Sayandipa সায়নদীপা

Drama Romance


5.0  

Sayandipa সায়নদীপা

Drama Romance


উল্টো স্রোত

উল্টো স্রোত

10 mins 1.4K 10 mins 1.4K

আজকের কথা ...


“কোথায় বেরোচ্ছ জানতে পারি কি?”

“না পারোনা।”

“রণ আয়াম ইওর ওয়াইফ।”

“সো? এই শোনো প্লিজ এই সব বাংলা সিরিয়ালের ন্যাকা বউগুলোর মত শুরু কোরো না।”

“রণ আয়াম প্রেগন্যান্ট। এই সময় তোমাকে আমার সব থেকে বেশি দরকার আর তুমি!”

“হেই সবসময় গ্যাজগ্যাজ কোরো না তো। বাই।”

“রণ… লিশন… কোথায় যাচ্ছ তুমি? রণ…”

মুখের ওপর দড়াম করে দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে যায় রণ, দরজার এপারে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ে ঈশানি। সে ভাবতেও পারেনা যে রণর জন্য সে তার সব কিছু ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল একদিন আজ সেই রণরই এ কি রূপ! এখন কোথায় যাবে ঈশানি! গা’টা গোলাতে শুরু করেছে, বাথরুমে যাওয়ার আগেই হড়হড় করে বমি হয়ে যায় মেঝেতে। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে নিজের পেটের ওপর হাত রাখে ঈশানি; ডাক্তার বলেছিল প্রথম তিন মাস খুব ভাইটাল। এই তিন মাস খুব সাবধানে থাকতে, কোনোরকম শারীরিক বা মানসিক চাপ না নিতে কিন্তু ঈশানির ভাগ্যে কি আর তা আছে! মানসিক চাপের কথা তো না বলাই ভালো আর শারীরিক চাপ… রণর জন্য কোনো কাজের মেয়ে রাখতেও সাহস হয়না তাই এই অবস্থাতেও বাড়ির সব কাজ ঈশানিকে নিজেকেই করতে হয়।


  “পায়েলটা কে রণ?” রাত দশটার সময় রণ বাড়ি ঢুকতেই হিসহিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো ঈশানি।

“হোয়াট? তুমি পায়েলকে কি করে চিনলে?”

“ইট ডাজ নট ম্যাটার রণ, তুমি শুধু বলো পায়েল কে?”

“আমার গার্লফ্রেন্ড… আর কিছু?”

“রণ...! লজ্জা করলো না তোমার এরকম একটা কথা মুখ ফুটে বলতে?”

“লজ্জা! তোমার কাছে? তোমার কাছে আবার কিসের লজ্জা?”

“আয়াম ইওর ওয়াইফ…”

“এই থামো তো, ওয়াইফ ওয়াইফ কোরো না তো সবসময়। সালা এঁটো মাল, দয়া করে থাকতে দিচ্ছি এই ঢের। বেশি প্যানপ্যান করলে না ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব বাড়ি থেকে।”

“কি বললে? বাড়ি থেকে বের করে দেবে? ভুলে যেও না তোমার বাড়ি আর ব্যবসার সমান ভাগীদার আমিও।”

“হুমম তোমার ফ্যান্সি ওয়াল্ডে… হাঃ হাঃ হাঃ।”

“মানে?”

“বাড়ি ব্যবসার কাগজপত্র গুলো কখনো দেখেছো যেখানে তোমার নাম লেখা আছে?”

“মানে?”

“হাঃ হাঃ হাঃ…”

“রণ… ইউ লায়ার… চিটার… আমার সব কিছু নিয়ে তুমি! আমি ভাবতে পারছিনা! তোমাকে আমি মেরে ফেলবো…” 

সোফা থেকে উঠে এসে ঈশানি সজোরে খামচে ধরে রণর কলার। রণ জোর করে ঈশানির হাতটা ছাড়িয়ে জোরে একটা চড় মারে ওর বাম গালে, ঈশানি উল্টে পড়ে সোফায়। তারপর আবার চরম আক্রোশে উঠে আক্রমণ করে রণকে, রণও পাল্টা আঘাত হানে। এইভাবে ধস্তাধস্তি চলতে চলতে হঠাৎ করে রণ সজোরে একটা লাথি কষায় ঈশানির পেটে; যন্ত্রনায় কঁকিয়ে ছিটকে পড়ে ঈশানি, দেওয়ালে ওর মাথাটা ঠুঁকে গিয়ে সরু রক্তের রেখা নেমে আসে কপাল চুঁইয়ে। অজ্ঞান হওয়ার আগে শুধু আবছা যেন শুনতে পায় দরজার বাইরে অনেক মানুষের কোলাহল, কেউ যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে…


