SUKANYA SAHA

Inspirational


2  

SUKANYA SAHA

Inspirational


জগিং...

জগিং...

4 mins 476 4 mins 476

জগিং...

সুকন্যা সাহা

এক

পার্কের দরজাটা আলতো করে ঠেলল সায়ন, একটা ক্যাচ করে শব্দ হল আর তখনই চোখ চলে গেল বোগেনভেলিয়া গাছটার তলায়...বেগুনি রঙয়ের ফুলে ফুলে গাছটা ছেয়ে আছে, মাটিতেও ছড়িয়ে আছে অজস্র ফুল... আর গাছের নীচে সেই হলুদ ট্রাকসুট, চুলটা হর্সটেল করে বাঁধা.... শিরিন!! সায়নের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে শিরিন একমনে ফ্রী হ্যান্ড এক্সাসাইজ করছিল তাই পার্কের দরজা খুলে কখন যে সায়ন ভিতরে ঢুকেছে মোটেই টের পায়নি সে।শিরিন কি তবে জানতে এল সেদিনেরনা বলা কথাটা?বলে দেবে আজ সায়ন? যে কথাটা সে নিজেও এতদিন ভিতরে ভিতরে ভেবে চলছে?অনেক দিন পর আবার পার্কে সেই মিষ্টি সুবাসটা পেল সায়ন....কোথাও কি ছাতিম ফুল ফুটেছে ?


দুই

লম্বা করে শ্বাস টেনে নিয়ে দৌড় শুরু করে সায়ন। সে অ্যাথলিট। তবে সকালের এই জগিং এক্সাসাইজ করার সময়টা একেবারে তার নিজস্ব এরপরেই সে চলে যাবে ইস্টবেঙ্গলের মাঠে, সেখানে কোচ অমিতদার তত্তাবধানে শুরু হবে তাদের ট্রেনিং।তারা মোট আঠারো জন এবার ন্যাশনাল মিটে বেঙ্গলকে রিপ্রেজেন্ট করছে। লম্বা লম্বা পায়ে মাঠটাকে একবার দৌড়ে প্রদক্ষিণ করে আসার সময়ই শিরিনের মুখোমুখি হল  সায়ন ।দূর থেকেই দেখতে পেয়েছিল শিরিন এক্সাসাইজ থামিয়ে কোমরে হাত দিয়ে একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে আছে ।শিরিনের সামনে এসে সায়নের পা যেন মাটিতে আটকে যায়।শিরিন নরম গলায় জিজ্ঞেস করে তুমি কি যেন বলবে বলছিলে আমায় ? বলবে এখন ? সায়নের গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে কান্না, শরীরের সব রক্তকণিকারা একসঙ্গে বলে উঠতে চায় আমি ... আমি তোমায় ভালবাসি শিরিন! তুমি কি বোঝ না ? না বুঝতে চাও না?কিন্তু সে মুখে একটাও শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না! যেন তাকে বোবায় ধরেছে !অদ্ভুত ফাঁকা দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে শিরিনের দিকে ! শিরিন আবারও নরম গলায় বলে , আমি তোমার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাইছি সায়ন । কিন্তু সায়নের মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বেরোয় না ।হতভম্ব শিরিনকে পাশ কাটিয়ে বিপরীত দিকে দৌড়ে যাওয়ার সময় সায়ন টের পায় শিরিন কাঁদছে ... নিঃশব্দে..                                                       

তিন

পার্ক থেকে ফেরার সময় পরী কাকুর মুদি দোকানের সামনে দাঁড়ায় সায়ন । মা বলে দিয়েছে ফেরার পথে এক কেজি আটা আর পাঁচশো চিনি নিয়ে আসতে ।পরী কাকুর দোকানে  তাদের বাকি খাতা আছে । মাস কাবারি । শিরিনদের পাশের পাড়াতেই থাকে তারা ।ভাড়া । একতলায় দুটো ঘর। বারান্দা আর কলঘর।সায়নের বাবা একটা প্রাইভেট কোম্পানির বড়বাবু।তাদের সংসারে হয়তো প্রাচুর্য নেই কিন্ত স্বাচ্ছল্য  আছে ।আর সারা বাড়ীতে ছড়িয়ে আছে মায়ের হাতের যত্নের ছোঁয়ার অনাবিল স্নিগ্ধতা ।সায়ন জানে তাকে অনেক অনেক বড় হতে হবে... হাসি ফোটাতে হবে মায়ের মুখে ।সে অ্যাথলিট। জীবন যুদ্ধ সে ভয় পায় না। মাঝে মাঝে সে ফিনিশিং লাইনটা দেখতে পায়। আর দেখতে পায় ট্র্যাকের ওপর দিয়ে সে এঁকে বেঁকে দৌড়াচ্ছে । পেছনের গ্যালারি ফেটে পড়ছে চীতকারে । শুধু সে জানে না বাস্তবে সেই দিনটা কবে আসবে ...


