Maheshwar Maji

Drama Romance


3  

Maheshwar Maji

Drama Romance


আটপৌরে প্রেম

আটপৌরে প্রেম

6 mins 1.7K 6 mins 1.7K

বাতাসী দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল,শুনছো..বলি একবার খোল দেখি।

আমি এখনো লেখা শুরু করিনি।প্রায় আধ ঘন্টা হল।শুধুই ভাবছি।কী লিখব?..জীবন যন্ত্রণা নাকি সেই গতানুগতীক কোন প্রেমের গল্প?...অনেকদিন হল কোন ভূতের গল্প লেখা হয়নি।

ভাবছিলাম কোথা দিয়ে শুরু করি?রাত না দিন?

ঠিক সেই সময়েই বাতাসীর খটখটানি কানে এল।এই অবস্থায়, যে কোন লেখকরই রাগ ওঠে।আমারো হল।আমি তো আগে সংসারি।কথাটা ভুললে চলবে না। তাছাড়া লেখাটা আমার তো আর পেশা নয়।যে রাগ করে বলব,সব সময় ডিস্টার্ব করো না। লেখাটা পরশুর মধ্যে জমা না দিতে পারলে আগের উপন্যাসের রয়্যালটি প্রকাশক আটকে দেবেন।

লিখি মনের তাগিদে।একটু সুনামের লোভে।

দরজা খোলার সাথে,সাথেই বাতাসী দুমদাম পা ফেলে আলমারিটা খুলতে লাগল।

একটা পাট করা নতুন কাপড় বের করে বলে উঠল,কই টাকাটা বের করো।আমি কী খালি হাতে যাব মেলায়?

আমার তো মাথায় হাত।একদম ভুলে গেছি।

এই তো গত রাতেই কথা হল।পাড়ার সব বউদের সাথে মেয়েকে নিয়ে গিন্নী রায়দিঘীর মেলায় যাবে। আমার কাছে তিনশো টাকা চেয়েছে।না করিনি।তাহলে হয়তো রাতের আদরে ভাটা পড়ে যেত।

ভেবেছিলাম গোলকের কাছ সকালে গিয়ে প্রিমিয়ামটা নিয়ে আপাতত কাজ চালিয়ে নেব।

সকাল,সকাল গল্প লেখার ঘোরে সব উবে গেছে।আমি আমতা,আমতা করে বলে উঠলাম,না মানে একটা .স...স..সমস্যা হয়েছে গো।

বাতাসী গলারটা খুলতে গিয়ে থমকে আমার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে চেয়ে বলে উঠল,তোমার সমস্যা কখন হয় না,বলতে পারো?

সারাদিনে বসে,বসে গনেশ ঠাকুরের মত মাথা ঝুকিয়ে লিখতেই শুধুমাত্র কোন সমস্যা হয় না।বাকি সব জায়গাতেই তোমার সমস্যা ।

আমি বাতাসীকে খুব কম দিনেই জেনে গেছি।আসলে শখের হলেও লেখক তো।মেয়েদের মন পড়তে দেরী লাগেনি। তাই দু হাত টান,টান করে বলে উঠলাম,আজ বাদ দাও না।সবাই কেমন মেলায় যাবে। পুরো ঘরে শুধু তুমি আর আমি।

বাতাসী চোখ পাঁকিয়ে ডান হাতের তর্জনী তুলে বলে উঠল,খবরদার আমাকে ছোঁবে না বলে দিচ্ছি।এই মাত্র বাসি কাপড় ছেড়ে এলাম।দিন,দিন যেন পাউস বাড়ছে!...ওই আদর,টাদরে আমাকে ভোলানোর একদম চেষ্টা করবে না বলছি।আমি কোন ছুড়ি নই।যেমন করেই হোক টাকাটা আমার চাই।না হলে আজ আড়াইটার বাসেই আমি বাপের বাড়ি রাওনা দেব।কথাটা মনে থাকে যেন।

বাতাসী বলেই ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল।

এই জন্যেই বলে নারীর মন বোঝা দায়।জানাশোনা ঔষুধে কাজ হল না।তাই এবার আমাকে ছুটতেই হল।

শালা,এদিকে গোলক বাড়িতে নেই।ইট ভাটায় চলে গেছে।ফোনটাও সাথে রাখেনি। বাড়িতে রেখে গেছে।

সটান চন্দরের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম।ওর আবার বাড়ির দরজা গোড়ায় একপাল ছাগল সার দিয়ে বাঁধা থাকে।কেউ গেলেই ছাগলগুলো ম্যা..ম্যা করে চেঁচিয়ে ঘরের মালিককে সাবধান করে দেয়।

