Sandip Das

Classics


2  

Sandip Das

Classics


কু ঝিক ঝিক শহর ১

কু ঝিক ঝিক শহর ১

13 mins 561 13 mins 561

গ্রাম্য পরিস্থিতির মধ্যেই বড় হয়েছি । গ্রাম চিরকাল তাই আমার মনের মধ্যেই রয়ে গেছে একটা ছাপ হয়ে । সত্যি বলতে গ্রাম নিজের বাহ্যিক দিক থেকে শহর থেকে অনেক পিছিয়ে । অনেক গ্রাম এখনো অন্ধকারে ডুবে আছে । এখনো বহু গ্রাম অনেক পিছিয়ে । তবে গ্রামের আভ্যন্তরীণ রূপটা সত্যিই মনহারি । সেই ভাগা , কুসবেদিয়ার আতিথেয়তা আমাকে খুব টেনে নিয়ে যেত । আর যেটা আরো বেশি আকৃষ্ট করতো তা হল তাদের সরলতা । ওই সরল আদিবাসীদের মুখ চেয়ে মনে হতো না কোনদিন ওরা কাউকে ঠকাতে পারে কখনো । বাবার মুখে এই সাঁওতাল গ্রাম ও আদিবাসীদের নিয়ে অনেক সত্যি ঘটনা শুনেছিলাম । যত শুনতাম ততই এই মন পালাই পালাই করে উঠতো । বেশ অনেকবারই গেছিলাম সেই গ্রামে । মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম ওই মাটির ছাদের তলায় বসে । সেই অভিজ্ঞতা আজ না বললে খুব অন্যায় হবে । তবে তার আগে বাবার মুখ থেকে শোনা একটা গল্প বলি । 

চিত্তরঞ্জন শহরে একবার বাঘ বেড়িয়েছিল । সারা গ্রাম রাত জেগে কাটিয়েছিলাম বেশ কয়েক রাত । বন দপ্তরকে খবর দেওয়া হল , কিন্তু বন দপ্তর বাঘটিকে খুঁজে বের করতে না পেরে ফিরে গেল । তারা ধরে নিয়েছিল অজয় নদ পার করে বাঘটি তৎকালীন বিহারে ঢুকে পড়েছে । কিন্তু তাদের অনুমান সম্পূর্ণ ভুল ছিল । দুদিন এর মধ্যেই বাঘের গর্জনে সারা শহর জেগে উঠল । আদিবাসীরা মাদলের শব্দে ঢেকে ফেললো গোটা এলাকা । মশাল হাতে সারা রাত জুড়ে চললো খানা তল্লাশি । অবশেষে , ভোর বেলায় বাঘটিকে শিকার করা হল , সৌজন্যে সাঁওতাল আর আদিবাসী শ্রেণী । সত্যি অদ্ভুত সেই আদিবাসী ভাবনা , অদ্ভুত তাদের ভালোবাসা মানুষের জন্য , অদ্ভুত তাদের ভালোবাসা আমার শহর চিত্তরঞ্জনের প্রতি । 

