Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Chiranjit Saha

Tragedy Classics


4.3  

Chiranjit Saha

Tragedy Classics


গোলাপ

গোলাপ

5 mins 937 5 mins 937

  এক স্টেপ এগিয়ে এসে বা পায়ের ওপর ভর দিয়ে দর্শনীয় কভার ড্রাইভ । বল সোজা আছড়ে পড়ল গ্যালারিতে । কপিবুক ক্রিকেটের নিখুঁত নিদর্শন রেখে আবারও একবার নেতাজী সংঘকে ক্রিকেট কাপের ফাইনাল জেতাল খেপ খেলোয়াড় প্রীতম মুখার্জি । ৩৬ বলে ৭৭ রানের ঝকঝকে ইনিংসের সৌজন্যে ম্যান অফ দি ম্যাচের পুরস্কারও আজ তারই হাতে । তবে ম্যাচ জয়ের তৃপ্তিকেও ছাপিয়ে হাজির তীব্র দহন দিনের শেষে কালবৈশাখীর পশলার স্বস্তি । মুষলধারে বৃষ্টিকে মাথায় নিয়েই প্রীতম বেরিয়ে পড়ল স্টেডিয়াম থেকে । প্রায় তিরিশ কিলোমিটার পথ সাইকেলে প্যাডেল করে , কাকভেজা ছেলেটা যখন বাড়ি পৌঁছলো , ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁয়েছে । ট্রফিটাকে বুকে আঁকড়ে বাড়ির দরজায় পা রাখতেই এক সাইক্লোন এসে তছনছ করে দিয়ে গেল ওর ম্যপ্রীতমদের বাড়িতে রোজগেরে সদস্য বলতে একমাত্র ওর বাবা প্রদীপবাবু , শেওড়াফুলির এক টায়ার কারখানার তিরিশ বছরের বিশ্বস্ত কর্মী তিনি । রোদ-ঝড় -বৃষ্টি -বাদল মাথায় নিয়েও রোজ সাতটি স্টেশন পেরিয়ে কারখানায় হাজির হন সাতটা পঁচিশের ডাউন কাটোয়া-হাওড়া লোকালের এই ডেইলি প্যাসেঞ্জার । কর্মক্ষেত্রে তার উপস্থিতি সূর্যোদয়ের মতোই চিরসত্য । কিন্তু সময়ের চাকার ঘূর্ণনের সাথেসাথেই বদলায় পরিস্থিতিও । টায়ার কোম্পানির মালিকানার বদল হয়েছে সদ্যই । বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে মহেশবাবুর অবসরের পর তার ছেলে সুরাজ এখন মালিকের মসনদে । কম্পিউটার না জানা , ডিপ্লোমা ডিগ্রি না থাকা পুরোনো সব কর্মীদের ছেঁটে ফেলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেকার ছেলেদের সুযোগ দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে । সেই মতো আজই পঞ্চাশোর্ধ্ব সমস্ত কর্মীকে এক মাসের মাইনে অতিরিক্ত দিয়ে সসম্মানে বিদায় জানালেন কারখানার নতুন মালিক । অর্থাৎ প্রীতমের বাবা প্রদীপবাবু আজ থেকে কর্মহীন । তিন জনের সংসারের একমাত্র উপার্জনের পথটিও রুদ্ধ হল সূর্যাস্তের গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে প্রায় দু'বছর ধরে একরকম বসেই আছে প্রীতম । তবে পুরোপুরি বসে আছে বলাটাও ভুল হবে মস্ত । চাকরির দরখাস্ত নিয়ে প্রায়শই সে ছুটে যায় এখানে ওখানে , আবার ফিরেও আসে ব্যর্থ মনোরথে । বেশ কিছু ছাত্র পড়ায় বটে ছেলেটা , কিন্তু তাতে হাজারখানেকও জোটে না মাসে । আসলে আধুনিক যুগের অতীব সচেতন অভিভাবকগণ মূলত স্কুল শিক্ষকের কাছেই নিজেদের ছেলেমেয়েদের টিউশন পড়াতে চান , মাসে চারটে দিনের জন্য