Nikhil Mitra Thakur

Romance Tragedy


3  

Nikhil Mitra Thakur

Romance Tragedy


অপরাহ্নে বসে সকালে ফিরে যাওয়া

অপরাহ্নে বসে সকালে ফিরে যাওয়া

7 mins 195 7 mins 195


স্মৃতির সমুদ্রে দিলাম ছেড়ে দিয়েছে সুব্রত পানসি, ঘাট পায় না ভীরার, শুধু ভেসে বেরায় একূল-ওকূল। ছোট বেলায় বালির তৈরি বাড়িতে সে হতো বরকর্তা। আর বাড়ি তৈরি করে বিজয়া হতো কনে কর্তী। সে যে কতো কিছু আয়োজন। স্বচ্ছ লালচে মোটা মোটা বালির দানা দিয়ে পোলাও তৈরি, একটু মোটা পাথর কণা দিয়ে মাছ, আগাছা পাতা দিয়ে শাক, ধুতরো ফল দিয়ে ফুলকপি ঝোল, তমাল ফল দিয়ে রসগোল্লা, ভোজের আয়োজন


জমে ক্ষীর বিয়ে বাড়িতে। কিন্তু, লক্ষ্য করার বিষয় সাম্য ছিল বিয়ের দিনের ভোজ, আর বৌভাতের ভোজের মধ্যে।একই উপাদান দিয়ে একই মেনু দুই বাড়িতে, কোন ভেদ নেই।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রির দিকে গেলে হাতের সুখে তৈরি বাড়ি পায়ের সুখে ভেঙে দিয়ে নিজের নিজের বাড়ি চলে যাওয়া। ধীরে ধীরে বড়ো হলো ওরা, প্রকৃতি নিজের হাতে তৈরি শৈশব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বড়ো করে দিল ওদের। জগতটা পাল্টে গেল। শুরু হলো ইঁদুর দৌড়। টিউশন পড়ো,স্কুল যাও, ফিরে এসো, আবার পড়তে যাও। ক্লান্ত দেহে টান টান হয়ে বিছানায় স্বপ্নহীন ঘুমের দেশে নিজেকে হারিয়ে দাও। ওই দ্যাখো আত্মপ্রতিষ্ঠার সাহারা হাত ইশারায় ডাকছে তোমায়। এগিয়ে চলো পড়বে ওর হাঁ মুখে।

বিজয়া এখন অনেক বড়ো হয়েছে। নারী দেহের বৈশিষ্ট্য গুলো ওর দেহে মাথা চাড়া দিয়ে ফুটে উঠেছে। বিজয়া নিজেও সচেতন সে বিষয়ে। তাই থেকে থেকেই ও নিজের ওড়না প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ঠিক করে নেয়। এই কদিনে এটা অনেকটা মুদ্রা দোষ হয়ে দাঁড়িয়েছে ওর। সুব্রত কথা বলতে গেলে ওর মধ্যে ফল্গু ধারার সাথে চপলতা মিশে একটা অদ্ভূত ভাবের সৃষ্টি হয়। ও ধরা দিয়েও ধরা দিতে চায় না।

বিজয়া এখন আর শুধু সুব্রতের খেলার সাথী নেই। এখন বিজয়া আরো অনেকের দৃষ্টিক্ষেত্রের অভয়ারণ্যে হরিণী। শত সহস্র চোখের এস পি জি বলয়ে ওকে করতে হয় ঘোরাফেরা। সুব্রত সেটা বুঝতে পারে, অনুভব করতে পারে ওর হৃদয় পাখি ছটপট করছে খাঁচা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। তবুও খাঁচার মধ্যে ছোলা খেয়ে ওকে জীবন ধারণ করতে হয়। সাত কিমি হেঁটে স্কুল গিয়ে,আবার ফিরে আসতে সন্ধ্যা নেমে আসে। শীতের সন্ধ্যার মতো জবুথবু করে ক্লান্তি তাকে, আর সেই সন্ধ্যা বেলায় পুতুলের বিয়ে দিতে যাওয়া হয় না। সে রামও নেই, আর সেই অযোধ্যাও নেই।