চিত্তরঞ্জন শহরে কাটানো দশ বছরে দশ হাজারের জীবনের আনন্দ আমি উপভোগ করেছি । উপভোগ করেছি এর ইতিহাস , এই শহরের গরম , এই শহরের শীতের কুয়াশা , আদিবাসী প্রতিবেশী গ্রামের আপনতা , সূর্যোদয়ের ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য্য , গাছ পালায় ঘিরে থাকা একটা নাম : শহর থেকে দূরে একটা শহর : চিত্তরঞ্জন । অনেকেই এই শহরটাকে কাড়া নগরী নাম দিয়ে থাকলেও , এই শহর কোনদিন কাউকে নিজে থেকে বেঁধে ফেলেনি , বরং এই শহরে যে বা যারা এসেছে , তারাই বাঁধা পড়ে গেছে এর মায়ায় । বহু দিনের চেষ্টার মধ্য দিয়ে আমার প্রাণের শহরটাকে সকলের প্রাণে মিলিয়ে দেওয়ার এক ছোট্ট প্রচেষ্টা এই লেখা । শুরুটা তার হোক আমার এলাকা এরিয়া ২ অথবা সুন্দর পাহাড়ি নর্থ থেকে , যেখানে কাটানো দশ বছরে দশ কোটি ঘটনা একটু একটু করে ফুটিয়ে তুলবো আর তার মধ্যে দিয়ে সবাই দেখতে পাবেন একটা ভারতবর্ষের ছবি ; যার বৈচিত্রের মধ্যেও কত ঐক্য । তাহলে ক্যামেরা ঘোরানো যাক আর অফিসার কলোনি ধরে সটান ঢুকে পড়া যাক ৭০ নম্বর রাস্তার এক প্রান্তে যার কোয়ার্টার নম্বর শেষ হয়েছে ৭৬/বি - তে । এর পড়েই একটি চার মাথার মোড় পার করলেই ঢুকে পড়া যায় অফিসার কলোনির বাংলোর দরজায় । এই পিচ রাস্তার দুদিকে সারিবদ্ধ ভাবে বাংলো দাঁড়িয়ে আছে আর পথটি শেষ হয়েছে মিহিজাম সংলগ্ন ১ নম্বর গেটের কাছে । পথটি স্থানীয়ভাবে সানসেট এভিনিউ নামে পরিচিত । রাস্তার প্রায় শেষের দিকে অবস্থিত জি এম বাংলো আর ঠিক তার উল্টোদিকে রয়েছে একটি বন সৃজন প্রকল্প আর একটি গল্ফ কোর্স । এই স্থান থেকে সূর্যাস্ত দেখার মজা সত্যিই অপরূপ ও মনহরিনী । 


চিত্তরঞ্জন রেলস্টেশন থেকে বেরিয়ে যে রাস্তাটা স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসছে তার বাইরে রয়েছে মিহিজাম । রেলস্টেশন এর প্ল্যাটফর্মটি বাঙলায় থাকলেও , স্টেশনের বাইরের এই মিহিজাম শহরটি কিন্তু বিহার ( বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের ) অন্তর্ভুক্ত । স্টেশনের পাশ থেকেই দুমকা , রাঁচি , দেওঘর প্রভৃতি ঝাড়খণ্ডের বাস ছাড়ে । বাস স্ট্যান্ডের সামনে রিকশা স্ট্যান্ড এবং সেই রিকশা স্ট্যান্ড পার করে হাটতে থাকলে দুপাশে তরি তরকারি বাজার । এরই মধ্যে দিয়ে রাস্তাটি অটো স্ট্যান্ড পার করে হাজির হয় একটি গেটের সামনে । গেটের দুপাশে বাংলা ও বিহারের ( বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের) সীমানা নির্ধারক প্রাচীর পূর্ব পশ্চিম দিক বরাবর দাঁড়িয়ে । এই গেটটি ১ নম্বর গেট নামে পরিচিত । ১ নম্বর গেট পার করেই চিত্তরঞ্জন শহরটির মূল ভূখণ্ড শুরু হয় । 

এই ১ নম্বর গেটের পাশেই ( চিত্তরঞ্জনের দিকে ) কলকাতা , আসানসোল , বর্ধমান , মালদা প্রভৃতি জায়গায় যাওয়ার বাস ছাড়ে । এখান থেকে চিত্তরঞ্জন হলদিয়া ভায়া কলকাতা যাবার এস বি এস টি সি বাস পরিষেবা পাওয়া যায় । এছাড়াও অসংখ্য মিনি ও লোকাল বড় ও এক্সপ্রেস বাসও এখান থেকে পাওয়া যায় । 