হাজার টাকা খরচেও তারা রাজি সেখানে । কিন্তু প্রাইভেট টিউটরের আসনে কোনো বেকার ছেলেকে বসাতে গেলেই তাদের ট্যাকে পড়ে টান , মাথায় জড়ো হয় সারা মাসের সাংসারিক হিসেবের হেয়ালি আর সব শেষে শুরু হয় মাছবাজারের দরাদরি । তাই প্রীতমের মতো শিক্ষিত বেকাররা নিজেদের সমস্ত জ্ঞানভান্ডারকে যত্ন নিয়ে ছাত্রদের কাছে উজাড় করে দিলেও মাসের শেষে সঙ্গী হয় খুচরো পয়সএই চাকরির খোঁজ , বেঁচে থাকার লড়াই আর টিউশনের মাঝে প্রীতমের মনকে আজও অক্সিজেন দেয় এক শেষ না হওয়া স্বপ্ন ; হ্যাঁ , ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্নের মতোই ক্রিকেটার হতে চায় প্রীতম ---- বিরাট কোহলি , রোহিত শর্মাদের সাথে ভাগ করে নিতে চায় ভারতীয় ড্রেসিংরুম । ব্যাট হাতে মাঠে নেমে নিজের জীবনের সব হতাশা , আক্ষেপ , অভিমান তাই উগড়ে দেয় বোলারের ওপর । কব্জির মোচড়ে একের পর এক বল পায় বাউন্ডারির ঠিকানা । প্রতিভার জোরে এক আধটা খেপ খেলার ডাক মাসে জুটে যায় বটে , কিন্তু তাতে একটা একশো টাকার নোটের বেশি আজ অবধি মেলেনি কোনোদিন । ভাঙা ব্যাট , ছেঁড়া প্যাড নিয়ে তবুও সে ছুটে যায় খেপের মাঠেলড়াকু প্রীতমের জীবনের কানাগলিতে এক টুকরো নিয়ন বাতি , হতাশার বিদিশায় একমাত্র আশার আলো তার গার্লফ্রেন্ড অমৃতা । জীবনযুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রীতমের প্রেরণা অমৃতার আশ্বস্ত হাত । পাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক পরিতোষবাবুর একমাত্র মেয়ে অমৃতা ক্লাস ফাইভ থেকেই প্রীতমের সহপাঠী । ছেলেবেলার বন্ধুত্ব কখন যে পরিণত হয়েছে প্রেমে , নিজেরাই বুঝে উঠতে পারেনি । প্রীতম একটা চাকরি পেলেই বি.এড. পাঠরতা অমৃতা বাড়িতে জানাবে নিজেদের সম্পর্কের কথা --- এমনটাই প্ল্যান ওআজ সাতদিন হয়ে গেল, মনমরা প্রদীপবাবু কর্মহীন হয়ে বসে আছেন ঘরে । পঞ্চান্ন বছর বয়সে দাঁড়িয়ে নতুন করে কাজ খুঁজে পাওয়াও একরকম অসম্ভব তার পক্ষে । পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে অগত্যা সংসারের হাল কাঁধে তুলে নিল প্রীতম নিজেই । ভালো চাকরির স্বপ্ন বা ক্রিকেটের মোহকে সিন্ধুকে তুলে নেমে পড়ল জীবনের রণাঙ্গনে । প্রীতমের বাবা প্রদীপবাবুও একসময় দারুণ ক্রিকেট খেলতেন , জেলা টিমে চান্সও পেয়েছিলেন কিন্তু রোজগারের তাড়নায় ছাড়তে হয় সব , কাজ নেন টায়ার কারখানায় । মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের যে স্বপ্ন দেখা পাপ । নিজের ব্যাট , প্যাড , গ্লাভস অল্প দামে বেচে দিয়ে প্রীতমও নেমে পড়ল কাজে । ক্রিকেট খেলতে গিয়ে একসময় ওর সাথে আলাপ হয়েছিল পাশের শহরেরই রাজু হাঁড়ির । খেপ-খেলুড়ে ক্রিকেটারদের দালালির পাশাপাশি শবদেহ সাজানোর ব্যবসার সাথেও যুক্ত লোকটা অর্থাৎ শ্মশানযাত্রার পূর্বে অর্থের বিনিময়ে শবদেহকে সুন্দর করে ফুলমালায় সাজিয়ে তোলেন তিনি । তার অধীনে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে নিম্নবর্ণের পাঁচটি জোয়ান ছেলে; ব্যাবসাও ইদানীং জমে উঠেছে বেশ । উপায়ন্তর না দেখে ব্রাহ্মণপুত্র প্রীতম শরণাপন্ন হল রাজুবাবুর আর তৎক্ষণাৎ জুটে গেল কাজ। মাইনে মাসে ফিক্সড তিন হাজার , সাথে বডিপার্টি বকশিস দনাহ ! এমন একটা ছেলেকে বিয়ে করা একদমই মানায় না অমৃতার ; নিজের প্রধান শিক্ষক বাবার সম্মানের কথাটাও তো ভাবতে হবে । বারো বছরের বন্ধুত্ব তথা সাত বছরের প্রেমে দাঁড়ি টানতে ঠিক সাত সেকেন্ড লাগল তার । একদিন বিকেলে প্রীতমকে ডেকে জানিয়ে দিল নিজের সিদ্ধান্তের কথা । জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত প্রীতম চোখের জলকে পাথর করে হাসিমুখে মেনে নিল সবদেখতে দেখতে কেটে গেছে সাত মাস । কাজের চাপ এখন সপ্তমে । বিকেল থেকে দুটো মৃতদেহ সাজানো হয়ে গেছে বছর তেইশের প্রীতমের । সন্ধ্যেবেলা চা খাওয়ার সময়টুকুও পায়নি , বাড়ি যাওয়া তো দূরের কথা । এরই মধ্যে হঠাৎ ফোন এল রাজুবাবুর , যেতে হবে আরেকটা বডির অর্ডারে, সেটা নাকি আবার প্রীতমের বাড়ির কাছেই । বিরক্ত প্রীতম ক্লান্তির কারণে প্রত্যাখ্যান করল রাজুবাবুর প্রস্তাব । কেটে দিল ফোন , বোতল হাতে বসে পড়ল পুকুরপাড়ে । একসময়ের ক্রিকেট ব্যাট আজ পরিণত হয়েছে মদের বোতলে , নেশায় ডুব দিয়েই প্রীতম খুঁজে পায় জীবনের সব সুখকে ; মলম পড়ে হতাশা , অপ্রাপ্তি , যন্ত্রণার দগদগে পুকুরপাড়ের ভাঁটিশালা থেকে চুল্লু গিলে বাড়ি ফিরতে রোজকার মতোই রাত দেড়টা বেজে গেল । বেহুঁশ প্রীতম ডাইভ দিল সোজা ঘুমের রাজ্যে । পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দলাপাকানো কান্না আটকে গেল গলায় । মায়ের বর্ণনা শুনে স্পষ্ট বুপারল , গতকাল রাতে শেষ যে ডেডবডির অর্ডারটা এসেছিল , সেটা আসলে তারই প্রাক্তন প্রেমিকা অমৃতার । গলায় দড়ি দিয়েছে মাস্টার মশাইয়ের মেয়ে । দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য উন্মাদ প্রীতম তৎক্ষণাৎ ছুটে গেল অমৃতার বাড়ি । দাহকাজ সেরে মাস্টারমশাই সবেমাত্র বাড়ি ফিরেছেন , গোটা বাড়ি জুড়ে শ্মশানের স্তব্ধতা । অমৃতার বোন প্রীতমের হাতে তুলে দিল একটি চিরকুট , তাতে লেখা --- " হাজার মৃতদেহের ভিড়ে আমার লাশটাও যত্নে সাজিয়ে দিস ফুলের সুবাস আর সৌন্দর্য দিয়ে । নিয়ে আসিস ঠিক সেইরকম একটা লাল গোলাপ , যেমনটা দিয়ে আমাকে নিজের লাজুক ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলি সাত বছর আগের পড়ন্ত এক ভ্যালেন্টাইনস বিকেলে । "


Rate this content
Log in

More bengali story from Chiranjit Saha

Similar bengali story from Tragedy