এখন বিজয়া নিজেই কনে। ওর বিয়ের কথা নিয়ে ভাবে বাড়ির লোক। ওর মা এখন থেকে একটু একটু করে গহনা গড়িয়ে রাখে বিয়েতে দিতে হবে বলে। বলির যুপকাষ্ঠে চড়বে বলেই যেমন পুরুষ ছাগলের জন্ম তেমনি যেন ওর জন্ম হয়েছে বিয়ের যূপকাষ্ঠে চড়ার জন্য, ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে বিজয়া। পরের দিনে আবার ঘড়ির কাঁটার মতো একই রাস্তায় ঘুরতে শুরু করা। তাই বিজয়া গেয়ে ওঠে "এই তো জীবন যাক না যেদিকে যায় মন।"

স্কুলের গন্ডি ছাড়িয়ে সুব্রত এখন কলেজের চৌকাঠে পা ফেলেছে৷ মাধ্যমিক পাশ করে ও এবার কলেজে গিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে। বাস্তবের মাটির রস শুকিয়ে আরো কঠিন রূপ ধারন করছে। মাটির উপরি তলের তাত বাড়ছে ওর ভেতরের কামনা গুলোর উষ্ণতার সাথে পাল্লা দিয়ে। অথচ বাস্তবে ওর সামনে সোনার হরিণ ছাড়া কিছু নেই।সুব্রত চেষ্টা করে নিজেকে গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে। কিন্তু, এখন দিনে-রাতে ওকে স্বপ্ন ঘিরে ধরে। স্বপ্ন গুলো প্রজাপতির ডানার মতো রঙিন, উড়ে বেড়ায় সারা রাতদিন।

বিজয়া মাধ্যমিক পাশ করে, স্কুলেই কলা বিভাগে ভর্তি হয়েছে। বিজয়ার জগতের জলবায়ু আমূল পাল্টে গেছে।


এখন সুব্রতর সাথে ওর দেখা হয় না বললেই হয়। আসা যাওয়ার পথ, মেলা-মেশার সাথী সব পাল্টে গেছে। তবুও যেন কোথাও একটা অদৃশ্য বন্ধন ছোটবেলার সাথীর জন্য রয়ে গেছে মনে। স্বার্থ মোড়কের ভেতরে থাকা জগতে কারো সাথে বিন্দুমাত্র মনোমালিন্য হলে মনটা টাইম মেশিনে উল্টো দিকে ঘুরতে থাকে। থেকে থেকে অন্যান্য বন্ধুদের সাথে তুলনায় অদৃশ্যে সুব্রত ঢুকে পড়ে।

সুব্রত এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে একটা ইন্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে। ওকে গিয়ে থাকতে হবে হোস্টেলে। লালমাটির সড়কে মোরা সহজ-সরলতার গ্রাম ছেড়ে এবার হংসরাজ যাচ্ছে শহরে, আজব দুনিয়া দেখতে। উৎসুক,উৎকন্ঠা, উদ্বিগ্নতা, আনন্দ সবকিছু মিলে মিশে সুব্রতর মনের অবস্থা এখন ঘেটে ঘ হয়ে আছে। মনের মধ্যে বিন্দু বিন্দু বাস্প জমে আছে, যেগুলো উষ্ণতা ছড়াচ্ছে।


বিজয়ার কানে গেছে কথাটা। সুব্রত ইন্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেয়েছে, চলে যাচ্ছে পড়তে বাইরে। আজকে প্রথম ওর বুকটা বর্ষার নদীতে ঘুর্ণির মতো মোচড় দিয়ে উঠছে থেকে থেকে। ও ভর্তি হলো সুব্রত পড়তো যে কলেজে সেই কলেজে, আর সুব্রত চলে গেল এবারেই কলেজ ছেড়ে নাগালের বাইরে। তবে কি বিধাতা চাই না ওদের মিলন। বিজয়া নিজের মনকে প্রশ্ন করে তুমি কি চেয়েছিলে আন্তরিক ভাবে? যদি চেয়ে থাকো তাহলে এতদিন বলো নি কেন মুখ ফুটে। মন বলে, আরে ক্ষেপি জানিস না মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না। তা হলে আর কি এখন কাটা মুরগির দেহের মতো ছটপট করো আর কি!

সুব্রত কলেজে গিয়ে হাওয়ায় ভাসা পাখির খসা পালকের মতো ভেসে বেরাচ্ছে। কতো স্মার্ট বন্ধু-বান্ধব, কতো স্মার্ট সুন্দরী বান্ধবী দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসেছে। ঘর ছেড়ে নিজের এক চিলতে ঘর নিজের করে পাওয়া। স্বাধীনতার বন্যা বইছে। নেই কোন টিউশনির ঝামেলা। ক্লাস, আড্ডা, রাতে নিজের মতো করে একটু পড়া। এত সুখের মাঝেও একটা দুঃখ ওকে বড্ডো পীড়া দেয়। জঘন্য খাবার খেয়ে প্রতিদিন দুবেলা মায়ের হাতের রান্না খাওয়ার জন্য মনটা কেঁদে কেঁদে ওঠে।

চার বছর পর সুব্রত বিদেশ চলে গেল পড়তে, সাথে একটা চাকরি নিয়ে। এখন আর ওকে বাড়ি থেকে কোন টাকা নিতে হয় না। তাই বাড়ির সাথে যোগাযোগের মাত্রা কমে গেছে। দুই-তিন মাস পরপর বাবামায়ের সাথে ফোনে কথা হয়। তাও কেমন আছো তোমরা, আমি ভালো আছি, বাবা আজ তোমার অ্যাকাউন্টে এতো টাকা পাঠালাম-এর মধ্যে থাকে সীমাবদ্ধ। সময় ট্রেনে চেপে জীবন চলে ঝিকঝিকিয়ে সূদুর অজানার দেশে।

বিজয়া কলেজে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে এক বড়ো সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর বড়ো দিদি হঠাৎ করে ক্যানসারে মারা গেছে। দিদির এক মেয়ে ও ছেলে, তারা দুজনেই খুব ছোট, ওদের দেখভাল করার জন্য জামাইবাবুকে বিয়ে করতেই হবে। অন্য কোন পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করলে ছেলে-মেয়েগুলোর জীবন হয়তো ভেসে যাবে। তাই, নিজের জীবন উৎসর্গ করলো বিজয়া। ছেলে মেয়ে দুটোকে নিজের ছেলেমেয়ে হিসাবে লালনপালন করার জন্যই বিয়ে করলো অসম বয়সের জামাইবাবুকে।

সুব্রত এক বিদেশিনীকে হঠাৎ করে বিয়ে করে বসে। বাবা মায়ের খবর নেওয়া প্রায় বন্ধ। যখন দেশে এলো বাবা মারা যাওয়ার খবর পেয়ে। বৌ অ্যানি আসতে পারলো না বাচ্চা হবে বলে। মা আক্ষেপ করতে লাগলো আমিও মারা যাওয়ার একমাত্র বৌমাকে দেখতে পাব না বোধ হয়। সুব্রত দিদি ও জামাইবাবু ওর প্রতি একটু ক্ষুন্ন। বৃদ্ধ বয়সে বাবা- মাকে দেখভালের সব দায়িত্ব ওদের ঘাড়ে চেপেছে বলে। ওরা বারবার বলতে লাগলো দেশে ফিরে এসে কোন চাকরি নিতে। কিন্তু, সুব্রতর খাঁচা খুব শক্ত, ভাঙা খুব কঠিন। বাবার শ্রাদ্ধ শান্তি সব পের করে সুব্রত মায়ের চোখের জলে ভাসতে ভাসতে ফিরে গেল বিদেশে। বৃদ্ধা মা পড়ে রইল দেশে গ্রামের বাড়িতে।


এখন অবশ্য সুব্রত নিয়মিত টাকা পাঠায় মাকে। খোঁজও নেয় প্রায়ই ফোন করে। দেখতে দেখতে কেটে গেল পাঁচ পাঁচটা বছর। অ্যানি এখন দুই সন্তানের মা। সুব্রত ও অ্যানি দুজনের দৈহিক টান এখন কুয়াশা ঢাকা ভোরের আলো। মনের বন্ধন ছিন্ন হয়েছে নানা কারণে। বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করেছে অ্যানি। কিছুদিনের মধ্যে সুব্রতর জীবনে এলো বড়ো আঘাত। অ্যানি বিচ্ছেদের মামলা জিতে গিয়েছে, বাচ্চাদের অধিকার পেয়েছে। সুব্রত একা হয়ে গেল বিদেশে। এমন সময় সুব্রত খবর পেল মা মারা গেছে। সুব্রত ফিরে এলো দেশে। মায়ের শ্রাদ্ধ শান্তি করার পর আর ফিরে গেল না বিদেশে। এখন ওর আর ছোট বেলার দারিদ্র্যতা নেই। বিদেশ থেকে আসার সময় অনেক টাকা নিয়ে এসেছে।

