Bhattacharya Tuli Indrani

Classics Inspirational


3  

Bhattacharya Tuli Indrani

Classics Inspirational


ভুল সংশোধন, ভুল সবই ভুল

ভুল সংশোধন, ভুল সবই ভুল

7 mins 680 7 mins 680

জীবনটা আমার ভুলে ভরা। আমার দোষ বিশেষ নেই, বিধাতা পুরুষই আমাকে বানাতে গিয়ে ভুল করে বসলেন, নারীর আকৃতিতে পুরুষের প্রকৃতি ভরে দিয়ে।

ছোটবেলায় শোনা কথায়, কতবার যে লুকিয়ে লুকিয়ে লাল রঙ গুলে সেই জলে চান করেছি আমি… লাল জলে স্নান করলে নাকি ছেলে হওয়া যায়।

স্কুলে পেন, পেন্সিল টিফিন কৌটো সবই হারিয়ে আসি। বকুনি শুনতে শুনতে একদিন বুদ্ধি খোলে। লস্ট প্রপার্টি রুমে গিয়ে হারানো জিনিষের বদলে যা পেতাম নিয়ে আসতাম। সৎ ছিলাম কিন্তু… ছোট পেন্সিলের বদলে ছোট পেন্সিলই নিতাম। টিফিনের কৌটো বা জলের বোতলে বিশেষ সুবিধে করতে পারতাম না, ওগুলো মার ডিপার্টমেন্ট ছিল। একবার বাড়ি থেকে ফেরৎ আনতে হল ওয়াটার বটল।

'একি, এ কার না কার বোতল নিয়ে এসেছিস? এইরকম আবোদা মেয়ে আমি জন্মে দেখিনি!আবোদা না, মেয়ে যে অতিবোদ্ধার কাজ করতে চেয়েছিল মা তা বুঝতে পারেননি। সেই বোতল ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে ক্লাসের এককোণে চুপচাপ রেখে এসেছিলাম।

সব থেকে মুশকিলে পড়তাম খাতা বই হারিয়ে এলে। সে তো আর কখনই পাওয়া যেত না, যদিও সে খাতাতে দরকারি বিশেষ কিছুই থাকত না… পাতার পর পাতা 'ক্লাসে কথা বলিব না' লেখা ছাড়া... পরীক্ষা দিয়ে আসার পরে, আমার শিক্ষিকা মা প্রশ্নপত্র নিয়ে বসতেন। কোন প্রশ্নের কি উত্তর লিখেছি তা জানতে। প্রশ্নোত্তরের সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকতো চড় থাপ্পড়ের বর্ষা। কি দুর্বিপাক! একবার কত কষ্টে লিখে এসেও শান্তি নেই, আবার মৌখিক পরীক্ষা। মা'র কথামত আমি ছিলাম 'দু- কান কাটা' লজ্জার কোনও বালাই নেই। দেখা গেল, প্রশ্ন পত্রের বেশ কিছু উত্তর আমার জানা থাকা সত্ত্বেও আমি লিখে আসিনি… দেখতেই পাইনি।অঙ্কে তো আমি বরাবরই রামানুজনের ছোটবোন। সবই মাথার ওপর দিয়েই যায়। অতিকষ্টে যেগুলো বা করে উঠতে পারি, তারও উত্তর লেখার সময়ে ২৭ হয়ে যায় ৭২ বা শেষে বিয়োগ করার বদলে করে আসি যোগ। সিমপ্লিফিকেশনের উত্তর বাকি সবার ০ বা ১ এলেও আমার অঙ্কের উত্তরের সংখ্যা অযুত- লক্ষ- নিযুত- কোটি ছাড়িয়ে যায়। এত কষ্ট করে অত ছোট উত্তর আনার কোনও মানে হয়… কেউ আসলে কিছুই বোঝে না।

কুঁতিয়ে কাঁতিয়ে ক্লাস নাইনে উঠলাম। এইটের পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ডে বড় বড় করে লিখে এল… হিউম্যানিটিস। আমার তো শাপে বর হল। অঙ্ক চলে যাওয়ায় আমি হঠাৎ করে পড়াশোনায় ভাল হয়ে গেলাম।


সাঁতার শেখার খুব ইচ্ছে। বাবা কোন কিছুতেই না বলেন না। নাচের ক্লাসে তো ছোট থেকেই যাই।

'যা শিখতে ইচ্ছে, শেখো। আমি জীবনে কিছুই শেখার সুযোগ পাইনি।'

বাড়ির সকলের বিরূদ্ধাচরণ করেও বাবা আমার ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করে চলতেন।


সাঁতার শেখা শুরু হল। জলে নেমে দেখলাম, আমি ভাসতে পারছি। ছোটোবেলায় পিসের সঙ্গে লেকে যেতাম, কখন যেন ভাসতে শিখে গেছি জানতেও পারিনি। স্কুলের বন্ধুকে পেলাম সাঁতার কাটতে গিয়ে।

'এটা কি পরেছিস রে, এ আবার কীরকম কস্টিউম?'

