STORYMIRROR

Nityananda Banerjee

Thriller

4  

Nityananda Banerjee

Thriller

আকাশের রঙ ফ্যাকাশে

আকাশের রঙ ফ্যাকাশে

5 mins
389

ঊনচত্বারিংশতি অধ্যায়

ভরপেট ভোজনের পর বীরেশ্বর রক্ষিতের মন প্রফুল্ল হয়ে গেল । মি: রায়চৌধুরীর আতিথেয়তায় সন্তোষ প্রকাশ করলেন । ধন্যবাদ জানাতেও ভুল করেননি ।

এদিকে রূপা গোপার সঙ্গে একান্ত আলোচনায় নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিতে দিতে কান্নায় ভেঙে পড়ল ।

বুকুনের চোখ দু'টো কা'কে যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে । চঞ্চল পায়ে এ ঘর সে ঘর করে কাউকে যেন খুঁজে ফিরছে । শিউলি এবং সুনেত্রা খুনসুটি করে চলেছে । ত্রিলোকেশ্বর কাকাবাবু এই রোদে পথে পায়চারি করছেন ।

বাবলুদার বাড়ী থেকে ফেরার সময় আমি দেখতে পেলাম কাকাবাবু পথে দাঁড়িয়ে এ প্রান্ত ও প্রান্তে দেখছেন । সামনে এলে বললেন - এই যে বাবা ! তোমাকেই খুঁজছি । খেয়েছ তো !

আমি বললাম - এই রোদ্দুরে কেন কাকাবাবু? আসুন বাড়ীর ভেতরে বসে কথা বলি ।

তিনি বললেন - এখানেই তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই।

আমি এই প্রৌঢ়ের দশা দেখে বললাম - চলুন না বাড়ীর ভেতরে গিয়ে ...

মুখ থেকে কথা বেরোতে না বেরোতেই তিনি বললেন - বাড়ী ভর্তি লোকজন ; চল ওই গাছের নীচে বসে ..

আমি আর দ্বিরুক্তি না করে অশ্বথ গাছের তলায় বসে বললাম - বলুন কাকাবাবু, কি বলার আছে ?

কাকাবাবু বললেন - উৎসবের মুখে সবই তো শুনলাম। তোমাকে অন্ধকারে রেখে এত কাণ্ড ঘটিয়েছে যে আমারই অবাক মনে হচ্ছে । তা' বাবা ! তুমি ক্ষুণ্ণ হওনি তো ?

বুঝতে পারছি তিনি কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন । রূপাদেবীকে নিয়ে এমনিতেই তিনি মনোকষ্টে আছেন তার উপর আমি যদি এই প্রশ্নের কোন নেগেটিভ উত্তর দিই তবে হয়তো তিনি আরও অপদস্থ হবেন ।

বললাম - বড়দার কাজগুলোই এই রকম । গোয়েন্দা মানুষ তো ! হয়তো আমাকে জানাবার প্রয়োজন মনে করেননি । অবশ্য এটা আমার গা-সওয়া হয়ে গেছে । তাঁর কোন কাজের প্রতিবাদ কখনও তো করিনি ; আজও করব না । তিনি যা ভাল বুঝেছেন করেছেন।

- আমার প্রশ্নটা কিন্তু সঠিক তা' নয় বাবা । আমি বলতে চাইছি তুমি এই ব্যাপারটা কেমন ভাবে নিয়েছ ?

- দেখুন কাকাবাবু ! বড়দা শুধু আমার অগ্রজ নন ; বয়সের তুলনায় পিতৃতুল্য । আমি তাঁকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি । এক্ষেত্রেও আমি কিছু বলতে পারব না ।

অপরাহ্নের রোদ গায়ে পড়ছে । কাকাবাবু ঘেমে একশা । বললাম - চলুন, এখানে কষ্ট হচ্ছে । শীতলপাটিতে শুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নেবেন ।

কাকাবাবু হয়তো ভেবেছেন আমি তাঁকে সোজাসুজি কিছু বলতে চাইছি না । তাই ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন - গোপা মাকে তুমি একসেপ্ট করবে তো ?

একটা মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন আমাকে । এর কি উত্তর হয় তা' আমার এই মুহুর্তে জানা নেই । আমি একপ্রকার জোর করেই তাঁকে বাড়ীর ভেতরে নিয়ে এলাম । আমি জানি বাড়ীশুদ্ধ লোকের সামনে তিনি এ' নিয়ে কোন প্রশ্ন করতে পারবেন না ।

বাড়ীর দরজা খুলে দিল বুকুন । উজ্জ্বল সূর্য্যালোকে দেখলাম তার মুখ, চোখ, গোটা শরীর । নিজেকে লজ্জিত মনে হল ; অপরাধীও । এখন সে চল্লিশের কোঠায় । তবুও মনে হল শিশু । একবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হল । কিন্তু পারলাম না ।

বুকুন বলল - আপনারা এত রোদে কোথায় ছিলেন ?

আমি চুপ থাকলাম । উত্তর দিলেন কাকাবাবূ ।

- গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম দাদুভাই । সকালেই তো চলে যাব ; তাই ভেবে দেখলাম গ্রাম আর মহানগরীর ফারাকটা কতখানি বিশাল !