চিত্তরঞ্জন শহরটি তৈরি হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে । তার আগে অবধি জায়গাটি সাঁওতালদের বাসস্থান ছিল এবং এর পর রেল কোম্পানি এই জায়গাটি কারখানা নির্মাণ করতে এগিয়ে এলে সাঁওতালদের থেকে প্রচন্ড প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় । অনেক লড়াই এর ইতিহাস লেখা হয়েছিল একটি আধুনিক রেলশহর নির্মাণের পিছনে । এই লড়াইয়ের ইতিহাস আজও লিপিবদ্ধ আছে ডিভি বয়েজ স্কুলের পাশে গণপতি হাটের ভেতরে । অবশেষে ১৯৫০ সালে কারখানায় উৎপাদন শুরু হয় এবং ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এখানে কয়লায় টানা ইঞ্জিন ও ডিজেল ইঞ্জিন তৈরি করা হতো । তবে পরবর্তীতে এই কারখানায় ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিন নির্মাণ শুরু হয় । 

চিত্তরঞ্জন শহরটির নাম রাখা হয় দেশবন্ধুর নাম অনুসারে এবং এখানে একটি অডিটোরিয়ামের নাম বাসন্তী দেবীর নামানুসারে করা হয় । অন্যটি নামকরণ করা হয় শ্রীলতা নামানুসারে । বাসন্তীর ঠিক পিছনে শহরের একটি সিনেমাগৃহ রঞ্জন সিনেমা অবস্থিত । বর্তমানে রেলের উদ্যোগে রঞ্জন সিনেমাটির আধুনিকীকরণ করা হলেও এই শহরের দ্বিতীয় সিনেমা শ্রীলতা হলটি আর জীবিত নেই । শ্রীলতার ঠিক সামনে রবিন্দ্রমঞ্চ তৈরি করা হয়েছে । এই রবিন্দ্রমঞ্চে শহরের বিভিন্ন জলসা ও অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে । এই হল খুবই সংক্ষিপ্তভাবে চিত্তরঞ্জন শহরটির একটি নকশা , যার কেন্দ্রে রয়েছে রেলইঞ্জিন কারখানা এবং তাকে ঘিরে বিভিন্ন আয়োজন । এছাড়াও শহরটির নানা দর্শনীয় জায়গা আছে যা আগামীতে বলবো । তার সাথে এও বলবো যে রেল এই অঞ্চলটিকে কেন বেছে নিয়েছিল কারখানা নির্মাণের জন্য ।

সত্তরের যে কোয়ার্টার এ আমার জীবনের মূল্যবান সময় কেটেছে আজ সেই পথ ধরে বেড়িয়ে পড়বো একটু আশে পাশের সফরে । মূল বাস রাস্তা বা চ্যানাচুর মোড় থেকে বেশ কয়েকটা মোড় পেড়িয়ে সত্তরের মোড় । এই চ্যানাচুর মোড় মোড় থেকে ডানদিকে তাকালে দেখতে পাবেন দেশবন্ধু বয়েজ ও দেশবন্ধু গার্লস স্কুল । দেশবন্ধু বয়েজ এর সামনে অবস্থিত গণপতি হাট , যা চিত্তরঞ্জনের প্রথম এডমিনিষ্ট্র্যাটিভ বিল্ডিং ছিল । বর্তমানে এই ডিভি বয়েজ স্কুলের পাশে যে ফাঁকা জায়গা ছিল সেখানে তৈরি হয়েছে ইন্ডোর স্টেডিয়াম । সারা ভারতের নানা প্রতিযোগিতা এই ইন্ডোর স্টেডিয়ামে হয় আর এটা সত্যিই এক গর্বের বিষয় । গণপতি হাট নিয়ে পড়ে একসময় বলবো , তবে আজ তার পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে এগিয়ে যাই আরো খানিকটা । সামনেই একটি মোড় যেখানে বর্তমানে তৈরি হয়েছে চিত্তরঞ্জনের ৫০ বছর পূর্তিতে একটি হাত । এই রাস্তা শীত , গ্রীষ্ম , বর্ষা সমস্ত ঋতুতে কত সাইকেল , স্কুটারের ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে তা একজন চিত্তরঞ্জন বাসী খুব ভালোভাবে জানে । তবে চিত্তরঞ্জন কোনদিন এর জন্য কোন অভিযোগ করে নি । বরং গণপতি এভিনিউর এই পথ চিরটাকাল কলকাতার পথ ঘাটকে অনায়াসে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বারবার । কোন ফাটল নেই , বর্ষার জল জমে না কোনদিন । এই হল আমার শহর । তবে , এই শহরের আর একটি দিক আছে যার সাথে স্মৃতি আকড়ে পড়ে থাকে । সেটা হল ওভাল মাঠ আর তার সংলগ্ন অঞ্চল । পথ চলতে চলতে সেটাও জানাবো একদিন না হয় ।

