Sanghamitra Roychowdhury

Classics

4  

Sanghamitra Roychowdhury

Classics

মাঝ রাতের টুকরো কথা

মাঝ রাতের টুকরো কথা

5 mins
719


কলকাতা শহরের বুকে এতো গলি? দেখে ভারী অবাক হয়েছিলো বিন্দুবাসিনী। গ্রামের মেয়ে, সরল, সাদাসিধে।


বাড়িতে সবাই ওকে বিন্দু বলেই ডাকে। বিন্দু চোদ্দো পেরিয়ে যখন সবে পনেরোয়, গ্রামে ঘুরতে আসা বছর পঁচিশের অনিলদার সঙ্গেই তার তখনই ভারী ভাব হয়েছে। অনিলদা বিন্দুর ইস্কুলের বন্ধু পূর্ণিমার মাসতুতো দাদা, কলকাতায় বাড়ি। অনিলদা গ্রামে পূর্ণিমাদের বাড়িতে যখন প্রথম বিন্দুকে দেখেছিলো সেই তখন থেকেই নাকি বিন্দুকে ভালোবাসে, বিয়ে করতে চায়। খালি দু'টো বাধা, এক তো অনিলদারা জাতে বামুন, আর বিন্দু কায়েত ঘরের মেয়ে, আর দুই হোলো, অনিলদার এখনো পাকাপাকি কোনো কাজ নেই। এই দু'টো ব্যাপার সামলেই অনিলদা বিয়ে করবে বিন্দুকে, কথা দিয়েছে। গ্রামের পাশের সরস্বতী নদীর পাড়ে ঝাঁকড়া কদমগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে, বিন্দুর হাতে হাত রেখে।


সেই বিন্দু নাইনে উঠেছে সবে, বয়স ষোলো পুরোতে আরো কয়েকমাস। সরস্বতী পুজোর দিনে সেবার অনিলদার সঙ্গে পাশের গ্রামের ঠাকুর আর মেলা দেখতে গিয়েছিলো। সঙ্গে পূর্ণিমা আর পূর্ণিমার ভাইও ছিলো। ঠাকুর দেখে, মেলায় ঘুরতে ঘুরতে অনেকটা দেরী হয়ে গিয়েছিলো। বাড়ি ফেরার পথেই মাঘের শীতের সন্ধ্যে, ঝপ করে নেমে এলো।


শুক্লা পঞ্চমীর ক্ষয়াটে চাঁদের আলোয় দু'হাত দূর থেকেই সব ঝাপসা, অস্পষ্ট। ঝাঁপানতলার মাঠ পার হলেই খানিকটা পথ বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে। সরু পথ, দু'ধারে শেঁয়াকূলের ঝোপ, নড়চড় হলে বেশি সেই ছুঁচলো কাঁটায় খোঁচা খেতে হবে। খুব সাবধানে গা বাঁচিয়ে আগুপিছু করে সেই পথে নিজের গ্রামে, নিজের বাড়িতে ফিরছিলো ওরা চারজন। সামনে সামনে পূর্ণিমা ভাইয়ের হাত ধরে, ওদের পিছনে সামান্য তফাতে পাশাপাশি বিন্দু আর অনিলদা। সেই ছায়াঢাকা অন্ধকার পথে প্রথম বারের জন্য অনিলদা বিন্দুর বুকে হাত রাখলো। বিন্দু থরথর করে কেঁপে উঠলো, কিন্তু ভালোলাগায় গলেও পড়লো যেন। আরো দু'কদম এগিয়েছে পূর্ণিমারা, অনিলদার ঠোঁট নেমে এলো বিন্দুর ঠোঁটে, নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারলো না বিন্দু, নাকি ছাড়িয়ে নিতে চাইলো না, সমর্পণ করে দিলো নিজেকে। পূর্ণিমা হাঁক পাড়লো, "তাড়াতাড়ি চ, বকবে এবার ঘরে।"


