SUKANYA SAHA

Classics


2  

SUKANYA SAHA

Classics


ইন্টারভিউ

ইন্টারভিউ

7 mins 617 7 mins 617

"মাইন্ড ইট সুদেষ্ণা , দিস  ইজ  ইওর লাস্ট চান্স । ইফ ইউ ফেইলড দিস টাইম অলসো ; আই উইল বি কম্পেলড টু কিক ইউ অফ !" অ্যান্ড ইউ বেটার নো দ্যান  মি দ্যাট ইউ উইল নট গেট এনি চান্স  এনি হোয়ার ইন দিস  ইন্ডাস্ট্রি ..." যা রেপুটেশান বানিয়েছ !" শেষ কথাগুলো বাংলায় বলেন মিঃ গিলানি , চীফ এডিটার অফ ওয়ান অফ দি লিডিং নিউস পেপার হাউস ...


                  কথাগুলো খুব একটা গায়ে না মাখলেও সুদেষ্ণা জানে  এবারের প্রোজেক্টটা তাকে ভালোভাবে নামাতেই হবে । মিঃ গিলানি যদিও তাকে স্নেহ করেন নিজের মেয়ের মতোই; কিন্তু তিনি বা কতদিন  আর তাকে ব্যাক করবেন ? তারও তো একটা লিমিট আছে !তাকেও তো চাকরিটা বাঁচাতে হবে ! জবাবদিহি করতে হবে উপরওয়ালার কাছে !

                                              নিউস পেপার অফিসে সুদেষ্ণার এই  চাকরিটা খুব একটা পুরোনো নয় । পোস্ট: ফিল্ড রিপোর্টারের । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাসকম নিয়ে  পাশ করা সুদেষ্ণা আগাগোড়া ভালো ছাত্রী ছিল । চাইলেই যেতে পারত অ্যাকাডেমিক লাইনে ; তবুও বাড়ির লোকের অমতে প্রায় জোর  করেই কাগজের অফিসে  চাকরি নেয় । এই লাইফটা খুব অ্যাডভেঞ্চারাস  মনে  হয়েছিল তার কাছে । খুব চ্যালেঞ্জিং । ভেবেছিল নিজেকে প্রমাণ করার অনেক সুযোগ পাবে ... কিন্তু আজ তিন বছরের মাথায় এসে বুঝতে  পারছে অন্যান্য প্রফেশনের থেকে এতটুকু পার্থক্য নেই এখানেও !সেই একঘেঁয়েমি...থোড় বড়ি খাড়া ,খাড়া বড়ি থোড় !কলিগদের ল্যাং মারামারি , হিংসা , লেগপুলিং! কি নেই ... তারপর সুদেষ্ণার কপালটাও খারাপ ! আজ অবধি তেমন একটাও ব্রেকিং নিউজ জুটল না যাতে সে  একেবারে পৌঁছে যেতে পারে লাইম লাইটের আলোয় !


               সিটি সেণ্টারের সিঁড়িতে বসে তন্ময়কে  একথাটাই বোঝাচ্ছিল সুদেষ্ণা। তন্ময়ের দেওয়া সিগারেটের কাউন্টারে জোরে টান দিতে  দিতে উত্তেজনায় মুখ চোখ লাল হয়ে উঠছিল তার ... বুঝলি মিঃ গিলানিকে বলে এবার বিখ্যাত লোকেদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কাজটা হাতিয়েছি । প্রতি শনিবারের সাপ্লিমেন্টারি পেজে যে ইন্টারভিউটা ছাপা হয় , এবার থেকে আমিই ওটার দায়িত্বে ...”আই হ্যাভ টু ডু সামথিং আউটস্টান্ডিং ...” অফিসিয়ালি তন্ময় সুদেষ্ণার কলিগ । ফোটোগ্রাফার ও । আগে ফ্রিলান্স  করত  এখন কাগজের কোম্পানি জয়েন করেছে ... এমনিতে সুদেষ্ণাকে  সব কাজে অ্যাসিস্ট করে সে ... আনঅফিসিয়ালি অবশ্য তাদের মধ্যে অন্য একটা সম্পর্ক আছে ... তারা ভালোবাসে  দুজন দুজনকে ... কিন্তু চাকরির এই টালমাটাল পরিস্থিতির জন্য সংসার পাতার সিদ্ধান্ত  নিতে পারছে না ...

"তা আমায় কি করতে হবে ম্যাডাম ? " তন্ময় হাসল সুন্দর করে ... হাসলে ওকে বড্ড সুন্দর দেখায় ...