  চোখ খুলে ঈশানি বুঝতে পারে সে শুয়ে রয়েছে হসপিটালের বিছানায়, পেটে অসহ্য যন্ত্রনা। গলাটাও শুকিয়ে কাঠ, কাউকে ডাকতে গিয়ে দেখে মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই বেরোচ্ছে না। একজন বয়স্ক নার্স ওর আওয়াজ শুনে ছুটে আসেন ভেতরে, “বাহ্ এই তো জ্ঞান ফিরে গেছে আপনার।” 

নার্সকে কিছু বলতে গিয়েও গলার স্বর জড়িয়ে যায় ঈশানির। নার্স এগিয়ে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, “কষ্ট হচ্ছে মা? দাঁড়ান এক্ষুনি ডাক্তারবাবুকে ডাকছি।” চোখ ফেটে জল আসে ঈশানির, বহুদিন বাদে এইটুকু স্নেহের স্পর্শ পেয়েই নিজেকে আর সামলাতে পারেনা সে। 


  ডাক্তারকে আসতে দেখে ঈশানি মনে যেন একটু বল পায়, অনেক কষ্টে জিজ্ঞেস করে, “আমার বাচ্চা…!” বয়স্কা নার্সটি আবার এগিয়ে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “শান্ত হোন।”

ডাক্তার চোখ দুটো নিচে নামিয়ে বলেন, “সরি মিসেস রয়, আপনার বেবিকে বাঁচাতে পারিনি।”

“না…!” আর্তনাদ করে ওঠে ঈশানি। 

“শান্ত হোন। আওয়াজ শুনে আপনার প্রতিবেশীরা ঠিকসময় দরজা ভেঙে না ঢুকলে আপনার স্বামী আপনাকেও হয়তো… তবে চিন্তা করবেননা আপনার স্বামী এখন জেলের ঘানি টানছেন।” মৃদু হেসে জানান সেই নার্স।

“নার্স ওনার মা বাবাকে ভেতরে আসতে বলুন।” অর্ডার দেন ডাক্তার।

“আমার মা বাবা! ওরা কি করে জানলো!”

“তা তো জানিনা, হয়তো আপনার প্রতিবেশিরাই খবর দিয়েছে।”

“কিন্তু আমার প্রতিবেশীরা তো আমার মা বাবার কথা জানেনা… কে খবর দিলো!”

“ওনারা ভেতরে এলে ওনাদেরই জিজ্ঞেস করে নেবেন।” এই বলে বেরিয়ে যান ডাক্তার। 

হতভম্ভের মতো বিছানায় শুয়ে থাকে ঈশানি, সিলিংয়ের দিকে তাকাতেই সেখানে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ভেসে ওঠে অনেক গুলো ছবি…


ফ্ল্যাশব্যাক


রণর হাত ধরে কোর্ট চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে ঈশানি। চারিদিকে কালো কোর্ট পরা মানুষদের সাথে সাথে আরও কতরকম বিচিত্র পোশাক পরা মানুষের সমাহার, নানাজনের সমস্যা নানান রকম। এতো কোলাহলের মাঝেও ঈশানির ইচ্ছে করল রণকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেতে। আজ অবশেষে তাদের মুক্তি, পৃথিবীর আর কোনো শক্তিই তাদের আলাদা করতে পারবে না। অনেক নীতিবাগীশদের চোখ রাঙানি সয়েছে এতদিন ধরে, আর নয়। এবার দুই মুক্ত বিহঙ্গের মত নিজেদের জগৎ গড়ে তুলবে ওরা। আজকের এই খোরপোষের টাকায় এবার রণ শুরু করবে তার স্বপ্নের ব্যবসা। উফফ, কতদিনের চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের ফল আজ অবশেষে মিললো।


  “চেকটা ঠিকঠাক নিয়েছ ইশু?”