চার

ইস্টবেঙ্গলের মাঠে প্রাক্টিসে পৌঁছতে আজ বেশ দেরী হয়ে গেল সায়নের ।এমনিতে সে সবার আগেই আসে। আজ রাস্তায় বেশ জ্যাম ছিল।অমিতদা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন সবার প্রাক্টিস ।প্রথমে হালকা জগিং , তারপর ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট।এই দুটি বিভাগেই কম্পিট করবে সায়ন । তার মধ্যে ২০০ মিটার তার সবচেয়ে প্রিয় ইভেন্ট । কিন্ত আজ বার বার তার মনসংযোগ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে । ২০০ মিটারে তার সময়ও আজ ঠিকঠাক হল না ।অমিতদা বললেন মনোসংযোগ বাড়া সায়ন ; মিট কিন্ত এগিয়ে আসছে ।কোথা থেকে যেন ছাতিম ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে ।সায়ন জানে এই গন্ধটা আজ সারাদিন তার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে।


পাঁচ

এবারের ন্যাশনাল গেমস চেন্নাইতে । আজ রাতে সায়নদের ট্রেন । কাল তারা পৌঁছে যাবে চেন্নাই। পরশু থেকে গেমস শুরু । বাবা মাকে ছেড়ে  এই প্রথম তার দূরে যাওয়া নয় । এখন তার বয়স কুড়ি। এর আগেও সে বহুবার বিভিন্ন মিটে অংশ  নিতে  বাইরে গেছে । এর মধ্যে শিরিন আর একদিনও পার্কে আসে নি ।সায়নও জেদ ধরে যায়নি ওদের পাড়ায়। কেন সব সময় আগে তাকেই বলতে হবে ? শিরিন কি কিছুই বোঝে না ? আর সায়নের চেন্নাই যাওয়ার কথাও তো শিরিন জানে ... তাহলে ? সে  এতদূর চলে যাবে তার  আগে একবার  দেখা করতে  আসতে পারল না ?শুভেচ্ছা জানাতেও তো আসে লোকে ... তবে ? সে কি এতটাই পর ? তাও বুকের মধ্যে একটা ছাতিম ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়ায় সব সময় ..

           দুপুরে একটা লম্বা টানা ঘুম দেয় সায়ন । ট্রেনে রাতে ঘুম হবে না । মা নিজের হাতে দলের সবার জন্য রাতের খাবার বানিয়ে দিচ্ছেন।লুচি, আলুরদম।সন্ধ্যে সাতটায় তাদের হাওড়া স্টেশানে মিট করার কথা। সাড়ে আটটায় ট্রেন । বাবা যিনি কোনদিনই সায়নের খেলাধূলার সাপোর্টার ছিলেন না  কিন্ত আজ তার গর্বে বুক ফুলে উঠেছে ।নিজে গিয়ে তিনি সায়নের জন্য স্পোর্টস শু কিনে দিয়েছেন।রিবকের দোকান থেকে ।কাল তো খেতে বসে বলেই ফেললেন ,"আই অ্যাম প্রাউড অফ মাই সান ।"


ছয়

ট্রেন ছাড়তে আর কয়েক মিনিট বাকি।লাগেজ সব আগেই উঠে গেছে ।তার দলের ছেলেরা ট্রেনে উঠেই নিজেদের মধ্যে খোশ গল্পে মেতে উঠেছে ।তাদের মোট আঠারো জনের দলে বেশির ভাগই বাঙ্গালী। শুধু দুজন আছে বিহারী ।সায়ন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে জলের বোতল কিনছিল ...কিন্ত তার চোখ খুঁজছিল অন্য কাউকে ।একবারও দেখা করল না শিরিন ! এত্ত রাগ!তাহলে এতদিন  কি সেই বুঝতে ভুল করল !শিরিনের চোখের ছায়ায় সে যে স্পষ্ট দেখেছিল ভালবাসার রং!তবে সে কি নিছকই চোখের ভুল ছিল !

         ট্রেনের হুইসেল দিয়ে দিয়েছে ... বন্ধুরা ডাকছে সায়ন সায়ন হারি আপ !কাম অন !ট্রেন ছেড়ে দেবে ।স্টলওয়ালার হাতে কোনরকমে জলের দামটা গুঁজে দিয়ে একলাফে ট্রেনের হাতলটা ধরে ফেলে সায়ন ।ট্রেন ততক্ষনে প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে শুরু করেছে ।হঠাৎ দেখে একটা মেয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে দৌড়ে আসছে ট্রেনের দিকে । শিরিন না? হ্যাঁ শিরিনই তো ! সেই হর্সটেল! সেই একহারা লম্বা চেহারা !শুধু আজ হলুদ রংয়ের চুড়িদার পড়েছে ।হাওয়ায় উড়ছে হলুদ ওড়না !সায়ন প্রবল বেগে হাত নাড়তে থাকে । শিরিনও হাত নাড়ছে । সায়নের চোখের সামনে আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো মানুষজন , চারপাশের গাছপালা , সে শুধু দেখতে পাচ্ছে হলুদ রংয়ের একটা ফিনিশিং লাইন, ট্র্যাকের ওপর দিয়ে সে এঁকেবেঁকে দৌড়চ্ছে আর পেছনের গ্যালারি ফেটে পড়ছে চিৎকারে ...


Rate this content
Log in

More bengali story from SUKANYA SAHA

Similar bengali story from Inspirational