*********


তারপর আরো ক'টা মাস বিন্দু স্বপ্নের জাল বুনে বুনে কাটিয়ে দিলো। নিজের একটা ছোট্ট ঘর, ছোট্ট সংসার, ছোট্ট ছোট্ট বাসন-কোসন, তারপর ছোট্ট ছোট্ট.... আর ভাবতে পারে না বিন্দু। লজ্জায় তার গাল রাঙা, কান গরম আর ঘন নিঃশ্বাস। লেখাপড়া, ইস্কুল, বন্ধু এসবে তার আর মন নেই। দিন গোনে বসে বসে, মনে সেই প্রথম পুরুষ ছোঁয়ার দুরুদুরু, দমবন্ধ করা শিহরণ বুকে নিয়ে। মহালয়ার দিন সরস্বতী নদীর ঘাটে মেলার মতো ভিড়, পুণ্যিচানের। বিন্দু উদাস হয়ে বসে ছিলো ঘাটের শানবাঁধানো পৈঠায়। ক'পা দূরে খেয়াঘাটে কত লোকের আনাগোনা, শহরের যাত্রীদের। হঠাৎই বিন্দুর বুকের ভেতরকার টুকটুকে লাল হৃদপিণ্ডটা ব্যাঙের মতো একলাফে বিন্দুর গলার কাছে উঠে এলো। বিন্দুর মুগ্ধতা মাখা চোখ দুটি একজনের ওপরে স্থির হয়ে আছে, অনিলদা, অনিলদা এসেছে। তখন সামান্য চোখাচোখি। হাতের ইশারা। বিকেল না হতেই অস্থির বিন্দু ছুটলো পূর্ণিমাদের বাড়িতে।


পূর্ণিমার আর বাড়ির সবার চোখ এড়িয়ে দু-একটি কথা হয়েছিলো। ব্যবস্থা একটা হয়েছে, অনিলদা নিতে এসেছে বিন্দুকে। কেউ না মানুক, অনিলদা একলাই বিন্দুকে বিয়ে করে নিয়ে নিজের মতো নিজে থাকবে, আলাদা বাসা ভাড়া করে। অতবড়ো কলকাতা শহরে ঠিক তাদের নিজেদের ছোট্ট ঘরে ছোট্ট সংসার হবে। অনিলদা বলেছিলো, "এক কাপড়ে চলে এসো, নইলে লোকের সন্দেহ হবে। গ্রাম থেকে পালিয়ে গিয়ে কলকাতায় গিয়ে আগে বিয়ে করে তারপর নিজের ভাড়ার বাসায় ঢুকবো, সংসার করবো।"

চারটে দিন বড়ো কঠিন কাটলো বিন্দুর, উত্তেজনায় আর ভয়ে। অনিলদার পরামর্শ মতোই বিন্দু সেবারকার পুজোর নতুন নকশাতোলা কাপড়খানা পরে পঞ্চমীর ভোরে ফুল তুলতে যাবার নাম করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে সোজা খেয়াঘাটে পৌঁছলো। তারপর খেয়া পেরিয়ে হেঁটে গিয়ে রেলের স্টেশন, তারপর রেলগাড়িতে চেপে সোজা হাওড়া স্টেশন। সেখান থেকে বাসে চেপে অনেকটা পথ। ভিড়ে ভিড়াক্কার রাস্তায় বাস থেকে নেমে পড়তে হোলো, বাস আর যাবে না। তারপর হাঁটতে থাকলো বিন্দু, অনিলদার হাত খামচে ধরে। এতো চওড়া রাস্তা? এতো মানুষ? এতো ভিড়? কী সব বিরাট বিরাট ম্যারাপ বেঁধে দুর্গাপুজো হচ্ছে, কী সুন্দর সাজ মাদুর্গার! দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম জানালো বিন্দু, মনে মনে মা'কে বললো, "নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি মা গো, যেন সুখী হতে পারি, আশীর্বাদ কোরো মা।"


**********


আরো খানিক পথ হেঁটে এক মন্দিরতলায়, ঠায় দুপুরে মন্দিরের দরজার চৌখুপি দু'খানা খুলে রেখে মন্দিরের দোর দিয়ে পুরুতমশাই হয়তো বসে বা শুয়ে কোনোখানে বিশ্রাম নিচ্ছে। এদিক ওদিক দেখে কাউকে না পেয়ে অনিলদা বললো, "আমি নিজেই তো বামুনের ছেলে, এই খোলা আকাশ আর সামনে মা-কালীকে সাক্ষী রেখে আমি তোমায় বিয়ে করলুম, আজ থেকে তুমি আমার ইস্ত্রি, আর আমি তোমার স্বামী".... বলেই অনিলদা প্রণামী বাক্সের পাশে রাখা মায়ের প্রসাদী তেলসিঁদুর দিয়ে বিন্দুর সিঁথি ভর্তি করে দিলো। বিন্দুর কানে তখন শাঁখ, উলু, নহবৎ, ঢাক, কাঁসর, ঘন্টার সব আওয়াজ একেবারে মিলেমিশে বাজছে। বিন্দুর গাল বেয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়লো গরম অশ্রুধারা। হাঁটু মুড়ে গলায় আঁচল দিয়ে গড় হয়ে বিন্দু প্রণাম করলো মন্দিরের ভেতরের মা-কালীর বিগ্রহকে, তারপর গড় করেই অনিলদার পায়ের ধুলো নিয়ে নিয়ে নিজের কপালে সিঁথিতে ছোঁয়ালো বিন্দু। নিজের মায়ের মুখখানা মনে পড়লো, মা বলে, "পতি পরম গুরু।"

