Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sulata Das

Abstract


3  

Sulata Das

Abstract


কেরিয়ার

কেরিয়ার

6 mins 35 6 mins 35

আজ আমার ঊর্মির বিয়ে। ঊর্মি-আমার একমাত্র মেয়ে।কত হাঁকডাক-বাড়ি আত্মীয় পরিজনে গমগম করছে। গোল হয়ে চলছে গল্প- ঘন্টায় ঘন্টায় চা। চারিদিকে সাজো সাজো রব। কি খাবো,কি শাড়ি পরবো, কেমন সাজবো,কোন গহনা পরবো!! বাড়িতে নহবত বসেছে-সকাল থেকে বাজছে সানাই।আজ আমি বড় ব্যস্ত। সবকিছু যাতে ভালোভাবে সম্পন্ন হয় তাই তদারকি করে যাচ্ছি সকাল থেকে। ছোট থেকে ছোট জিনিসগুলিও দেখে নিচ্ছি-কোন ত্রুটি যাতে না থাকে। কারো কোন অসুবিধে না হয়!।সবকিছু যাতে খুব সুন্দর ভাবে হয়। কাজের লিস্ট মিলিয়ে নিলাম- কিছু বাদ পরলো না তো!! একবার বরণডালায় ও চোখ বুলিয়ে নিলাম। কত প্রার্থনার পর আজ আমার সব আকাঙ্খা পূরণ হতে চলেছে। রোমান্চিত-শিহরিত-আহ্লাদিত আমার মন।আজ আমার সব স্বপ্ন পূরণের দিন।


সব মনে হচ্ছে এই সেদিনের কথা। ছোট্ট ঊর্মি-তার কচি কচি হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরা,আধো আধো বুলি বলা,টলমল পায়ে হাঁটা,গাল ভরে খাবার জমিয়ে রাখা-ছোট বড় দুষ্টুমি করা-হাত ধরে অ আ-ক খ -A B C D শেখানো, ছোট ছোট পায়ে একদিন স্কুলে যাওয়া ।ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা -সব খুব মনে পড়ছে আজ।ঊর্মি বরাবরই খুব ভালো পড়াশুনায়। খুব ভালো রেজাল্ট করলো বোর্ড আর জয়েন্টে। বাড়ির কাছের আই আই টি তে মনের মতো বিষয়ে ইন্জিনিয়ারিং এ চান্স পেলো। বাড়িতে একদম খুশির জোয়ার।কলেজ থেকে এসেই সব কথা আমাকে বলা চাই ঊর্মির। কলেজ, নতুন নতুন সব বন্ধু- তাদের সাথে কি কি গল্প হয়, কখন কোথায় যায় সব -আমরা দুজনে খুব ভালো বন্ধু। সুজয়-আমার স্বামী- বড় ভাল মানুষ। খুব শান্ত। সে তার কাজ নিয়ে থাকে । এভাবেই দিন যাচ্ছিল।ঊর্মি ওর পড়াশুনা আর প্রোজেক্ট নিয়ে কিছুটা ব্যস্ত হয়ে পড়ে । আজকাল কথা সংক্ষেপে হয়।কলেজ ক্যাম্পস থেকেই বেশ বড় এক চাকরি পেল উর্মি। খুশিতে আমরা সবাই ডগমগ। বেশ ভালই কাটছিল-হঠাৎ ছন্দপতন- ম্যাসিভ হার্ট এট্যাক। সুজয় চলে গেল। একদম ভেঙে পড়লাম ।ঊর্মি একদম চুপ হয়ে গেল।


সবে সুজয়ের কাজ হয়েছে ।একটা ফোন এলো।ফোন রেখে ঊর্মি খুব উচ্ছ্বাসিত - বিদেশে চাকরির এক দারুণ অফার পেয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই জয়েন করতে যেতে হবে। বললাম “কি করে সম্ভব!! এই অবস্থায় নিজেকে সামলাবার ও সময় পাইনি। এখন কি না গেলেই নয়!! পরেও তো সুযোগ আসবে!” অস্থির হয়ে উঠলো ঊর্মি। যেতে তাকে হবেই-সে চলে গেল। একা আমি হয়ে গেলাম। একদম একা। দমবন্ধ হয়ে আসছে আমার। কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না । পারছি না সহ্য করতে। ঊর্মি ছাড়া জীবন কিছুতেই ভাবতে পারছি না।আমার জীবনে পুরোটাই ছিল ঊর্মিময়। নিজের ভালোলাগা, নিজের সখ আলাদা করে কিছুই ভাবিনি- ভাবার সময় ও পাইনি।ঊর্মির আনন্দে আমার আনন্দ,ওর সুখে আমার সুখ,ওর সাফল্যই আমার সাফল্য। সবই ঊর্মি। সেই ঊর্মি দূরে চলে গেল- তাও আমার এই অসময়ে। তবে সকাল- বিকেল ফোন করছে, সব খোঁজ নিচ্ছে। আর ওখানের সব গল্প আমায় করছে- কত সুন্দর জায়গা, কত পরিষ্কার , কত ভালো সব সিস্টেম, কত ভালো ব্যবস্থা, কত আরাম, কত সুখ। ওর আনন্দে আমার চোখও আনন্দে চিকচিক করে উঠলো। ওর সুখে - আনন্দে নিজের দু:খ , একাকিত্ব ভোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর ফোন আসা কম হতে থাকল। খুব নাকি ব্যস্ত -খুব কাজের চাপ।কথা সংক্ষিপ্ত হতে থাকলো। উইকেন্ড ছাড়া নাকি কথা বলা সম্ভব নয়। একদিন খুব অভিমান হলো। বললাম - যতই ব্যস্ত হও দুমিনিট তো রোজ কথা বলতে পারো-একা একা আর পারছি না সহ্য করতে। ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলো-“উ: মা!! রোজ রোজ এত কথা বলার কি আছে?? রোজ এক কথা বলে বোর হওনা তুমি??? কেমন আছিস, কি খেলি? এসব এবার ছাড়ো। সবাই কে একা বাঁচতে শিখতে হয়। সারাদিন আমার পেছনে না পড়ে থেকে কিছু একটা করো। আমায় আমার মতো থাকতে দাও।”

