলমান চাচাও তার পিছনে হাঁটা লাগালো । 


একটা ঘরের দালান এর ওপর জনা ছয় লোক বসে । তারা এই প্রতিবাদ কর্মসূচি কে দিশা দেবে এটা বোঝা যাচ্ছিল । দালান ঘিরে এলাকার মানুষজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে , কেউ আবার হাঁটু মুড়ে বসে । সকলকে দেখলে বোঝা যাচ্ছে যে তারা অপেক্ষারত । গরিমা এসব দেখছিল আর তার মনে নানা চিন্তা জেগে উঠছিল বারবার আর সবচেয়ে প্রথমেই যে চিন্তা তার মাথায় আসছিল তা হল তার মায়ের । মায়ের কী হবে যদি এই এলাকা না থাকে তাহলে ? এমন হাজার কথা ভাবতে ভাবতেই সে এগিয়ে চললো ভিড়ের দিকে । গরিমাকে সেদিকে আসতে দেখে সাধারণ মানুষও এগিয়ে এলো তাদের নেত্রীকে স্বাগতম জানাতে । তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে মনে হচ্ছিল যেন তাদের মাসিহা নেমে এসেছে পৃথিবীতে । গরিমার শিক্ষার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তারা দলে দলে চিৎকার করে ধ্বনি দিতে শুরু করে , " গরিমা জিন্দাবাদ । কলোনি বাঁচাও , মানুষ বাঁচাও " । এমনই এক মুহূর্তে পাড়ার মোড়ে একটা অটো এসে থামলো । অটোর ভিতর থেকে কিছু ব্যাগ হাতে গরিমার মা কে নেমে আসতে দেখা গেল । বাড়ির পথে জমে থাকা ভিড় দেখে তিনি ভয় পেয়ে গেলেন । গরিমার নাম নিয়ে চিৎকার করে উঠলেন তিনি । আমার গরি ঠিক আছে তো ? এত ভিড় কিসের ? কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই তিনি ক্রমাগত একই কথা আওড়াতে আওড়াতে দৌড় লাগলেন ঘরের দিকে । এদিকে মায়ের গলার ডাক শুনে গরিমা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লো । এই সব নেতৃত্ব ফেতৃত্ব মায়ের খারাপ লাগবে এই ভেবে গরিমা সব ভুলে এক ছুট দিল বাড়ির ভেতরে । আন্দোলনের বাকি লোকজন কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে চেয়ে রইল শুধু ।  

মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটা আজ চুপ । সাহস করে সমস্ত ঘটনা বলার সাহস নেই তার মায়ের কাছে । মা তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে । তার মুখ চোখে যেন হাজার কথা কিন্তু কিভাবে বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না । চাঁদের আলো এসে পড়ছে দুজনের মুখে এখন । মুখ চোখ ধপধপে সাদা হয়ে উঠছে । মায়ের এই সাদা মুখের দিকে তাকিয়ে গরিমা আস্তে করে বললো , " মা । আমাদের আর কিছু থাকবে না । ওরা বস্তি উচ্ছেদের নোটিস দিয়ে গেছে আজ " । 

মা , মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বললো , " তাতে কি হয়েছে । কেড়ে নেওয়া কী এত সহজ ! তুই আছিস । বস্তি বাসী আছে । যা ওদের নিয়ে রুখে দাঁড়া " । 

