ললন্তিকা ধারাবাহিক
ললন্তিকা ধারাবাহিক
পর্ব বাহান্ন
অরবিন্দের খবর পেয়ে মিঃ আরণ্যক বসুরায় এক্কেবারে চুপসে গেলেন । কিছুটা সময় হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন গোপালকৃষ্ণ বাবুর মুখের দিকে ।
তারপর নিস্তব্ধতা ভেঙে বললেন - সত্যি বলছেন দাদা ? অরবিন্দ এখনও বেঁচে বর্তে আছে ?
গোপালকৃষ্ণ বললেন - তুমি শোননি ? আমি তো গত পরশুদিন খবরটা পেলাম রাণীগঞ্জের বেয়াইয়ের মুখে ! আমি ভেবেছি তুমি জান হয়তো !
- না দাদা । এমন খবর তো শুনিনি । তাহলে পরমেশ্বর ভট্টাচার্য্য কি চেপে রেখেছে খবরটা?
- এদিকে ওই সন্তু মুখার্জী - মানে - রাণীগঞ্জ থানার ওসি থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করার আগেই অরবিন্দ মুখ খুলে দিয়েছে । বলেছে তোমার টাকাপয়সায় নাকি ওরও অংশ আছে ।
- কি ডেঞ্জারাস ছেলে ! বলে কিনা আমার টাকাকড়িতে ওর ভাগ আছে ! দেখাচ্ছি মজা !
- আর কত মজা দেখাবে ভাই ? এখন তুমি মজা দেখে যাও। কনককে অযথা মারলে কেন ? ও বেচারার দোষ কি ছিল ?
আরণ্যক শান্ত গলায় বললেন - আগে শুয়ারটাকে দেখি; তারপর সব প্রশ্নের উত্তর দেব।
- তাহলে তুমি মেনে নিচ্ছ কনকলতাকে তুমিই যোগসাজশ করে মেরেছ ?
- এখন চলি দাদা ! তবে আমি সত্যি বলছি এতে আমার কোন হাত নেই ।
ফুঁসে উঠলেন বনলতা দেবী !
- দ্বিভুজেরা অনেক সময় বহুভূজ হয় , আরু । যেমন তুমি। যাবে যাও ; বাধা দেব না, কিন্তু আমরা তোমার নামে নালিশ জানাব - এ টুকু জেনে যাও ।
রাগে আরণ্যকের সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল । দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে উঠলেন - তোমরা এই দুনিয়ায় থাকলে তো নালিশ করবে ।
বলে পকেট থেকে একটা ছোট্ট পিস্তল বের করে একবার বনলতা দেবী এবং একবার গোপালকৃষ্ণ বাবুর দিকে তাক করে ধরলেন ।
কোথা থেকে বিল্টু এসে আরণ্যককে জড়িয়ে ধরল । আবদারের সঙ্গে বলল - ওটা আমায় দাও না ছোড়দা ! খেলব আর দিদিকেও ভয় দেখাব !
মুহুর্তের মধ্যে আরণ্যক বিল্টুকে চেপে ধরল । পিস্তল তার মাথায় ঠেকিয়ে বললেন - এটাকে ঈশ্বর কেমন পাঠিয়ে দিলেন দেখ !
তারপর হাসতে হাসতে বললেন - তোমরা নালিশ জানাতে যাবে বলছিলে ?
তারপর একটা হেঁচকা টান মেরে বিল্টুকে তুলে নিয়ে বললেন - যা না যা ! এই রাস্তা ছেড়ে দিলাম। যা এবার। এই ওয়ান টু--
কল্যাণী ছিল রান্নাঘরে । অনেকক্ষণ ধরে কথাবার্তা শুনছিল বটে; স্পষ্ট বুঝতে পারেনি । আরণ্যকের জন্য পছন্দমত খাবার তৈরিতে ব্যস্ত ছিল । বিল্টুর মাথায় পিস্তল ঠেকানো দেখে বেলন চাকীর চাকতিটাই ছুঁড়ে দিল আরণ্যকের হাত লক্ষ্য করে ।
চাকতিটা ঘুরতে ঘুরতে এসে বিল্টুর মাথায় আঘাত করল। ভারসাম্য বজায় রাখতে না পেরে আরণ্যক একটু টলে যেতেই বিল্টু আলগা হয়ে বেরিয়ে পালাল ।
এবার তো আরণ্যক আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন । রীতিমত ধমকের সুরে বললেন - তোমরা না আমার আত্মীয় ! একজন প্রখ্যাত প্রথিতযশা লেখকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে বলে মর্মাহত হলাম । ঠিক আছে, থানায় যাবে , নালিশ করবে, কোর্টে তুলবে - ভেরি বিগ প্রসেস।
এই নাও ।
বলে পিস্তলটা বনলতা দেবীর হাতে দিয়ে বললেন - অত সময় নষ্ট করে লাভ কি ? এই ধর, এটা লোডেড পিস্তল। ছ'ছ'খানাই ঢুকিয়ে দাও আমার বুকে। ল্যাঠা চুকে যাক।
বনলতা দেবী অবাক হয়ে গেলেন। গোপালকৃষ্ণ বাবু বিমুঢ় । আর কল্যাণী ? সে তো অলরেডি অজ্ঞান হয়ে গেছে!
বনলতা দেবী কোনমতে বললেন - এটা নিয়ে কি করব? তারচে' তুমিই রেখে দাও ; রিজার্ভড রাখো আমাদের জন্য । পথ চলতে যদি কোন বিপদ আসে একটা একটা করে শেষ করে দিও না হয় এটা দিয়ে ?