"যা করিস অ্যাজ ইউজুয়াল ... মানে ফোটোশুট অফ দ্যাট সেলিব্রিটি ..."


                       আজ ইন্টারন্যাশনাল সুইসাইডাল অ্যাটেম্পট প্রিভেনশান ডে । অনেক প্ল্যানিং করে সুদেষ্ণা এই সময়ের একজন বিখ্যাত কমিক অভিনেতার ইন্টারভিউ নেবে বলে ঠিক করেছে ... একাধিক টিভি রিয়েলিটি শো , রেডিও জকির কাজ , প্লাস সিনেমায় অভিনয় সব মিলিয়ে  তিনি দারুণ ব্যস্ত ... সব জায়গাতেই তিনি মানুষকে হাসিয়ে বেড়ান । সুদেষ্ণার কেন জানি না মনে  হয়েছে এই হাসি, মানুষটার মুখোশ; এর পিছনে লুকিয়ে আছে অনেক চোখের জল ... অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে তবে ইন্টারভিউয়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট জোগাড় করেছে সুদেষ্ণা ... তাও তার নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্টে , কোনো ফোটোগ্রাফার নিয়ে যাওয়া যাবে না এই কন্ডিশনে ...

                              এখন প্রায় রাত এগারোটা ... এই সময়ে কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরেন অভিনেতা । কাজ শেষ করে ফ্রেশ হয়ে  তবে  ইন্টারভিউ দেবেন বলেছেন । সেই মতো ডিনার করেই বেরিয়েছে সুদেষ্ণা । এই ইন্টারভিউটা নিতে সে মরীয়া । বাড়িতে বলেই বেরিয়েছে যে ফিরতে রাত  হবে । তন্ময় আসতে চেয়েছিল সুদেষ্ণাই বারণ করেছে ...

“না রে  তাতে  ইন্টারভিউটা কেঁচে যেতে পারে ...

"দেন টেক কেয়ার অফ ইওরসেলফ বেবি ... তেমন দরকার হলে ফোন করিস ... টু ডে আই অ্যাম অনলাইন ফর হোল নাইট ফর ইওর সেক ..."

“আরে না না ফোন তো খোলা রইলই... তেমন কিছু প্রয়োজন হবে না আশা করি ... টেনশান করিস না ... ওকে বাই ...”

রাস্তায় এসে মনে মনে ভাবে সুদেষ্ণা ... তন্ময়টা বড্ড কেয়ারিং ! তবে তাকে ভালোওবাসে ... ফ্রম দ্য কোর অফ দ্য হার্ট ...


              লেক টেরাসে অভিনেতা মীরমোহনের রিয়েল এস্টেট কমপ্লেক্সের সামনে যখন সুদেষ্ণা এসে দাঁড়ায় তখন ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারো ছুঁই ছুঁই ... সিকিউরিটি রুম থেকে  জানতে পারে ফ্ল্যাট ডি সেভেনের ওনার মীরমোহন  এখনও ফেরেন নি... এই ফ্ল্যাটে তিনি একাই থাকেন ... মনে মনে খানিকটা থমকায় সুদেষ্ণা ... কত রাত অব্দি অপেক্ষা করতে হবে কে জানে ? এত রাত্তিরে একা একজন পুরুষ অভিনেতার ইন্টারভিউ নেওয়া ...


          সুদেষ্ণার কপাল ভালোই বলতে হবে ।মিনিট দশেকের  মধ্যে মীরমোহনের  সাদা স্কোডা গাড়িটা কমপ্লেক্সের ভিতর ঢুকে পড়ে । গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামেন মীরমোহন ; এত রাতেও ফুল এনার্জিটিক । টিভিতে আগে বহুবার  দেখলেও সামনাসামনি এই প্রথম ।বয়েস পঞ্চান্নর কাছাকাছি । হালকা পাক ধরেছে চুলে । তবে নিয়মিত জিম করা ফিগার ...সুদেষ্ণাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন , 'আপনিই সুদেষ্ণা মিত্র তো ?" স্যরি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল... আসলে প্যাক আপ করতে এত রাত হয়ে গেল ...”

        “ইটস ওকে স্যর ... নো ইস্যু ... আর বাই দ্য ওয়ে  আপনি আমাকে সুদেষ্ণা বলেই ডাকতে পারেন ... আমি অনেক ছোটো আপনার  থেকে ...”