আর তুমি ? গরিমা প্রশ্ন করলো । 

মায়ের দু চোখ ছলছল করছে । কিছু কথা সে চেয়েও বলতে পারছে না । কিন্তু মেয়ের বারবার করা প্রশ্ন , " তুমি ঠিক আছো তো ? তুমি দাঁড়াবে না আমার পাশে "? তাকে অস্বস্থিতে ফেলে দিচ্ছে বারবার । অবশেষে আর চুপ থাকতে না পেরে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সে । বলে তার বদলে যাওয়া পরিচয়টা । ইটভাঁটায় রাতে তাকে ভোগ করে যায় নানা বাবুরা । শুধু তাকে নয় , সেখানে কর্মরত সব মেয়েদের একই অবস্থা । তার বদলে মোটা টাকা পায় তারা । কিন্তু এসব ইটভাঁটার বাইরে বা সেখানে অন্য কাউকে সে সব বলা বারণ । মায়ের দু চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে । তবু সে মেয়ের দিকে তাকিয়ে জল মুছে নিচ্ছে বারবার । আর গরিমা ?? তার বুকের মধ্যেকার রাগের আগুন হু হু করে জ্বলছে । যেন নতুন কোন প্রতিজ্ঞা জন্ম নিচ্ছে তার চোখে ।


পরদিন খুব ভোরে গরিমার ঘুম ভেঙে গেলে সে নিজের অভ্যাসমত বাইরে বেড়িয়ে এলো । মন যে এখনও তার ভাল আছে এটা বলা যায় না । হাজার চিন্তা দানা বেঁধেছে তার মনে । একদিকে এলাকার ওপর ঘনিয়ে আসা বিপদ আর অন্যদিকে তার মায়ের চোখের জল গরিমার জীবনকে আরও কঠিন করে দিচ্ছে । সে কোনভাবেই বুঝে উঠতে পারছে না যে জীবনের এমন একটা সময় সে ঠিক কোনদিকে যাবে । এমনই এক দিশাহীন অবস্থায় কেউ যদি তার পাশে থাকতো তাহলে খুবই ভালো হতো । কিন্তু কে আর তাকে সাহায্য করবে । কে আর তার হাত ধরবে । আজ গরিমা ভীষন ভাবে আনমনা । ঠিক এরকম একটা সময়ে মায়ের ডাকে মনটা তার একটা দিশা পেল । 

" গরি , ও গরি .... " , তার মা তাকে ডাকতে ডাকতে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে । ছুটির শেষে তিনি প্রস্তুত আবার ফিরে যেতে সেই ইট ভাটায় । একটু পরেই গাড়ি এসে উপস্থিত হবে ও মা কে নিয়ে চলে যাবে । তার আগে গরিমা তার মায়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো একবার । মা , মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে তার মাথায় চুমু খেল ও বললো সে যেন তার কথা না চিন্তা করে এলাকা বাসীর পাশে দাঁড়ায় । এরই মধ্যে একটা সাদা চার চাকা গাড়ি এসে উপস্থিত হল এবং গরিমা কে ছেড়ে তার মা সরলা ধর বেরিয়ে গেলেন আবার । গরিমা দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল । 

মা চলে গেল । গরিমার মন আরও চঞ্চল হয়ে উঠছে আজ । সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না ঠিক এই মুহূর্তে সে কি করবে ? অন্ধকার রাত আজ তার কাছে খুবই চিন্তার একটা বিষয় । রাস্তা দিয়ে একা একা হেঁটে চলেছে সে । ভাবতে পারছে না যে কোন পথ তার জন্য ঠিক হবে । রাস্তায় লোক জন কেউ নেই কোথাও । দুদিকের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে । নিজের মনে হেঁটে চলা গরিমা একটা গাড়ি ওই পথেই আসতে দেখে থমকে দাঁড়ায় হঠাৎ । এ গাড়ি তো তার পরিচিত । এ তো সাহেবের গাড়ি । গাড়িটি প্রথমে কিছু বুঝতে না পেরে এগিয়ে গেলেও কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে । গরিমাকে দেখতে পেয়েছে মনে হয় । গাড়িটি কয়েক পা পিছিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায় এবার । সামনের দরজাটি খুলে এরপর সাহেবের মেজো ছেলেকে গাড়ি থেকে নেমে আসতে দেখা যায় ।

~ " গরিমা । এত রাতে তুমি এখানে "? 

