Debdutta Banerjee

Drama

0.2  

Debdutta Banerjee

Drama

সুখের খোঁজে

সুখের খোঁজে

5 mins
1.5K


-''দাদা, খুব খিদে পেয়েছে রে। বাবা কখন আসবে ? আর পারছি না। ''

ছোট বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে দশ বছরের পুপাই বলে -''আর একটু দেরি হবে। তুই একটু ঘুমিয়ে নে। বাবা এলে ডেকে দেবো। '' 

-'' এমন তো কালকেও বলেছিলি। ডাকিসনি তো। সেই কোন সকালে একটু পাউরুটি খেয়েছিলাম। দুপুরে আজ ভাত ও বসায়নি বাবা । খালি পেটে কি ঘুম আসে ?''

ছোট তিতাই এর কথায় চোখটা ভিজে ওঠে পুপাইয়ের। 

মা থাকতে ওদের এতো কষ্ট ছিল না। যে করেই হোক পেট ভরে দুবেলা খেতে পেত ওরা। বাবা তো কখনো সংসারের দিকে তাকায়নি। চোলাই খেয়ে বাড়ি এসে মা কে পেদানো ছাড়া কিছুই করত না সারাদিন। 


সেই মা একটা অসুখে ভুগে চলে যেতেই ওদের এই দুর্দশা। স্কুলটা খোলা থাকলে তবু ওরা খেতে পায় পেট ভরে, রাতটা আর ছুটির দিনগুলো খুব কষ্ট। পুপাই চায়ের দোকানে বিকেল থেকে কাজ করে পাউরুটি আর বিস্কুট আনত আগে। এখন আবার কি সব শিশু শ্রমিক রাখা যাবে না, তাই কেউ কাজ দেয় না। তাছাড়া চায়ের দোকানদার বিশুর নজর খারাপ। তাই ওদিকে যায় না আর পুপাই। চার বছরের বোনটাকে আগলে রাখে শেয়াল কুকুরের থেকে সব সময়।

এখন গরমের ছুটি, সবে চারদিন হল স্কুল বন্ধ। প্রথম দু দিন বাবা দুপুরে ভাতে ভাত করেছিল। কাল থেকে সব বন্ধ। দু দিন বাড়িই ফেরেনি লোকটা। 

নীল আকাশের বুকে আইসক্রিমের মত সাদা মেঘের দল ভাসছে। সেদিকে তাকিয়ে তিতাই বলে -''মামন দি বলেছে মা ঐ মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে। ঐ মেঘের উপরে নাকি একটা খুব সুন্দর দেশ আছে। সেখানে কত খাবার, সবাই সুন্দর জামা পরে, বাগানে কত ফুল, ফল । মা আমাদের কেনো নিয়ে গেল না দাদা?''

ছোট বোনটাকে কোলের কাছে টেনে নেয় পুপাই। বলে -'' আমি একটা বড় সিঁড়ি বানাবো দেখিস। একদিন চুপি চুপি আমি আর তুই ঐ মেঘের দেশে চলে যাবো। মা আমাদের দেখে অবাক হয়ে যাবে। ''

-''আমি মায়ের সাথে কথাই বলব না। কেন আমাদের ফেলে চলে গেলো ?''

-''আচ্ছা, আমিও বলব না। এখন এই জলটুকু খেয়ে একটু ঘুমাতো। ''

জলের বোতল থেকে জল খাইয়ে বোনকে বিছানায় শুইয়ে দেয় পুপাই। এখন দুপুর। বাস রাস্তার ধারে পাইস হোটেলে ভিড় করে লোকে খাচ্ছে। বাবুয়া দা বলেছিল তিনটের দিকে গেলে একটু ভাত দেবে। পুপাই জানে অনেকেই ভাত ফেলে উঠে যায়। সেই এঁঁটো ভাত বাসন মাজার সময় একটা প্লাস্টিকে জমিয়ে রাখে বাবুয়া দা। ও বহুবছর ফরমাস খাটে দেবুদার হোটেলে।দেবুদার চোখ এরিয়ে আগেও কয়েকদিন দিয়েছে এমন পুপাইকে। মা সবসময় বলত কারো এঁটো খেতে নেই। কিন্তু খালি পেটে কি থাকা যায়? পেটের খিদা যে এঁটো বোঝে না। 

****


-''দাদা, তুই যে বলেছিলি একটা সিঁঁড়ি বানাবি, আমরা ঐ মেঘের উপরের দেশটায় যাবো ? ওখানে গেলেই কত খাবার ... মায়ের দেখা পাবো...''

জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তিতাইয়ের শরীর। দু দিন বৃষ্টিতে ভিজে আম কুড়িয়েছিল। তারমধ‍্যে পেটে তেমন খাবার নেই। কাল রাতে একটা ডাষ্টবিন থেকে আধ প‍্যাকেট নষ্ট হয়ে যাওয়া বিরিয়ানি এনেছিল পুপাই। ভোর থেকে বোনটা বমি করছে, তার সাথে জ্বর। বাবা শেষ তিনদিন আগে একবার এসেছিল।

জলপটির কাপড়টা বদলাতে বদলাতে পুপাই বলে -''বানাবো তো, বড় বড় বাঁশ কেটে আনতে হবে ঐ রেল লাইনের ধারের বাঁশ ঝার থেকে। ''

-'' আজ খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে রে দাদা। মা থাকলে খেতে পেতাম। ''

পাশের ঘরের মায়া মাসীর থেকে পাঁচটা টাকা নিয়ে পুপাই চিড়ে কিনে এনেছে। জল দিয়ে ধুয়ে নরম করে একটু নুন দিয়ে বোনের মুখে দেয় চামচ দিয়ে। কয়েক চামচ খেয়েই তিতাই বমি করে ফেলে। 

জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকতে থাকে তিতাই। মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলে -''সিঁড়িটা শক্ত করে ধর দাদা, আমি উঠে যাই। ঐ তো মা, সিঁড়ির মাথায়, মেঘের আড়ালে।'' অসহায় পুপাই বাইরে তাকায়। তিন দিন বৃষ্টির পর ঝকঝকে আকাশ। আজ আবার নীলের গায়ে সাদা মেঘের আলপোনা। সত‍্যি কি মা রয়েছে ওর পেছনে? সাদা মেঘের আড়ালে মায়ের মুখটাই যেন ভেসে ওঠে। সত‍্যি যদি একটা সিঁড়ি পেত পুপাই পৌঁছে যেত ঐ মেঘের দেশে, মা কে জোর করে ফিরিয়ে আনত আবার। 


***** 


সকাল থেকে তিতাই আজ একবারো চোখ খোলেনি। খেতেও চায়নি। জল ও খাচ্ছে না মেয়েটা।বাবার কোনো খবর নেই। বস্তির পাশে একটা ক্লাব আছে, ফ্রিতে একজন ডাক্তার আসে রবিবার। চার বছরের বোনকে কোলে নিয়ে সেখানে এসেছে পুপাই। বোনটার শরীরে কোনো ওজন নেই। 

-''একি!! একেবারে শেষ করে এনেছিস দেখি !! খেতে পেতো না নাকি ? '' ডাক্তার শর্মার চোখ কপালে। 

কম্পাউন্ডার কে ডেকে বললেন -''ক্লাবের ছেলেদের বলুন তো এখনি একবার করপোরেশনের হাসপাতালে নিতে। বড় কে আছে তোদের ঘরে ?'' 

-''বাবা তো কতদিন হল ঘরেই আসে না। আর কেউ নেই। '' পুপাই বলল।


কিন্তু হাসপাতাল ও জবাব দিল। ক্লাবের ছেলেরাই বাকি সব কাজ করল। নদীতে ডুব দিয়ে পুপাই যখন ঘরে ফিরল ওর গায়েও ধুম জ্বর। মায়া মাসি একটু দইচিড়া মেখে খাইয়েছিল। 

জ্বরের ঘোরে ভোর রাতে পুপাই দেখল মেঘের আড়ালে সেই সুন্দর দেশে পৌঁছে গেছে তিতাই। সেখানে কত খাবার। একটা পরীদের মত সাদা জামা পরে মায়ের কোলে বসে তিতাই কত কি খাচ্ছে। ওকেও হাতছানি দিয়ে ডাকছে তিতাই। 

-''তুই ও চলে গেলি আমায় ফেলে ? আমি কি করে যাবো বল তো ?'' কেঁদে ওঠে পুপাই।

-''আয় না দাদা, কত খাবার এখানে। চলে আয় তুই। '' 

-''কিন্তু কি করে যাবো। সিঁড়িটা তো বানাতে পারিনি আমি।''

-''সিঁড়িটা আর বানাতে হবে না। এই দেখ, এটা বেয়ে উঠে আয়। ''

একটা রামধনু রঙের মই নামিয়ে দেয় ওর বোন। 

হাসি ফুটে ওঠে পুপাইয়ের মুখে। টলোমলো পায়ে এগিয়ে যায় মইটার দিকে। মইটা বেয়ে ও উঠতে থাকে উপরে, ঐ মেঘের আড়ালে রয়েছে ওর মা, বোন। রয়েছে আনন্দ, রয়েছে খাবার, সুখের ঠিকানা। ওখানে গেলেই ও খেতে পাবে পেট ভরে। আর কষ্ট থাকবে না, মইটা বেয়ে উঠে যায় পুপাই সুখের খোঁজে।


একটু বেলায় লাল চা আর মুড়ি নিয়ে এসেছিল মায়া। সারা রাত ছেলেটা ভুলভাল বকেছে, দু বার ঘুমের ঘোরেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। চেপে শুইয়েছে মায়া। তবে ভোর থেকে অঘোরে ঘুমোচ্ছে ছেলেটা । মা টা চলে গিয়ে বাচ্চা দুটো ভেসে গেলো। দেখলেই কষ্ট হয়। চা আর মুড়িটা পাশে রেখে পুপাইকে দু বার ডাকে মায়া। কপালে হাত বুলোতে গিয়ে চমকে ওঠে ? গায়ে হাত দেয় !! ঠান্ডা শক্ত শরীরটায় প্রাণের চিহ্ন নেই আর, শুধু ঠোঁঁটের কোনে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত সুন্দর হাসি। 

 



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Drama