দেখা গেল পোষাকটি আমি উলটো করে পরেছি, সামনের দিক গেছে পেছনে। তাই অসুবিধেও হচ্ছিল। মা ঠিকই বলেন, আমি আবোদাই!

বিয়ের পরে পৌঁছোলাম, পাহাড় ঘেরা ছবির মত একটি শহরে, ঘাটশিলার মৌভাণ্ডারে। শাশ্বত অফিসে বেরিয়ে গেলেই বই নিয়ে বসে যেতাম। মাঝে মাঝেই চলে যেতাম ক্যাম্পাসের পাঁচিল টপকে অনতিদূরের ছোট ছোট পাহাড়ে চড়ে বসতাম। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের হিসেব মত 'বাঙালি ঢিপি দেখিলেই উৎসাহিত হইয়া পড়ে...' আর আমি তো জন্ম পাহদুজনের সংসার। বিশেষ কাজকর্ম ছিল না। বই পড়ার নেশা তো ছিলই। আমি তো 'ঠোঙা পাব্লিক' বাজারের জিনিস এলে, সেই কাগজের ঠোঙাও পরিস্কার করে খুলে আমি পড়তে বসি। বিয়ের আগে তো বাড়ির কোনও কাজই কখনও করিনি। মা শেখাতে চাইলেও ঠাম্মি বিরোধিতা করতে'পড়াশোনা করুক, বাড়ির কাজ শিখতে ইউনিভার্সিটি যেতে হয় না, শিখে যাবে। ঠাম্মি কে কি যে ভাল লাগত আর মার ওপরে রাগ হত।

মার গজগজানি চলতেই থাকত।

'বিদ্যাদিগগজ হয়েছেন, পড়াশোনার সঙ্গে তো সম্পর্ক নেই...খালি গল্পের বই। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে নাকের জলে চোখের জলে এক হবে। সামনের দরজা দিয়ে ঢুকবে, তৎক্ষণাৎ পেছনের দরজা দিয়ে বার করে দেবেআমার সর্বগুণসম্পন্না মা মেয়ের মধ্যেও সেই রূপের প্রকাশ দেখতে চাইতেন।

বর্ষা বর্ষা দুপুরে বই নিয়ে শুয়েছি। পায়েসের গন্ধ ভেসে আসছে কোথা থেকে।

'আহ, কার বাড়িতে যেন পায়েস রান্না হচ্ছে। শাশ্বতও খুব ভালবাসে পায়েস খেতে।

খানিক্ষণ বাদেই পোড়া গন্ধ পাওয়া গেল...'আহারে পায়েসটা পুড়িয়ে ফেলল রে!!

হে ভগবান! আমিই তো পায়েস বসিয়েছিলাম।' 

এই পায়েস পোড়ানোতে আমার নাম গিনেস বুক ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে যেতে পারে। বড় মেয়ে বলে, 'অমেজিং মা! তুমি কোনও দিনই আমাদের পায়েস খাওয়াতে পারলে না।

বাচ্চারা যখন ছোট ছিল তাদের খাওয়ার জল ফুটে ফুটে শুকিয়ে যেত। বোতল ফোটাতে গিয়ে বাসনের তলায় পড়ে থাকা এক টুকরো প্লাস্টিক পেয়েছিলাম একবার।

শাশ্বত সব সময়ই সাবধান করত...

'রান্না বসিয়ে রান্নাঘর ছেড়ে বেরবে না… যখন এত ভুল তোমার!'

যাহ, তা আবার হয় না কী?

কী বোরিং ব্যাপার স্যাপার… রান্না হতে হতে কত কাজ সারা হয়ে যায়। ফলস্বরূপ প্রায়ই দুবার তিনবার রান্না করতে হয়েছে… কি অপচয়!শাশ্বত বদলি হলো নাসিকে। মন খারাপ হলেও ভালোই লাগল পরিবর্তনটা। নতুন দেশ দেখা হবে, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে। কোলে তখন এক বছরের বাচ্চা। কলকাতা হয়ে নাসিক যাওয়া হবে। মা বাচ্চার দুধের টিন কিনে দিয়েছেন। বিদেশ বিভুঁই, গিয়েই যাতে আতান্তরে পড়তে না হয়। 

সেইবারে বাড়ির সকলের সঙ্গে ঝগড়া করে একা একা ট্রেন ভ্রমণ। দুধের টিন হাতে তুলতেই, অদ্ভুত ফিলিং হলো, খুলতেই মাথায় বাজ। ভরা কৌটোর যায়গায় খালি কৌটো নিয়ে এসেছি। নিজের গালে নিজেরই ঠাসিয়ে চড় কষাতে ইচ্ছে হলো। কি করে আমি ভরা আর খালি কৌটোর তফাৎ করতে পারলাম না... ওদিকে মাও তাজ্জব… কাজের মাসি ঘর পরিষ্কার করার সময় ভর্তি দুধের টিন এনে মার হাতে দেয়'তোমার গুণনিধির কাণ্ড দেখ। ভরা কৌটো রেখে, কী নিয়ে গেল?' 