সত্তর থেকে শুরু করে একটা চক্র শেষ করে ফিরলাম ঠিকই , তবে অনেক পথ ঘুরে আসা এখনো বাকি থেকে গেছে । বাকি থেকে ওভালের লাল মাটি অথবা কুয়াশা ভেজা ঘাসের মধ্যে আড়চোখে দেখে নেওয়া নিজেদের প্রেমিক অথবা প্রেমিকার মুখখানা , দেখে নেওয়া বন্ধুত্বের প্রাপ্তিগুলো , স্যারদের সাথে মেতে ওঠে প্রাপ্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক উল্লাসে , জনগণমন র গানে মধ্যে জেগে ওঠা দেশ প্রেম -- এ সবই তো একটা চ্যাপ্টারে বলে দিতে পারবো না । কারন চিত্তরঞ্জন এক চ্যাপ্টারের গল্প নয় । এই শহর কিছু নেই এর মধ্যেও অনেক কিছু আছে র কথা । এই শহর স্কুল বানক করার মধ্যেও স্কুলে ফিরে আসার শহর , এই শহর একটা মিলন ক্ষেত্র - গ্রাম ও শহরের , আদিবাসী ও শহরের , আদিম ও প্রাচীনের । আগেই বলেছিলাম না , এই শহর একটা গোটা ভারতবর্ষ : বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য । আজ যাত্রা আবার শুরু করবো , ভাগ করে নেবো কিছু অভিজ্ঞতা তবে ওভালের দিকে নয় । আজ ৭১ ও ৭৩ পার করে নেমে যাবো নীচে , সাঁওতাল পরগনার মধ্যে ; যেখানে প্রায় যেতাম আমার ছেলেবেলায় । একবার ঘুরে আসবো সেই শান্তির আশ্রয়স্থল শিব মন্দিরে । তাহলে চলো বেড়িয়ে পড়ি । শুভাস্য শিঘ্রম । 


সত্তরের পাশে ৭১ ও ৭৩ নম্বর রাস্তা পার করতে করতে প্রায়ই ভাবতাম , এরা বুঝি হিসাব জানে না । তাই ৭২ নম্বরটা হিসাব করে নি । কিন্তু তার পরেই ৭৩ এর মোড়ে পৌঁছে তিনটে জিনিসের আকর্ষণ আমাকে কেমন যেন সব ভুলিয়ে দিত । 

ক) পন্ডিতজীর পানের দোকান । প্রতি রবিবার দুপুরে মাংস ভাত খেয়ে বাবার সাথে গিয়ে হাজির হতাম সেই পানের দোকানে । বাবাকে দেখলেই পন্ডিতজী বুঝে যেত দুটো মিষ্টি পান আর আমার ফাউ হিসাবে পাওনা ছিল এক মুঠো মৌরি আর চেরি । সেই মৌরি চেরির স্বাদ আজও ভুলতে পারি নি । আজকাল অনেক মশলা দিয়ে তৈরি দামি দামি মিষ্টি পানের স্বাদ ওই সাধারণ পানের কাছে হার মানতে বাধ্য । পন্ডিত জি খুব সুন্দর রাম চরিত মানস পাঠ করতেন । অনেকবার শুনেছি সেই সুর আর যত শুনেছি ততই হারিয়ে গেছে তার মাধুর্য্যে । পন্ডিত জির বাড়ি ছিল ৭১ নম্বর রাস্তায় আর তার বাড়ি যেতাম শুধুমাত্র তার পোষা কুকুরটিকে দেখবো বলে । 