ওর বউ মন্দাকিনী হাতে সব সময় একটা মুড়ো ঝাঁটা ধরে থাকে।উঠোন ঝাট দেয় না ওটা ওর অস্ত্র বোঝা মুশকিল।হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসে বলবে,মালিক নেই।সন্ধ্যেয় আসো।

সন্ধ্যেয় গেলে বলবে আজ ফেরেনি।অথচ চন্দর সব সময় বাড়িতেয় থাকে।খায়,দায় আর বাপ,ঠাকুর্দার লাখ,লাখ টাকাগুলোকে বিছানা করে পান চিবিয়ে টিভি দেখে।

ওর বউ ওকে বাড়ির বাইরে যেতে দেয় না। গেলেই মেয়েবাজি আর দুনিয়াবাজি করে সব টাকাগুলো উড়িয়ে দেবে।

বংশের রক্ত যাবে কোথায়?

আমার বন্ধু।একসাথে হাই ইস্কুলে পড়তাম।

চাইলে পাঁচশ টাকা নিশ্চিত পাব।

পাঁচিল টপকেই ঢুকে পড়লাম।ওর বউকে দেখতে পেলাম না। চন্দরের কামরাটা আমি জানি।সোজা ওঠে গেলাম দোতলায়।দরজার কড়া নেড়ে বলে উঠলাম,চন্দর...আমি মিতেশ।দরকার আছে।একবার খোল।

চন্দর কোন সাড়া দিল না। আমি আরো জোরে কড়া নাড়তেই দরজাটা ধড়াম করে খুলে গেল।চন্দর গোল,গোল চোখগুলো চারপাশে ঘুরিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে দরজাটা এঁটে দিল।

ওর বিছানার দিকে নজর যেতেই আমার চোখদুটো অল্পক্ষণ স্থির হয়ে গেল।

চন্দর নকল রাগ ফুটিয়ে বলে উঠল,প্যাঁঠা ..আসার আর সময় পেলি না!..সবে পাজামা ঢিলে করেছিলাম।তুই তো আবার সতী মানুষ!..এসব মেয়েছেলে চলবে না।আমার আবার এসব ছাড়া চলে না।অনেক করে বউকে ভুলিয়ে,ভালিয়ে মেলায় পাঠিয়েছি।সময় বেশি নেই।বল তোর কাজ কী?

--পাঁচশো টাকা ছাড় দেখি।

চন্দর মানিব্যাগ থেকে ফট করে দুটো নোট বাড়িয়ে বলে উঠল

--এ নে হাজার টাকা।বউ দরজায় আসার আগেই যেন মোবাইলে খবরটা পাই?

আমি ঘোমটায় মুখ ঢাকা মহিলাটির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে উঠলাম,

--একে তো ঠিক...

--তোর চিনে লাভ কী?চুড়ি,ফিতে বিক্রি করে দরজায়,দরজায়।গতকালই আলাপ হয়েছে।বউ চান করতে গেছিল,সেই ফাঁকে।এবার যা।আমাকে আমার কাজ করতে দে।

আমি তো একেবারে যুদ্ধ জয়ের হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।এসেই বাতাসীকে টাকাটা ধরিয়ে বলে উঠলাম,এই নাও।এবার আমি একটু বাইরে বেরুলাম।কাজ আছে।

বাতাসী বলে উঠল,তোমার কাজ আমার খুব জানা আছে।লাইবেরিতে গিয়ে চেয়ারে বসে ফ্যানের হাওয়ায় ঘুম মারবে।..তাইত?..সে তুমি যাওগে।তবে সাথে করে রুমিকে নিয়ে যাও।মেলায় গিয়ে এটা নেব,সেটা নেব করে কান একেবাব ঝালাপালা ধরিয়ে দেবে।তুমি তো আমায় কুবেরের ধন তুলে দিলে তাই না!.. এবার ওই টাকায় আমি তোমার মেয়েকে মেলাশুদ্ধ কিনে দিইগে?অত ঝামেলা আমি পোয়াতে পারব না। ওকে তুমিই সামলাও।খিঁচুড়ি রেঁধে দিয়েছি।থালে নিয়ে খেয়ে নেবে।মা,বাবা সকালেই বেরিয়ে গেছেন।কীর্তন শুনতে।আমার তো উপায় নেই। তোমার সাথে কীর্তন করেই আমার সব ধর্ম উজাড় হয়ে গেল।

আমি বড়শির কাটা গলায় লাগার মত ঝটফট করে উঠলাম,না..না..।তা হয় না বাতাসী।ও আমার কাছে কাঁদবে।বেচারি মেলায় যাওয়ার জন্য সেই কবে থেকে বাইনা ধরে বসে রয়েছে?..এখন যদি তুমি ওকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাও।ও তো কেঁদে পাড়া ভাসিয়ে দেবে।

বাতাসী চুল আছড়া শেষ করে বলে উঠল,ধন্যি তুমি বাপ!..নিজের মেয়েকে নিজের কাছে রাখার ক্ষমতাটুকুও নেই?