~ এই ভালো লাগছিল না তাই । 

ভেতর থেকে সাহেবের কন্ঠস্বর শোনা গেল এবার । 

" ওকে গাড়িতে তুলে নাও । আমাকে ক্লাবে ছেড়ে দিয়ে তুমি নাহয় ওকে নামিয়ে দিও ওর গন্তব্যে " ।

ছেলেকে বাবার কথায় সম্মতি জানিয়ে গরিমা কে তুলে নেয় গাড়িতে । ঘন্টা খানেক গাড়ি চলার পর একটা বড় ক্লাবের সামনে গাড়িটা এসে দাড়ালো । ক্লাবের নাম রিচম্যান ক্লাব । সাহেব সেখানেই গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয় । এরপর গাড়িটি অন্ধকারের মধ্যে আরো এগিয়ে যেতে শুরু করে । 

" আমরা কোথায় যাচ্ছি এখন " ? , গরিমা প্রশ্ন করলে মেজো সাহেব মুচকি হেসে উত্তর দেয় , " তুমি কোথায় যেতে চাও বলো । ওই ভূকা নাঙ্গাদের সাথে দু চারশো টাকা কামাতে । নাকি ....

গরিমা তার মুখ চেপে ধরে বলে , " আমি ওসব দিকে যেতে চাইনা । আমাকে বাঁচান । হেল্প মি প্লিস " । মেজো সাহেব তার ব্যাগ থেকে দুটো বোতল বের করে । একটি নিজে খেল ও আরেকটি গরিমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে , " ড্রিংক ইট । এনার্জি পাবে । অনেক ..... " । ছেলেটিকে গরিমা বড় বেশি বিশ্বাস করে ফেলেছিল আর তাই এর আগে নিজের শরীর দিয়েছিল আর আজ .....

সকালে গরিমা যখন ঘুম থেকে উঠলো তখন তার শরীরে জামাটা পর্যন্ত নেই । ডান পাশে ছিঁড়ে পড়ে আছে আর তার পাশে পড়ে সদ্য খুন হওয়া তার মায়ের ডেড বডিটা । দুটো শরীরের কামড়ের দাগ স্পষ্ট । ছেঁড়া জামাটা তুলে কোন মতে নিজের শরীরটা ঢাকার চেষ্টা করলো সে , আর তারপর ব্যর্থ হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো । গরিমার কান্নার আওয়াজে এলাকা বাসীর ভিড় আছড়ে পড়লো তাই নয় , বহুদিন পরে ভাই আর সায়ন্তনী এসে বাড়িতে হাজির হল আজ । দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে সম্পূর্ণ প্লটটা আগে থেকেই সাজানো ছিল । বোনকে ওই অবস্থায় রাস্তায় টেনে বের করে আনলো সোহাগ । দু গালে দুটো চড় কষিয়ে দিয়ে বললো , " কুলাঙ্গার । নিজে ধান্দা করছিলিস , কর । মাকেও ! বাপটাকে খেয়েছিলিস । এবার মাকেও গিললি । রাক্ষুসী দূর হয়ে যা এখান থেকে " । 

জনগনের সমস্যা হল তারা কোনদিন বিচার করে না বুদ্ধি খাটিয়ে । এই দু চোখে যা দেখে তাই সত্যি বলে মেনে নেয় তারা । এটাই সমাজের নিয়ম । এক্ষেত্রেও তারা গরিমাকে দোষী সাব্যস্ত করতে এক মিনিট সময় নিল না । আর বাকি কাজ ছেলে পূরণ করে দিলো । মায়ের শরীরটা পড়ে রইল ঘরের কোনায় । সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না দিয়েই ঘরটা খালি করে দিল ওরা । পুলিশে খবর দেওয়া হলে , পুলিশ এসে গরিমাকে এরেস্ট করলো ও তার মায়ের লাশটাকে ইনভেস্টিগেশন এর জন্য নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে । 

লক আপের পিছনে বসে থাকা মেয়েটা আজ চুপ । দেওয়ালের ধারে এক কোনায় বসে আছে সে । আজ থেকে তার ঠিকানা সেল নম্বর ৮ আর তার নতুন নাম হয়েছে অপরাধী নম্বর ৭৮৬ ।