খ) ৭৩ এর শিব মন্দির । পাহাড়ের উপর অবস্থিত এই শিব মন্দির আমার ছোটবেলার অনেক স্মৃতি বহন করে । যখনই মন খারাপ হয়ে যেত তখনই এই মন্দিরে এসে বসে থাকতাম । এক অদ্ভুত শান্তি ছিল মন্দির জুড়ে । বাবার মুখে শুনেছি মন্দিরটি আগে ছোট্ট মতন ছিল , পরে সেটিকে বড় মন্দির করা হয় । শিবরাত্রি ও নীলের উপসে সেই মন্দিরে কতবার গেছি তার হিসেব নেই । আর তাছাড়া নর্থের শিব মন্দির ছিল আমার কাছে মন পরিবর্তনের এক অমূল্য জায়গা । পাহাড়ের ওপরে বসে সাঁওতাল পরগনার রূপ দেখতে দেখতে কোথায় যে হারিয়ে যেতাম তার ঠিক ঠিকানা ছিল না কোন । চারিপাশের সবুজ ধানক্ষেত আর অন্য পিঠে গড়ে ওঠা নগর সভ্যতা আমাকে অনায়াসে আকৃষ্ঠ করতো বার বার । সেই শিব মন্দিরের পাশে ছিল একটা রাম ও হনুমান মন্দির । জন্ম অষ্টমী ও রাম নবমিতে সেখানে ভিড় উপচে পড়তো বরাবরই । 


গ) সাঁওতাল গ্রাম ও তাদের সংস্কৃতি । সাঁওতাল পরগনায় কত বিকেল , কত সকাল আমি কাটিয়েছি তার হিসেব নেই । সেই আল , ধানের শীষ তুলতে যাওয়া , সেই কাঠের ব্রিজ , সেই মাটির ঘর , সেই গোবরের গন্ধ , সেই ভুট্টার স্বাদ , সেই গরম গরুর দুধ , সেই বিহুর আনন্দ , সেই মনসা পুজোর খাসি খেতে যাওয়া আর সবার ওপরে সেই সাধারণ আদিবাসী পরিবারগুলো আজও আমাকে টেনে নিয়ে যায় আমার স্বপ্নের শহর চিত্তরঞ্জন । 

৭৩ এর এই তিনটি জিনিস ছাড়াও যেটা আমার খুব মনে পড়ে সেটা হল ৭৩ এর গাছ , পাখি ও সবচেয়ে বেশি ছেলেবেলার দিনগুলো । ছট থেকে দোল , ঈদ থেকে ক্রিস্টমাস এই শহর সবার সাথে মিলে উৎসবে মেতে উঠতো বারবার আর এই ৭০ , ৭১ ও ৭৩ আমার কাছে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় স্বাক্ষী । এখানকার মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ আজও মনকে ভীষন টানে । আর এই সব অভিজ্ঞতা নিয়েই তো স্বপ্নের শহর নির্মাণ হয় ।

আমার কোয়ার্টার থেকে ছেড়ে আসা একদিক আজ ঘুরে এসে মন বেশ ভারাক্রান্ত । তাই বাড়ি ঢুকে পড়বার কোন চান্স নেই এখন । বরং ওভালের দিকটা যেটুকু বাকি ছিল সেখান থেকে আবার একবার ঘুরে আসা যাক । আর ফেরার পথে সানসেট এভিনিউ এর মহুয়ার বুক চিরে দেখে নেব সূর্যাস্তের লাল মুখখানা । তাহলে চলুন , লেটস গো ।


