লাল দীঘি
লাল দীঘি
সবার প্রিয় লাল দীঘি আমি।
আমার জল লাল নয়।
লাল নুড়ি পাথরে ঢাকা রাস্তা
চলে গিয়েছে আমার পাশ দিয়ে-
তাই সবাই আমায় এই নামে ডাকে।
সকাল থেকেই কত ব্যস্ততা-কলরব,
কত লোক কত কাজে যে আসে,
কেউ বা কাজের ফাঁকে একটু চুপটি করে বসে।
কেউ ঢিল ছুঁড়ে মারে আমার জলে,
কখনো পাড়ের গাছের ফল-জলে পড়ে ঝরে।
কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া রা আমার জলে
পড়ে মিলেমিশে করে রাসলীলা,
পলাশের লাল রং আমাতে ঝরে
ধরায় এক আজব উন্মাদনা।
সকালের ব্যস্ত ঘাট, দুপুরে তা ফাঁকা,
ক্লান্ত পথিক আমার স্নিগ্ধ শীতল ঘাটের
তরুছায়ায় বসে আছে একা।
অলস দুপুরে গাঁ’য়ের মেয়েরা দীঘির
ঘাটে বাসন ধুতে আসে,
সময় হলে সংসারের সুখ-দুঃখের গল্প করতে বসে।
কাল রায় গিন্নি আনন্দের সাথে বললেন হেসে-
সৎ মেয়ের বিয়ের খুব ভালো সম্বন্ধ হোল অবশেষে।
বেশ বড়লোক, নেই কোন পণ-
শুনে আমারও ভালো হয়ে গেল মন।
ছোট থেকে দেখেছি মেয়েটিকে।
সহজ-সরল-মা মরা অভাগী মেয়ে,
সারাদিন কাটে কাজ করে-
সৎ মা’য়ের গন্জনা সয়ে।
এসব ভেবে কখন হয়েছি আনমনা
দু ফোঁটা জল পড়ল আমার বুকে।
সম্বিত ফিরে দেখি রায় বাড়ির মেয়ে
ঘাটে আছে বসে।
অশ্রুসজল নয়নে উদাস ভাবে চেয়ে।
ভাবি একি হোল! কথা বলতে পারিনা-
তার মনের দু:খও যে জানিনা।
ধীর পায়ে মেয়েটি নামছে জলে,
মনেতে প্রার্থনা করি কেউ যেন আসে চলে।
বোবা ছেলেটি-যে রোজ তাকে দূর থেকে দেখতো,
মনে মনে বুঝি তাকে ভালোবাসতো।
ঝাঁপিয়ে পড়ে সে বাঁচাল মেয়েটিকে।
কানাঘুসো শুনলাম-বিয়ের নামে রায় গিন্নি-
মেয়েটিকে ষাটের বুড়ো তিন বাচ্চার
বাবাকে করছিলো বিক্রী।
জেনে সে কথা সবাই আক্রোশে ফুঁসছে,
কে যেন বলে ওঠে গরীব বোবা
ছেলেটি মেয়েটিকে ভালবাসে।
মেয়েটিকে শুধোলো সবাই- বললে আপত্তি নাই-
তৎক্ষণাৎ সবাই করল বিয়ের সব আয়োজন,
কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়ার ছাওয়া মন্ডপে বসল বিয়ের আসর।
পলাশের অলংকারে সাজলো মেয়ে
পরণে বরের দেওয়া ছাপা শাড়ী ।
এলো পুরোহিত,বাজলো মঙ্গলগীত-এলেন পরিচিতরা,
চা-জলখাবার-দিল উপহার পাড়ার দীনু ময়রা।
আশীর্বাদের সাথে দিল সবাই শ-
দু-শ যা ছিল যার কাছে,
আচমকা এই ঘটনা প্রবাহে মেয়েটি
মরে যে লাজে।
শুভ পরিণয় হোল সমাপন-
আমারই কোলে এক হোল দুজন।