জেলের মধ্যে বিভিন্ন অপরাধীদের সাথে থাকলেও গরিমার তীব্র জেদ ও সকলের প্রতি ভালোবাসা তাকে বাকিদের নয়নের মনি করে তুলেছিল । তবে এত জেদ থাকলেও গরিমাকে প্রায়ই উদাস বসে থাকতে দেখা যেত । একদম একান্তে চুপচাপ বসে থাকা মেয়েটি সকলের কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠছিল এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই ।

জেলের ওই চার দেওয়ালের মধ্যে গরিমার বন্ধু বলতে দুজন ছিল - তার ডায়েরি যার মধ্যে নানা কথা নানা সময়ে বসে সে লিখে যেত আর জয় নামে একজন অপরাধী । খুন করার অপরাধে ছয় মাস আগে জেলে আনা হয়েছিল তাকে । গরিমার মতোই সেও একসময় চুপচাপ বসে থাকতো । তবে গরিমার আসার পর থেকে তার সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে । গরিমা ফাঁকা সময়ে তার সাথে গল্প করতো , ডায়েরির বিভিন্ন লেখা তাকে শোনাতো । 

সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে । গরিমা জেলের উত্তর দিকের বড় বারান্দার এক ধারে বসে নিজের মনে কিছু লিখে চলেছে । খেয়াল পর্যন্ত করেনি কখন জয় এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে । হয়ত খেয়াল করতও না আরো কিছুক্ষন যদি জয় ডায়েরি দেখে তার সবেমাত্র লেখাটি জোড়ে জোড়ে পড়ে উঠতো , 

" আমি একজন মাইয়া । তাই এই গল্পগুলো জানি ।

 ওরা যারা পুরুষ তারা গল্প জানে না , চরিত্র হয়ে ওঠে । 


সবটাই খিদের দোষ । মানুষ তো নয় যেন জানোয়ারের অধম । পেটে টান পড়লে শুনেছিলাম খাবার খোঁজে , শিকার করে । বড় হয়ে প্রথম বুঝলাম মাথার ইস্ক্রুব ঢিলা হলেও পেটে টান পড়ে । তখনও শিকার করে ওরা । 


মানুষগুলা ...


আমি একজন মাইয়া । তাই এই গল্পগুলো জানি ।

 ওরা যারা পুরুষ তারা গল্প জানে না , চরিত্র হয়ে ওঠে । 


তখন শীতকাল .... " 

গলার শব্দ শুনেই ডায়েরিটা বন্ধ করে পিছন ফিরে তাকালো গরিমা । তারপর জয়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটা ছোট্ট হাসি হেসে বললো , " তুমি কখন এলে , জয় দা " । 

" অনেকক্ষন । তোর কবিতা পড়ছিলাম । বেশ লিখিস তো । বন্ধ করলি কেন ? দে বাকিটা পড়ে দেখি " , জয় আবদার করে বললো এবার । 

" না । থাক । এমন কিছু নয় । ওই বসে ছিলাম তাই ..... " , গরিমা উত্তর দিলো ।

" আহ । বেশ লাগছিল । পড়তেও দেয় না মেয়েটা । দেখি দে বলছি এদিকে । ভালো খারাপ আমি বুঝে নেবো " , এটুকু বলেই জয় ডায়েরিটা গরিমার হাত থেকে কেড়ে নিল একপ্রকার । গরিমা আর বাধা দিল না । দিয়েও লাভ ছিল না , জয় শুনবে না এটা সে বেশ বুঝেছিল । 

ওদিকে ডায়েরির পাতাটা খুলে জয় তো থ । কত লেখা -- কবিতা , গল্প , আরও কত কি । জয় পাতা উল্টে যাচ্ছিল আর অবাক হচ্ছিল বারবার । 

বেশ জোরে জোরেই সে পড়তে শুরু করলেও , খুব শীঘ্রই শব্দ চয়নের সুবাদে তার গলার স্বর আস্তে হয়ে গেল এবং শেষ মেস সে ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল একেবারেই । এদিকে জয়ের অবস্থা দেখে গরিমার হাসি আর ধরে না । হো হো করে হাসতে লাগলো সে । 

জয় , গরিমার মুখের দিকে তাকালো একবার । চোখ দুটো পাকিয়ে গরিমার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো , " এসব কি " ? 