ওভালের সাথে জড়িয়ে আছে আমার ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি । ১৫ই আগস্টের আগে বৃষ্টি হওয়া যেন প্রকৃতির থেকে পূর্ব নির্ধারিত ছিল আর তার ফলে পরের দিন মাঠের কাদা ঢেকে ফেলতে লাল পাথর গুঁড়ো কি করে ভোলা যায় । সাদা জামা প্যান্ট এর অবস্থা যে কি হতো তা একমাত্র চিত্তরঞ্জন বাসীরাই জানে । এদিকে কাক ভোরে স্কুল থেকে হাঁটা পথে ওভাল যাত্রা শুরু হত । তারপর সেখানে এটেন্ডেন্স নেওয়া হতো । কিছু কিছু বিচ্ছু ছেলে অবিশ্যি আগে ভাগেই মাঠে পৌঁছে যেত এবং সুযোগ বুঝে নিজের স্কুলের দলে এসে মিশে যেত । কারুর চেনবার বা ধরবার জো ছিল না । 

এই একই ঘটনা দেখা যেত ২৬সে জানুয়ারি । ফ্ল্যাগ হোস্টিং , জি এম এর ভাষণ , মার্চ পাস্ট , মাস ড্রিল , ইন্টারস্কুল স্পোর্টস এ সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত ওভালের ওই গোলাকারের মধ্যে । এছাড়া বাবার মুখে শুনতাম কোন এক সময় ওভালের এই মাঠে এককালে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রাদল আসতো । আর সত্যি বলতে চিত্তরঞ্জন চিরকালই শিল্পীদের মাতৃস্থান হয়ে থেকে গেছে । অগুনতি শিল্পী এই চিত্তরঞ্জনে জন্মেছে , বড় হয়েছে ; আবার অনেক শিল্পী কর্মসূত্র ধরে একসময় এসেছিল এই রেলশহরে । ভাবা যায় ওভালের ওই পরিধির মধ্যে আশা ভোঁসলে , রাহুল দেব বর্মনের মত নামি শিল্পীরাও অনুষ্ঠান করে গেছেন । সত্যিই এই শহরের বহুমুখী দিক আকৃষ্ট করে যতবার তার দিকে ফিরে তাকাই । তবু চিত্তরঞ্জন সব সময় একটাই মন্ত্র শিখিয়েছে সবাইকে , দূরে যাওয়ার মন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে , নিজের পায়ে দাঁড়াতে । রেল ইঞ্জিনের এই শহর তাই তো রেল সুবিধা দিয়ে গেছে আমাদের বারবার যাতে যাতায়াতের সমস্যা না হয় । উন্নতির দিকে যাত্রা , প্রগতির দিকে যাত্রা । আর যাত্রা বললাম যখন তখন শ্রীলতার মাঠ কি ভোলা যায় । রাত জেগে যাত্রা দেখার সুযোগ আমার আজও হয় নি কিন্তু বড়দের মুখ থেকে শুনেছি , কত নামি দামি শিল্পীরা ছুটে এসেছে চিত্তরঞ্জনে শো করতে । তাদের মধ্যে কিছু নাম বলছি , কুমার শানু , নচিকেতা , রবি ঘোষ , পি সি সরকার প্রভৃতি ; কারন সব নাম নিলে চিত্তরঞ্জন ভরে যাবে তবু নাম শেষ হবে না । ওভালের পাশেই চিত্তরঞ্জন গেস্ট হাউস ও তার সামনে অবস্থিত শিশু বিহার স্কুল । এই ৬৩ নম্বর রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেও ১ নম্বর গেটে পৌঁছানো যায় । সেক্ষেত্রে পথে দেখার মত দাঁড়িয়ে সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট স্কুল । এই ১ নম্বর গেটে যাওয়ার আরো দুটি রাস্তা আছে যার একটি অফিসার কলোনি বা সানসেট এভিনিউ আর একটি ম্যানগ্রোভ এভিনিউ বা মূল বাস রাস্তা । সে দুটি সম্বন্ধে পরে বলবো একদিন । 