দাদুকে ভেতরে নিয়ে বসিয়ে দিল । আমাকে নির্লজ্জের মত বলল - বাবা !

আমি ষাট অতিক্রান্ত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী । এই প্রথম নিজেকে ' বাবা' ভাবতে প্রস্তুত ছিলাম না। তাই ওর ডাকে সাড়া দিতে বেশ কুন্ঠাবোধ হল ।

বুকুন আবার বলল - বাবা ! এবার আপনি একটু বিশ্রাম নিন । সারাদিন যা ধকল গেল..

সারাদিনের ধকল আমার উপর কিছুই প্রভাব বিস্তার করেনি । বেশ একটা এমিউজমেন্টে ছিলাম । অনভিপ্রেত 'বাবা' সম্বোধনটাই আমাকে যারপরনাই লজ্জায় ফেলে দিল । আমি যেন বোবা হয়ে গেলাম ।

বুকুন আমার হাত ধরে টানতে লাগল । জীবনে সেই প্রথম সন্তানের হাতের স্পর্শ পেলাম। সর্বশরীর রোমাঞ্চিত হল । সেই সঙ্গে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস আমার বক্ষ বিদীর্ণ করে বেরিয়ে এল । সন্তানের মায়ায় যেন জড়িয়ে পড়লাম।

বুকুন আমাকে তার নির্দিষ্ট ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল। লো ভোল্টেজে ফ্যানটা মাঝে মাঝে কুই কুই করছে। আমার শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে । বুকুন হাতপাখা দিয়ে আমার মাথায় হাওয়া করতে লাগল ।

এতক্ষণে সুযোগ পেয়ে বললাম - এ কি করছ ! আমার এ সব লাগবে না । এখুনই ঘাম চলে যাবে ।

- মানছি বাবা । তবু রোদ মেখে এলেন তো ! একটু বাতাস দিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করে দিই!

তারপর বুকুন বলল - আমার জন্মবৃত্তান্ত আশা করি আপনি শুনেছেন । তাই আর ও নিয়ে কিছু বলব না । শুধু কয়েকটা কথা বলতে চাই। জ্ঞান হওয়া থেকে মাকে দেখছি - কেমন যেন আনমনা থাকে । কিন্তু আজ আর মাকে দেখে আমার সেই চিরপরিচিত মা যেন হারিয়ে গেছে। কোন যাদুবলে এমন হল জানি না ; কিন্তু এমন ফুরফুরে মেজাজে মাকে কোনদিন দেখিনি।

আমার মনে হল এ তো মায়ের কথা; তুমি কি জান আমার কথাগুলো? কত চাপ, কত অনুরোধ না রাখতে পেরে কত জনের নিকট যে বিরাগভাজন হয়েছি- সে তো আমিই জানি । ব্যতিক্রম শুধু আমার বড়দা ।

বললাম - শুনেছি তুমি বিশাল উঁচুদরের অফিসার হয়েছ । ডেপুটি কমিশনার অব দুমকা । তা' তোমার এই উত্থানে আমার তো কোন অবদান নেই । এতে তোমার মনে কোন ক্ষোভ বা দুঃখ নেই ?

বুকুন হাসল ।

- আপনি তো বাবা পরিস্থিতির শিকার । সম্পূর্ণ এক ভুল ধারণা নিয়ে আপনার এবং মায়ের সম্পর্ক তৈরি । এখনও কি আপনার মনে সেই ধারণাই রয়ে গেছে ?

আমি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছি । সেই দোদুল্যমানতা এখন আর আমার মধ্যে নেই ।

হঠাৎ বুকুন প্রশ্ন করে বসল - আচ্ছা বাবা, আপনি তো ইচ্ছে করলেই বিয়ে করতে পারতেন - কেন করেননি?

- সবই ভবিতব্য । নইলে সত্যিই তো ইচ্ছে করলেই বিয়ে করতে পারতাম । অনেক সুযোগও এসেছিল । তবু কেন জানি না; বিয়ে করার ইচ্ছেটাই মন থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল ।

- আমরা তো আপনাকে বহুবার খোঁজার চেষ্টা করেছি, পারিনি । তেমনই আপনার কখনও মনে হয়নি যে মেয়েটি আপনার সঙ্গে এই ধরণের প্রতারণা করে জবরদস্তি মাথায় সিঁদুর পরিয়েছিল , তাকে খুঁজে বের করতে ?

- ইচ্ছে হলেও সুযোগ আসেনি । তা-ছাড়া লঙ্কেশ্বরের পরিচয় পেয়ে দু:সাহসও হয়নি ।

এমন সময় সুনেত্রা এসে বলল - কি এত কথা হচ্ছে আপনাদের বুকুনদা ?

বুকুন নি:সঙ্কোচে বলে দিল - পিতা-পুত্রের সম্ভাষণ শুনে তোর কি লাভ ? যা এখান থেকে । আর শোন ! মা আর মাসীমণিকে এখানে আনতে পারবি ?

আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম ।

- তোমরা গল্প কর; আমি বাবলুদার পাওনাটা দিয়ে আসি।

বুকুন বলল - জেঠুমণি অলরেডি পেমেন্ট করে দিয়েছেন । আপনি বসুন । ব্যস্ত হবেন না ।

( চলবে )


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Thriller