আমি বললাম,লাভ কী?..একদিন তো পরের ঘরেই ওকে যেতে হবে।তখন বুকটা যে হুট করে শূণ্য হয়ে যাবে।

বাতাসী এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বলে উঠল,লম্বা লম্বা কাব্যি জ্ঞানই আওড়াতে শিখেছ।যদি কাজ কিছু শিখতে,তাহলে আর কপালে এত দুঃখ থাকত না।

আরো একশো টাকা দাও।মেয়েকে তো খালি হাতে আনতে পারব না।

তাই দিলাম।

দিয়েই সেখান থেকে ছুট দিলাম।একেবারে চন্দরের বাড়ি।

চন্দর কে আওয়াজ দিয়ে বলে উঠলাম,তোর কতক্ষণ লাগবে রে?..আমার যে আবার হাগু পাচ্ছে।

চন্দর দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বলল,এই নে একশো টাকা।আমার সাইকেলটা নিয়ে হরির দোকান থেকে দুটো কন্ডোম নিয়ে আয় তো।রিক্স নিয়ে লাভ নেই।

না বললে চলবে না।

তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেলাম।যা ভেবেছি তাই।হরির ভাইপোটা দোকানে বসে আছে।আমার কাছে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বাংলা টিউশানি পড়ত।এই তো বছর কয়েক আগের কথা।আজ তার হাত থেকে কন্ডোম নেব?

কিছুতেই না। ফিরে গেলেও চলবে না। তাই মিষ্টি দোকানের মদনদাকে ডাকলাম,ও মদনদা একটু এদিকে এসো তো।

মদনদা হাতের হাঁজা চুলকে সামনে দাঁড়াল।

--কী দেব স্পেশাল না চালু।

--তার আগে একটা কাজ করে দাও তো।হরির দোকান থেকে এক প্যাকেট কন্ডোম নিয়ে এসো তো?

--সে আবার কী?

--তুমি টাকা দেবে,জিনিস নেবে।এত জানার কী দরকার শুনি?..এই নাও টাকা ।

মিনিট পাঁচেক পরেই মদনদা হাতে প্যাকেট নিয়ে হাজির হল।আমি পকেটে রেখে,পাঁচ টাকা মদনকে দিয়ে বললাম,এ নাও।এখন আর চা খাব না। আর হ্যাঁ ।কাউকে কিচ্ছু বল না যেন।

মদনের মুচকি হাসিটা আমি অতক্ষণ লক্ষ্যই করিনি।

তাই জিজ্ঞাসা করলাম,হাসছো কেন?

মদনদা আবার হাঁজা চুলকাতে শুরু করল।

---কার জন্য গো?

--কার জন্য মানে?

---না,ওই দোকানের ছেলেগুলো আমাকে চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করছিল।তাই জিজ্ঞেস করছি।ওরাই বলল।এটা দিয়ে নাকি মেয়েদের সাথে ইয়ে করা হয়।যাতে ইয়ে না হয়।

আমার তো বেশ শোচনীয় অবস্থা ।আগে সে কথা ভেবে দেখেনি।তাই বলে উঠলাম,তুমি কী বললে?

--যা সত্যি তাই বললাম।তুমি আনতে দিয়েছ।তাই শুনে ওরা খুব হাসতে লাগল।

এই মরেছে!..এই চন্দরের চক্করে পড়ে আমার ইজ্জতের বারোটা বাজল দেখছি।

চন্দর বলে উঠল,শালা এত দেরী করলি যে?..আমার কাজ তো হয়ে গেল।এভাবে কী বেশিক্ষণ চেপে রাখা যায়?