গরিমাও বেশ হাসতে হাসতে উত্তর দিল , 

" কবিতা " । 

" এগুলো কবিতা !! এসব কি হচ্ছে গরিমা !! কি লিখছিস তুই এসব " ? জয় বেশ চিৎকার করে বলে চললো ।

গরিমা নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো । জয়ের পিঠে হাত রেখে বললো , " এটা আমার গল্প । প্রতি নিয়ত ধর্ষিত হওয়া সেই প্রত্যেকটা মেয়ের গল্প । বুঝলি জয় দা তোরা ছেলেরা সব কিছু শরীরে এনে মিশিয়ে দিতে ব্যস্ত আর আমরা প্রত্যেকটি মেয়ে সেই যন্ত্রনা গুলো হজম করি নিজের শরীরে । বুঝলি জয় দা , ঘটনাটা একই , প্রত্যেকের জীবনে কমন । তবে কেউ বলে সোহাগ , কেউ বলে প্রেম , কেউ বাসর রাতের সুখ আর কেউ ধর্ষণ । 

জয় দা এই কবিতার মেয়েটার মতোই উই গার্লস অল আর রেপড সামহাউ । এই সমাজ নারীকে ধর্ষিতা না হওয়া পর্যন্ত এগিয়ে যেতে দেয় না " । 

জয় এর মুখ চুপ । বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছেড়ে তার কানে এখন শুধু গরিমা । হজম না হলেও গিলে চলেছে অনর্গল । 

বিকেলে উকিল দেখা করতে এলো তার সাথে । গরিমার অত সাধ্য না থাকায় সরকার থেকে একজন উকিল দেওয়া হয়েছে বিনা খরচে তার কেস লড়তে । কেস সংক্রান্ত কিছু পেপার্স সই করানোর ছিল । সেই ফাঁকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেরে নেবে ভেবে এসেছিল সে । আর সেই লক্ষ্যেই এই কেস নিয়ে গরিমার বক্তব্য জানতে চাইলে , গরিমা জানায় যে সে যা বলবে আগামীকাল কোর্টে জানাবে । তবু উকিল বাবু তাকে কিছু অন্তত বলতে অনুরোধ করে যাতে এই কেসের রায় তার পক্ষে আসতে পারে । 

উত্তরে গরিমা হা হা করে হেসে উঠে বলে , " এই কেস আমাদের পক্ষে কোনদিন আসবে না । আইন এই সমাজের সৃষ্ট আর এই সমাজ দুজন কে চেনে - ধনি আর পুরুষ । কেস কেনার টাকা আমার নেই । থাকলে কবে বেরিয়ে যেতাম । আর আমি একজন নারী । দুর্গা , কালি সমস্ত নারী পূজার বেদিতে পুরুষ পুরোহিতের মন্ত্রে বাঁধা । দড়ি ছিঁড়লেই বিসর্জন " । 

উকিল মশাই গরিমার কথাগুলো শুনে গেল শুধু । আজ তার সমস্ত যুক্তি গরিমার আদালতে ম্লান হয়ে পড়ে রইল কালো কোটের পকেটের মধ্যে । আর কিছু না বলে উকিল বাবু বেড়িয়ে গেল সেখান থেকে । এসব ঘটনা ওই দুজন ছাড়া আর একজনই দেখেছিল সেদিন -- গরিমার মা ও বাবা , দূর ওই আকাশ থেকে । 