“উমম… ডোন্ট ওয়ারি বেবি।” একটা প্রশান্তির হাসি খেলে গেল ঈশানির ঠোঁটে মুখে, রণর চোখেও লাগলো সেই হাসির ছোঁয়া।

“থ্যাংক্স ঈশানি।” হঠাৎ করে একটা পরিচিত কন্ঠ শুনে রণর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাল ঈশানি; দেবজিৎ এসে দাঁড়িয়েছে।

“থ্যাংক্স ফর হোয়াট?”

“জেলে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য।”

“ওহ ইয়াহ। ইউ সুড বি থ্যাংকফুল টু মি।”

“ইয়েস অফকোর্স। ঈশানি…”

“কি?”

“বাবার হার্ট এট্যাক হয়েছে, খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন।”

“তো? আমি কি করব? যাও গিয়ে জানিয়ে দাও যে তোমাকে জেলে যেতে হয়নি, এমনি এমনি সেরে যাবেন।”

“ঈশানি…”

“এই মিঃ দেবজিৎ তাড়াতাড়ি আপনার কথা শেষ করুন তো।”

“আমি আপনার সাথে কথা বলছিনা রণীত।”

“দেব এতদিনে তোমার বুঝে যাওয়া উচিৎ ছিল যে আমার সাথে কথা বলা মানেই রণর সাথে কথা বলা। ওর সাথে খবরদার এরকম জোর গলায় কথা বলবে না।”

“সরি… আয়াম রিয়েলি সরি ঈশানি, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে তুমি তো কোনো নারী নও, ইউ আর এ বিচ।”

“হেই শাট আপ…”

“গায়ে লাগলো বুঝি? আসলে কি জানোতো তুমি ঠিকই বলতে আমি সত্যিই একটা বোকা নয়তো আজ এখানে তোমার সাথে কথা বলতে আসতাম না। তোমার মত একটা মেয়ের থেকে মানবিকতার সামান্য দুটো শব্দও আশা করা আমার ভুল হয়েছে। চললাম, আর কোনোদিনও তোমার মুখ দেখতে চাইনা। বাট ইউ নো হোয়াট? ইউ হ্যাভ টু পে ফর দিস ওয়ান ডে। পাপ কাউকে ছাড়ে না ঈশানি, কাউকে না। বাই।”

ঈশানি হয়তো আরও কিছু বলত কিন্তু রণ ওকে সে সুযোগ না দিয়েই ওর হাত ধরে হনহন করে হাঁটা লাগালো। 


  কোর্ট চত্বরে হাজার মানুষের ভিড়েও একলা দাঁড়িয়ে রয়ে গেল দেব। অজান্তেই ওর দু’চোখ বেয়ে নেমে এলো জল। জীবনে দ্বিতীয়বারের জন্য কাউকে এতো ভালোবেসেছিল, সেই মানুষটাও আজ ওর থেকে দূরে চলে গেল। এবার কি করবে দেব? কেমন করে সামলাবে নিজেকে? পাড়ায়, পরিবারে নানান জন নানান কথা বলছে, তারওপর বাবার এই অবস্থা সব কিছু কেমন করে সামাল দেবে সে! ঈশানি কি করে পারল এমনটা করতে? দেবের নামে কলঙ্ক লাগিয়েই শুধু থেমে থাকলো না, দেবের বাবার নামেও… ছিঃ ঈশানি…