তীরের মতো বিঁধেছিল কথাগুলি। হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। ঊর্মি এসব বললো, বলতে পারলো আমাকে!!! কত বদলে গেছে- যে মেয়ে একদিন আমায় ছেড়ে থাকতো না, আমায় কোন কথা না বললে যার শান্তি হতো না- আমি যতই ব্যস্ত থাকি আমায় শুনিয়েই ছাড়তো, আজ সে এতো কঠিন ভাবে আমায় এতো কথা বললো!! অনেক কাঁদলাম, স্তব্ধ হয়ে গেলাম।


    একদিন পুরোনো হারমোনিয়ামটির দিকে নজর গেল। কাছে গিয়ে ঢাকনাটা সরালাম।ভুলেই গিয়েছিলাম এটার কথা- গান করা। ঊর্মির বলা কথাগুলো মনে পড়লো।নিজেকে সংযত করলাম- দৃঢসংকল্প নিলাম। শুরু হলো নতুন পথ চলা।দমিত ইচ্ছেকে নতুন করে জাগালাম। অবসর সময় কাজে লাগানো বা নিজেকে ব্যস্ত রাখতে আবার গান করা -শেখা শুরু করলাম। একসময় ভালোই গান করতাম। সবাই বলতো আমার গলা নাকি খুব সুরেলা- মিষ্টি।কিন্তু সংসারের চাপে, ঊর্মির পড়াশুনা ,সব দেখতে গিয়ে নিজেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আবার নতুন করে শুরু করলাম। ভালো,আরও ভালো- নেশা হয়ে গেল। সুন্দর সময় কাটছে, ভালো কিছু শেখার আনন্দে মন ভরে গেল।একাকিত্ব কাটাতে ডুবে গেলাম গানে। কিছু নাম হয়েছে-ডাক পাচ্ছি বিভিন্ন জলসায়। মনে খুশির জোয়ার- এতোদিনে নিজের মধ্যে এক নতুন ‘আমি’ কে খুঁজে পেলাম।পেয়েছি আনন্দ-সুখের সন্ধান। 


ফোন বেজে উঠলো। ঊর্মি নিজের মনের মানুষ খুঁজে নিয়েছে- তাকে বিয়ে করতে চায়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম আমি। এইতো চেয়েছিলাম- মনের মতো জীবনসাথী পাক ঊর্মি। একা একা থাকে দূর দেশে- একজন ভালো সাথী হবে- দুজন দুজন কে দেখে রাখবে- ভালো থাকবে। এক-মাস পরেই বিয়ে। হাতে একদম সময় নেই। তাও মনের মতো করে সব করলাম।সব আয়োজন, কেনাকাটা-শাড়ী-গয়না-ড্রেস-সব সব।ভাগ্য ভালো -আমাদের কমপ্লেক্স এর কমিউনিটি হল আর ব্যাঙ্কোয়েটটার ঐদিন কোন বুকিং ছিলোনা- তাই পেয়ে গেলাম। নাহলে এতো কম সময়ে কোন ভালো হোটেল বা হল পাওয়া খুব মুশকিল হয়ে যেত।নামী ক্যাটারার, ডেকরেটর সব হয়ে গেছে। মেনুটা ঊর্মির সাথে আলোচনা করেই করেছি।এক সপ্তাহ আর বাকি ঊর্মির বিয়ের। আজ ঊর্মি আসছে। কতদিন পর দেখব ও কে । অধীর আগ্রহে উৎসুক নয়নে অপেক্ষা করছি ঊর্মির।