মায়ের তো গালে হাত। 

গরমের দিন। ছোট এক কুঁজো করে জল দিয়েছিলেন বাবা… সঙ্গে। একটা ছোট মিক্সিও কিনে দিয়েছিলেন, ছোট বাচ্চা নিয়ে কষ্টে পড়বে মেয়ে। নাসিক স্টেশনে নামার আগে, বাঙ্ক থেকে ভাঙ্গা কুঁজো নামিয়ে ব্যাগে ভরলাম, কিন্তু মিক্সির কথা মনেই পড়ল না। কুলিও মাল নামিয়ে পয়সা না নিয়েই চম্পট দিলো। ট্রেনে ছেড়ে যাওয়া মিক্সির বাক্সটা নজরে পড়ে থাকবে।

শাশ্বত স্কুটারে, পেছনে মালপত্র- বাচ্চা নিয়ে আমি রিক্সায়। নতুন শহর দেখতে দেখতে চলেছি। হোর্ডিং এর মিক্সির ছবির দিকে নজর যেতেই মাথায় হাত… আমার মিক্সি?

ভুলের বহর বাড়ল বই কমল না। 

শুক্করবারির হাটে শাশ্বতই যায়। একবার কী যেন কারণে সে আমাকে বাজারে যাওয়ার কথা বলল। প্রতিবেশী মহিলাদের অনেকেই নিয়মিত ভাবে বাজারে যেতেন। একজনকে পাকড়াও করলাম, 'ভাভী আপকে সাথ যানা হ্যায় বাজার।'

'চলো...' 

টাকা- পয়সা, ব্যাগ, বাচ্চা সব সামলে রেডি হলাম। মেয়ে গড়গড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে দেখে তার পেছনে ছুটলাম, তাকে ধরার জন্যে। মনের মধ্যে কি যেন একটা কাঁটা খচ খচ করতে থাকল। কাঁটা নামলো বাজার থেকে ফিরে দরজা খুলতে গিয়ে, দরজা তো বন্ধই করা হয়নি। সেই রাতে শাশ্বতকে সবই বললাম..

'পড়বে একদিন এমন বিপদে। কি যে সর্বনাশ ঘটাবে, ভগবানই জানেন।'

কোনরকম উন্নতি তো হলই না, দিনের পর দিন ভুলের মাত্রা বেড়েই যেতে লাগল। 

ইমারশন হিটার জ্বালিয়ে বাইরে চলে গেছি। আগুনটাই লাগতে বাকি রয়ে গেছিল। জল ফুটে ফুটে, কমে গিয়ে প্লাস্টিকের বালতি পুড়ে বিরাট গর্ত।

শাশ্বত আর কিছু বলা ছেড়ে দিয়েছিল।দোকানে জিনিষ কিনে ফেলে আসা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আবার করে রিক্সা চড়ে সেই দোকান থেকে জিনিষ ফিরিয়ে আনা।

 তালার চাবি তো কখনোই খুঁজে পাওয়া যেত না। মাঝে মাঝেই স্নানের সাবান বেরতো ফ্রিজ বা আলমারি থেকে।

কলকাতা যাওয়া হবে, তার তোড়জোড় চলছিল। শাশ্বত অফিস থেকে আসবে, আমি মেয়েকে নিয়ে স্টেশনে পৌঁছে যাব...

'স্টেশনে যাওয়ার সময় আমার শার্টটা টেলারের থেকে নিয়ে নিও তো।'

রিক্সায় বসার পর কি খেয়াল হলো… শুরু করলাম ব্যাগ পরিস্কার করতে। সত্যিই সময় পাই না। স্কুলের কাজ, বাড়ির কাজ নিয়ে হিমশিম... বাজে কাগজ একে একে ফেলতে লাগলাম। ব্যাগ পরিস্কার হলো। দর্জির দোকানে পৌঁছে বিল আর পাওয়া যায় না। বিলের মধ্যে টাকাও ছিলো… শাশ্বত দিয়ে গেছিল।

সেই রিক্সা নিয়েই আবার ফিরতি পথে যাওয়া… ফেলে দেওয়া কাগজ খুঁজতে খুঁজতে। এত সব কাণ্ডের পরেও ভগবান আমার সহায় ছিলেন, টাকা সমেত মোচড়ানো দর্জির দোকানের বিল পাওয়া গেলো।

শার্ট নিয়ে স্টেশনে পৌঁছোতে পৌঁছোতে ট্রেন প্রায় ছেড়ে যায়...


বহুদিন সংসার করে ফেললাম, মেয়েরা বড় হওয়ার পরে তারা অনেকটাই সামলে নিত, তাদের অত্যন্ত অগোছালো, অসম্ভব অন্যমনষ্ক মা’কে। বেড়াতে যাওয়ার সময়ে দেখা গেল সুটকেস বাঁধার চেন, জলের বোতল নেই... 'ভুলে গেছি রে...'

টাকা নিয়ে চট করে তারা স্টেশনেই কিনে নেয় আর একটা চেন, জলের বোতলও...

অতি সুশৃঙ্খল স্বামীর সান্নিধ্যে কাটিয়ে বোধহয় কিছুটা শুধরিয়েছি...

সংশোধন হয়েছে কি না পরিচিতরাই বলতে পারবে।


Rate this content
Log in