দেবের মনে পড়ে গেল ঈশানিদের বাড়িতে পাকা কথা দিয়ে আসার পর বাড়ি ফিরে ওর বাবা বলেছিলেন, “দেখবি এবার আমাদের বাড়ির চেহারাটাই পাল্টে যাবে, আমার মেয়ে আসছে যে। তোর মায়ের ফেলে যাওয়া সংসারটা নতুন করে সেজে উঠবে আবার।” সত্যিই ঈশানিকে বাবা মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন কিন্তু ঈশানি কি প্রতিদান দিল! ভরা কোর্টে দাঁড়িয়ে বললো ওই বুড়ো মানুষটা নাকি ওকে কুপ্রস্তাব দিত, ওকে খারাপ ভাবে ছুঁত! ছিঃ… মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে! আজ দেব স্পষ্ট বুঝতে পারছে পুরোটাই ছিল ওই রণীত আর ঈশানির মিলিত প্ল্যান। দেবকে বিয়েটাও করেছিল সেই প্ল্যান মোতাবেক, ওর কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়ে এবার নিজেদের সংসার সাজাবে। আচ্ছা দেবের বাচ্চাটাকে কেন মেরে ফেললো ঈশানি! বাচ্চাটা থাকলেও দেব নাহয় তাকে আঁকড়েই কাটিয়ে দিত বাকি জীবনটা। একটা মেয়ে হয়ে ঈশানি কি করে পারলো ওই সদ্য আসা ভ্রূণটাকে নিজের এই জঘন্য প্ল্যানে সামিল করতে! সেই দিনটা আজও স্পষ্ট মনে আছে দেবের। তখন ওর মনে খুশির হিল্লোল, বাড়িতে নতুন অতিথি আসছে যে। ঈশানির জন্য অনেক ফলমূল কিনে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতেই দেখতে পেয়েছিল খাটের উপর ছড়ানো অবস্থায় রয়েছে কিছু মেডিক্যাল রিপোর্ট… ঈশানি এবরশন করিয়ে এসেছে! নিজের মাথার ঠিক রাখতে পারেনি দেব ফেটে পড়েছিল ঈশানির ওপর, জানতে চেয়েছিল সে কেন এমন করলো। তখন তো ও ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে এসব আসলে ঈশানির প্ল্যান, লুকোনো ক্যামেরায় উঠে যাচ্ছে দেবের এই উন্মত্ত অবস্থার ছবি যার সাহায্যে দেবের বিরুদ্ধে বধূ নির্যাতনের মামলা আনবে ওর স্ত্রী। কি অবলীলায় ঈশানি বলেছিল বাচ্চাটা নাকি দেবের বৈবাহিক ধর্ষণের ফসল ছিল! উফফ এরকম কত শত মিথ্যে গুলো ঈশানি কোর্টে বললো অবলীলায়, কি করে পারলো ও! আর ঈশানির মা বাবা তারা মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন ঠিকই কিন্তু একবারও তো দেবের পাশে এসে দাঁড়ালেন না! বাবা ছাড়া দেবের তো আর কেউ নেই, কেন এমন হয় যে ও যাকেই ভালোবাসে সেই ওর জীবন থেকে হারিয়ে যায়? সেই মফস্বল শহরটাকে দেব চিরকাল মনে মনে দুষে এসেছে যে শহরটা ওর মাকে কেড়ে নিয়েছিল একসময়, যে শহরটা কেড়ে নিয়েছিলো ওর প্রথম ভালোবাসাকে। বাবার কলকাতায় ট্রান্সফার হওয়ার পর দেব ভেবেছিল এই মহানগরের বুকে ওরা বাবা ছেলে মিলে আবার নতুন করে শুরু করবে জীবন। এই বিশাল জনস্রোতের মাঝে ওরাও ঠিক খুঁজে নেবে ওদের খুশির ঠিকানা। ঠিকঠাক তো চলছিলোও সব কিছু, কিন্তু তারপর হঠাৎ করে কি হয়ে গেল? এতো বড় শহরের এতো মানুষের মধ্যে থেকে ঈশানিকেই আসতে হল ওর জীবনে! আচ্ছা এই শহরের সব মানুষই কি ঈশানির মত স্বার্থপর?


আজ, অন্য_কোথাও …


স্ট্রিটল্যাম্পের আলোটা দপদপ করছে, যে কোনো মুহূর্তে কেটে যাবে হয়তো। গোটা রাস্তাটা শুনশান। দেবজিৎ এসে দাঁড়িয়েছে ল্যাম্পোস্টটার নীচে, ভীষন ক্লান্ত লাগছে ওর নিজেকে। বিশ্রামের প্রয়োজন। আপাদমস্তক কালো পোশাকে নিজেকে মুড়ে মেয়েটা এসে দাঁড়ালো দেবের সামনে। একটা ব্যাগ বাড়িয়ে দিয়ে বললো, “দেবজিৎ বাবু আপনার টাকা পয়সা আর বাকি যা যা দিয়েছিলেন সব এই ব্যাগে আছে।”

“এসব আমাকে দিচ্ছ কেন? এসব তুমিই রাখো।”

“তা হয়না দেবজিৎ বাবু, আমি একটা কাজের দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তার জন্য যা যা প্রয়োজন নিয়েছি। এসবের আর দরকার নেই।”

“ঈশানি কেমন আছে?”