লিফটে উঠতে উঠতে খানিকটা সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করে সুদেষ্ণা ... সুন্দর করে হাসলেন মীরমোহন ... ঝকঝকে হাসি ... অবাক হয়ে লক্ষ্য করে  সুদেষ্ণা এই বয়েসেও হাসলে মীরমোহনের গালে টোল পড়ে...বেল বাজাতেই একজন মধ্য বয়স্ক লোক দরজা খুলে দেন ... ঘরে ঢুকে মীরমোহন সোফা দেখিয়ে সুদেষ্ণাকে  বলেন তোমায় যে আর একটু অপেক্ষা করতে  হবে ইয়াং লেডি ... আমি ফ্রেশ হয়ে  আসি, তারপর ইন্টারভিউ ...হেসে ফেলে সুদেষ্ণা ... মনে মনে  ভাবে দেরী তো যা হওয়ার হয়েছেই এখন ভালোয় ভালোয় ইন্টারভিউটা মিটলে হয় ...


      প্রায় আধ ঘণ্টা পর বসার  ঘরে ফেরেন মীর । পরনে হালকা পাজামা পাঞ্জাবী ... হাতে ড্রিংকের গ্লাস ...

“উইল ইউ জয়েন উইদ মি ?” সুদেষ্ণাকে জিজ্ঞেস করেন মীর ...

“নো থ্যাংক্স । আমি কাজের সময় খাই না ...”

হা হা করে প্রাণ খোলা হাসি হাসেন মীর ... “আসলে  এই ফ্ল্যাটে আমি একাই থাকি ... এনজয়িং আমি লাইফ অ্যালোন  ইন মাই ওন স্টাইল ...”

“ প্লিজ সুইচ অফ অল রেকর্ডার ... দিস ইন্টারভিউ ইজ পারসোনাল অ্যান্ড এক্সক্লুসিভ ।“

ব্যাগের মধ্যে আগেই রেকর্ডার অন করে রেখেছিল সুদেষ্ণা ...

মীরের নির্দেশের উত্তরে শুধু সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়াল সে ।

" বল ইয়াং লেডি কি জানতে চাও তুমি আমার  কাছে ?"

“আজ কি দিন জানেন তো স্যর ? ইন্টারন্যাশনাল সুইসাইডাল অ্যাটেম্পট প্রিভেনশান ডে ... কিশোরী বেলা  থেকে আপনার অভিনয় দেখে  বড় হয়েছি ... টিভিতে , মঞ্চে ... কি তুমুল হাস্যরোল তৈরী করেন আপনি অভিনয়ের সময় ... কিন্তু আমার যেন কোথায় মনে হত এই জনপ্রিয় কমিক চরিত্রাভিনেতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে অনেক কান্না ...সেই মানুষ মীর মোহনের , জীবন চরিতই জানতে  এসেছি আমি ...

“হা হা... গুডঃ কোয়েশ্চেন ... লাইক চার্লি চ্যাপলিন ... কমিক স্টাররা কাঁদে বৃষ্টির মধ্যে আর বাথরুমে শাওয়ারের তলায় ...”আমিও বহুদিন মনে প্রাণে বিশ্বাস করতাম এটা ...ভাবতাম মানুষকে আনন্দ দেওয়া বোধহয় পৃথিবীর সেরা কাজ ... মানুষের সারাটা জীবনই তো দুঃখে ভরা ... আমি সেই ক্লিন্ন মুখে  যদি একটু হাসি ফোটাতে পারি ... সেই চেষ্টাই করে যেতাম দিন রাত ...বুঝতে পারি নি যে একদিন আমার কাছের লোকেরাও আমার বউ ছেলে ,এরাও আমায় জোকার ভাবতে শুরু করবে ... ভাববে আমি শুধু চব্বিশ ঘণ্টা হাসি আর হাসাই ... আমার পড়ে গেলে লাগে না , ব্যথা হয় না, রক্ত পড়ে না , চোখে জল আসে না ...আরেকটা ড্রিংক নেন মীর মোহন ...

“কিন্তু স্যর ,এত বড় ফ্ল্যাট এই বিলাস বহুল জীবন...

“না সুদেষ্ণা , এসবের লোভ আমার ছিল না ... আমি অতি সাধারণ ঘরের ছেলে । মাটিতে বসে ভাত খাই ... সাফল্য আমার মাথা ঘুরিয়ে  দিতে পারে নি । কিন্তু বউ আর  সংসারের চাপে আমি ক্রমশঃ টাকা রোজগার করার যন্ত্রে পরিণত হয়েছিলাম ...সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে তখন তর তর করে উঠছি । খেয়ালই করিনি কখন সংসারে ভাঙ্গন ধরেছে ... ক্লাস নাইনে পড়া ছেলে মদ জুয়া আর ড্রাগের নেশায় তলিয়ে গেছে অন্ধকারে ... মাত্র পনেরো বছর বয়েসে একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে সে ... বাবা হয়ে নিজের একমাত্র ছেলের মুখাগ্নি করেছি আমি ... এর থেকে বাবা হিসেবে বড় ব্যর্থতা আর কি হতে পারে ?”