বিয়ে করে অনিলদা বিন্দুকে নিয়ে চললো গলি পথে, বড়ো রাস্তা ছেড়ে এমন গলিপথ দেখেই অবাক হয়েছিলো বিন্দু, "কলকাতা শহরেও এমন গলিপথ আছে?" অনিলদার গলার স্বরে চটকা ভাঙলো বিন্দুর, "এও আমার আরেক মাসীর বাড়ি, খানিকক্ষণ থাকো এখেনে, আমি তোমার জন্যে ক'খানা কাপড়চোপড় কিনে আনি। তারপর আজ রাতটা এখেনে থেকে কাল নিজেদের বাসায় যাবো" একটা পুরনো বাড়ির শ্যাওলা ধরা দরজার কড়া নাড়তে নাড়তে কথাগুলো অনিলদা বিন্দুকে বললো।


ওদের কথার মাঝেই দরজা খুলেছে অনিলদার মাসী, "আয় বাছা, আয়, ভেতরে আয়, শুনিচ্চি বাছা, আমি তোদের সব খপর অনিলের মুক্কে, আয়।" অনিলদা মাসীকে বললো, "বিন্দুর ক'খানা কাপড়চোপড় কিনে আনি মাসী, রইলো ও তোমার কাছে।" তারপর অনিলদা বিন্দুর দিকে ফিরে বললো, "থাকতে পারবে তো?" বড়ো করে ঘাড় হেলালো বিন্দু। মাসী দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিন্দুর পিঠে হাত রেখে ভেতরে যেতে যেতে বললো, "তোকে বরং বিন্দি বলেই ডাকি, ঐ বিন্দু নামটা যেন কেমনধারা বুড়োটেপানা!" বিন্দু আবারো বড়ো করে ঘাড় হেলালো।


অনেকটা রাত হয়েছে, এখনো অনিলদা ফেরে নি।

বিন্দুর বয়সী, বা একটু বড়ো ক'টা মেয়ে ওকে দূর থেকে দেখছিলো। মাসী বিন্দুকে বললো, "চ, তুই আমার ঘরে বসে বিশ্রেম নে বাছা, অনিল এলে ডেকে দোবোখনি।" বিন্দু বসে বসে দেখছে ঘরের এপাশে ওপাশে চোখ বুলিয়ে, অনেক দামী দামী সব জিনিসে ঘর সাজানো, বেশ বড়ো ঘরখানা। এসব জিনিস চোখে দেখা তো দূর, নামও কখনো শোনে এসব জিনিসের। জড়োসড়ো হয়ে সাদা ধবধবে বিছানায় একপাশে বসে থাকতে থাকতে বিন্দুর চোখদুটো লেগে এসেছিলো, সারাদিনের ধকলে।


**********


শেফালিমাসী পানের পিকটা পিকদানে ফেলে গুনে গুনে টাকাটা নিয়ে ব্লাউজের ভেতর চালান করে দিয়ে গলা তুলে ডাকলো, "বিন্দি, ও বিন্দি .... একবার ইদিকে আয় দিকি, বাছা।"

ষোলো বছরের বিন্দি জড়োসড়ো হয়ে এসে মুখ নীচু করে দাঁড়ালো। শেফালিমাসী ছাপ্পান্ন বসন্ত পার করা বসন্তবাবুর দিকে ফিরে চোখ মটকে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, "যান গো বাবু, দেক্কে নেবেন, এক্কেবারে আনকোরা নতুন মাল, আপনার পচ্চন্দসই!"


এফএমে কোথাও বাজছে, "রঙ্গ বরষে... ভিগে চুনরওয়ালী.... রঙ্গ বরষে!"


মাঘের বসন্তপঞ্চমী থেকে আশ্বিনের দুর্গাপঞ্চমী... অনেকটা সময় একেবারে একদমে ছুটে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে, পঞ্চমীর ক্ষয়াটে চাঁদের ছায়া ম্লান আলোয়, ঝাপসা অস্পষ্ট বিশ্বচরাচরে!!


(বিষয়: বিশ্বাসঘাতক)


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Classics