আর কোন চাকরি বা ব্যবসা সুব্রত করতে চায় না। সমাজ সেবামূলক কাজ করতে চায়। গ্রামে ওদের বেশ কিছু জায়গা আছে। একটা বড়ো জায়গার ওপর বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করলো সুব্রত। এখন ওখানে অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা খুব আরামে গ্রাম্য তপোবনের পরিবেশে জীবনের বাকী সময়টুকু কাটাতে পারে। একদিনে অপরাহ্নে আশ্রমের বাগানে সুব্রত একা বসে আছে নিরালা, সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার ধীরে ধীরে গাঢ়ো হচ্ছে। সুব্রত ফিরে গেছে এই গ্রামে কাটানো ছোটা বেলার ঘটনা গুলোতে। হঠাৎ মনের দেওয়াল থেকে খসে পড়লো একটা ছবি। কোথায় এখন আমার পুতুল বিয়ের কনে কর্তী।

সুব্রতোর হৃদয় থেকে দুঃখের গরম লাভা উঠে আসতে থাকলো ফুসফুসে। ফুসফুসের হাওয়া গরম হয়ে দীর্ঘশ্বাস উঠতে বারবার। শুরু করলো বিজয়ার খোঁজ নিতে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো যে বিজয়া এখন বিধবা। শহরে একটা বাড়িতে একা থাকে। বিজয়াদের পরিবারের কেউ এখন থাকে না গ্রামে। ফোন নম্বর জোগাড় করে সন্ধ্যা বেলায় ফোন করলো বিজয়াকে। ফোন বেজে গেল কেউ ধরলো না। তাই বিজয়ার সাথে দেখা করতে যাবে ঠিক করলো সুব্রত।

বিজয়া এখন বিধবা, ছেলে বড়ো হয়ে বিদেশে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বিজয়া বড়ো একা। এক চাঁদনি রাতে বাড়ির ছাদে বসে বিজয়া ফিরে গেছে ওর ছোট বেলায় পুতুল খেলার কথায়। রাস্তায় বালি দিয়ে তৈরি করতে না পারলে সুব্রত ওরটা তৈরি করে দিতো। ঝোপ থেকে ধুতরো ফল গুলো তো ওই নিয়ে বসতো। ভাবছে কোথায় এখন ওর পুতুল বিয়ের বর কর্তা। ভাবতে ভাবতে চোখ থেকে জল গাল বেয়ে চিবুকে এসে পৌছে গেছে। সুব্রত ছোট বেলায় তো ওখানেই বারবার খেলার ছলে হাত দিত। সুব্রত হয়তো ভালোই আছে বিদেশি বৌ নিয়ে। সে কি আর আমার কথা মনে রেখেছে। আমার জীবনটা যে কোন দেবতার পূজোয় না লাগা ফুল হতেই এসেছিল এই পৃথিবীতে।


নিচে ফোন বাজছে। বিজয়া নেমে গেল ফোন ধরতে। ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। কি জানি কে করেছিল।যাকগে, আমাকে আর কার কি প্রয়োজন। হয়তো ছেলেটার বিদেশে পালক মায়ের কথা হঠাৎ মনে পড়েছে, তাই একবার ফোন করেছিল। ফোন করবো কি না ভাবছে, এমন সময় বাইরের দরজার কলিং বেলটা বেজে উঠলো। এই সাঁজ বেলা আবার কে এলো। দরজা খুলে দেখলো ওর বড়ো দাদা এসেছে। এই শহরেই থাকে। ভাই বোনে একথা সেকথা হতে হতে সুব্রতর মা মারা যাওয়ার কথা বিজয়া জানে কি না দাদা জিজ্ঞেস করলো। বিজয়া হ্যাঁ জানি, মা ছাড়া গ্রামের আর একটি মানুষ আমাকে প্রান ঢেলে ভালোবাসতো।তিনিও চলে গেলেন। এখন গ্রামে যাওয়া মানে যমপুরীতে যাওয়া। আরে তোকে বলা হয় নি, সুব্রতকে ওর বৌ ডির্ভোস করেছে। বাচ্চাগুলোও ওর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। সুব্রত গ্রামে ফিরে এসে শুনলাম বৃদ্ধাশ্রম করেছে। আর বিদেশে ফিরে যাবে না। দাদা ভাবলো বোন খবরটা শুনে খুব আনন্দিত হবে। কিন্তু, সুব্রতোর জীবনে বিপর্যের কথা শুনে বিজয়া নির্বাক হয়ে গেল। ওর মন চাইছে এখনই গ্রামে সুব্রতোর আশ্রমে ছুটে যেতে।


Rate this content
Log in

More bengali story from Nikhil Mitra Thakur

Similar bengali story from Romance