আট্টহাসিতে বাড়িটা গমগম করছে। আরণ্যক বসুরায় শীতকাতুরে গলায় মিনমিন করে বললেন - আই অ্যাম সরি। আই অ্যাম ভেরি সরি । লঘু গুরু জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। রিকোয়েস্ট করছি কোন হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিতে । যদি নেন--
বনলতা দেবী বললেন - আমাদের পুরো পরিবারটা খতম করে দেবে - তাই তো ?
আরণ্যক হাসলেন। হেসে হেসে বললেন - মনে থাকে যেন।
তারপর তড়িৎ গতিতে বেরিয়ে পড়লেন । বনলতা গোপাল বাবুর চেয়ে একটু বেশি দৃঢ়চেতা । কল্যাণীর শুশ্রূষায় বসে পড়লেন। গোপালকৃষ্ণ বাবু তখনও স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে আছেন ।
ভাগ্যিস নাতনী পলা ছিল না বাড়িতে । নইলে যে রকম বিচ্ছু মেয়ে - একটা অঘটন ঘটে যেত।
ধীরে ধীরে কল্যাণীর জ্ঞান ফিরল । তড়াক করে উঠে বিল্টুর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইল - তোর কোন ক্ষতি হয়নি তো বাবা ।
বনলতা দেবীকে বললেন - এখানে আমরা আর থিকব না মা ।
তারপর গোপালকৃষ্ণ বাবুর পায়ে পড়ে মিনতি করল - আমাদের রাণীগঞ্জে পাঠিয়ে দিন বাবা । আপনারা যা করবেন করুন; আমাদের বাঁচতে দিন ।
তখন সন্ধ্যা হয়েছে সবে । রুদ্র বাড়ি ফিরে সব জেনে বলল - কল্যাণী, রেডি হও । আমরা এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যাব। মা বাবা যদি মনে করেন - যাবেন - তবে আসতে পারেন । অন্তত কয়েকমাস তোমাদের এখানে থাকা চলবে না। মেসোমশাই আহত বাঘের মত হয়ে গেছে । কখন কি কাণ্ড বাধিয়ে বসবে - ঠিক নেই।
গোপালকৃষ্ণ বাবূ তখনও মুখ দিয়ে কিছু বলতে পারছেন না ।
বনলতা দেবী বললেন - কিগো ? চুপ হয়ে গেলে কেন ? রুদ্র দেখ তো তোর বাবাকে ! ঠিক আছেন কি না ।
রুদ্র ' বাবা ! ও বাবা ! বলে একটু ঝাঁকানি দিতেই গোপালকৃষ্ণ বাবূ ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেলেন । রুদ্র নাড়ী টিপে কোন সাড়া পেল না বলে নিজেই বাবাকে কোলে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল । গাড়ি চলল নিকটবর্তী কোন ডাক্তারের কাছে ।
চেম্বারে নিয়ে গেলে ডাক্তারবাবূ স্টেথো দিয়ে কোনরূপ কম্পন পেলেন না দেখে রেডিও- ম্যাগনেটিক ডিটেক্টরে দেখে নিলেন । ম্যাগনেট থেরাপি করে শ্বাস প্রশ্বাস ফিরিয়ে আনলেন । তারপর বললেন - এ যাত্রা বেঁচে আছেন । তবে হসপিটালে নিয়ে যান আই সি সি ইউতে ভেন্টিলেটরে রাখতে হবে । তা না হলে ওঁকে বাঁচানো যাবে না ।
ডাক্তারবাবু অ্যাপেলো হসপিটালে নিয়ে যাবার পরামর্শ দিলেন।
রুদ্র তৎক্ষণাৎ গাড়িতে তুলে অ্যাপেলোর দিকে যাত্রা করল ।
বনলতা দেবীকে সব জানিয়ে দিল রুদ্র ।
- অ্যাপেলোয় ভর্তি করে দিয়েছি মা ! বাবা এখন অনেক ভালো আছেন । তবে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছে। ডাক্তার সাহেব বলেছেন বিপদ কেটে গেছে।
বনলতা দেবী দুশ্চিন্তার হাত থেকে বাঁচলেন। কল্যাণীকে সব জানিয়ে দিতেই কল্যাণী বলল - মা! আমি ভুল করেছি । ওই কথাগুলো বলা উচিত হয়নি।
- কোন কথা বৌমা ? যা বলেছ ঠিক বলেছ। আমিও তাই ভেবে নিয়েছি ।
- মা ! পলা বিল্টুকে নিয়ে আমরাও হসপিটালে যাই!
- চল চল। দেরী কর না ।
বনলতা দেবীরা সবাই মিলে হসপিটালের দিকে যাচ্ছেন। একটা উবের ভাড়া করে । ভি আই পি রোডে উঠতেই দেখেন আরণ্যকের আরবান ব্লু অডিটা কৃষ্ণপুর মেইন রোডে পার্ক করা আছে।
আরেক দুশ্চিন্তায় পড়লেন বনলতা দেবী । তবে কি আরণ্যক কৃষ্ণপুরেই রয়েছে ! তাদের উপর নজর রাখছে!
কাউকে সে কথা বললেন না। শুধু একবার করে পিছন ফিরে দেখে নিতে থাকলেন অডিটা তাদের ফলো করছে না তো !
( ক্রমশ )