     ম্যানগ্রোভ এভিনিউ আর গণপতি এভিনিউ একই রাস্তার দুটো নাম । গণপতি হাট সংলগ্ন রাস্তার নাম গণপতি এভিনিউ আর ১ নম্বর গেট থেকে ওভাল অবধি এই রাস্তার নাম ম্যানগ্রোভ এভিনিউ । ওভালের ঠিক উল্টো দিকে এস পি ইস্ট বাজার আর বাজারের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রঞ্জন সিনেমা ও বাসন্তী ইনস্টিটিউট । রঞ্জন সিনেমাটি বর্তমানে আধুনিকতার ছাপ লাগলেও , পুরোনো হলে বাবার হাত ধরে দেখা ইংরেজি সিনেমা দেখার মজা আজও মনে লেগে আছে । তখন হলটিতে নতুন সিনেমা লাগতো না । রিলিজ হয়ে যাওয়া সিনেমা অনেক হাত ঘুরে এসে পৌছাত হলের পর্দায় । তবু লোকের আগ্রহ কোন ভাবেই কম ছিল না । তাছাড়া রঞ্জনে মাঝে মাঝে জলসার আসর বসতো । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর মত নামি শিল্পীও এই রঞ্জনে জলসা করে গেছেন । এস পি ইস্ট মার্কেট থেকে বাস রাস্তা ধরে গণপতি এভিনিউ ধরে হাঁটলে পৌঁছে যাওয়া যায় এরিয়া ২ ডিস্পেন্সারি র সামনে । এই ডিস্পেন্সারির ঠিক পাশেই এক কালে মহিলা মহলের দুর্গাপুজো হতো । এই পুজোর বৈশিষ্ঠ ছিল সম্পূর্ণ পুজোটি মহিলা দ্বারা পরিচালিত ছিল এবং পুজো কমিটিতে কোন পুরুষ সদস্য ছিল না । বেশ কিছু বছর পুজো হওয়ার পর পুজোটি অবশেষে বন্ধ হয়ে যায় । তবে এর স্মৃতি আমার মনে আজীবন জ্বলজ্বল করবে । 

এই পথ ধরে আর একটু এগিয়ে গেলেই এস পি নর্থ মার্কেট । এই বাজার এর বেশ কিছু স্মৃতি পরের পর্বে আলোচনা করবো , কেমন ।


নর্থের বাজারে ঢুকেই পড়লাম যখন তখন আজ আর কোন কথা বলবো না । বরং একটা কবিতা হয়ে যাক আজ । আরে আরে মুখ ভার করলে চলবে ? চিত্তরঞ্জনে এলে আড্ডা না দিয়েই চলে যাবে ? চিত্তরঞ্জন মানেই তো আড্ডার শহর । চিত্তরঞ্জন মানেই তো হুল্লোড়ের শহর । শীতের সন্ধ্যে বেলা সকলে গোল করে বসে আগুন সেঁকা আর গরমে ঘরে কে ঢুকবে ? ভেতরটা ভ্যাপসা । পাপাই , বুকু , মিঠু , ফুচান , আমি , পুকান , পোষন সবাই বোস আজ । আড্ডা দেবো জমিয়ে । সামনে না পারি এই বইয়ের পাতায় সকল চিত্তরঞ্জন বাসীর মহা আড্ডা । সবার আমন্ত্রণ কেন ? কারন এ শহর ভেদাভেদ জানে না তাই । কবিতাটা আমার সাথে বলো , পুরোনো প্রেমিকার কথা মনে পড়ে যাবে । পুরোনো প্রেমিকাটা কে ভাবছো তো ? দুর্গা পূজার এই নর্থের বাগানেই একটা ঝালমুড়ি খাইয়ে চারদিন চুটিয়ে গল্প করেছিলে যার সাথে ভলেন্টিয়ারের বেঞ্চে বসে বসে । তার কথায় বলছি গো । এবার আসর শুরু করি তাহলে আজকে ?  