আর ওরো তো দেরি হচ্ছে। মেলায় যাবে জিনিস বেচতে।দে ।রেখে দিই।পরের বার কাজে লাগবে।

রাতে বাতাসীর কোন শব্দ না পেয়ে অবাক হয়ে গেলাম।আমাদের বিয়ে হওয়া দশ বছর হয়ে গেছে।আজ পর্যন্ত বাতাসীকে এত চুপচাপ কখনো থাকতে দেখিনি।

বাতাসী কোন নারী নয়।একটা ঝড়!

খারাপ লাগা হোক কী ভাল লাগা।কোনকিছুকেই মনে বেশিক্ষণ জমা রাখতে দেয় না।মুহূর্তে উড়িয়ে দিয়ে একেবারে ফাঁকা করে দেয়।

তাই আমিই আজ প্রথম ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম,চুপচাপ কেন গো আজ?

তখনি দেখলাম বাতাসীর চোখে জল।

---একি!..তুমি কাঁদছ?

বিয়ের এত বছর পর আমি প্রথম নিজেকে অসহায় মনে হল।আজ বুঝলাম বাতাসী আমার জীবনে ঠিক কী?

অতদিন আমাকে ও এই অভাববোধটুকু বুঝতেই দেয়নি।সংসারের সমস্ত দুঃখকে নীলকন্ঠের মত একাই গিলে নিত।

তাই ওর চোখের জল আমার হৃদয় কাঁপিয়ে তুলল।

আমি দুহাতে অশ্রু মুছিয়ে বলে উঠলাম,সত্যি করে বলো তো কী হয়েছে আজ তোমার?

বাতাসী হাতদুটো ছাড়িয়ে আবার বালিশে মুখ গুঁজল।

আমি এবার একটু অভিমান করে বলে উঠলাম,তুমি কাঁদলে আমিও কাঁদব।

বাতাসী সঙ্গে,সঙ্গে আমার গলা জড়িয়ে বলে উঠল,তুমি আমাকে ভালবাসো না?

বাতাসীর মুখে ভালবাসার কথা!

এ আমি কী শুনছি!

নিজের কানকেই যে বিশ্বাস হচ্ছে না! যে কথাটা বাতাসীর মুখ থেকে আমি শত চেষ্টা করেও একবার বলাতে পারিনি।এমন কি বিবাহবার্ষিকীর দিনে,তাও না।সেই বাতাসী আজ হঠাৎ করে ভালবাসার কথা বলে তাও আবার প্রশ্ন তুলে!!

আমি আনন্দে অল্প কেঁদেই ফেললাম।বললাম,শুধু ভালবাসি না গো।প্রান দিয়ে ভালবাসি।

বাতাসী চট করে ওর ডান হাতটা আমার মাথায় ধরে বলে উঠল,বলো তোমার দিব্যি বলছি?

আমি হতবাক।তবু বললাম,তোমার দিব্যি বলছি।

বাতাসি চোখ,মুখ মুছে বলে উঠল,মেলায় হরিদার ভাইপো শিবার সাথে দেখা হতেই আমাকে ঈশারাই কাছে আসতে বলল।ছেলেটা আমাকে কাকিমা বলে একদম মানে না। বউদির মতই ইয়ার্কি মারে।আমিও ছাড়ি না। আজ ওর মুখে তোমার কন্ডোম কেনার ব্যাপারটা শুনে হেসে উড়িয়ে দিতে পারলাম না।

ও যেভাবে বলছিল।মনে হল একদম সত্যি।এতক্ষণে বুঝলাম,ও আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই কথাটা বানিয়ে বলেছে?

আমি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলাম,একদম না। কথাটা সত্যি ।আমি মদনের হাত দিয়ে কন্ডোম আনিয়ে ছিলাম।তবে তা নিজের জন্য না।

বাতাসীর চোখ চঞ্চল হয়ে উঠল,তবে কার জন্য? আমরা তো আজ পর্যন্ত কোনদিনও জিনিসটা ব্যবহার করিনি।

আমি বলে উঠলাম,কার জন্য?সেটা নাই বা জানলে!..তোমরা জাতীতে নারী।আজ হোক, কাল হোক নামটা পাঁচ কান করবেই।তাতে আরো কিছু সম্পর্ক পুড়ে ছাঁই হয়ে যাবে। তার আচ রেহায় দেবে না আমাদেরও।তাই থাক।তোমার কী আমার উপর কোন বিশ্বাস নেই বাতাসী?

বাতাসী আমার বুকে মাথা রেখে জবাব দিল,একদম না। পুরুষদের বিশ্বাস করা আর চোখ বুঁজে রাস্তা পার করা,একই জিনিস।

-----সমাপ্ত-----


Rate this content
Originality
Flow
Language
Cover Design