একটা ফোন বেজে উঠলো। - এ কি শুনলাম আমি!! বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক নিজে আমার নাম বলেছেন এক বিখ্যাত পরিচালকের  বড় ব্যানারের চলচিত্রে মহানায়িকার লিপে গান গাওয়ার জন্য। আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।এ কি সত্যি-না স্বপ্ন!! কিন্তু এ কি শুনলাম আমি- রেকর্ডিং ঊর্মির বিয়ের দিন সন্ধ্যায়!! এ কি করে সম্ভব!! অনেক অনুরোধ- উপরোধ করলাম। সব বৃথা। সংগীত পরিচালক অন্য সময় দিতে পারবেন না। মুষড়ে পরলাম।মনের সাথে লড়াই চললো। এই রেকর্ডিংয়ে নির্ভর করবে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে সংগীত দুনিয়ায় আমার পা রাখা। প্রথমেই এতো বড় পরিচালকের সাথে কাজ- এত বড় ব্যানারের ছবি!!তাঁকে ফিরিয়ে দিলে আর হয়তো কখনো এমন সুযোগ পাব না।এতদিন যে স্বপ্ন দেখেছিলাম আজ তা নিজে আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে।এত বড় পরিচালক-এত বড় ব্যানারের ছবি- মহানায়িকার লিপে গান- আমি আর ভাবতে পারছি না। অনেক দ্বিধা-অনেক দ্বন্দ্ব- নিজের মনের সাথে লড়াই চললো। 


আজ ঊর্মির বিয়ে।সব আয়োজন সুন্দর ভাবে হয়ে গেছে।ঊর্মি টুকটুকে লাল বেনারসী পড়েছে। ওর খুব ইচ্ছে ছিলো লাল টুকটুকে শাড়ী পড়বে বিয়েতে। সব শাড়ী আমি কিনলেও ওকে ভিডিও কলে সব দেখিয়ে-পছন্দ করিয়েই কিনেছি।সেই বেনারসি পড়েছে উর্মি।পার্লারের লোক এসে সাজিয়েছে ওকে।কি অপূর্ব লাগছে উর্মিকে-চোখ ফেরানো দায়।সবাই হৈ হৈ করছে -সবার সাজগোজ চলছে।আমিও সুন্দর কিন্তু হাল্কা ফুরফুরে হয়ে সাজলাম। নিজেকে নিজে আয়নায় দেখে চমকে উঠলাম-ভারী মিষ্টি লাগছি আমি-প্রত্যয়ী-আত্মবিশ্বাসী।

এবার আমায় বের হতে হবে-গাড়ী এসে গেছে। উর্মি বিষ্ফোরিত চোখে দেখছে আমায়- এই মা কে যে সে চেনে না। সবার নজর আমার দিকে- গুন্জন-ফিসফিস। আমার কোন খেয়াল নেই।মাথা উঁচু করে, চোখ না নামিয়ে সবার সামনে দিয়ে বের হচ্ছি আমি- নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে। 

বারবার কানে বাজছে ঊর্মির বিদেশ যাবার আগের কথাগুলো। -“সুযোগ বারবার আসে না।সবাইকে বাস্তববাদী হতে হয়।সবার নিজের ইচ্ছে মতো বাঁচার অধিকার আছে। কেউ কারো জন্য থেমে থাকেনা। আমাকে আমারটা বুঝতে দাও। আমি বড় হয়েছি, নিজের ভালোমন্দ বুঝি।তুমি বুঝবে না এসব। নিজের স্বপ্নকে পুরো করতে আমি সব করতে পারি।নিজের জগৎ নিজেকে তৈরী করতে হয়।সবাইকে একা বাঁচতে শিখতে হয়- কাউকে অবলম্বন করে নয়।”


আজ আমি সেই পথে চললাম।

ঊর্মি সামনে এলো- চোখে একরাশ জিজ্ঞাসা-“আমার ভবিষ্যত গড়ার জন্য আমায় দূরে যেতে হয়েছে।কেরিয়ারের জন্য আমাকে নিজেকে বদলাতে হয়েছে। কিন্তু মা তুমি কেন এত বদলে গেলে!! আমার এই পরম দিনে আমার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তোমার জীবনে কি করে হলো? আমায় ছাড়া তোমার অন্য জগৎ কি করে বানাতে পারলে তুমি!! তুমি তো আমার সেই মা- যে ,আমি দেরী করে ফিরলে না খেয়ে বসে থাকতে। পরীক্ষার সময় আমার সাথে পুরো রাত জাগতে ।আজ কি করে পারলে আমায় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে??”


অনেক কিছু বলার ছিল,পারলাম না। বলার ছিল ‘তুই বদলে দিয়েছিস আমায়।’এতদিনের জমা একাকিত্বের যন্ত্রণাগুলো দলা পাঁকিয়ে গলা বন্ধ হয়ে এল।কিছুই বলতে পারলাম না।

আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পা বাড়ালাম।


Rate this content
Log in

More bengali story from Sulata Das

Similar bengali story from Abstract