অন্ধকার নেমে এসেছে তখন পৃথিবী জুড়ে । নিজের সেলের এক কোনায় গরিমা চুপ করে বসে আছে । পাশে তার ডায়েরিটা পড়ে আছে । ওই দূরে ঠিক সামনের ১৯ নম্বর সেলে জয় দাঁড়িয়ে । ইন্সপেক্টর দুবার রাউন্ড মেরে গেছে ইতিমধ্যে । জেলের বড় ঘড়িটা ঢং ঢং করে দশবার বেজে থেমে গেল । কয়েদিদের লাইন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল খাবার জায়গায় । গরিমার কিন্তু কোন হুশ নেই । জয় আস্তে করে দুবার ডাক দিলে সে বলল , " খিদে নেই রে জয় দা । কালকের আদালত , বিচারের নামে প্রহসন এ সব কিছু দুর্বল করে দিচ্ছে আমায় । বারবার শুনতে পাচ্ছি মা বাবাকে ভীষন করে । " এটুকু বলেই পুরোনো ছন্দে দু বার হাহা করে হেসে উঠে আবার বলতে শুরু করলো , " গরিমা ধর । আমি গরিমা ধর । জীবনের যুদ্ধগুলো জয় করার ইচ্ছা নিয়ে মাঠে এসে দাঁড়িয়েছি । কোন মাঠে জানিস জয় দা ... " , জয় চুপ করে বসে তার পাশে আর সে বলে চলেছে নিজের তালে , " যে মাঠে তাকে বারবার লাঞ্ছিত হতে হবে । এই সমাজ বলে , নারী পুরুষ নাকি সমান সমান । না রে জয় দা । সমান হয় না । পুরুষ আমাদের বুকের মাঝখানে থাকে আর আমরা ওদের পায়ের তলায় । বিশ্বাস করলেই ওরা তোর শরীর খুঁজবে । আর শরীরটা বাসি হয়ে গেলেই ছুড়ে ফেলে দেবে । কেউ বাদ যায় না । মা এর গায়ে এই বিশ্বাসের দাগ দেখেছিলাম । আর আমার !! সেই কবে থেকে দেখে আসছি । ছেলে পরিবারের সব । সব অধিকার ওদের । আমরা মেয়ে । তাই বাড়িতে পাত্তা দেয় না । জোর করে বিয়ে করতে । আর বিয়ে মানেই গলায় একটা পট্টি বেঁধে দেওয়া । জয়দা , এই শরীরটাকে নিজের ভাই ছাড়েনি । বিপদে পড়ে যে মানুষটাকে আশ্রয় ভেবেছিলাম সেও ছাড়ে নি । ছাড়বে কেন বল ? আমরা তো মাংস পিন্ড এক একটা । পথে ঘাটে বেরোলে শিক্ষা দীক্ষা সংস্কার দেখে না কেউ । দেখে এই বুক পেট পাছা । ওরা ফুর্তি করে আর তারপর সেটা সহ্য করে নিতে হয় আমাদের । ৯৯% মেয়ে চুপ করে যায় । আর যে একজন মাঠে নামে সে হয়ে ওঠে একটা গরিমা ধর । যেদিন ঘরে ঘরে গরিমা ধর গজিয়ে উঠবে , সেদিন দেখতে চাই কটা আইন এদের পাশে দাঁড়ায় । কত সাধু এরা সাজতে পারে । কিন্তু বাস্তবটা উল্টো - ন স্ত্রী স্বতন্ত্রমারহতি । অনেক বেশি বলে ফেললাম না রে । যা খেয়ে নে তুই " । 

জয় , সেদিন খাবার জায়গায় গেলেও একটা দানাও মুখে তুলতে পারেনি । আর শুধু সেদিন কেন আগামী অনেক দিন ..... 

পরেরদিন সকালে গরিমার নিথর শরীরটা সেল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ । পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে বিষক্রিয়া , কিন্তু কি ভাবে গরিমা মারা গেল তা আজও অজানা । হয়তো এজন্য যে সে ধনিও ছিল না আর পুরুষও ছিল না । 

অন্যদিকে তার প্রিয় জয় দা আজীবন গরিমার সেই শেষ শব্দগুলো ভুলতে পারে নি - ন স্ত্রী স্বতন্ত্রমারহতি , মৃত্যুর পরেও নয় । 


Rate this content
Log in

More bengali story from Sandip Das

Similar bengali story from Classics