“মোটামুটি ভালোই, মানসিক ধাক্কাটাই বেশি লেগেছে। চিন্তা করবেন না ওর মা বাবা ওর সাথে আছে।”

“থ্যাংক্স পায়েল, থ্যাংক ইউ সো মাচ।”

“আমি জানতাম না ও প্রেগন্যান্ট…”

“আমিও না, জানলে এমনটা করতাম না। তবে ও বোধহয় ওর পাপের শাস্তি পেল, নিজের প্রথম আসা সন্তানকে নিয়ে যে পাপটা করেছিল…”

“দেবজিৎ বাবু, ছোটো মুখে একটা বড় কথা বলবো?”

“এরকম করে বলছ কেন পায়েল! তুমি আমার জন্য যা করলে…”

“আপনি প্লিজ ঈশানিকে ফিরিয়ে নিন। আই হোপ ও ওর ভুল বুঝতে পারবে।”

“তা সম্ভব নয় আর…”

“কেন? আপনি তো ওকে ভালোবাসতেন, হয়তো আজও বাসেন।”

“না আজ আর বাসিনা। পায়েল, একজন স্বামী তার প্রতারক স্ত্রীকে ক্ষমা করে দিতে পারে কিন্তু একটা ছেলে কি করে তার বাবার খুনিকে ক্ষমা করবে বলতে পারো? ঈশানিই তো আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে, প্রত্যক্ষ ভাবে হয়তো নয় কিন্তু পরোক্ষভাবে। আমার বাবার মত সজ্জন একজন মানুষের গায়ে ওরকম কলঙ্ক… উফফ!”

“শান্ত হোন দেবজিৎ বাবু, আয়াম সরি।”

“ইটস ওকে। পায়েল…”

“হুম?”

“একটা কথা ছিল…”

“বলুন।”

“আমায় বিয়ে করবে?”

“হাঃ হাঃ হাঃ… আপনি এসব কি বলছেন দেবজিৎ বাবু? আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি আজও ড্রিংক করে এসেছেন?”

“না পায়েল আমি সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কেই জিজ্ঞেস করছি, বিয়ে করবে আমায়?”

“আপনি কি প্রতিদান দিতে চাইছেন?”

“না। সব কিছুর প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। আমি …. আই রিয়েলি লাভ ইউ। যেদিন প্রথম তোমার কাছে যাই সেদিন জীবনে প্রথমবার ড্রিংক করেছিলাম তারপর তোমার শরীরের সন্ধানে গিয়েছিলাম। নিজের ফ্রাস্ট্রেশন তাড়াতে সেই সেই কাজ গুলো করেছিলাম যাকে একসময় ঘৃণা করতাম। কিন্তু আমি যে তোমার মনটাকে ভালোবেসে ফেলেছি পায়েল।”

“দেবজিৎ বাবু ভুলে যাবেননা আমি কি, ভদ্র সমাজে মুখ দেখানোর জন্য আমি নই।”

“তাহলে কে ভদ্র সমাজে মুখ দেখানোর যোগ্য পায়েল? ঈশানি? তুমি আমায় বলেছিলে পায়েল তোমায় একদল লোক জোর করে তুলে এনে এই পেশায় ঢুকিয়েছিল, তুমি নিজে তো চাওনি, আর এদিকে ঈশানির মত মেয়েরা স্বেচ্ছায়...।”

“এসব কথা সমাজ শুনবে না। আপনি প্লিজ আমায় ভুলে যান।”

“ভুলে কি করে যাব? চেনা নেই জানা নেই একটা লোক মদ খেয়ে তোমায় কাছে গিয়ে পড়লো, রোজই হয়তো এরকম অনেক লোক যায় কিন্তু তুমি আমার চোখ দেখে বুঝে গিয়েছিলে আমি তোমায় ভোগ করতে যাইনি, নিজের থেকে পালাতে গিয়েছিলাম তোমার কাছে। তারপর কত যত্নে কত ধৈর্য ধরে আমার কাছে শুনেছিলে আমার সব কথা। তারপর স্বেচ্ছায় তুমি আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে ময়দানে নেমেছিল। ওই রণীতের সাথে প্রেমের অভিনয় করা, ওকে টাকার লোভ দেখানো সব করেছিলে আমার জন্য। এমনকি আজ যে তুমি ঈশানিকে সবার অলক্ষ্যে সাহায্য করেছ সেটাও আমি জানি আমার কথা ভেবেই। এরপরও আমি কি করে তোমায় ভুলে যাব পায়েল? কি করে?”