গলা ধরে আসে মীর মোহনের ... সুদেষ্ণাও আর কথা খুঁজে পায় না ...

“রাহুলকে পুড়িয়ে আসার পর আমি তিনদিন কিছু খাই নি জানো ? চারদিনের মাথায় সিলিং ফ্যান থেকে গলায় দড়ি দেওয়ার চেষ্টা করি ... দ্যাট ওয়াজ মাই ফার্স্ট সুইসাইড অ্যাটেম্পট ... এই হরিকাকা যাকে  দেখলে একটু আগে  তিনি না থাকলে  বোধহয় এই মীর মোহনকে আজ এখানে  দেখতে পেতে না ...”

“আপনি ? সুইসাইড অ্যাটেম্পট ? যে লোকটা সারাদিন সবাইকে এত পজিটিভ ভাইবস দিয়ে  থাকেন ... তিনি ব্যক্তিগত জীবনে  এত ডিপ্রেসড ?”

“শুধু একবারই নয় ... এরপর  যখন শিখা চলে যায় আমায় ছেড়ে , বেছে নেয় নতুন জীবন , মেনে নিতে পারি নি জানো ? শিখা শেষ পর্যন্ত  সব কিছুর জন্য  আমাকেই দায়ী করেছিল ! শিশুর মতো কেঁদেছিলাম ওর পা ধরে ... বাট এলাস ! যে যায় সে কি আর ফিরে আসে ? “

“আসলে কোনো সম্পর্কই বোধহয় চিরস্থায়ী নয় ... সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের দাবি মেনে সব সম্পর্কই রিমডেলিং হয় ... কিন্তু জীবন তো একটাই ... জিন্দেগী না মিলেগি দোবারা”

“কিন্তু আপনি তো কোথাও কোনো ইন্টারভীউতে  এর আগে ...”

“না বলিনি , কারণ ভয় পেতাম... ইনসিকিউরিটিতে ভুগতাম ... ভাবতাম মানুষ যদি ভুল বোঝে আমায় ...কিন্তু জানো এখন আর কোনো ভয় নেই ... আজ সকালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে একটা প্রোগ্রাম ছিল ... বিষয়ঃ ইন্টারন্যাশনাল সুইসাইডাল অ্যাটেম্পট প্রিভেনশান ডে ... অনেক যুদ্ধ করলাম নিজের সঙ্গে ... তারপর ভাবলাম বলেই দিই নিজের জীবনের কথা ... কি অভূতপুর্ব সাড়া পেলাম শ্রোতাদের থেকে  তোমায় কি বলব সুদেষ্ণা ! সব্বাই বলল মীর তুমি ভয় পেয় না ... আমরা তোমার পাশে আছি ... ভাবলাম এতো লোক এখনও আমায় ভালোবাসে ! আমার  সকালটা ভরে  উঠল ।“

“তারপরেই তুমি ফোন করলে ... ইন্টারভিউয়ের বিষয় বললে তখনই ঠিক করে ফেললাম যত রাতই হোক আজ তোমায় ইন্টারভিউটা দেব ।“

“তুমি কাল কাগজে যা খুশি লিখতে পার ... আমার আর কোনো ভয় নেই ...” এক নিঃশ্বাসে  কথাগুলো বলে থামলেন মীরমোহন ...

গ্লাস হাতে স্লাইডিং উইন্ডোর পাশে এসে দাঁড়ালেন ...পুব আকাশ তখন সবে ফর্সা হতে শুরু করেছে ।

মোবাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে সুদেষ্ণা বলল , "এবার আমি আসি স্যর ?"

হ্যাঁ এসো ... আবার এসো একদিন সাংবাদিক হিসেবে নয় , মীরের সঙ্গে আড্ডা মারতে ...

"নিশ্চয়ই ..."

দরজাটা হালকা করে বাইরে থেকে ভেজিয়ে সিঁড়িতে পা রাখে সুদেষ্ণা । বাইরে বেরিয়ে রেকর্ডিংটা দ্রুত হাতে ডিলিট করে দেয় সে ... আর যাই হোক কারো পার্সোনাল জীবন নিয়ে সে পেজ থ্রি র খবর করতে পারবে না ...


Rate this content
Log in

More bengali story from SUKANYA SAHA

Similar bengali story from Classics