নর্থ মানেই রাত জাগা আড্ডার মহড়া 

নর্থ মানেই চা সিগারেট , মিষ্টি আর সিঙ্গারা 

নর্থ মানেই মন্টু ঘোষ 

নর্থ মানেই ডালপুরি , রসগোল্লা 

নর্থ মানেই অজানতিক ফুটবল 

আর স্কাউটে র ছেলে ছোকরা ।

নর্থ মানেই দুর্গা পুজো - প্রস্তুতি থেকে বিসর্জন 

নর্থ মানেই বিশাল ঠাকুর - মেলায় বসে বসে 

ভাজা সেই বাদাম ভোজন ।

নর্থ মানে বন্ধু হয়ে যাওয়া মুহূর্ত 

নর্থ মানে পাশের বাড়ির খবর রাখা 

নর্থ মানেই দেওয়ালির খুব ভোরে 

ক্যান হাতে মণ্ডপে মণ্ডপে ভোগ আনা ।

নর্থ মানে দোল খ্যালে - হিন্দু থেকে মুসলমান 

নর্থ মানে ঈদের সিমুই , বড়দিনের কেক 

আর একটা পুরোনো নেশা , নতুন বোতলে সিল করা ।


সুন্দর পাহাড়ি নর্থ বাজারে ঢুকেই পড়েছি যখন তখন একজনের নাম না বললে ভীষন অন্যায় হবে । তিনি হলেন মন্টু ঘোষ । মিষ্টির জগতে এক উল্লেখযোগ্য নাম এই মন্টু ঘোষ । তবে তার থেকেও উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় তার কর্ম উদ্যম মানসিকতা । সকাল থেকে রাত অবধি দোকান ও রান্না হওয়া মিষ্টি তৈরির প্রবল তত্ত্বাবধান তার সফলতার মূল মন্ত্র ছিল । ধীরে ধীরে ওই স্থান মানুষের মিলনস্থলে পরিনত হয়ে ওঠে । একসময় চিত্তরঞ্জনে চাকরি নিয়ে এসেছিলেন খরাজ মুখার্জীর মতো অনেকেই । সন্ধ্যে বেলা ওই দোকানের সামনের ফাঁকা জায়গায় সময় কাটিয়ে গেছেন তাদের মত নামি দামি ব্যক্তিরাও । যারা এখনো এ দোকানে যান নি তাদের জন্য বলে রাখি "কালাকাঁদ 'আর "ভাপা' সন্দেশ বললে মন্টু ঘোষের নাম মিষ্টির ইতিহাসে এমনিই চলে আসবে। 


এছাড়া নর্থের দুর্গা পুজোর একটা ইতিহাস আছে । পুজোর সময়ে নানা মানুষ ও নানা দোকানের সমাহারে জায়গাটি হয়ে ওঠে বহু মানুষের মিলন ক্ষেত্র । পাশাপাশি পুজোর ঐতিহ্য স্থানটিকে করে তোলে চিত্তরঞ্জনের ম্যাডক্স । তবে শুধু নর্থের দুর্গাপুজো নয় , অন্যান্য অঞ্চলের পূজগুলিও যে কোন এলাকাকে টেক্কা দিতে পারে এ ক্ষেত্রে । সেসব পুজো নিয়ে একটা গোটা পর্বে আলোচনা করবো । এখন আপাতত এগিয়ে চলি । 

নর্থের প্রতিবেশী বলতেই যে অঞ্চলের নাম মানুষের মুখে উঠে আসে সেটি হলো সিমজুরি । বাজার ছেড়ে বড় বাস রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলেই চার মাথার মোড় । বাদিকে কুশবেদিয়া যাওয়ার উন্মুক্ত পথ আর ডান দিকে ফতেপুর যাওয়ার রাস্তা । সিমজুরির প্রবেশ দ্বার এখান থেকেই শুরু । 


ক্রমশঃ---


Rate this content
Log in

More bengali story from Sandip Das

Similar bengali story from Classics