“আপনি প্রলাপ বকছেন। ঈশানি না হোক অন্য কোনো ভালো মেয়ে আপনি ডিসার্ভ করেন।”

“প্লিজ আমায় ফিরিয়ে দিও না, আমি তোমাকে ওই অন্ধকার জগৎ থেকে বের করে আনতে চাই। পায়েল… তোমার কি আমার প্রতি কোনো অনুভূতি নেই?”

“আমরা বেশ্যা, আমাদের শরীর নিয়ে কারবার। কারুর প্রতি অনুভূতি আমাদের থাকতে নেই।”

“কি থাকতে আছে বা কি নেই তা আমি জানতে চাইনি পায়েল, আমি জানতে চেয়েছি তোমার আমার প্রতি কোনো অনুভূতি আছে কিনা।” সহসাই পায়েলের কাছে এগিয়ে আসে দেব, দু হাত দিয়ে ওর বাহু দুটো ধরে ফেলে। পায়েল চোখ বন্ধ করে জবাব দেয়, “না।”

“তাহলে আমার জন্য কেন করলে ওসব?”

“নিজের পাপ ধুতে একটু ভালো কাজ করতে চেয়েছিলাম।”

“তাই? তাহলে তোমার কোনো অনুভূতি নেই আমার প্রতি?”

“নাহ… নেই বললাম তো।” চোখ বন্ধ অবস্থাতেই চিৎকার করে ওঠে পায়েল।

ওর বাহুদুটো ছেড়ে দেয় দেব, ওর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চায়, “আমার ভাগ্যটা খুব খারাপ জানো তো পায়েল, যাকে যাকে ভালোবেসেছি সেই আমায় ছেড়ে চলে গেছে। জীবনে প্রথম যাকে ভালোবেসেছিলাম, হয়তো সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ভাবে যাকে ভালোবেসেছিলাম সে আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল আচমকাই, তারপর অনেক বছর পর ঈশানি এলো আমার জীবনে… সে ওরকম করলো। আজ তুমিও আমায় ফিরিয়ে দিলে…! জানো প্রথম ভালোবাসাকে হারিয়ে সেই ছোটো শহরটা থেকে ঘৃণায় পালিয়ে এসেছিলাম এখানে নতুন জীবনের সন্ধানে আর আজ দেখো এই বড় শহরটাও আমাকে দ্বিগুণ যন্ত্রনা দিলো আবার… 

ভালো থেকো পায়েল। আর কোনোদিনও হয়তো দেখা হবেনা, আমি চলে যাবো কোথাও… অনেক দূরে কোথাও… অনেক দূরে...”

“দেবজিৎ বাবু আপনার প্রথম ভালবাসা…”

“হারিয়ে গেছিল সে হঠাৎ, কোনোদিনও খুঁজে পাইনি তাকে। ছোটবেলার বন্ধু ছিলাম। তখন আমারা ক্লাস এইটে পড়তাম, একদিন স্কুল গিয়ে আর ফিরে আসেনি। অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছিল কিন্তু পাওয়া যায়নি সমদর্শীকে, আমার সমুকে…”

দেবের বাকি কথাগুলো আর কানে ঢুকছে না পায়েলের, কাঁপছে ওর শরীর। সময়ের স্রোত আরও একবার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে ওদের। সেদিন মদ্যপ দেবজিতের পকেট থেকে পড়ে যাওয়া আইডি কার্ডটা দেখে চমকে উঠেছিল সে; শিহরিত হয়েছিল তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসার মানুষটাকে এই অবস্থায় দেখে, নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল মানুষটাকে আবার সব ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু আজ মানুষটা এ কি চেয়ে বসলো তার কাছে? ইচ্ছে করেই নিজের পূর্বজীবনের পরিচয় লুকিয়ে গিয়েছিল পায়েল, কিন্তু তাও এ কি হলো! দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে পায়েলর মন, দেবের চোখে কাতর মিনতি...


  হঠাৎ করেই একটা কোকিল ডেকে উঠলো কোথাও, চমকে উঠলো ওরা, দেখলো মহানগরের আকাশেও লাগতে শুরু করেছে বসন্তের রঙ...

  

 শেষ...



Rate this content
Log in